মনের বাড়ি

ডা. মো. সালেহ উদ্দীন

শনিবার , ২৫ নভেম্বর, ২০১৭ at ৫:০১ পূর্বাহ্ণ
145

মনে পড়ে, মনে লাগে, মনে আছে। মনে কি দ্বিধা রেখে চলে যাবার প্রশ্নটা আপনি করতেই পারেন। নয়ন ভরা জল হলেও নয়ন দুজোড়া দিয়ে তো দিব্যি দেখি। কান দুজোড়া সর্বক্ষণ পাহারায় রেখে কান পেতে রই। কিন্তু মন/হৃদয়/অন্তর কোন কিছুই তো খালি চোখে দেখিনা। তবে কি মন বলে কিছুই নেই? কোথায় তার বাড়ি? এ মন কোন গাঁয়ের ছেলে?

কারো তির্যক মন্তব্যের খোঁচা যেমন মনে বড্ড ব্যথা দেয়, আবার তীক্ষ্ন বস্তুর খোঁচায় ‘আউ’ শব্দ করে বোঝাই ‘হাতে ব্যাথা পেলাম’। ভয় পাবো জেনেও ভয়ের ছবি দেখে ভয় পেয়ে আনন্দ পাই। আর কারো পা পিছলে ধরণিপাতের দৃশ্য দেখে কেউ হন আনন্দিত কেউ হন ব্যথিত। কিন্তু কিভাবে আমাদের মাঝে এ বিচিত্র সব অনুভবের বা বোধের ব্যাপারটা সম্পন্ন হয়? হ্যাঁ ঠিকই ধরেছেন, মন মহাশয় নীরবে নাটাই ঘোরাচ্ছেন।

আমাদের ত্বকে, চোখে, কানে, নাকে এমন কি জিহবায় রিসেপ্টর (স্নায়ুপ্রান্ত) থাকে। বলতে পারেন অভ্যর্থনাকারী। সে অভ্যর্থনাকারী শব্দ, দৃশ্য, আলো, স্পর্শ, কম্পন, তাপমাত্রা, স্বাদ, ঘ্রাণ ইত্যাদির সংকেত স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে স্নায়ুর পথ বেয়ে মগজের নানা অঞ্চলে পাঠায়। প্রেরিত সংকেত নানা অনুভূতির সৃষ্টি করে। মগজে রিওয়ার্ড এবং পানিশমেন্ট সেন্টারের উদ্দীপনা/নীরবতার কারণে উক্ত অনুভূতির সাথে যুক্ত হয় ধনাত্বক বা নেতিবাচক ভাবনা। ধরুন, কাঁচা লঙ্কার স্বাদের দৃষ্টান্ত। কাঁচা লঙ্কা মুখে পুরেই আগুন ঝাল! লঙ্কার ঝাল কারো মাঝে সুখানুভুতি আর কারো মাঝে নেতিবাচক অনুভূতি জাগায়। আর এ পুরো ঘটনার বারংবার পুনরাবৃত্তি মগজের ভাঁজে ভাঁজে স্মৃতি তৈরি করে। পরবর্তিতে ঐ লঙ্কা মহাশয়কে দেখে বা তার কথা ভেবে কেউ হন পুলকিত কেউ হন বিরক্ত। মাঝে মধ্যে স্মৃতি বেচারা স্বপ্নে দু একবার লঙ্কার ছবি মনে করিয়ে দিতেও পারেন। কিন্তু এখানে মন কোথায়? এতো এক ধরনের অনুভূতির ব্যাখ্যা। প্রকৃতপক্ষে, আমাদের দৈনন্দিন জীবনের নানা বিষয়, যেমন দেখা, শোনা, অনুভব করা, বিশ্লেষণ করা, বোঝা, স্মৃতিতে রাখা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, মনোযোগ, চিন্তা করা ইত্যাদি কাজের মূল ঘটনাস্থল হলো আমাদের মস্তিষ্ক বা মগজ বা ব্রেন।

তাই সাদামাটা ভাবে ‘মন কি’ এ প্রশ্নের উত্তর হলোণ্ড মগজের নানা অঞ্চলের স্নায়ুকোষের মাঝে এক অপূর্ব ছন্দময় কথোপকোথনের সারমর্মই হলো মন। আরো সহজভাবে বললে, শ্বাস নেয়ার অঙ্গ যদি হয় ফুসফুস মনের অঙ্গ মগজ বা মস্তিষ্ক। আর মানুষের আচরণ সৃষ্ট দর্পণে আমরা মনের অস্তিত্বই দেখতে পাই। কেউ নিশ্চুপ কিংবা ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছেন তার মানে হচ্ছে মন ভালো নেই। কষ্টে আছেন তিনি। প্রেমিকার কাছে মনের বা হৃদয়ের আকুতি প্রকাশের জন্য গানে গানে কেউ কেউ হৃদয় চিরে দেখানোর ইচ্ছে প্রকাশ করেন। হৃদয় বা মন তাহলে কি বুকের মাঝখানে থাকে? কিন্তু বুকের পাঁজরগুলো সরিয়ে যা দেখা যায় তার নাম তো হৃদপিণ্ড। তবে কি হৃদপিণ্ড আর হৃদয় এক নয়? না হৃদপিণ্ড আমাদের সারা গায়ে রক্ত ছড়িয়ে দিয়েই চুপ। চার প্রকোষ্ঠের সে ঘরে নেই কোন আক্ষেপ, উষ্মা, রাগ বা ভালোবাসা। আপনার আকুতি বুঝতে সে একেবারেই অক্ষম। তার মাঝে শুধুই গতিময় রক্ত রস আর কণিকা।

হৃদয়হীনার কাছে হৃদয়ের দাম থাকা না থাকার বিষয়টি তাই পুরোপুরি হৃদয়হীনার মস্তিষ্কপ্রসূত ব্যপার। হৃদ মাঝারে রাখা মানে মগজে রাখা। মনের সন্ধান পেতে চান? মগজ খুঁড়ুন!

মূল বার্তা : মানুষের মন বা মনস্তাত্ত্বিক যাবতীয় ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া আমাদের ব্রেন বা মস্তিষ্কে সংগঠিত হয়।

লেখক : মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, মনোরোগবিদ্যা বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, চট্টগ্রাম।

x