মহিমান্বিত রজনী লাইলাতুল কদর

মঙ্গলবার , ১২ জুন, ২০১৮ at ৭:২৪ পূর্বাহ্ণ
90

হাজার মাসের চেয়েও উত্তম যে রাত, পবিত্র কোরআনুল করিম যে রাতে অবতীর্ণ হয়েছে আজ সেই মহিমান্বিত রজনী। সূর্য অস্ত গেলেই শুরু হবে পবিত্র লাইলাতুল কদর বা মহিমান্বিত রজনী। লাইলাতুল কদরে আল্লাহপাক মানবজাতির পথ প্রদর্শনকারী কিতাব পবিত্র আল কোরআনকে লওহে মাহফুজ থেকে পৃথিবীর মানুষের জন্য নাজিল করেন। মহানবী হযরত মুহাম্মদ ()-এর ওপর পবিত্র কোরআন নাজিল হয় দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে। পবিত্র কোরআন নাজিলের শুভ সূচনার রাতকে আল্লাহতায়ালা মহিমান্বিত রাত হিসাবে অভিহিত করেছেন। আল্লাহপাক বলেছেন: নিশ্চয়ই আমি পবিত্র কোরআন নাজিল করেছি লাইলাতুল কদর বা কদরের রাতে। হে মুহম্মদ, তোমার কি জানা আছে কদরের রাত কি? কদরের রাত হচ্ছে হাজার মাসের চেয়ে উত্তম একটি রাত।

মুসলমানদের কাছে শবে কদর অত্যন্ত মহিমান্বিত একটি রাত। ‘লাইলাতুল কদর’ আরবি শব্দ। শবে কদর হলো ‘লাইলাতুল কদর’এর ফারসি পরিভাষা। ‘শব’ অর্থ রাত আর আরবি ‘লাইলাতুন’ শব্দের অর্থও রাত বা রজনী। কদর অর্থ সম্মানিত, মহিমান্বিত। সুতরাং লাইলাতুল কদরের অর্থ সম্মানিত রজনী বা মহিমান্বিত রজনী।

প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (.) বলেছেন, তোমরা রমজান মাসের শেষভাগে পবিত্র লাইলাতুল কদর তালাশ করো। হাদিসের ভাষ্য মতে, রমজান মাসের শেষাংশের যে কোনো বিজোড় রাত অর্থাৎ ২১, ২৩, ২৫, ২৭, ২৯এর মধ্যে যে কোনো রাতই লাইলাতুল কদর। এ জন্য রমজান মাসের শেষ ১০ দিনে ইতেকাফের বিধান রাখা হয়েছে যাতে ইতেকাফকারীরা সহজেই লাইলাতুল কদর পেতে পারে এবং এর ফজিলত লাভ করতে পারে। আলেম সমাজের অধিকাংশের মতে, ২৭ রমজানের রাতই পবিত্র লাইলাতুল কদর। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ)-এর বর্ণনা মতে, রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর যুগে কয়েকজন সাহাবী ২৭ রমজানের রাতকে লাইলাতুল কদর হিসাবে স্বপ্ন দেখছিলেন। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: আমাকেও তোমাদের মত ২৭ তারিখ রাতকেই লাইলাতুল কদর হিসাবে স্বপ্ন দেখানো হয়েছে। অতএব, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি লাইলাতুল কদরকে নির্দিষ্ট করতে চায় সে যেন ২৭ তারিখ রাতকে নির্বাচন করে নেয়।

আমাদের দেশে ২৭ রমজানের রাতকেই লাইলাতুল কদর হিসাবে গণ্য, মান্য ও পালন করা হয়। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে রাতটি পালিত হয়। রাতভর নামাজ, দোয়াদরূদ, জিকিরআজকার পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত ইত্যাদির মাধ্যমে ধর্মপ্রাণ মানুষ রাতটি অতিবাহিত করে। এ বিশেষ রাতে মসজিদগুলোতে মুসল্লীদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।

হযরত ইবনে আব্বাসের (রা) বর্ণনা মতে, শবে বরাতে আল্লাহ এক বছরের জন্য বান্দার রুজিরিজিক, হায়াতমউত ও অন্যান্য তকদীরী ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, আর লাইলাতুল কদরে সেই সকল সিদ্ধান্তের প্রয়োগ ও রুজিরিজিক প্রভৃতি সরবরাহের দায়িত্ব আল্লাহ সংশ্লিষ্ট ফেরেশতাদের হাতে তুলে দেন (কুরতুবি)। তাই নফল নামাজ আদায়, কোরআন তিলাওয়াত, জিকিরআজকার, তাসবিহতাহলিল, দরূদ শরীফ পাঠ, দানসদকা ইত্যাদির মাধ্যমে ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ এই রাতটি উদযাপন করে থাকেন।

