মাউশিকে ধন্যবাদ, তবে আরেকটি পরিপত্র জারি হবে কি?

মাধব দীপ

শনিবার , ২৭ এপ্রিল, ২০১৯ at ১১:০৯ পূর্বাহ্ণ
181

গত ২৪ এপ্রিল মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর (মাউশি) বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পালনের জন্য কিছু নির্দেশনা জারি করেছে। দারুণ কিছু সিদ্ধান্ত সেসব। স্বাক্ষর করেছেন পরিচালক (মাধ্যমিক) প্রফেসর ড. আবদুল মান্নান। যে পরিপত্র তিনি জারি করেছেন তা এখন অনলাইন দুনিয়ায় ভাইরাল। ব্যাপক প্রশংসিত হচ্ছে সেটি। আমার চোখে পড়ার পর আমি অভিভূত হয়েছি; যেন এই সিদ্ধান্তগুলো আমার জন্যও দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত। শুধু আমার কেনো, যেকোনো সচেতন মানুষমাত্রই সেসবের বাস্‌তবায়ন চাইবেন।
পরিপত্রের মাধ্যমে জারি করা নির্দেশে – শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে কিংবা বাইরে শিক্ষার্থীদের সামনে ধূমপান না করতে শিক্ষকদের প্রতি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই নির্দেশনায় শিখন-শিখানো কার্যক্রম পরিচালনার সময় কিংবা শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে শিক্ষকদের পান, জর্দা ও গুল গ্রহণ না করার জন্যও বলা হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাস তৈরির জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি বিজ্ঞান বিভাগের পরামর্শে খাদ্য তালিকা তৈরি করে দেওয়া হয়েছে এবং বিদ্যালয়ের আশেপাশে ভ্যানগাড়ি বা দোকানে যেসব খাবার বিক্রি হয় তা তদারকির আওতায় আনার জন্য প্রতিষ্ঠান প্রধানদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অন্য আরেকটি আদেশে- বিদ্যালয়ের সহশিক্ষা কার্যক্রমের পুরস্কার হিসেবে ক্রোকারিজ সামগ্রী না দেওয়ার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
আমার আজকের এই লেখার বিষয় এই শেষ বিষয়টি ঘিরেই। নির্দেশনায় এ প্রসঙ্গে বলা হয়- ‘বিদ্যালয়গুলোর সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রমে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে ক্রোকারিজ সামগ্রী দেওয়া হয়। এ ধরনের পুরস্কার শিখন-শেখানো কার্যক্রমের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে গুণগত শিক্ষা অর্জনের জন্য অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পুরস্কার হিসেবে বয়স উপযোগী মানসম্মত বই অথবা শিক্ষা উপকরণ দেওয়ার জন্য বলা হয়।
আবারও বলছি- দারুণ একটি খবর এটি। কেননা, ছোটোবেলা থেকেই দেখে এসেছি (এখনও আশে-পাশে দেখছি)- বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার পুরস্কার হিসেবে ক্রোকারিজ সামগ্রী কম-বেশি প্রতিবারই দেওয়া হচ্ছে। এই অভিজ্ঞতা হয়তো দেশের গ্রাম কিংবা শহরের সকল সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী অর্জন (!) করেছেন ও করছেন।
খেয়াল করলেই আমরা বুঝতে পারবো- এই ধরনের পুরস্কার যথেষ্ট জেন্ডার অসংবেদনশীল। কেননা, এধরনের পুরস্কার ঘর-কন্নার সঙ্গে জড়িত হওয়ায় শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার বিষয়ে উৎসাহ বেশি বোধ করার চেয়ে ‘সাংসারিক আইটেম বৃদ্ধি পেল’ ভেবে আটপৌরে পারিবারিক-বিষয়ে প্রাপ্তি (!) যোগ হওয়ার তৃপ্তি লাভ করতো। অধিকাংশ সময়েই হয়তো তা মনের অজান্তেই ঘটতো। যার বহিঃপ্রকাশ জীবনের কোনো না কোনো সময় ঘটতোই। তাই তো আমরা দেখি- পরিণত কিংবা অপরিণত বয়সী নারী-পুরুষ নির্বিশেষে আমাদের দেশের প্রায় সবাই-ই ঘর-কন্নার কাজকে নারীর কাজ মনে করে। আমি মনে করি, পরিপত্রের এই নির্দেশ- শিক্ষার্থীদের মনোজগতে দারুণ পরিবর্তন আনবে। আর বইপত্র পড়ার কী লাভ- সে কথা আর নাইবা বললাম!
