মহাচীনের পথে : অপূর্ব ভ্রমণ কাহিনি

বিপুল বড়ূয়া

শুক্রবার , ৪ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৪:১২ পূর্বাহ্ণ
29

পায়ের তলায় সর্ষে’এই চমৎকার কথা কাহন নিয়ে মানুষের জীবন। মানুষ মাত্রেই ঘুরে বেড়াতে উন্মুখ। আর বাঙালিদের আরো বড়ো ধরনের খ্যাতি রয়েছে কাছে দূরের দেশ-দেশান্তরে ঘুরে বেড়ানোর। বিদেশ বিভুঁই ঘুরে দেখা যেনো বাঙালিদের মজ্জাগত অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে সে কাছে দূরে যা ই হোক না কেনো, ট্যাকে টাকা থাকুক বা না থাকুক তাতে কি এসে যায় সে বেড়াবেই ঘুরে দেখবেই চারদিক আশপাশ হোক না দেশ প্রতিবেশ। এতসব ঘুরে বেড়ানো নিয়ে ভ্রমণ কাহিনী নিয়ে বহুলাংশে সমৃদ্ধ হয়েছে আমাদের সাহিত্য সংস্কৃতির পরিমণ্ডল খুলে গেছে দোর বিশ্ব সৌভ্রাতৃত্বের। সারা বিশ্ব হয়ে উঠেছে যেনো নিজ প্রতিবেশী।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ বৌদ্ধনেতা সধর্মে অন্তপ্রাণ। লেখক নীহারেন্দু বড়ুয়া সম্প্রতি চীন ঘুরে এসেছেন বিশ্ব বৌদ্ধ সৌভ্রাতৃত্ব সংঘের ২৭তম সাধারণ সভায় যোগ দিয়ে। বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের অন্যতম সদস্য নীহারেন্দু বড়ুয়া তাঁর মহাচীনের পথে চমৎকার ভ্রমণ কাহিনীতে বিশাল চীনের অনেক কটা শহর দেখার চাক্ষুষ বিবরণ বর্ণনা দারুণ কথামালায় বিবৃত করেছেন। সৃজনশীল ব্যক্তিত্ব নীহাবেন্দু বড়ুয়া দারুণ খোশমেজাজী মানুষ প্রাণভরে উপভোগ করেছেন মহাচীনের আর্থ সামাজিক নানা চিত্র-বিচিত্র নানা অনুষঙ্গ এবং পরবর্তীতে তা গ্রন্থভুক্ত করে সবাইকে পাঠ করার সুযোগ করে দিয়েছেন যা বলতে গেলে পাঠকমহল লুফেই নিয়েছে। বেশ আগ্রহ ভরে পাঠ করে বিশ্বে উন্নতির শিখরে পৌঁছে যাওয়া চীনের বহুবিধ বিষয় আশয় সম্পর্কে চকিতে হলেও কিছু জানার সুযোগ পেয়েছে। অপার কৌতূহলে কিছুটা হলেও মিটেছে বলা যায়।
মহাচীন যাত্রার শুরুতেই লেখকের দেখা কুনমিং বাওজির মতো পরিচ্ছন্ন পরিকল্পিত শহর। কুনমিং এ যেনো পাথর কেটে খাঁজ খাঁজ করে রাখা আছে। এ পাহাড় থেকে সে পাহাড়ে যাওয়ার জন্য রয়েছে রোপওয়ে। কুনমিং যেনো ফুলের শহর। চারদিকে ফুলের বিকিকিনি। কুনমিং থেকে সারা বিশ্বে নাকি ফুল রফতানি হয়। এ শহরে প্রাকৃতিক শোভা মনোহর। বাওজি শহরের রাস্তায় দারুণ শৃঙ্খলাবোধ। চারপাশের দালান একই মাপের, রাস্তায় গাড়ি চলছে অতিমাত্রায় নিয়মকানুন মেনে-গাড়ির কোনো হর্ন বাজানো নেই। বিশ্ববৌদ্ধ সৌভ্রাতৃত্ব সংঘ (ডঋই) এর ২৭তম সাধারণ সম্মেলন এবং বিশ্ববুদ্ধ সৌভ্রাতৃত্ব সংঘ যুব (ডঋইণ) এর ১৮তম সাধারণ সম্মেলন ফেমেন টেম্পল চত্বর। জমজমাট অনুষ্ঠান আয়োজন। মহামতি বুদ্ধের আঙুলের অস্থি রাখা আছে টেমপলের মাটির তলার কক্ষে। সব দেখা হলে লেখকের জানালেন পাঠককে। চারপাশের নানা কথা নিরাপত্তার কথা। লিখেছেন বাওজি ব্রোঞ্জ জাদুঘরের কথা। তিনতলা এ ব্রোঞ্জ জাদুঘরের রয়েছে চীনা রাজবংশের রাজাদের চৌ এন লাইয়ের দারুণ মূর্তি। চীনের শিল্প সম্ভারের মহামূল্যবান নিদর্শন। বেইজিং শহর ঘুরে লেখকের বিখ্যাত চীনের প্রাচীর সাক্ষাৎ দেখা। নানা সময়ে বিশটি রাজবংশের তৈরি এই বিস্ময়কর কীর্তি চীনের জাতীয় প্রতীক। সৌর্য বীর্যের অতুলনীয় নমুনা। চীনের প্রাচীরের ইতিহাস ঐতিহ্য নির্মাণ স্থাপনা নিয়ে বিশদভাবে আলোচনা করেছেন লেখক এখানে। যা ভ্রমণ পিপাসু ইতিহাস পছন্দের যে কারো কৌতূহল মেটাবে এ কথা হলফ করে বলা যায়। লেখক এক পর্যায়ে আমাদের কাছে তুলে ধরেন চীনের তথা বিশ্বের