মহাজয়ের সাথে মহা দায়-ও

মোস্তফা কামাল পাশা

মঙ্গলবার , ২২ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৫:৩২ পূর্বাহ্ণ
16

দেশের রাজনীতি এখন পুরোপুরি ওয়ানওয়ে ট্র্যাকে! ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অবিশ্বাস্য জয় ও বিএনপি-জামাত তথা ঐক্যফ্রন্টের পতন রাজনীতির সমীকরণটাই পাল্টে দিয়েছে। ড. কামাল বিচক্ষণ রাজনীতিক হলেও গড়ে উঠেছেন বঙ্গবন্ধুর ছায়ায়। আইন ব্যবসা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, জ্বালানি, সমুদ্র ও বিশেষায়িত কিছু আইন কানুনে তিনি বিশেষজ্ঞ শুধু নন, প্রণেতা এবং চৌকস বিশ্লেষকও। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর সমকক্ষ বিশেষায়িত আইনজ্ঞ খুব কমই আছেন। স্বাভাবিক কারণে তাঁকে বছরের বেশিরভাগ সময় বিদেশে কাটাতে হয়। বঙ্গবন্ধুর একান্ত আস্তাভাজন মানুষটি বঙ্গবন্ধু উত্তর এবং টানা স্বৈরাচার কবলিত আমলে রাজনীতিতে নীতির ক্ষয় খুব কাছ থেকে দেখেছেন। সামরিক স্বৈরাচার বঙ্গবন্ধুর গড়া প্রিয় দেশটি থেকে তাঁকে মুছে ফেলার যত অপকৌশল ও অস্ত্র আছে সবই ব্যবহার করেছে। বাঙালিকে বাংলাদেশী বানিয়েছে। ধর্ম নিরপেক্ষতার মানবিক বিশালত্ব মুছে দেশকে খৎনা করিয়ে রাষ্ট্রধর্ম ইসলামে দীক্ষিত করেছে জবরদস্তি।
‘৭৫এর মধ্য আগস্টের ভোররাতে সবাংশে বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে খুন করে যুদ্ধজয়ী দেশটার মুক্তিযুদ্ধের সব অর্জন ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলা হয়। এরপর পুরো ঔপনিবেশিক পাকিস্তানি ঘরানায় পরিচালিত হয়েছে দেশ। আবার বঙ্গবন্ধু কর্তৃক নিষিদ্ধ মদ-জুয়া- নগ্ন সংস্কৃতি ও মাদকের স্রোতে পুরো দেশকে ডুবিয়ে দেয়া হয়। তাও ইসলামের পতাকা উঁচিয়ে ধর্মান্ধতার জজবা তৈরি করে! অস্বাভাবিক এক দুঃশাসন চেপে বসে জাতির ঘাড়ে! সপরিবারে বঙ্গবন্ধুসহ জেলের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় নিষ্ঠুরতম হত্যাকাণ্ডের শিকার জাতীয় চার নেতার খুনীদের দায়মুক্তি দিয়ে আইনও পাশ করা হয়! অদ্ভুত এই দেশে সাবেক সেনাশাসক জিয়া, এরশাদ, ৯১ সালে গণ অভ্যুত্থানের পর প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়ার সরকার বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনী ও জেল হত্যাকাণ্ডের সকল ঘাতককে পুরস্কৃত করে রাষ্ট্রীয় খরচে পুনর্বাসন ও বিদেশি মিশনে বড় বড় চাকুরি, ব্যবসা দিয়ে রাজার হালে বিলাসী জীবন যাপনের সুযোগ করে দেয়। এমনকী তাদের কেউ কেউ দেশে ফ্রিডম পার্টি, প্রগশ (প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তি) নামে রাজনৈতিক দল গঠন করে আওয়ামী লীগ নির্মূলে সশস্ত্র রাজনীতিরও সুযোগ পায়। ফ্রিডম পার্টির জনক খুনী সর্দার ফারুক ও রশীদ। প্রগশ প্রধান আরেক খুনী শাহরিয়ার রশীদ। এরা কেউ কেউ শেখ হাসিনা সরকারের দু’মেয়াদে দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার পর মৃত্যুদণ্ডের সর্বোচ্চ সাজা ভোগ করলেও রশীদ, নূর চৌধুরী, ডালিম, মোসলেমসহ আরো কয়েকজন এখনো আত্মগোপনে আছে বিভিন্ন দেশে। এরশাদ ও বেগম জিয়ার আমলে খুনী ফারুক পাতানো নির্বাচনে এমপিও হয়েছে! জিয়ার আমলে পাকিস্তান পলাতক ‘৭১ এর যুদ্ধপরাধের পালের গোদা গো, আযমকে মায়ের জানাজার ছুঁতোয় দেশে এনে নাগরিকত্বসহ রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করা হয়।
