মহানগরীর জলাবদ্ধতা : মুক্তি কতদূর

ড. মুহাম্মদ ইদ্রিস আলি

শুক্রবার , ১২ জুলাই, ২০১৯ at ৭:৫০ পূর্বাহ্ণ
55

দ্রুত বর্ধনশীল মহানগরীর একটি হলো চট্টগ্রাম মহানগরী। পঁয়ষট্টি লাখোর্ধ বাসিন্দার ঘন বসতির একটি মহানগরী এটি। দুইশত বিশ বর্গ কিলোমিটারের এ মহানগরী ক্রমান্বয়ে জনসংখ্যার বাড়তি চাপে অস্থির হয়ে উঠছে। এ নগরীতে সরকারের অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ অফিস আছে। দেশের ব্যবসা বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র এটি।
নগরীর পাশ দিয়ে বয়ে গেছে দেশের অন্যতম প্রধান নদী কর্ণফুলী। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিবেচনায় এটি দেশের এক নম্বর নদী। এ নদীর উপর দেশের বৃহত্তম বন্দর চট্টগ্রাম বন্দর। নদী কেন্দ্রিক এ বন্দরে বছরে ভিড়ে প্রায় সাড়ে তিন হাজার জাহাজ। দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের ৯৮% এবং অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের ৯২% এই নদী কেন্দ্রিক। বন্দর কেন্দ্রিক অর্থনৈতিক সকল কর্মকাণ্ডের কৃতিত্ব সর্বশেষে এ নদীর প্রাপ্য হয়।
একপাশে পাহাড় সমতল ভূমি, অন্যদিকে বহমান নদী কর্ণফুলি, বিস্তৃত জলরাশির বঙ্গোপসাগর। সাগর নদী পাহাড়ের ত্রিমাত্রিক সজ্জা নান্দনিকতা দিয়েছে চট্টগ্রামকে, এ অঞ্চলকে। সবুজে শ্যামলে ঘেরা এ মহানগরীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ঋতুতে ঋতুতে যে বৈচিত্র্যের আবহ বয়ে নিয়ে আসে, তা এক কথায় অপূর্ব। পাহাড় এ মহানগরীর অন্যতম নান্দনিক অনুষঙ্গ।
চট্টগ্রাম নগর থেকে মহানগরী চট্টগ্রাম আকারে সাকারে বেড়ে ওঠে দিনে দিনে। গত শতাব্দীর শেষার্ধ থেকে মাস্টার প্লেনের আলো আঁধারিতে নগরের কথিত উন্নয়নের যাত্রা। প্লেনও নেয়া হয়েছে অনেক। পাকিস্তানি উপনিবেশিক আমলের শেষ বছরে ১৯৬৯ সালে এসে প্রথম নগর উন্নয়ন পরিকল্পনা গৃহীত হয়। পাকিস্তান আমলের শেষ বেলায় এসে সে পরিকল্পনা যথাযথ আলোর মুখ দেখতে পায়নি। তারপরেও তখনকার ভাবনাতে আজকের সংকটের ইঙ্গিত ছিল। পরিকল্পনার নাম ছিল, স্টর্ম ড্রেনেজ এন্ড ফ্লাড কন্ট্রোল মাস্টার প্লেন এন্ড ফিজিবিলিটি রিপোর্ট ফর চিটাগাং। এটিতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপাত্ত ছিল, যা আজকের প্রেক্ষাপটে গুরুত্ববাহী। তখনকার সাড়ে তিন লাখ অধিবাসীর চট্টগ্রামে ৩৪টি খালের কথা উল্লেখ ছিল। যাদের গুরুত্বপূর্ণ কতিপয় হলো-চাক্তাই খাল, রাজাখালি খাল, মহেশ খাল, হিজড়া খাল, বিরজা খাল, ডোম খাল, নোয়া খাল, সদরঘাট খাল, মাঝিরঘাট খাল, শীতল ঝর্ণা খাল, কাট্টলি খাল, নাসির খাল, পাকিজা খাল, রামপুর খাল, ত্রিপুরা খাল, গয়নাছড়া খাল, বামুনি খাল, জামালখান খাল, কালির ছড়া খাল, চট্টেশ্বরী খাল প্রভৃতি। ৩৪টি খালের শুরু এবং শেষ চিহ্নিত করা হয়েছিল।
দেশ স্বাধীন হয়েছে। শাসনভার আমাদের হাতে এসেছে। মহান স্বাধীনতার ৪৮ বছর পর চট্টগ্রাম ওয়াসা ২০১৭ সালে ড্রেনেজ মাস্টার প্লেন প্রণয়ন করেছে। তাদের তালিকায় খাল মিলেছে ২২টি। ইতিমধ্যেই ১২টি খালের অস্তিত্ব হারিয়ে গেছে মহানগরীর মানচিত্র থেকে। আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। খালগুলো খোয়া গেছে। এই না পাওয়া বা খোয়া যাওয়া একটি পরিবেশ বিপর্যয়। আমরা সম্মিলিত ভাবে তার মূল্য দিচ্ছি। পরিকল্পনা হয়েছে ১৯৭২ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ডের। ১৯৮৬ সালে এরশাদ আমলেও পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে, যা লুইস বার্জারের পরিকল্পনা নামে খ্যাত। সবশেষ ১৯৯৫ সাল। রাখঢাক করে, আলোচনা পর্যালোচনা করে, কাঠ খড় পুড়িয়ে। চারিদিকে জানান দিয়ে। কিন্তু প্রেসক্রিপশন অনুসারে ওষুধ খাওয়া হয়নি। রোগ সারেনি। সবগুলো প্লেনে মহানগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থার আদ্যোপান্ত ছিল না। তবে খালের সংখ্যা একই ছিল। হারিয়ে যাওয়া খাল উদ্ধারের প্রচেষ্টা কার্যকর ভাবে আর নেয়া হয়নি। ১৯৯৫ এবং ২০১৭ এর পরিকল্পনায় পয়:নিষ্কাাশনকে গুরুত্বের সাথে তুলে ধরা হয়। ব্যবস্থাপত্র মোতাবেক পথ্য গ্রহণ না করলে রোগ মুক্তির আশা অনুচিত। হয়েছে যে তাই, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। চট্টগ্রাম মহানগরীর মানুষ জলাবদ্ধতায় মহাদুর্যোগ অতিক্রম করছে। মাত্র ১৫০ থেকে ২০০ মিমি বৃষ্টিপাতেই নগরীতে যে জলাবদ্ধতা ও জলমগ্নতার সৃষ্টি হচ্ছে, তা এক কথায় অনাসৃষ্টি। নগর জীবনে চরম বিপর্যয়, সম্পদের বিনাশ, দুর্ভোগ, দুর্যোগ।
