মহাবিপর্যয়ের হাতছানি

অ্যান্টিবায়োটিক

মো. আবুল হাসান, খন রঞ্জন রায়

শনিবার , ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৯:০০ পূর্বাহ্ণ
130

 

 

 

১৯২৮ সালে জীবাণুবিদ আলেকজান্ডার ফ্লেমিং পেনিসিলিন আবিষ্কার করার পর চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক অসাধারণ ঘটনা ঘটে। অলৌকিকভাবে আবিস্কৃত এই অ্যান্টিবায়োটিক অপ্রতিরোধ্য সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য মানব সভ্যতার এক অনন্য হাতিয়ার হয়ে ওঠে। পেনিসিলিন আবিষ্কৃত হওয়ার আগ পর্যন্ত সংক্রামক রোগ প্রতিকারে কার্যকর কোন ব্যবস্থা বা অ্যান্টিবায়োটিক ছিল না। কার্যকর কোন ব্যবস্থা বা অ্যান্টিবায়োটিকের অভাবে তখন বিশ্বব্যাপী লাখ লাখ মানুষ সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করত।

অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট অথচ জীবন রক্ষাকারী এই মানব সভ্যতার জন্য এক ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে যাচ্ছে। এই বিপর্যয়ের মাত্রা অনিশ্চিত, ভেদাভেদ অনির্ধারিত, ধনীগরিব, শিশুবয়স্ক, সুস্থপ্রতিরোধ ক্ষমতাবিহীন রোগি কেউই এই বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাবে না। তখন একের দোষ অন্যের ওপর চাপানো ছাড়া গত্যন্তর থাকবে না। এই সংকট সৃষ্টি হচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিকের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারে বা অপ্যবহারের ফলে।

চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া বা পরামর্শকৃত মাত্রার চেয়েও বেশি ওষুধ নিয়ম না মেনে ইচ্ছেমতো সেবন করার প্রবণতা বাংলাদেশে ব্যাপক। বিষয়টি নিয়ে এখন চিকিৎসক ও চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের নতুন করে ভাবনায় ফেলেছে। নির্বিচারে অ্যান্টিবায়োটিক অপপ্রয়োগের ফলে জীবাণু, অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা নিস্ক্রিয় করে দেওয়ার জন্য তৎপর হয়ে ওঠে এবং পরিবর্তনের মাধ্যমে নিজেদের অন্য নতুন স্ট্রেইনে রূপান্তর করে। অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা নিষ্ফল করে দেয়। জীবাণুর এই রেজিস্ট্যান্ট স্ট্রেইন অ্যান্টিবায়োটিকে ধ্বংস না হয়ে বহাল তবিয়তে জীবদেহে অবস্থান ও বিস্তৃতি লাভ করতে পারে। তাতে রোগিরা দিন দিন আরো বেশি রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ে। এ কারণে আমাদের ব্যাপকভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করতে হচ্ছে। ফলে জীবাণু নিজেদের অবয়ব বা কাঠামো পরিবর্তন করে ফেলছে। অন্যদিকে এই জীবাণু মোকাবিলায় নতুন নতুন অ্যান্টিবায়োটিক উদ্ভাবন বা আবিষ্কারে উৎসাহ ও উদ্দীপনা হারিয়ে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে এ নিয়ে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া বা চিন্তা নেই। সমাজ বিজ্ঞানীদের ধারণা অতীতের মতো চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা পর্যাপ্ত কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার করে সংকট মোকাবিলায় যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

পেনিসিলিন আবিস্কৃত হওয়ার পরবর্তী ২৫ বছরে বিশ্বব্যাপী সালফাড্রাগ, ক্লোরামফেনিকল, টেট্রাসাইক্লিন ও অ্যামাইনোগ্লঅইকোসাইডজাতীয় অনেক কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক বাজারজাত হয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখছিল। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা যখন নতুন নতুন কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক উদ্ভাবনে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন, তখন ভোক্তা ও চিকিৎসকদের অযৌক্তিক ও অবিবেচনাপ্রসূত হেতুহীন ওষুধআচরণের কারণে মানবসভ্যতা এক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। যে অ্যান্টিবায়োটিকে মনে করা হতো রোগ চিকিৎসার ম্যাজিক বুলেট, যা যেকোনো জীবাণুর বিরুদ্ধে অব্যর্থএসব অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার এমন এক মাত্রায় পৌঁছে গেছে যে কিছু কিছু জীবাণু অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতার প্রতি উল্টো চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে।

