মাগফেরাতের প্রথম দিনে দুই প্রতিবন্ধীর প্রার্থনা

শান্তি-সাম্য-মৈত্রীর অনাবিল অমিয় ধারা বর্ষিত হোক

মো. জামাল উদ্দিন, লোহাগাড়া

সোমবার , ৪ জুন, ২০১৮ at ৪:৩১ পূর্বাহ্ণ
21

মাহে রমজানের প্রথম ১০ দিন রহমতের চাদোয়ায় ডেকে যায় সমগ্র মুসলিম উম্মাহ। পরবর্তী ১০ দিন মাগফেরাতের সুর ধ্বনিত হয় এবং পরবর্তী ১০ দিন নাজাতের সেজদায় বান্দা আল্লাহর কাছে হাজির হন। গত ২৯ মে ছিল মাহে রমজানের ১১তম দিবস। এদিন ছিল মাগফেরাতের প্রথমদিন। লোহাগাড়ার বটতলী মোটর স্টেশনে সোনালী ব্যাংকের সিড়ির সামনে তপ্ত দাবদাহে অপেক্ষমান দু’জন প্রতিবন্ধী যথাক্রমে মোহাম্মদ হোসেন ও আবদুল আলিম প্রার্থনা করেছিলেন সবার জীবনে শান্তিসাম্যমৈত্রীর অনাবিল অমিয়ধারা যেন বর্ষিত হয়। তারা এসেছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সমাজসেবা মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রদত্ত পঙ্গুভাতা উত্তোলনের জন্য। ভরদুপুর পর্যন্ত তপ্ত গরমে তারা দু’জনই ছিল অপেক্ষমান। শক্তিহীন বলে উপরে উঠতে পারছিলেন না। নিজের জীবনের কষ্ট একপাশে রেখেই তারা স্বপ্ন দেখছেন আগামী দিনে তাদের ভাতা বৃদ্ধি হবে। বাজেটের বাড়তি ভাড়া পেয়ে আগামী দিনের কষ্টের প্রহর অতিক্রম করতে পারবেন। মোহাম্মদ হোসেনের এসেছেন লোহাগাড়ার পুটিবিলা গৌড়স্থান এলাকা থেকে। তিনি জানালেন, ২০০৫ সালে গাছের মগঢাল কাটতে গিয়ে অসাবধানতাবশতঃ নিচে পড়ে গিয়ে আহত হন। দেড় মাস চলৎশক্তিহীন অবস্থায় হাসপাতালের বিছানায় ছিলেন। তার দু’মেয়ে ছিল। একজন মেয়ে মারা যায়। চলতে ফিরতে পারেন না বলে বৌটিও তাকে ছেড়ে চলে যায়। অনেক কষ্টে একটি মেয়ে তার সেবা করে চলছিল। এক পর্যায়ে গ্রামবাসীদের সহায়তায় মেয়েটিকে বিয়ে দিয়ে দেন। ২০০৫ সালের আগে মোহাম্মদ হোসেন মধ্যপ্রাচ্যে গিয়েছেন। সেখানে দুর্ভাগ্য বশতঃ ধরা পড়ায় সৌদি সরকার তাকে দেশে পাঠিয়ে দেন। সেখানে দূর্ঘটনায় পতিত হন। বিদেশ থেকে পাঠানো টাকায় স্ত্রীকন্যাগণ সুন্দরভাবে দিনযাপন করতেন। তখন তার অন্যরকম কদর ছিল। পঙ্গু হওয়ার পরে একটি ভাতা ফরমের জন্য বিভিন্নস্থানে দেনদরবার করেন। তখন তাকে সবাই তুচ্ছজ্ঞান করতেন। তদানীন্তন ইউপি মেম্বার ছরওয়ার কামাল একটি ফরম দেন। পরবর্তী পর্যায়ে তিনি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হওয়ায় মোহাম্মদ হোসেনকে একটি পঙ্গুভাতার বইয়ের ব্যবস্থা করে দেন। তখন থেকে তিনি প্রতি মাসে ৬শ টাকা। পরবর্তীতে ৭শ টাকার উপরে নির্ভরশীল হয়ে কোন রকমে দিনাতিপাত করছেন। নিজস্ব কোন ঠাঁই না থাকায় পাশে নদীর ধারে একটি টংঘরের উপরে দিনাতিপাত করেন। হাঁটতে পারেন না বলে ৬ মাসের ৪ হাজার ২শ টাকা ভাতা উত্তোলনের জন্য ৫শ টাকা ভাড়ায় একটি ভ্যানগাড়ি নিয়ে দীর্ঘপথ অতিক্রম করে সোনালী ব্যাংকে এসেছেন। সকাল ৯টায় বই জমা দিয়েছেন। কিন্তু টাকার কোন খবর নেই। পাশে মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনের সারিতে ভ্যানগাড়িটি ঠাঁই শুয়ে আছেন। এক পাশে ময়লা আবর্জনার ডাষ্টবিন। সেখানে লাওয়ারিশ ময়লাআবর্জন নিয়ে টানাটানি করে লুটোপুটি খায়। আর মোহাম্মদ হোসেন অপেক্ষা করে কখন সোনালী ব্যাংকের অফিস থেকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের লোকজন তার নাম ডাক দেয়। মোহাম্মদ হোসেন আশা করছেন যদি ভাতার টাকা তার ঠিকানা পাঠিয়ে দেয়া হয় তাহলে দূর্ভোগ লাঘব হবে। তার সে আশা পূরণ হবে কিনা সেটি তিনি বলতে পারেন না। স্থানীয় চৌকিদার তাকে বলেছেন আগামী দিনে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা পঙ্গুভাতা বাড়িয়ে দেবেন। সে দিনের সেই সুখবর শোনার জন্য মোহাম্মদ হোসেনের অধির আগ্রহের প্রহর আলোর পথ পাবে। তবে তার জন্য আগামী বাজেট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে বলে চৌকিদার আরো জানিয়েছেন।

