মনুপাগলা

ফারজানা রহমান শিমু

মঙ্গলবার , ১১ জুন, ২০১৯ at ১০:৫৬ পূর্বাহ্ণ
24

বেদম মার খেয়ে ঠোঁট ফেটে রক্ত ঝরছে লোকটির। তবু শব্দ নেই তার মুখে। ভরদুপুরে আন্দরকিল্লার মোড়টি সবসময় সরগরম থাকে। মানুষ আসে যায়, এদিক-ওদিক হাঁটে, ব্যস্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকে টেম্পো বা বাস ধরার জন্য। একে তো রমজান মাস, তার উপর সূর্যের গনগনে বিচ্‌ছুরণ। তবু মানুষের স্রোত থেমে নেই। এরই মধ্যে আচমকা সুঠামদেহী এক লোক গলা উঁচিয়ে বলে উঠল-তোর এত্তর সাহস! আঁর পকেটত আত! ব্যাস, এরপর শুরু হল দমাদ্দম লাথি। প্রথম লাথিতে ছিটকে পড়ে গেল মাঝারি আকারের মানুষটি। তার খোলা গায়ে নোংরা কালচে ছোপ। হতভম্ব লোকটি একবার, শুধু একবার মুখ তুলে দেখল, এরপর দু’হাতে মাথা চেপে ধরে বসে পড়ল।
প্রতিপক্ষের নির্লিপ্ততা খেপিয়ে তুলল সেই অভিযোগকারীকে। তুমুল ব্যস্ততার মধ্যেও ছোটখাট একটা জটলা তৈরি হয়ে গেল। এসব লাইভ কাহিনী দেখার জন্য কিছু মানুষের সময়ের অভাব থাকে না। কেউ কেউ প্রফেশনাল ফটোগ্রাফার বা জার্নালিস্টের মত মোবাইলে ভিডিও করা শুরু করে। আর অন্যদের সাক্ষী করে লোকটি বলতে থাকে, ‘চঅনত, কত্তর সাহস! আঁর পকেটত আত দিয়্যি। অডা, তুই জানস না আঁই কন? লাইত্থাই তোর ভাড়াল ফালাই দিয়্যুম।’
মোড়ের অন্যপাশ থেকে নিরাসক্ত চোখে জটলার দিকে তাকায় এক পুলিশ। ব্যাপারটা সামান্য বুঝতে পেরে খানিকটা দূরে সরে যায় সে, যেন দেখতেই পায়নি। জটলার অন্যান্যরা দু’চার কথা বলতে থাকে- ‘ন লরের, ওভাই, ইয়ুনুরে পিডি কিছু অইতোনো।’ ‘ধ্যতা হই গেইয়ে।’ ‘কিছু লইয়িনা বদ্দা?’ আরেকজন এগিয়ে এসে বিজ্ঞের মত বলে, ‘ছাড়ি দিলিও ক্যানে? আরো বাড়ে। ঐচ্ছুন, পুলিশুর কাণ্ড চঅন। চোগেও ন দেহের।’ জটলার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এক মহিলার চোখ পড়ল মার খাওয়া লোকটির উপর। সে তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে অনুরোধের সুরে বলল, ‘প্লিজ, একটু সরুন’। লাইভ প্রোগ্রামের যেন ষোলকলা পূর্ণ হল। মোবাইলগুলো ঘুরে গেল মহিলার দিকে। অত্যন্ত দরদি ও উদ্বিগ্ন কণ্ঠে সে বলে উঠল, ‘আপনারা ওকে মারছেন কেন?’ কয়েকজন একত্রে জবাব দিতে যাচ্ছিল, কিন্তু সেই সুঠাম লোকটি ট্রাফিকের ভঙ্গিতে হাত তুলে সবাইকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘ম্যাডাম, বদমাইশটা আমার পকেটে হাত দিয়েছে।’ অত্যন্ত জোরালো কণ্ঠে মহিলা বলে উঠল, ‘অসম্ভব ও পকেটমার নয়।’ জনসমক্ষে অপমানিত বোধ করে সুঠামদেহী বলে উঠল, ‘আপনি কি বলতে চান? আমি মিথ্যা বলছি?’ মহিলা দাঁতে জিব কেটে জবাব দিল, ‘না, না, আমি সেটা বুঝাইনি। ওর কোন বোধশক্তি নেই। ও পাগল, যদি আপনার গায়ে হাত লেগেও যায়, এমনি লেগে গেছে।’ মুহূর্তে মারমুখী মানুষগুলো কোমল হয়ে উঠল। জেদি মানুষটি শেষবারের চেষ্টার মত বলে উঠল, ‘আপনার ভুল হচ্ছে না তো?’ মহিলা অপেক্ষাকৃত কোমল স্বরে বললো, ‘না, ওর নাম মনু। সোসাইটির সিকিউরিটি গার্ড ছিল, গত বছর ডেলিভারির সময় ওর বউ মারা যায়। সেই থেকে পাগল হয়ে গেছে।’