এবার যদি আরেকটি বিষয়ে পরিবর্তন আসে- তবে আরও ভালো লাগবে। এগিয়ে যাওয়ার লক্ষণ আরও স্পষ্ট হতো। আর সেটি হচ্ছে- খেলাধুলা নিয়ে। গ্রাম-শহর; স্কুল-কলেজ এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও দেখি- এই খেলাধুলা নিয়ে জেন্ডার বৈষম্যকে প্রকট করে তোলা হচ্ছে। কী, বিশ্বাস হচ্ছে না, প্রিয় পাঠক? তাহলে বলুন তো, দেশের প্রায় সব শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে এখনও কেনো ছাত্রদের জন্য ক্রিকেট, ফুটবল, হা-ডু-ডু, মোরগ লড়াই এবং ছাত্রীদের জন্য হাড়ি ভাঙা, চেয়ার খেলা, বালিশ খেলা, রশি টানাটানি ও মাছখেলা রাখা হয়?
আচ্ছা, আমরা যদি নারীর জন্য নির্ধারিত ওই খেলাগুলো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে এর মধ্যে নিহিত থাকা ‘সমাজবাস্তবতার প্রতীকী চিত্র’ খোঁজার চেষ্টা করি তবে দেখবো- ‘হাড়ি ভাঙা’র খেলার মাধ্যমে নারীকে সংসার ভাঙার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়ে থাকে; ‘চেয়ার খেলা’য় নারী দৌড়লেও সেই দৌড় লজ্জামাখা (প্রবাদে তো আছেই ‘লজ্জা নারীর ভূষণ’) হওয়ায় পুরুষের জন্য হয়ে ওঠে বেশ দর্শনীয়; ‘বালিশ খেলা’ দ্বারা নারীর ‘কামুক’ মনোভাব ফুটিয়ে তোলা হয়ে থাকে; ‘রশি টানাটানি’ খেলা দ্বারা সংসারের মধ্যে স্বার্থের টানাটানি শেখানো হচ্ছে যেখানে নারীকে জন্মগতভাবে (‘নারীর জন্ম তো পরের ঘর আলোকিত করতে’, সমাজে চালু থাকা এই প্রবচন দ্বারা নারীকে স্বার্থপর হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে) স্বার্থপর হিসেবে ভাবা হয়ে থাকে; আর ‘মাছ খেলা’ দ্বারা নারীর শারীরিক শক্তিহীন পরিশ্রমবিমুখ চরিত্র গড়ার চেষ্টা করা হয়ে থাকে। সমাজ এভাবেই দিনে-দিনে খেলাধুলার মাধ্যমেও নারীকে অবচেতনভাবে ‘অক্রিয়’ হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করে চলেছে। পুরুষের জন্য নির্ধারিত খেলাধুলার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ এই লেখায় আর নাইবা করলাম।
আচ্ছা, স্কুল-কলেজের কথা বাদ-ই দিলাম। প্রথাগত সমাজব্যবস্থায় যে খেলাগুলো কেবলই নারীর জন্য নির্দিষ্ট করে রাখা হয়েছে সেই খেলাধুলা কেন বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও ছাত্রীরা খেলবে? এর বাইরে গিয়ে কি ভাবা যায় না? বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কি এই প্রথাগত নিয়মের বাইরে গিয়ে ভাবতে প্ররোচিত করার কথা না শিক্ষার্থীদের?
অবশ্য, আশার কথা হল, এতদিন ধরে ‘পুরুষালি’ খেলা বলে পরিচিত এই ফুটবল ও ক্রিকেটের খেলায়ও বিশ্বের নারীরা পারদর্শিতা দেখাচ্ছে। পারদর্শিতা দেখাছে আমাদের এই বাংলার মেয়েরাও। নারীদের ক্রিকেট ও ফুটবল খেলার বিশ্বকাপের আসর বসছে, নানা ধরনের আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হচ্ছে। এবং এটাই সত্য যে- খেলার কোনো নির্ধারিত ‘শ্রেণি’ নেই। নারী-পরুষ সকলেই যেকোনো খেলা খেলতে সক্ষম। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সময়ের অগ্রগতি আমাদের এই মেসেজ-ই দিচ্ছে।
কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রীদের জন্য হাড়ি ভাঙা, চেয়ার খেলা, বালিশ খেলা, রশি টানাটানি ও মাছখেলা ইত্যাদি বিষয়ে নিরুৎসাহিত করার জন্য কোনো পরিপত্র জারি হবে কি? যথাযথ কর্তৃপক্ষ নিশ্চয়ই সেটি ভেবে দেখবেন একদিন।
লেখক: শিক্ষক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

x