পবিত্র কোরআনের বর্ণনা মতে, কদরের রাতে আল্লাহর নৈকট্যশীল ফেরেশতারা হযরত জিবরাইল ()-এর নেতৃত্বে পৃথিবীময় ঘুরে বেড়ান। তারা আল্লাহর ইবাদতে মশগুল মানুষের প্রতি সালাম ও বিশেষ বার্তা প্রদান করেন। আল্লাহপাক বলেছেন: ফেরেশতারা জিবরাইলের নেতৃত্বে এই রাতে পৃথিবীতে নেমে আসে এবং ফজর পর্যন্ত শান্তির বার্তা বিতরণ করে। বিশ্বময় যে অশান্তি ও হানাহানি বিরাজ করছে তাতে এখন সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন শান্তি এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। এই বিবেচনায় আজকের রাতটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ সহজেই অনুমেয়। শান্তি প্রদানের মালিক আল্লাহপাক। তিনি আজ রাতে ফেরেশতাদের মাধ্যমে শান্তির বার্তা বিতরণ করবেন। এই সুযোগ বিশ্ব মুসলিমের জন্য এক বিশেষ ও বিরল সুযোগ। ধর্মপ্রাণ মানুষেরা এ রাত অতিবাহিত করেন ক্ষমা প্রার্থনা ও কল্যাণ কামনা করে। উল্লেখ্য, এ রাত ছাড়া শতায়ু মানুষের পক্ষেও এত ফজিলত আর কোনো কিছুর মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব নয়। প্রতিটি মুসলমানের উচিত এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আল্লাহর রহমত ও নৈকট্য লাভ করা।

পবিত্র কোরআন নাজিলের এ মাসকে আল্লাহপাক রোজার মাস হিসাবে নির্ধারণ করেছেন। পবিত্র কোরআনকে আল্লাহ মুত্তাকিদের পথপ্রদর্শক হিসাবে নির্ধারণ করেছেন। আর রোজাকে তাকওয়া অর্জনের উপায় হিসাবে বর্ণনা করেছেন। বস্তুত, তাকওয়া অর্জনকারীকেই মুত্তাকি হিসাবে অভিহিত করা হয়ে থাকে। পবিত্র কোরআন ও রোজার লক্ষ্য অভিন্ন; মানুষকে মুত্তাকি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে আল্লাহর করুণা ও নৈকট্য অর্জনের অধিকারী করা। রোজা হলো মুত্তাকি হওয়ার প্রশিক্ষণ। আর মুত্তাকির জীবনবিধান হলো পবিত্র আল কোরআন। পরহেজগার মানুষই আল্লাহপাকের নৈকট্য ও করুণা লাভ করতে পারে। মাহে রমজানে যারা রোজা রেখেছেন, ইবাদত বন্দেগী করেছেন, তারা তাদের কাঙিক্ষত প্রাপ্তি লাভ করুক এটাই কাম্য।

এ রাতে ইবাদতে মশগুল বান্দাহদের জন্য অবতরণকৃত ফেরেশতারা দোয়া করেন (হাদিস)। ‘যে ব্যক্তি লাইলাতুল কদরে ঈমান সহকারে ও আল্লাহর কাছ থেকে বড় শুভফল লাভের আশায় ইবাদতের জন্য দাঁড়িয়ে থাকবে, তার পেছনের সব গুনাহ মাফ হয়ে যাবে’ (বুখারি ও মুসলিম)। এ রাতের কল্যাণ থেকে একমাত্র হতভাগ্য লোক ছাড়া আর কেউ বঞ্চিত হয় না (ইবনে মাজাহ ও মিশকাত)

আল্লাহপাক আমাদের লাইলাতুল কদর নসীব করুন। সংহতি বৃদ্ধি করুন। বিশ্ব মুসলিমের জন্য সার্বিক উন্নয়ন, কল্যাণ ও মুক্তির ব্যবস্থা করে দিন, আজকের রাতে এটা একটি বড় প্রত্যাশা। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সকলকে তার রহমতের ছায়াতলে আশ্রয় দান করুন, এই কামনা করি।

x