খাল হারিয়ে গেছে। নালা নিখুঁজ হয়েছে। পাহাড় ধস ঘটছে নিয়মিত। গভীরভাবে লক্ষ্য করা যায়-অপ্রয়োজনীয়, অবাঞ্ছিত, অপরিকল্পিত নগরায়ন, বোধ বিবেক বর্জিত দখল অপসংস্কৃতি, তদারকিহীন, নির্লিপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ সংস্কৃতি নালা খালকে হারিয়ে যেতে সহযোগিতা দিচ্ছে। নগরীর ঝড়ো পানির বেরিয়ে যাওয়া মাধ্যম খাল, রাস্তার পাশের ড্রেন, কালভার্ট প্রভৃতি। পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায় নগরীর বিদ্যমান খালসমূহের ৮০% এর ভিতর দিয়ে ঝড়ো পানি বের হয়ে যাওয়ার সক্ষমতা অকার্যকর। রাস্তার পাশ দিয়ে বিদ্যমান ড্রেন নালাগুলো অপর্যাপ্ত এবং ভরাট হয়ে যাওয়া। নিয়মিত পাহাড় ধসের নগরীতে যে ভাবে এসব নালা নর্দমা পরিচর্যায় রাখা দরকার, তা কখনোই দৃশ্যমান নয়। রাস্তার পাশের এসব নালা নর্দমার ৬০% সম্পূর্ণ বন্ধ বা অকার্যকর। অধিকন্তু, রাস্তায় বিদ্যমান কালভার্টগুলো অকার্যকর, অপর্যাপ্ত এবং যুগোপযোগী নয়। সুতরাং এসবের ভিতর দিয়ে আকাঙ্ক্ষার এক তৃতীয়াংশ পানিকেও নি:সরণ সম্ভব নয়। নগরীর রাস্তাঘাট, বাজার দোকানপাট, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট বা সংলগ্ন ভূমির উপর কার্পেটিং করে ঢেকে দেয়ায় বৃষ্টির পানির পুনর্ভরণ প্রক্রিয়া চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নগরীতে খোলা উন্মুক্ত মাটি না থাকলে বৃষ্টির পানি পুনর্ভরণ ঘটবে না। এতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে গিয়ে পানিকে অধরা করে ফেলবে। যা একটি পরিবেশ প্রতিক্রিয়া। একটি বিপর্যয়। এদিকে মনোযোগ বাড়াতে হবে। এটি রোধ করতে হবে। পাহাড় দখল, খাল দখল, নালা দখল, ঘাট মাঠ দখলের যে অপসংস্কৃতির বিকাশ ঘটছে, তা কার্যকর ভাবে বন্ধ করতে হবে। নগরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে।
পরিকল্পনার নামে যে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প গৃহীত হচ্ছে, তার যথাযথ সমন্বয় সাধন এবং জবাবদিহিতার উন্নয়ন সাধন করতে হবে। নগরীর সার্বিক পরিবেশ সংরক্ষণ এবং উন্নতি সাধনের জন্য চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম ওয়াসা, চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ প্রভৃতি সংস্থার আন্ত:সমন্বয় ও উন্নয়ন সমন্বয়ের নিবিড়তা বাড়াতে হবে। সময়কে সর্বাধিক গুরুত্বের সাথে নিতে হবে।
হাসপাতালে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে, স্কুল কলেজ মাদ্রাসায়, ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে যায় সামান্য বৃষ্টিতেই। একই নগরের জনজীবন বিপদাপন্ন, বিষাদগ্রস্ত হয় বারবার। সম্পদের একই রকম ক্ষতি সাধন ঘটে। এ খবর উন্নয়ন প্রত্যাশী অদম্য বাংলাদেশের জন্য কখনোই সুখের খবর নয় । বারবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি আমাদের পরিকল্পনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। অকর্ম্যন্যতাকে প্রমাণ করে। জনগণের দুর্ভোগকে তাচ্ছিল্য করে। সরকারের উন্নয়ন অগ্রগতিকে সমালোচনায় ফেলে দেয়। যে দেশকে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব জলবায়ু অভিযোজনের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক দেশ মনে করে সম্মানিত করে, সে দেশে বাস করে জলাবদ্ধতার কাছে বারবার হেরে যাওয়া আমাদের জন্য সম্মানের নয়। সংশ্লিষ্টদের এটি মনে রাখা অত্যন্ত জরুরি। আসুন সকল প্রকার সমন্বয়হীনতাকে পিছনে ফেলে সামনের গতিকে ত্বরান্বিত করি।
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক, কর্ণফুলী গবেষক

x