মহাত্মা গান্ধীর আত্মকথা

কাজী রুনু বিলকিস

মঙ্গলবার , ২৯ মে, ২০১৮ at ৫:৫৪ পূর্বাহ্ণ
34

ক্ষিতীশ রায় অনুদিত মহাত্মা গান্ধীর আত্মকথা অথবা সত্যের সন্ধানে পড়ছিলাম। পড়তে পড়তে আমার মনে হয়েছে তিনি যতটা রাজনৈতিক তার চেয়ে ঋষিই বেশি। কোনো ঐশি শক্তির দাবি তিনি কখনো করেননি। একজন রাজনীতিবিদের এমন জীবনচিত্র বিরল ঘটনা। তার উপলব্ধি ছিল সত্যই ঈশ্বর। চোখের বদলে চোখই যদি নীতিতে হয় তাহলে পৃথিবীতো একদিন অন্ধ হয়ে যাবে। তাই বেছে নিয়েছিলেন অহিংসার পথ। বিশ্বের ইতিহাসে অন্যায় অবিচারের প্রতিরোধে অহিংস গণ সত্যাগ্রহের একটি নতুন যুগের সূচনা করেছিলেন। অন্তর্জগতে এই সত্য উদ্ভাসিত হয়ে উঠলে যে সত্যরূপী ঈশ্বর অন্বেষণের সঙ্গে নিরন্তর সাধনা বা আন্তরিক প্রয়াস যুক্ত হলে খুব সাধারণ নরনারীও নৈতিক শক্তির অধিকারী হতে পারে। হিংসায় উম্মত্ত পৃথিবীতে একজন অহিংস গান্ধীর প্রয়োজন। ক্লেদাক্ত রাজনীতির বিষিয়ে উঠা চারপাশটায় আমরা হয়তো আর কখনোই কোনো গান্ধীর প্রত্যাবর্তন দেখব না। গান্ধীজীর অহিংস রাজনীতির দর্শন ও কৌশল যাদের প্রভাবিত করেছিল তাঁরা হচ্ছেন মার্টিন লুথার কিং (জুনিয়র) নেলসন ম্যান্ডেলা, বিশপ টুটু। গান্ধীবাদী বলে কাউকে অভিহিত করা হোক এরও প্রবল বিরোধিতা করেছিলেন তিনি। তাঁর বক্তব্য ‘নতুন কোনো সত্য প্রকাশ করতে আসিনি, সত্য আমার কাছে যেমনভাবে উদ্ভাসিত হয় তার অনুসরণ ও প্রতিনিধিত্ব করাই আমার প্রয়াস।’

গান্ধীজী ছিলেন সত্যাগ্রহ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা এর মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে জনসাধারণের অবাধ্যতা ঘোষিত হয়েছিল। এ মতবাদ বা দর্শনের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল অহিংস মতবাদ। এবং এটি ছিল ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের চালিকাশক্তি। সারা বিশ্বে মানুষের স্বাধীনতা ও অধিকার পাওয়ার আন্দোলনের অন্যতম অনুপ্রেরণা। গান্ধীজী ভরসা দিয়ে বলেছিলেন Whatever is possible for me is possible even for a child.

বিক্ষুব্ধ বিশ্বে বিভ্রান্ত মানুষের কাছে প্রবল আশার বাণীগান্ধীজী তাঁর আত্মজীবনীর ভূমিকায় লিখেছেন, বস্তুতপক্ষে আমার জীবন যেহেতু পরীক্ষানিরীক্ষার সমষ্টি আর কিছুই নয় এই কাহিনী হয়তো আত্মজীবনীর রূপ নেবে। আমার ধারণা অন্ততপক্ষে একথা ভাবতে ভালো লাগে যে আমি যদি এসব কথা একত্রে গ্রোথিত করে দিই লোকের তাতে কিছু উপকার হলেও হতে পারে। রাজনীতির ক্ষেত্রে আমি যেসব পরীক্ষা করেছি সেগুলো কেবল এদেশে নয় তথাকথিত সভ্য জগতের। আমার কাছে তার বিশেষ কিছু মূল্য নেই। যেমন মূল্য নেই আমার এই মহাত্মা নামের। অধিকাংশ সময় এটা আমার যন্ত্রণার কারণ হয়েছে। এই মহাত্মা নাম থেকে কখনো আত্মপ্রসাদ লাভ করেছি বলে আমার মনে পড়ে না। তিনি আরো লিখেছেন আমি যা বলি, যা লিখি একটি লক্ষ্যের দিকে দৃষ্টি রেখে। যেহেতু আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করে এসেছি যে যা একজন মানুষের পক্ষে সম্ভব তা সকলের পক্ষেই সম্ভবপর।