অপর এক প্রতিবন্ধী আবদুল আলিম তিনিও পুটিবিলার তাঁতীপাড়া থেকে লোহাগাড়া বটতলীতে এসেছেন ভাতার জন্য। মোহাম্মদ হোসেনের ভ্যানগাড়ি হেলান দিয়ে অপর এক গাড়িতে বসেছিলেন। তারই একই বক্তব্য। এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম মানুষের অবস্থার উন্নতি ও বাঙ্গালীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা সংগ্রামে তিনি শহীদ হয়েছেন। তারই কন্যা বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় দেশের অন্যান্য স্থানের মতো লোহাগাড়া ও সর্বক্ষেত্রে সর্বসূচকে দেশ উন্নয়নের সিঁড়িতে উপরের দিকে উঠে যাচ্ছেন। মানুষ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে চলছেন। পঙ্গু প্রতিবন্ধীসহ মায়েরা পর্যন্ত ভাতার টাকায় সুন্দর দিন যাপন করছেন। আগামী ঈদেও তারা নতুন পোষাকে ছেলেমেয়েদেরকে নিয়ে দিন অতিবাহিত করবেন। তবে একজন প্রতিবন্ধীর অসহায়ত্বের সুযোগে একটি মহল ব্যবসা করছেন বলে আবদুল আলিম ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। প্রতিবন্ধীকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে কম্বল দেয়ার নামে কিংবা নামমাত্র সামান্য কিছু টাকা যাকাত ফিতরা দেয়ার নামে ঢেকে এনে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বসিয়ে রাখেন। ফটো তুলেন। পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়। তারা বাহবা কুড়ান। আর প্রতিবন্ধীদের দুঃখের তিমির আরো গাঢ় হয়। বৎসরের ১২ মাস কিভাবে কাটে সে খবর ক’জনইবা রাখে। তবুও সান্তনা একটাই দেশের মানুষের কল্যাণে জননেত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামীলীগ সরকার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। সরকারের এ প্রচেষ্টায় প্রতিবন্ধীদের সৌভাগ্যের স্বপ্নরেখা দিগন্ত পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে। প্রতিদিন দুঃখের সূর্য অস্তমিত হয় আগামী দিনের নতুন প্রভাত উদয়ের প্রত্যাশা নিয়ে।

x