মাতারবাড়ীতে ১৫ গ্রাম পানির তলায়

ভাঙছে বেড়িবাঁধ, ভারি বর্ষণেও হচ্ছে জলাবদ্ধতা

ফরিদুল আলম দেওয়ান, মহেশখালী

বৃহস্পতিবার , ১১ জুলাই, ২০১৯ at ১১:১২ পূর্বাহ্ণ
14

কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পসহ দেশের মেগা মেগা উন্নয়ন প্রকল্পের জোন খ্যাত মহেশখালীর বিচ্ছিন্ন উপদ্বীপ মাতারবাড়ীর মানুষ যেন ত্রাহি সমস্যায় পতিত হয়েছে। একদিকে বঙ্গোপসাগরের করাল গ্রাসে বেড়িবাঁধ ভেঙে ঢুকছে লোনা পানি। অপরদিকে প্রবল বর্ষণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় ডুবছে লোকালয়ের ঘরবাড়ি। তার উপর কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত কোল পাওয়ার কর্তৃপক্ষের গাফিলতি ও খামখেয়ালিপনার কারণে স্লুইচ গেট বন্ধ থাকায় জলাবদ্ধতায় ডুবে মরছে স্থানীয় অধিবাসীরা। এ যেন জলে কুমির ডাঙায় বাঘ অবস্থা।
উপজেলার মাতারবাড়ীতে ১৪শ’ একর ও ১২শ’ একর জায়গা অধিগ্রহণ করে নির্মিত হচ্ছে ২৬শ’ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দু’টি কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র। তাছাড়া মাতারবাড়ীর পশ্চিমে জাইকার সহযোগিতায় সমুদ্র বন্দর নির্মাণের জন্য চলছে জরিপ কাজ। সব মিলিয়ে মাতারবাড়ী হতে যাচ্ছে মিনি সিঙ্গাপুর। তারপরেও মাতারবাড়ীর সাগর পাড়ের মানুষের আর্তনাদে যেন আকাশ বাতাস ভারি হয়ে উঠছে। প্রতিটি ঘরে ঘরে চলছে নীরব কান্না। মাতারবাড়ীতে এত উন্নয়ন তারপরও সুখে নেই এ ইউনিয়নের মানুষগুলো, বর্ষা শুরু হলেই পানির সাথে যুদ্ধ করে চলতে হয় তাদের। সাগরের জোয়ারের পানি আর বৃষ্টির পানিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় তলিয়ে গেছে মাতারবাড়ীর কমপক্ষে ১৫টি গ্রামের নিম্নাঞ্চল।
সরজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, এসব গ্রামের মধ্য রয়েছে, ১ নং ওয়ার্ডের পশ্চিম সিকদার পাড়া, পূর্ব সিকদার পাড়া, ২নং ওয়ার্ডের বান্ডি সিকদার পাড়া, খন্দার বিল, ৩ নং ওয়ার্ডের দক্ষিণ রাজ ঘাট, ৪ নং ওয়ার্ডের লাইল্যা ঘোনা, মনহাজির পাড়া, ৫ নং ওয়ার্ডের পশ্চিমে বেড়িবাঁধের ভাঙন ও স্লুইচ গেট বন্ধ থাকার কারণে পশ্চিম মনহাজির পাড়া, বলীর পাড়া, ৬ নং ওয়ার্ডের পশ্চিম তিতামাঝির পাড়া, পূর্ব তিতামাঝির পাড়া, ৭ নং ওয়ার্ডের রুস্তম দোনা স্লুইচ গেট বন্ধ থাকার কারণে পূর্ব মাইজপাড়া, ফুলজানমুরা, মোশারফ আলী পাড়া, নয়াপাড়া, মাঝির ডেইল, ৮ নং ওয়ার্ডের কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প সংলগ্ন মগডেইল এলাকা ও ৯ নং ওয়ার্ডের সাইরার ডেইল। এদিকে মাতারবাড়ী ইউনিয়নটি বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী হওয়ায় ঘূর্ণিঝড় ও দুর্যোগে তোপের মুখে থাকে প্রতিনিয়ত। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে মাতারবাড়ীর মানুষগুলো সব চাইতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে। স্থায়ীভাবে ব্লক দিয়ে বেড়িবাঁধ সংস্কার না করার কারণে বারবার ক্ষতির সম্মুখীন হয় উপকূলের এই গুরুত্বপূর্ণ ইউনিয়নটি। ক্ষতিগ্রস্ত মাতারবাড়ীবাসীর বেড়িবাঁধ সংস্কার ও স্লুইচ গেট নির্মাণের দাবি দীর্ঘদিনের হলেও নানা অজুহাত দেখিয়ে কাজের কোন প্রকার অগ্রগতি হয়নি এখনো। ফলে অতীতেও এ উপকূলের হাজার হাজার মানুষ দুর্যোগে প্রাণ হারিয়েছে। অপরদিকে মাতারবাড়ি ইউনিয়নের পশ্চিমে ষাইটপাড়া এলাকায় বেড়িবাঁধের আধা কিলোমিটার এলাকা নতুন করে সাগরে বিলীন হতে চলেছে। বেড়িবাঁধের বাকি এক কিলোমিটার অংশও যে কোন সময় ধসে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তাদের। তেমনটা হলে পুরো ইউনিয়ন সাগরের পানিতে তলিয়ে যাবে। মাতারবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাস্টার মোহাম্মদ উল্লাহ বারবার পানি নিষ্কাশনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে দাবি জানালেও কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি এতে কর্ণপাত না করার অভিযোগ খোদ চেয়ারম্যানের।
তিনি বলেন, আমি বারবার পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে আবেদন করার পরও তারা কোন ধরনের স্থায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছে না। মাঝে মাঝে জিও ব্যাগ দিয়ে বাঁধ নির্মাণ করলেও তা টেকসই না হওয়ায় সাগরের ঢেউয়ে বিলীন হয়ে যায়। চেয়ারম্যান মাস্টার মোহাম্মদ উল্লাহ আরো বলেন, সাইট পাড়া বেড়িবাঁধটি নির্মাণের জন্য দুইটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দিলেও তারা সময়মত কাজ করেনি। ওই বেড়িবাঁধের কাজ না করে দুই ঠিকাদারই এখন লাপাত্তা। তাই যে কোন মুহূর্তে বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকে বন্যার মত ভয়াবহ দুর্যোগ দেখা দিতে পারে মাতারবাড়ীতে।
চেয়ারম্যান মাস্টার মোহাম্মদ উল্লাহ আরো বলেন, পানি নিষ্কাশনের জন্য গত বছর যে দুইটি পাইপ বসানো হয়েছে তা দিয়ে সম্পূর্ণ পানি বের করা সম্ভব নয়। কিন্তু কোল-পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির কাছে বারবার বলা সত্ত্বেও তারা একটি স্লুইচ গেটের ব্যবস্থা না করায় এ দুর্ভোগের সৃষ্টি হচ্ছে মাতারবাড়ীতে। তবে এ বছর শীঘ্রই আগের পাইপ দুইটির পাশে আরো দু’টি পাইপ বসানো হবে বলেও জানান তিনি।

x