মহাকালের একখণ্ড মাটি

আহমেদ রাসেল

মঙ্গলবার , ৪ ডিসেম্বর, ২০১৮ at ১১:০৪ পূর্বাহ্ণ
9

স্থির ও অস্থির চিত্রের জাদুকর প্রয়াত হলেন, বিলীন হলেন জীবন থেকে। ক্যামেরা হাতের শিশুসুলভ পাকা চুলের বুড়ো মানুষটা নিঃসঙ্গ অবস্থায় মরে রইলেন ৯০৩ নম্বর হোটেল রুমে। পদ্মা পাড়ি দিয়ে রাজধানীতে আসা কিংবা বিচিত্র কোলাহলের নগরী ছেড়ে চলে যাওয়া লোকটির আকস্মিক প্রয়াণে ঝড় উঠল আলোকচিত্রীদের মধ্যে…। তিনি আনোয়ার হোসেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে সৃষ্টিশীল দশকে আবির্ভাব তাঁর। ষাটের উত্তাল দিনগুলোতে বাঙালি চিনে নিয়েছে আপনাকে, তৈরি হয়েছিল মুক্তি সংগ্রামে। ষাট এমনই এক দশক যাকে বায়ান্ন আর একাত্তর দুই পাশ থেকে আগলে রেখেছে। আনোয়ার সে-সময়েরই লোক। সাদাকালো যুগের দাপুটে এক শক্তিমান আলোকচিত্রী। স্থাপত্যবিদ্যায় শিক্ষালাভকারী এ-ব্যক্তিটি ইট-কাঠ-সিমেন্ট ছেড়ে মানুষের গ্রন্থিল পেশি, সরল বাঁকা চাহনি, জলকেলিরত অথবা স্নান শেষে সিক্ত বসনে নিতম্ব ভেসে উঠা নারীর অবয়বের মোহাচ্ছন্নতা ছাপিয়ে আমাদের চোখকে নিয়ে যায় জ্যামিতিক বিশ্বের কাছে। তাঁর ছবির নদী, নারী, মানবদেহ, জীবিকার জাল, খাঁজকাটা ভূমিবিন্যাস, ফসলী জমি সব কিছুতেই শুধু ফর্ম, ফিগার, শেপ ইত্যাদি জ্যামিতিক খেলা।
সময়ের সাদাকালো অথবা রঙিন নস্টালজিক নির্যাস ব্যবহারে তার মুন্সিয়ানাও চোখে পড়ার মতো। এক বিস্মৃত জনজীবন তুলে ধরেছেন গ্রাম বাংলার অনুষঙ্গে; যেখানে পালকি চড়ে, নারকেল পাতায় চশমা বানায়, পাটের স্তূপে বসে থাকে অথবা নগরে বাঁশি বাজে গ্রাম্য সুরে এমনই নানাবিধ চিত্রে ভরে উঠেছে তাঁর ফিল্মের দেয়ালগুলো। অন্যদিকে পুরান ঢাকায় জন্ম নেওয়া এ-মানুষটি রঙ্গিন ফিতায় বেঁধেছেন লালবাগের কেল্লা ও তার পার্শ্ববর্তী জনপদকে। তাঁর কাছে পোর্টেট শুধু একক মানব-মানবীর মুখাবয়বের ধারণ নয় বরং তা ছাপিয়ে পুরো একটি নগরীর!
সময়, সংস্কৃতি, জীবন, নারী, গ্রন্থিল পেশির প্রেমে পড়া মানুষটি এড়াতে পারেননি মুক্তিযুদ্ধের হিংস্রতার চিত্র। স্তূপাকারে লাশ টেনে নেওয়া, রাস্তায় পড়া খুলি, সম্মিলিত মুক্তবাহিনির রাইফেল উঁচানো অথবা ধর্ষিত নারীর বিস্বস্ত মুখাবয়ব… এইসব অনুষঙ্গে কেঁপে উঠেছে আনোয়ারের আগ্নেয়াস্ত্রের মতো ধারালো চোখ দুটো আর তা সংক্রমিত করেছে পরবর্তী বাংলাদেশকে।

স্থির ছবি ধারণের এ-লোকটি একসময় ঝুঁকলেন চলমান চিত্রের দিকে। ৭৪ সালে স্কলারশিপ নিয়ে পুনেতে গেলেন সিনেমাটোগ্রাফি শিখতে। তাঁর ভাষায় জীবন যেন বদলে গেল। এক বিস্তৃত জগতে মিশে গেলেন একের পর এক ছবি জোড়া দিয়ে আপনাআপনি তৈরি হয় চলচ্চিত্রের বিশাল ক্যানভাস। কিন্তু আনোয়ারের মত সেলুলয়েড কবির কি করার থাকে এখানে? প্রতিটি শটকে তিনি যেন নিখুঁত আলোকচিত্রের মাপে কেটে ফেলেন ফিতা থেকে। তার মধ্যে খোঁজেন স্থিরচিত্রের নান্দনিকতা। গোধূলি আলোয় মৃতদেহ নিয়ে হেলেদুলে যাওয়া চাকার ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ যেন একটা স্থিরচিত্র হয়ে আটকে দিয়েছে সময়কে। কিংবা চিত্রা নদীতে ডুবে যাওয়া বিসর্জনের দুর্গা প্রতিমা আর তার সাথে মিল রেখে রিরংসার শিকার হিন্দু নারী। যশোর রোড ধরে ঘন ছায়াবেষ্টিত ফেলে যাওয়া স্বদেশচিত্র… সবস্থানেই পরিচালকের পাশাপাশি আরেকটা অস্তিত্ব টের পাই আর সেটা হল আনোয়ারের চোখ।
ক্যামেরার জাদুকর এ-কবির জীবনে যা স্বীকৃতি জুটেছে তা নিতান্তই একজন পশ্চিমী মানুষের কাজের ফল। কিন্তু যা জোটেনি সেদিকে খেয়াল রাখা হয়নি রাষ্ট্রের। তবু মহান আলোকচিত্রী আনোয়ার হোসেন এ প্রজন্মের কাছে আইকনিক হয়েই গেঁথে গেলেন। বাংলাদেশের আলোকচিত্র অঙ্গন এ কিংবদন্তির মৃত্যুশোক কাটিয়ে উঠার আগে দৃষ্টি দিক অবশিষ্টদের অপ্রাপ্য অধিকারের দিকে।

x