অথচ জিয়ার দল বিএনপি শুরু থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ, লালন ও সামাজিক ন্যায় বিচারের কথা বলে আসছে। কিন্তু সেনা ছাউনীতে জন্ম নেয়া দলটিতে রাজনৈতিক সুবিধা শিকারি পরগাছা, চিহ্নিত স্বাধীনতা বিরোধী, ধর্মান্ধ উগ্রবাদীসহ সমাজের নানা স্তরের অপরাধ ও মাদকচক্রের হোতারা যোগ দেয়। পাশাপাশি উগ্র বাম ও বৈজ্ঞানিক জাসদের একটি অংশও বিএনপি ছাউনিতে একীভূত হয়। বিএনপি’র উত্থান ও রাজনীতির ধরণ, বর্তমান দুরবস্থার কারণ বুঝতে হলে জন্মভিত্তি ও দলটির রাজনীতির কিছু ইতিহাস টানা জরুরি । মোদ্দা কথায় মুক্তিযুদ্ধ ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ও তাঁর দল আওয়ামী লীগকে চিরতরে নির্মূল করে দেয়ার ভয়ঙ্কর মিশন নিয়েই বিএনপির জন্ম। দেশ, মানুষ, ধর্ম বা মুক্তিযুদ্ধের প্রতি দলটির কোন দায়বদ্ধতা কখনো ছিল না, এখনো নেই। যা আছে বা ছিল তা স্রেফ কথামালার ফুলঝুরি মাত্র। উপরের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস চর্চায় বিএনপি রাজনীতির একটা আবছা কাঠামো উঠে এসেছে।
ফেরা যাক নিকট অতীতে। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি-জামাত জোট রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ফিরে আসার সাথে সাথে বিশেষ ধর্মাবলম্বী ও আওয়ামী লীগের নিরীহ সমর্থক ও নেতাকর্মীদের উপর কী ঘটেছিলো তা দেশের ইতিহাসে নির্মম বিভীষিকা হিসাবে স্থায়ী কলঙ্কের দাগ হয়ে থেকে যাবে যুগ যুগ। এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা অনাবশ্যক। কিন্তু জঙ্গিবাদের ভয়াল উত্থান, প্রকাশ্যে ব্রাশ ফায়ারে আহসান উল্লাহ মাষ্টার এমপি হত্যাকান্ড, সাবেক সফল অর্থমন্ত্রী শাহ কিবরিয়া হত্যাকান্ড, বৃটিশ হাই কমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর উপর গ্রেনেড হামলা, ২১ আগষ্ট বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে পরিকল্পিত গ্রেনেড বৃষ্টি, দশ ট্রাক অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র আটক, বগুড়া ও ঢাকার উপকন্ঠে বিপুল অস্ত্র ও গোলাবারুদ আটক, ৬৪ জেলায় একযোগে বোমা হামলা, বাংলাভাই ও শায়খ রহমানের মতো জঙ্গি উত্থান পর্ব দেশকে পুরোপুরি উগ্র জঙ্গিবাদী ঘরানায় ব্রান্ডিং করে দেয়। বহির্বিশ্বে পাকিস্তানের পর জঙ্গিবাদের বীজতলা হিসাবে বাংলাদেশের নামও ব্রাকেটবন্দি হয়ে যায়।
‘০৭এর ওয়ান/ ইলাভেনের পট পরিবর্তন পরিস্থিতির মোড় পাল্টে দেয়। ‘ ডিসেম্বর ‘০৮এর সাধারণ নির্বাচনে বিপুল গণ ম্যাান্ডেড নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ক্ষমতায় আসে। এরপর থেকে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নয়ন অভিযাত্রার মিছিলে সামিল বাংলাদেশ। গত দশ বছরের অভিযাত্রায় বাংলাদেশ এখন বাস্তবিক অর্থেই বৈশ্বিক উন্নয়নের রোল মডেল। সুশাসনের সমস্যা আছে। আছে দুর্নীতি, আর্থিক খাতে পুঁজি লুণ্ঠনের মতো ভয়ঙ্কর ব্যাধি, মাদকের বিস্তার ও অনিয়মের দানব! এসব ব্যাধি ‘৭৫ এর মধ্য আগস্ট ট্রাজেডির বিষফল। যাদুর কাঠির ছোঁয়ায় লোভ-ভোগের দানবকে রাতারাতি নির্মূল অসম্ভব। কিন্তু এসব জটিল সীমাবদ্ধতার মাঝেও শুধু উন্নয়ন সূচকে নয়, খাদ্য উৎপাদন, গবাদি পশু,ছাগল, হাঁস-মুরগি, ফল, হর্টিকালচার তথা কৃষিখাতে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ উৎপাদনকারী দেশগুলোকে টপকে সামনের সারিতে চলে এসেছে। দেড় যুগ আগে যা ছিল কল্পনাতীত তাই এখন বাস্তব!