আর এক অধ্যায়ে অহিংসা সম্পর্কে তিনি লিখেছেন যখন আমি অহিংসার তাৎপর্য বুঝতে শিখলাম, তখন থেকে সন্দেহের কাঁটা দূর হয়েছে মন থেকে। তখন আমি ব্রহ্মচার্যের মহাত্মা বুঝতে শিখেছি আর বুঝেছি স্ত্রী স্বামীর সেবাদাসী নন, তিনি তার সঙ্গিনী বা সহযোগী। দুঃখে সুখে তার সহভাগী। ঈর্ষা সন্দেহের বিষ বাষ্পে অন্ধকার সেইসব পুরাতন দিনের কথা যখন ভাবি আমার নির্বুদ্ধিতা ও ইন্দ্রিয় লিঞ্ঝাজনিত দুর্ব্যবহারের কথা মনে করে নিজেকে ধিক্কার দিতে ইচ্ছে করে, বন্ধুর প্রতি অন্ধ আনুগত্যের কথা মনে করে মাথা হেঁট হয়ে আসে। বন্ধুর প্ররোচণায় গান্ধীজী শৈশবে একবার মাংস এবং সিগারেট খাওয়া শুরু করেছিলেন। মাংস খাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল মাংস খেলে শক্তি হবে, শক্তি হলে ব্রিটিশদের তাড়ানো যাবে। আর সিগারেটের উপকার বা গন্ধের আকর্ষণ ছিল না। ছিল মুখ দিয়ে ধোয়া ছাড়ার মজা। কিন্তু গান্ধীজীর পরিবার ছিল পরম বৈষ্ণব। নিত্য তারা মন্দিরে পূজাঅর্চনা করতে যেতেন। নিরামিষ ঐতিহ্যের মধ্যে তাঁর জন্ম। এসব নিষিদ্ধ জিনিস খাওয়ার কথা শুনলে নির্ঘাত শোকেদুঃখে আত্মঘাতী হবেন। প্রথমত বড়দের ফেলে দেওয়া সিগারেটের টুকরো দিয়ে শুরু করলেও সবসময় পাওয়া যেত না। তখন তাঁর বয়স নয় দশ। বাড়ির চাকরকে দৈনিক যে দু’চার পয়সা দেওয়া হতো সেখান থেকে সুযোগ বুঝে এক দুইটা সরিয়ে নিতেন। সেটা দিয়ে কেনা শুরু। কিন্তু তাতে মন ভরে না। এর মধ্যে অন্য বন্ধুদের কাছে খবর পাওয়া গেল এক রকম গাছ আছে যার সরু ডাঁঢা ফাঁপা বলে আগুন ধরিয়ে বিড়ির মতো টানা যায়। তাই দিয়ে শুরু হলো ধূমপানের ব্যবস্থা। তাতেও তৃপ্তি না মেটায় পরাধীনতাকে অসহ্য মনে হলো। অভিভাবকদের ওপর সব রাগ গিয়ে পড়লো। তাদের কথা ছাড়া চলা যাবে না। এ ভারি অন্যায়, তারপর আত্মহত্যার স্বাদ জাগলো। বনজঙ্গল ঘুরে ঘুরে ধুতুরার বীজ যোগাড় করে আত্মহত্যার দিনক্ষণ ঠিক করলেন। এবার মৃত্যুর কাছে সমপর্ণ। কিন্তু না। ভাবতে শুরু করলেন মরে তো বিশেষ লাভ হবে না। তাছাড়া ভয়ও কাজ করছে। সেই সিদ্ধান্ত বাদ দিলেন। আত্মহত্যার কথা ভাবা যত সহজ, আত্মহত্যা করা তত সহজ নয়। এক সময় চুরি করা, সিগারেট খাওয়ার অভ্যাসও কমে আসলো। মনে এক ধরনের অপরাধবোধ কাজ করতে লাগলো। এক পর্যায়ে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন বাবার কাছে সমস্ত অপরাধ স্বীকার করবেন মন থেকে সব পাপের কলঙ্ক মুছে ফেলবেন। যেই চিন্তা সেই কাজ।

কাঁপতে কাঁপতে বাবার হাতে আমার সেই অপরাধ স্বীকারের চিঠি তুলে দিলাম। সেইসময় তিনি ভগন্দরের যন্ত্রণায় শয্যাগত ছিলেন। তাঁর শয্যা ছিল কেবল একটি কাঠের শক্ত খাট। তাঁর হাতে চিঠি দিয়ে আমি পাশের একটি তক্তায় বসে রইলাম। বাবা আগাগোড়া চিঠিটি পড়লেন। তাঁর চোখ থেকে মুক্তার মতো, বিন্দুর মতো টসটস জল পড়ে চিঠির কাগজ ভিজে গেল। কিছুক্ষণের জন্য তিনি চোখ বুজে কী ভাবলেন। তারপর সেই কাগজ টুকরো করে ছিঁড়ে ফেললেন। আমার চোখে জল ভরে এল। বাবার মনে কি যে বেদনা, তা তাঁর মুখ দেখে স্পষ্ট বুঝতে পারলাম। তার চোখের জলের মুক্ত ধারায় আমার অন্তর শুদ্ধ হল পাপের কলঙ্ক মুছে গেলো। আমার কাছে এই ঘটনা হলো অহিংস নীতির একটি প্রত্যক্ষ প্রমাণ। তখন যা কেবলমাত্র পিতৃস্নেহ বলে মনে হয়েছিল, আজ বুঝতে পারি তা শুদ্ধ অহিংসা ছাড়া আর কিছু ছিল না। এই অহিংসার ভাব যদি সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে এই পরশ পাথরের ছোঁয়ায় সবকিছু রূপান্তরিত হয়ে যেতে পারে। বাবা যে রকম শান্তভাবে আমার অপরাধ ক্ষমা করবেন এ আমি আশা করি নি। বাবার স্বভাব ছিল অন্যরকম, ভেবেছিলাম তিনি রাগ করবেন তিরস্কার করবেন, নিজের কপালে করাঘাত করবেন। তা না হয়ে দেখলাম তার প্রশান্ত মুখ। মনে হয় অকপটে আমি যে আমার অপরাধ স্বীকার করেছিলাম এতেই তিনি শান্তি পেয়েছিলেন। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ই শিক্ষনীয় এবং অনুসরণীয়। এই বইটা আমি পড়া শুরু করেছি মাত্র, পাঠকদের সাথে আরো অনেক শেয়ার করার আছে যতটুকু পড়েছি তার থেকে সামান্য কিছু অংশ তুলে ধরেছি। ইচ্ছে রইল আগামীতে গান্ধীজীর বাল্য বিবাহ ও বিলাত যাত্রা নিয়ে লেখার।

x