একজন মানুষের শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হয় ওই অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের নিয়ম যথার্থভাবে পালন করা না হলে। চিকিৎসকের দ্বারা সঠিকভাবে নির্ধারিত মাত্রায় ও পূর্ণ মেয়াদে সেবন করা না হলে ওই অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে রোগির শরীরে সংশ্লিষ্ট রোগের জীবাণু প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। তারপর থেকে ওই অ্যান্টিবায়োটিক ওই রোগির শরীরে আর কাজ করতে পারে না।

বিকল্প ও উন্নত চিন্তা হিসাবে কোন অ্যান্টিবায়োটিক সঠিক মাত্রা প্রয়োগ করলে রোগি দ্রুত উন্নতি লাভ করে এর জন্য ব্লাড কালচার পরীক্ষা করে নিতে পারেন। এছাড়াও চিকিৎসকদের ব্যবস্থাপত্র লেখার সময় অ্যান্টিবায়েটিক দেওয়ার ক্ষেত্রে সুবিবেচনা করা দরকার। অনুমান নয় প্রয়োজন সর্ম্পকে নিশ্চিত হয়ে জনস্বাস্থ্যের এই ওষুধ প্রয়োগ করতে হবে। চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া নিজে নিজে অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের প্রবণতা পুরোপুরি ত্যাগ করতে হবে। চিকিৎসক যে মাত্রা ও মেয়াদ নির্ধারণ করে দেবেন, তা সম্পূর্ণভাবে মেনে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করতে হবে। এর জন্য জনচেতনতা বাড়ানোর নানাবিধ কর্মসূচি পরিচালনা করা প্রয়োজন। প্রশাসনিকভাবে অ্যান্টিবায়োটিক বিপণনে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে। চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি আইনত নিষিদ্ধ হলেও এই আইন অমান্যকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। কড়াকড়ি নজরদারিব্যবস্থা গড়ে না ওঠার সুযোগে ফার্মেসি ভিত্তিক ভয়ংকর ডাক্তারির প্রবণতা বন্ধ হওয়া দূরের কথা, সবাই যেন বেপরোয় হয়ে উঠেছে।

গবেষণায় দেখা গেছে ৮৭ শতাংশ ওষুধ বিনা ব্যবস্থাপত্রে বিক্রি হচ্ছে এবং ৬৪ শতাংশ বিক্রেতা উপসর্গ শুনে নিজেরাই ‘ডাক্তারি’ করছে।

চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য খাতে বিশৃঙ্খলার ফলে গণমানুষের ভোগান্তি, নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়া, অকালমৃত্যুএ বিষয়গুলো হরহামেশায় ঘটছে। ড্রাগ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ ১৯৮২এর ৪নং ধারা ‘ওষুধের রেজিস্ট্রেশন’ শিরোনামের ১নং ধারায় বলা হয়েছে, লাইসেন্স প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের রেজিস্ট্রেশন ছাড়া কোনো প্রকারের ওষুধ বিক্রির জন্য বা আমদানি বা বন্টন বা বিক্রি করা যাবে না। একই সাথে আইনের ১৩ নং ধারার ‘ফার্মাসিস্টদের নিয়োগ’ শিরোনামের ২নং ধারায় উল্লেখ আছে ‘কোনো খুচরা বিক্রেতা বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিলের কোনো রেজিস্ট্রেশন রেজিস্ট্রিভুক্ত শ্রেণি বিন্যাসের ফার্মাসিস্টদের তত্ত্বাবধান ব্যতিরেকে কোনো ড্রাগ বিক্রি করতে পারবে না।

এই আলোকে অল্প কয়েকটি ফার্মেসি ‘মডেল ফার্মেসি’ নামে নাম লেখালেও দেশের প্রায় ১২ লাখ ফার্মেসিতে ফার্মাসিস্ট হিসেবে কাজ করছেন সনদহীন, অনভিজ্ঞ ও অদক্ষ ফার্মাসিস্ট। অনুমোদনহীন এসব ফার্মেসি ও ফার্মাসিস্ট থেকে ওষুধ ক্রয় করে নানাভাবে বিপদের মুখোমুখি হতে হচ্ছে রোগিদের। অনুমোদনহীন ফার্মেসির কারণে সরকার প্রতি বছর হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব।

ফার্মাসিস্টদের নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিল প্রয়োজনমত পর্যাপ্ত সংখ্যক ফার্মাসিস্ট, ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্ট দোকানিদের দক্ষতা প্রশিক্ষণ দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ওষুধ শিল্পে অ্যান্টিবায়োটিক ভাবনায় সংযুক্তি ঘটাতে হবে মধ্যম মেধার ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্টকে। মধ্যম আয়ের দেশ কল্পনার প্রজন্মকে অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার ভার মধ্যম মানের ফার্মাসিস্ট নিয়োগের মাধ্যমেই নির্ভরতার ক্ষেত্র উন্মোচন করতে হবে।

x