এটা অপ্রিয় হলেও নিষ্ঠুর সত্য, প্রিয় দেশের অবিশ্বাস্য উন্নয়ন মহাযজ্ঞের একমাত্র সারথি প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা। তিনি এখন দেশের নেতৃত্বের একমাত্র রোল মডেল। বাকিরা সব দোহারি মাত্র। তাঁর ভিশন- মিশন টেনে নেয়ার যোগ্যতা যাদের ছিল, তাঁরা একে একে হারিয়ে যাচ্ছেন। সর্বশেষ চলে গেলেন, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। দেশের নিবেদিত সন্তান প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদের যোগ্য সন্তান সোহেল তাজও অভিমান করে সরে আছেন দূরে। বর্তমান মেয়াদে আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনাকে কঠিন থেকে কঠিনতর পরীক্ষা দিতে হবে। মহাজোট সরকারে নেই। অনেক জাঁদরেল নেতা মন্ত্রীত্ব থেকে ছিটকে গেছেন। নিকট আত্মীয়দেরও ছাড় দেননি তিনি।
কিন্তু কাজের চেয়ে বাকপটুতায় বেশি অভ্যস্ত কিছু নেতা নয়া মন্ত্রিসভায় আছেন। এদের অতীত রেকর্ডও স্বচ্ছ নয়। সব দায় সামলাতে হবে নেত্রীকেই।
এদিকে রাজনীতিতে নয়া নয়া উডিয়ম ও পাল্টা ইডিয়মের খেলা চলছে! তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ টিআইবির নির্বাচনী প্রতিবেদন নিয়ে বলেছেন, বিএনপি-জামাত নেতারা এখন আইসিইউতে। টিআইবি তাদের অক্সিজেন সরবরাহের দায়িত্ব নিয়েছে। আবার ঐক্যফ্রন্ট নেতা ড. কামাল হোসেন রাষ্ট্রকে হাইজ্যাক করার অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর দলের আরেক নেতা বলেছেন, ‘২০১৪ সালে গণতন্ত্রকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়, এবার বানানো হয়েছে লাশ’। এসব রাজনৈতিক ‘চাপান উতোর’ চলবেই।
এটা সত্য এবারের নির্বাচন নিয়ে সচেতন মানুষের মনে একটা ‘কিন্তু’ আছে। সরকারি দলেরও আছে। আবার ঐক্যফ্রন্ট বা বিএনপি-জামাত জনগণকে কোন জনপ্রিয় দাবি নিয়ে আন্দোলনের মাঠে নামাতে চরম ব্যর্থ, এটাও স্বীকার করতে হবে। না, হলে বিপুল গণজোয়ার বা প্লাবনের সামনে কোন ছোট কিন্তুর কাটা মাথা তুলে দাঁড়াতেই পারে না।
জননেত্রী শেখ হাসিনাকে নিজের দল ও শাসন ব্যবস্থায়ও সমান কঠোর হতে হবে। দুর্নীতি নির্মূলে তাঁর জিরো টলারেন্সের ঘোষণা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের পাশাপাশি দলের মন্ত্রী এমপি ও পদাধিকারীদের ২০০৮ সালের ও বর্তমান সম্পদের হিসাব বিবরণী জমা নেয়া দরকার।
ধর্ষক, মাদক ব্যবসায়ী-পাচারকারী, ব্যাঙ্কিং খাতের চিহ্নিত লুটেরা, বিদেশে অবৈধ সম্পদ পাচারকারীদের বিশেষ দ্রুততম ট্রাইব্যুনালে বিচার করে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ডের সাজা কার্যকর করে অন্যদের সামনে দৃষ্টান্ত তুলে ধরাও জরুরি। বিশ্বাস, প্রিয় জননেত্রী মনে রাখবেন, বিশাল জয়ে যেমন গৌরব আছে, তেমনি আছে জনগণের প্রতি আরো বড় দায়। আশা করি সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার সব যোগ্যতা পোড়খাওয়া প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার আছে। তিনি পারবেন সমৃদ্ধির চূড়োয় দেশকে টেনে তুলতে।

- Advertistment -