মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ কাজ শুরু

মহেশখালী প্রতিনিধি

ভিডিও কনফারেন্সে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

সোমবার , ২৯ জানুয়ারি, ২০১৮ at ৫:০৬ পূর্বাহ্ণ
499

মহেশখালীর মাতারবাড়িতে ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গণভবন থেকে গতকাল দুপুরে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তিনি এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভিত্তি স্থাপন করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ঘরে ঘরে বিদ্যুতের আলো জ্বালাটা শুধু এখন সময়ের ব্যাপার। দেশের প্রায় ৯০ ভাগ মানুষই বিদ্যুৎ পেয়ে গেছেন। আর ১০ ভাগ মানুষও পাবেন, সেদিকে লক্ষ্য রেখেই সরকার কাজ করে যাচ্ছে।’ মানুষের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা বৃদ্ধির সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধির বিষয়টি সম্পৃক্ত উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিদ্যুৎ পেলে মানুষের জীবনজীবিকার পথ খুলে যায়। আজকে ১৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমরা সক্ষম হয়েছি।’

জাপানের প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উপদেষ্টা কেনতারো সনুউরা এবং জাইকার জ্যেষ্ঠ সভাপতি ইনিচি ইয়ামাদাস গণভবন প্রান্ত থেকে এবং বাংলাদেশে জাপানের রাষ্ট্রদূত হিরোইসু ইজুমি মাতারবাড়ির অনুষ্ঠান স্থল থেকে অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. নজিবুর রহমান ভিডিও কনফারেন্সটি সঞ্চালনা করেন এবং বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব আহমেদ কায়কাউস প্রকল্পের ওপর অনুষ্ঠানে একটি পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনা উপস্থাপন করেন। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. তৌফিক এলাহী চৌধুরী এবং ড. গওহর রিজভী, বিদ্যুৎ ও জ্বালানী প্রতিমন্ত্রী নসল হামিদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক মো. আবুল কালাম আজাদ এবং সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্মকর্তবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। প্রকল্পটি উদ্বোধনের পরে প্রধানমন্ত্রী স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং স্থানীয় সাধারণ জনগণের সঙ্গে মত বিনিময় করেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এই নির্মাণ কাজ শুরু হল।

মহেশখালীর মাতারবাড়ি ও ধলঘাটা ইউনিয়নের ১৪১৪ একর জমিতে জাপান সরকারের সহযোগিতায় এবং জাপানের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতা সংস্থা জাইকার অর্থায়নে ৩৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হচ্ছে। মাতারবাড়ির এই বিদ্যুৎকেন্দ্র হবে বাংলাদেশের অন্যতম বড় বিদ্যুৎ প্রকল্প। পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের আওতায় যে বন্দর নির্মাণ করা হবে, পরে তাকে গভীর সমুদ্র বন্দরে রূপান্তরিত করা হবে। বিদ্যুৎ নিয়ে সরকারের মহাপরিকল্পনায় মাতারবাড়িকে ‘বিদ্যুৎ হাব’ হিসেবে গড়ে তোলার ঘোষণা রয়েছে। সরকার আশা করছে, বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও দেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ হলে মাতারবাড়ি একটি গুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে গড়ে উঠবে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ’৯৬ সালে সরকার গঠনের সময় দেশে ১৬শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ থাকার প্রসংগ উল্লেখ করে পরবর্তী বিএনপিজামায়াত সরকারের বিদ্যুতের উৎপাদন না বাড়িয়ে বরং কমিয়ে ফেলারও সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ২০০১ সালে আমরা ৪ হাজার ৩শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দেশে রেখে যাই আর ২০০৯ সালে সরকার গঠনের সময় দেখি সে বিদ্যুৎ ৩ হাজার ২শ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে। আর এখন তাঁর সরকার দেশে ১৬ হাজার মেগাওয়াটের অধিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করেছে।

সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনার সর্বাগ্রে প্রত্যন্ত এবং অবহেলিত তৃণমূল মানুষ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই মহেশখালীতেই আগে ঝড়জলোচ্ছাস সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হতো। প্রকৃতির খেয়াল খুশিতেই এই এলাকার মানুষের জীবনজীবিকা চলে। তিনি বলেন, আজ এখানে বিদ্যুৎ কেন্দ্র হচ্ছে, আমরা এলএনজি টার্মিনাল করছি এবং মহেশখালীসোনাদিয়া হয়ে ডিপ সী পোর্টও গড়ে উঠছে। তাতে একদিকে এখানকার মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরো গতিশীলতা পাবে এবং তাদের জীবন মান বাড়বে।

বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগও তাঁর সরকারের সময়ই গৃহীত উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কোন কোন এলাকায় দেখলাম আমি দিনের পর দিন বিদ্যুৎ নেই। তখনই নিদ্ধান্ত নিলাম এটা সরকারের একার পক্ষে করা সম্ভব নয়, এখানে আমাদের বেসরকারী খাতকে উন্মুক্ত করে দিতে হবে। তিনি বলেন, তখন আমরা আইন করে বেসরকারী খাতকে উন্মুক্ত করে দিয়েছিলাম বলেই আজকে সরকারীবেসরকারী ক্ষেত্রে নতুন নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে উঠে মানুষের জীবনমানকে উন্নয়নের সুযোগ করে দিচ্ছে।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশে নতুন কিছু করতে গেলেই বাধা আসে। অনেক ফর্মূলা আসে। অনেক তাত্ত্বিক গজিয়ে যায়, তারা নানা রকমের কথা বলে।’

প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণের শুতে ২০১৬ সালের ১ ও ২ জুলাই রাজধানীর গুলশানের হলি আর্টিজেন বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলায় বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পে কর্মরত ৭ জন জাপানী নাগরিক নিহত হবার ঘটনাটি স্মরণ করে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি পুনরায় সমবেদনা জানান। তিনি এতকিছুর পরেও বাংলাদেশে আসার এবং কাজ চালিয়ে যাবার জন্য জাপানের প্রধানমন্ত্রী এবং জাইকাকেও ধন্যবাদ জানান।

প্রধানমন্ত্রী এ সময় বাংলাদেশে কর্মরত জাপানের নাগরিকসহ বিদেশিদের নিরাপত্তার বিষয়টিতে সকলকে আশ্বস্ত করে বলেন, ‘আমি এতটুকু বলতে পারি আমাদের তরফ থেকে তাদের নিরাপত্তা দিতে যতটুকু করার দরকার আমরা তা করে যাচ্ছি। আমরা তা করে যাবো এবং আমি স্থানীয় জনগণ বিশেষ করে কক্সবাজার এবং মহেশখালীতে আমাদের যে জনপ্রতিনিধি, দলের নেতাকর্মী এবং স্থানীয় জনগণ সবাইকে আমি এ আহবান জানাবোআপনারাও তাদের নিরাপত্তার দিকটাতে খুব ভাল ভাবে লক্ষ্য রাখবেন। কারণ তাঁরা আমাদের মেহমান, তাঁরা আমাদের উন্নয়ন সহযোগী, আমাদের দেশের উন্নতির জন্যই তাঁরা কাজ করে যাচ্ছেন।’

ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী সংসদ সদস্য আশেক উল্লাহ রফিক, মাতাবাড়ির ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মাস্টার মোহাম্মদ উল্লাহ ও স্কুলছাত্রী তানজিলার সাথে কথা বলেন ।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, মাতারবাড়ি কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পের অধিগ্রহণ হওয়া জমির মালিকদের আমরা নিরাশ করিনি, করবো না। তাদেরকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়েছে এবং অবশিষ্টদের দেয়া হচ্ছে। একই সাথে মাতারবাড়ির মানুষের কর্মসংস্থান করা হবে।

স্কুলছাত্রী তানজিলার বক্তব্যের প্রেক্ষিতে শেখ হাসিনা বলেন, মাতারবাড়িকে আধুনিকায়ন করা হবে। সেখানে একটি আধুনিক মানের কলেজ ও সুপরিসর হাসপাতাল নির্মাণ করা হবে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠান উপলক্ষে মাতারবাড়িতে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কক্সবাজার জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোস্তাক আহামদ চৌধুরী, কক্সবাজার সদররামু আসনের সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমল, উখিয়াটেকনাফ আসনের সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি, চকরিয়াপেকুয়া আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ইলিয়াছ, চট্টগ্রাম উপবিভাগীয় কমিশনার নিজাম উদ্দীন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মাহিদুর রহমান, কোল পাওয়ার জেনারশনের এমডি আবুল কাশেম, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এড. সিরাজুল মোস্তফা, সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমান, মহেশখালী উপজেলা চেয়ারম্যান হোসাইন ইব্রাহিম, চকরিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর আলম, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল কালাম, ধলঘাটার চেয়ারম্যান কামল হাসান প্রমুখ।

x