মহাজয় বনাম মহাবিপর্যয়

মোস্তফা কামাল পাশা

মঙ্গলবার , ২৯ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৮:১৭ পূর্বাহ্ণ
13

দেশের পাশাপাশি মার্কিনসহ পুরো বিশ্বরাজনীতি বছর শুরুতে দ্রুত মোড় পাল্টাচ্ছে। সাথে অস্থিরতাও। সবচেয়ে বেশি অস্থিরতা চলছে যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন, ভেনিজুয়েলার মতো দেশগুলোতে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে দেশটির কংগ্রেসের বিরোধ দস্তুরমত ক্ল্যাইম্যাক্সপর্বে পৌঁছে গেছে। মেক্সিকো সীমান্তে অভিবাসী প্রবাহ আটকাতে দেয়াল তৈরির নির্বাচনী ঘোষণা ছিল ট্রাম্পের! এ’ জন্য ট্রাম্পের ৫৭০ কোটি ডলারের বাজেট প্রস্তাব আটকে দিয়েছে মার্কিন কংগ্রেস। সিনেটে ট্রাম্পের রিপাবলিকান প্রাধান্য থাকলেও প্রতিনিধি পরিষদ ডেমোক্রেটদের কব্জায়। আর ডেমোক্র্যাট স্পিকার ন্যান্সি পোলেসি ট্রাম্পের চাপ এড়িয়ে উল্টো ২৯ জানুয়ারি প্রেসিডেন্টের ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ ভাষণ আটকে দিয়ে ট্রাম্প অহংকারের বেলুন ফুটো করে দিয়েছেন। এদিকে কংগ্রেস-ট্রাম্প দ্বন্দ্বের জেরে কংগ্রেস দেশটির সরকারি তহবিল আটকে দেয়ায় তিন সপ্তাহের বেশি ধরে এক চতুর্থাংশ সরকারি কার্যক্রম আটকে আছে। লাখ-লাখ সরকারি কর্মীর বেতন বন্ধ। সর্বশেষ সিনেটে দুটো প্রস্তাব উঠে ২৫ জানুয়ারি। প্রথমটি মেক্সিকো সীমান্ত দেয়াল তৈরির বাজেট ৫৭০ কোটি ডলার চেয়ে। দ্বিতীয়টি দেয়াল তৈরির অর্থ ছাড় ছাড়াই সরকারি কাজকর্ম চালু রাখতে স্বল্পকালীন ব্যায় বরাদ্দ অনুমোদন চেয়ে। কোনোটই পাস না হওয়ায় দেশটির অচলাবস্থা কাটেনি। প্রয়োজনীয় ৬০ ভোটের বদলে রিপাবলিকান প্রস্তাবে ৫০ এবং ডেমোক্র্যাট প্রস্তাবে ৫২ ভোট পড়েছে। ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে ৬ রিপাবলিকান সিনেটরও ভোট দিয়েছে। পাঁকে আটকে ট্রাম্প সম্ভবত আপসরফার পথে হাঁটছেন।
বৃটেনে থেরেসা মে সরকার ব্রেক্সিট নিয়ে মহা পেরেশানিতে। ই ইউ’র সাথে বিচ্ছেদ প্রশ্নে চুক্তি হলেও থেরেসা মে সরকার চুক্তি নিয়ে বিরোধী এবং নিজ দলেরও প্রচন্ড চাপে আছেন। এটা বৃটেনের অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। লাতিনের তেলসমৃদ্ধ দেশ ভেনিজুয়েলায় এখন দু’ প্রেসিডেন্ট নিয়ে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। সামপ্রতিক সেনা অভ্যুত্থান চেষ্টা ব্যর্থতার পর প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বদলে প্রেসিডেন্ট দাবিদার বিরোধী দল নেতা হুয়াইন গুয়াইদোকে প্রেসিডেন্ট হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা কিছু দেশ। আবার রাশিয়া, কিউবা, তুরস্কসহ কিছু দেশ মাদুরোর প্রতি সমর্থন অব্যাহত রেখেছে।