আর এক মহত্তর স্থান বা চত্বরের ইতিবৃত্ত। সে বিখ্যাত তিয়েন আনমেন চত্বর। যার সাথে জড়িয়ে আছে মহান চীনের অনেক অনেক গৌরব কীর্তি গাথা। বিশাল এই ঐতিহাসিক চত্বরে আরো নানা স্তরের স্থাপনার পাশাপাশি রয়েছে মহাচীনের আধুনিক চীনের রাষ্ট্রনায়ক চীনা জাতির পিতা মাও সে তুং এর বিশালাকার আলোকচিত্র। আধুনিক চীনের সীমাহীন অগ্রগতি উন্নতিতে এই চত্বরের ইতিহাস অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। দেখা হলো জানা হলো আমাদের পাঁচ হাজার বছরের পুরো সভ্যতা, সংস্কৃতি ঐতিহ্যের লালিত নিদর্শনের অপরূপ ফরবিডেন সিটি। অসম্ভব মজবুত দেয়াল অত্যধিক পুরু লোহার গেট যার প্রবেশপথকে করেছে দুর্ভেদ্য ও বহুমাত্রায় নিরাপদ নিঃশন্ধ। এখানে রয়েছে শ্বেত পাথরের রেলিং ব্রিজ, হলঘরে মার্বেল পাথরে গ্যালারি ড্রাগন পরিবেষ্টিত অপূর্ব সোনার সিংহাসন, কোনো কোনো প্রাসাদের ঢোকার মুখে রয়েছে শ্বেত মার্বেল পাথরে নির্মিত ড্রাগনের বিশাল মাথা মুখ, স্বর্ণখচিত সিংহাসনের পাশে সারস পাখি ধূপদানি মুখে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অপূর্ব সে শিল্পকর্ম রয়েছে চমৎকার বিশাল ঘড়ি, ব্যবহার্য নানা সম্ভারের চমৎকার উপস্থাপনা যা দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যায়। অবাক হতে হয় তাদের শিল্প সামগ্রী নির্মাণের অপার পারদর্শিতা দেখে। বলা যায় ‘ফরবিডেন সিটির বিশাল অংশের মাত্র অল্প কিছু দেখে যে কাউকে অবাক হতে হবেই এদের শিল্পবোধ ও সৃজনশীলতার চমৎকারিত্ব দেখে।
ডঋই ও ডঋইণ সম্মেলনে বাংলাদেশ থেকে প্রতিনিধি দলে লেখকের সাথে আরো ছিলেন বাংলাদেশ বৌদ্ধকৃষ্টি প্রচার সংঘের সভাপতি সংঘনায়ক শুদ্ধানন্দ মহাথের, ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি পিআর বড়ুয়া, মহাসচিব ড. প্রণব কুমার বড়ুয়া, যুগ্ম মহাসচিব ড. বিকিরণ প্রসাদ বড়ুয়া, যুগ্ম মহাসচিব দেবপ্রিয় বড়ুয়া, অর্থ সম্পাদক প্রমথ বড়ুয়া, রণজিত বড়ুয়া, মিসেস নন্দিতা বড়ুয়া, অধ্যাপক মনিকা বড়ুয়া, পুষ্পেন বড়ুয়া, কাজল, প্রীতিশ রঞ্জন বড়ুয়া, ড. সুব্রত বরণ বড়ুয়া, নৃপতি রঞ্জন বড়ুয়া, সত্যপ্রিয় বড়ুয়া, লায়ন রূপম কিশোর বড়ুয়া, সুজন কুমার বড়ুয়া, তুষার কান্তি বড়ুয়া, আশীষ বড়ুয়া, ড. সংঘপ্রিয় থের, শাসনপ্রিয় মহাথের, শীলানন্দ থের, জগবন্ধু বড়ুয়া, দীপিকা বড়ুয়া, ডা. অসীম বড়ুয়া, বিধান বড়ুয়া, পীযুষ কুমার বড়ুয়া, মি. জাহেদ, প্রজ্ঞাজ্যোতি ভিক্ষু প্রমুখ।
লেখক তাঁর ভ্রমণ বিচিত্রায় চীনের পথ রাজপথের শৃঙ্খলা সৌকর্য, জনমানসের চমৎকার অমায়িক ব্যবহার, শুদ্ধাচার জীবন বৈচিত্র্য নানা নির্মাণ শৈলীর অপরূপ চিত্র গভীরভাবে অবলোকন করে তা পাঠককুলের কাছে চমৎকার বর্ণনার মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। বইয়ের শেষ দিকে চীন ভ্রমণের চমৎকার অ্যালবাম বসিয়ে বইকে আরো আকর্ষণীয় করেছেন। ইংরেজি বাংলায় দু’ভাবেই লেখকের বর্ণনা বিবরণ দারুণ উপভোগ্য। তার ‘কালের কপোল তলে’ ভারত ভ্রমণের মজাদার কাহিনীর মতো ‘মহাচীনের পথে’ও লেখক তার লেখনীর মুন্সিয়ানা আবারও দেখিয়েছেন। লায়ন রূপম কিশোর বড়ুয়া এই বইয়ের প্রকাশনার ব্যয়ভার বহন করে সবার প্রশংসাভাজন হয়েছেন। চমৎকার প্রচ্ছদ আঙ্গিকের ছাপ্পান্ন পৃষ্ঠার এই বইয়ের মূল্য একশত পঞ্চাশ টাকা। এই বই পাঠে এক ঝলকে চীনকে জানার চীনের আর্থসামাজিক বিষয় প্রসঙ্গ সম্পর্কে জানার বড়ো সুযোগ হবে পাঠকের।

- Advertistment -