এর বাইরে প্রতিবেশী ভারতে আগামী মে মাসের জাতীয় নির্বাচন ঘিরে ব্যাপক মেরুকরণ ঘটেছে। রাজধানী দিল্লির চারপাশের গো’বলয় নামে পরিচিত তিন রাজ্যে সমপ্রতি বিজেপি শাসনের অবসান ঘটিয়েছে কংগ্রেসের বিপুল বিজয়। কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে তৃণমূল নেত্রী ও পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি ২০ লাখ মানুষের বিশাল সমাবেশে বিজেপি উৎখাতের ডাক দিয়েছেন। সমাবেশে নয়টি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীসহ হেভিওয়েট সব বিরোধী নেতা যোগ দেন। আবার উত্তর প্রদেশে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর রাজনৈতিক অভিষেক কংগ্রেসসহ মোদি বিরোধী জোটে নতুন প্রাণশক্তি যোগ হয়েছে। প্রিয়াঙ্কার মাঝে কংগ্রেস ও ভারতীয়রা ইন্দিরা গান্ধীর ছায়া খুঁজে পান। দীর্ঘদিন ধরে প্রিয়াঙ্কা সরাসরি রাজনীতিতে না থাকলেও আমেথি ও রায়বেরেলিতে মা ও ভাইয়ের লোকসভা আসনে প্রচারে অংশ নিতেন। এখন তিনি উত্তর প্রদেশের অর্ধেক রাজ্যের কংগ্রেস সম্পাদক। প্রিয়াঙ্কা জিয়ন কাঠি আগামী নির্বাচনে কংগ্রেস ও বিজেপি বিরোধীদের নয়া অক্সিজেন যোগান দেবে বলে ভারতীয় রাজনীতি বিশ্লেষকদের ধারণা। মোদিও কংগ্রেস প্রধান ও রাজনীতির পোক্ত খেলোয়াড় রাহুল গান্ধীর প্রিয়াঙ্কা কার্ডে চমকে গিয়ে পরিবারতন্ত্রের বিরুদ্ধে কড়া মন্তব্য ঝেড়েছেন।
ফেরা যাক দেশের রাজনীতিতে। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা তাঁর নতুন মেয়াদে জাতির উদ্দেশে প্রথম টিভি ও বেতার ভাষণে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি দুর্নীতিকে কোনোভাবেই ছাড় না দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। আশা করি, নেত্রী ঘোষণা থেকে চুল পরিমাণ বিচ্যুত হবেন না। আর্থিক খাতসহ সব সেক্টরের ভয়াল দুর্নীতির ক্যান্সার নির্মূল ছাড়া উন্নয়নের ফসল পিঁপড়ার পেটে যাবে। পাশাপাশি অসামপ্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধের মূলনীতির ভিত্তিতে উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় জাতীয় ঐক্য গড়ারও ডাক দিয়েছেন। ২০২০ সালের ১৭ মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবার্ষিকী উপলক্ষে আগামী মার্চ থেকে বছরব্যাপী ‘বঙ্গবন্ধু বর্ষ’ উদযাপনেরও ঘোষণা দেন। এদিকে মার্চ থেকে কয়েক ধাপে দেশব্যাপী উপজেলা নির্বাচন শুরু হচ্ছে। কিন্তু বিএনপি বর্তমান সরকারের অধীনে আর কেন নির্বাচনে অংশ নেবেনা বলে ঘোষণা দিয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এবং সংসদ উপ নির্বাচনসহ কোনো নির্বাচনেই দলটি যাচ্ছে না বলেও ঘোষণা দিয়েছে।
এমনিতে গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মহাজয়ে রাজনীতিতে ভারসাম্যহীন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে সরকারের ভুল ধরিয়ে দেয়ার কেউ না থাকলে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি সঙ্কুচিত হয়ে পড়ে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সরকারের ভুল করার সম্ভাবনা থাকে। আওয়ামী লীগের সাথে জোটবদ্ধ অন্য দলের এমপি বা এরশাদের জাতীয় পার্টি বিরোধী আসনে বসলেও সংসদে সরকারের বড় ভুলের জোরালো বিরোধিতার নৈতিক শক্তি তাদের থাকবেনা। কারণ, তারা আওয়ামী লীগের সহযোগী হিসাবেই নির্বাচিত হয়েছে, নিজের শক্তিতে নয়! সরকারি দল চেপে ধরলে জোরালো প্রতিবাদ অসম্ভব। তাই যতই ছোট হোক বিএনপিসহ ঐক্যফ্রন্টের ৮ নির্বাচিত এমপি’র শপথ গ্রহণ ও বিরোধী আসনে বসা জরুরি। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর ভাষণে বিএনপিসহ ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচিত এমপিদের শপথ গ্রহণ ও সংসদে অংশ নেয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। দল ও জনগণের স্বার্থে এবং নিজেদের বক্তব্য জনগণের কাছে তুলে ধরতে বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের এই সুযোগ কাজে লাগানো উচিত। না হলে বিএনপি আরো বেশি চাপে পড়বে। এমনিতেই জামাত প্রশ্নে ড. কামালের মন্তব্যের পর বিএনপির প্রতিক্রিয়ায় ঐক্যফ্রন্টে ফাটল এখন দৃশ্যমান।
এরমাঝে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বিএনপিকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে ‘মহাবিপর্যয়, মহাপরাজয়, মহাদুর্যোগসহ যেসব শব্দসমষ্টি প্রয়োগ করছেন, তা কোনোভাবেই শোভন নয়। বিএনপি নিজ দোষে হোক বা জামাত আসক্তির কারণে হোক এখন সবচে খারাপ সময় পার করছে। এর কিছু দায় সরকারেরও। হ্যাঁ, দলটি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে অবজ্ঞা করে, মুক্তিযুদ্ধের মূলসূরকে অবহেলা করে, জয় বাংলা স্লোগান ধারণে ব্যর্থ, সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াকে জোর করে বঙ্গবন্ধুর সমান বা বেশি উচ্চতায় তুলে আনতে মরিয়া! বিএনপি আরো অনেক সীমাবদ্ধতায় ভুগছে। সাথে জামাতের মতো মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অপশক্তিও ঘাড়ে! এসব সীমাবদ্ধতা ঝেড়ে ফেলেই তাদের উঠে দাঁড়াতে হবে। জিয়া বেঁচে থাকতে কখনো বঙ্গবন্ধুর কাতারে উঠতে চাননি, তাহলে তাঁর পুত্র বা কিছু নেতা কোন যুক্তিতে বঙ্গবন্ধুকে অস্বীকার এমনকি তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার ধৃষ্টতা দেখায়! ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তধোয়া পবিত্র মাটিতে তারা যুদ্ধাপরাধী দলের সাথে গাটছড়া ছিঁড়তেও পারে না কেন?
পরিবর্তীত পরিস্থিতিতে বিএনপিকে জাতীয় রাজনীতিতে শক্তিশালী অবস্থানে উঠে আসতে হলে এসব সীমাবদ্ধতা ঝেড়ে ফেলা ছাড়া কোনোই বিকল্প নেই। একই সাথে গণস্বার্থ এবং সম্মানজনক সহাবস্থানের স্বার্থে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের মত দায়িত্বশীল পদের নেতার অন্য দলকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বক্তব্য দেয়া কোনোভাবেই শোভন নয়। আশা করি, ক্ষমতার অহমিকা সরকারি দলকে মোহাচ্ছন্ন করবে না। আর মন্ত্রী সংবর্ধনা এবং বাড়তি প্রটোকলের বাড়াবাড়ি সরকারি দল এড়িয়ে চললে জনগণের আস্থা ও সমর্থনের ভিত আরো মজবুত হবে। মন্ত্রীদের মনে রাখা উচিত, গণমানুষের সর্বোচ্চ সেবাই তাদের জন্য সবচেয়ে দামি ও সম্মানিত সংবর্ধনা। অন্যায় সুবিধা আদায়কারী বা চামচা-চাটুকারেরা জনবিচ্ছিন্ন করতেই ফুলের তোড়া আর সংবর্ধনার ফর্দ নিয়ে মন্ত্রী ও ক্ষমতাবানদের বেপথু করে, বিভ্রান্ত করে। এটা নির্মম সত্য, সংবর্ধনা মানেই গণ দুর্ভোগ।

Advertisement