কারো মুখে যেন রা সরে না। জটলা পাতলা হতে থাকে। অবস্থা জানার জন্য পুলিশ বাবাজী রাস্তা পার হয়ে এসে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখে। এক সুন্দরী কিছুটা নিচু হয়ে রক্তাক্ত লোকটিকে ডাকছে, ‘মনু, মনু চলো। বাড়ি যাবে না?’ পাগল কেবল হাত দুটো মাথা থেকে নামায়। এরপর শূন্য দৃষ্টিতে মহিলার দিকে তাকায়। কিছুই করার নেই ভেবে মহিলা রাজাপুকুর লেনের দিকে হাঁটা দেয়।
‘তিন্নি, এ্যাই তিন্নি…’ কে যেন ডাক দেয় পিছন থেকে। তিন্নি ফিরে দাঁড়ায় আর দু’এক মুহূর্তের জন্য কপাল কুঁচকে উঠে তার। এরপর উজ্জ্বল হাসিতে মুখ ভরিয়ে বলে উঠে, ‘অতনু তুমি?’ ‘আমাকে কেমন করে চিনলে, বলোতো।’-অতনুর বিস্মিত উক্তি, হাসতে হাসতে জবাব দেয় তিন্নি- ‘ছোটবেলায়ও এরকম করে ডাকতে তুমি। এত জোরের সাথে আমার নাম ধরে আর কেউ ডাকেনি।’
দু’জনের মধ্যেই প্রায় ২৫ বছর আগের মিষ্টি শৈশবের নানা চিত্র খেলে যায়। তিন্নি ও অতনু ভাই-বোনের মতই খুনসুটি করত। একত্রে খেলাধুলা আর মারপিট করত। তাদের মারামারি একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল প্রাণপণে চুল টেনে ধরা। ছোট্ট তিন্নি ঠোঁট ফুলিয়ে কাঁদতে চাইলেও অতনু ধমক দিয়ে বলত, ‘কাঁদবে না বলছি, খবরদার।’ চুল টানাটানি করে ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ত দু’জন।
আবার কোন না কোনভাবে ভাব জমে যেত। তবে অতনুর বাবা সিলেটে আর তিন্নির বাবা ঢাকা ট্রান্সফার হওয়াতে দুই পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। নানা কারণে তাদের মধ্যে আর সংযোগ তৈরি হয়নি।
শৈশব ফিরে পাওয়ার আনন্দ নিয়ে বাড়ি ফেরে তিন্নি আর অতনু। পরস্পরের ঠিকানা ও নম্বর নিতে ভুল করেনি ওরা। কি আশ্চর্য! ওদের বাসা খুব কাছাকাছি। অতনু তার স্ত্রী মৌ- কে বেশ উচ্ছ্বাসের সাথে জানায় ‘জানো, আজ তিন্নির সাথে দেখা।’ মৌ কাজ ফেলে ফিরে তাকায় স্বামীর দিকে। এরপর জানতে চায়-‘ কোন তিন্নি?’ অতনু কাপড় ছাড়তে ছাড়তে বলে, ‘ছোটবেলায় আমরা প্রতিবেশী ছিলাম। খুব মারপিট করতাম।’ মৌ বলল, ‘কখনো বলোনিতো!’ অতনু হাসতে হাসতে বলল, ‘আরে পাগল, বলার মত কিছু নয়। আমরা ছোট্ট ছিলাম। আশেপাশে আমাদের আর কোন খেলার সাথী ছিল না। আমরা দুজন একসাথে খেলতাম আর খুব চুল টানাটানি করতাম। তিন্নিকে বলেছি বাসায় বেড়াতে আসতে।’ মৌ আবার কাজে মন দেয়। অতনু স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বলে, ‘তুমি কিছু বলছ না যে!’ মৌ সহজ কন্ঠে বলে, ‘ওমা কি বলব? ভাল করেছ ওকে আসতে বলে। তিন্নিও তার স্বামীকে অতনুর কথা জানায়। আসিফ কিছুটা ঠাট্টার ছলে বলে, ‘আচ্ছা, ঐ অতনু? আমার বউয়ের মাথাটা স্টেডিয়াম বানাতে চাইত যে।’ দুজনেই হেসে ওঠে।
তিন্নির যেন তর সইছিল না। দেখা হওয়ার দ্বিতীয় দিনেই ফোন দিল অতনুকে। অতনু মোবাইল তুলে দিল মৌ-এর হাতে। খুব কম সময়ে ওদের মধ্যে বেশ জমে গেল। ঠিক হল অতনু ও মৌ তিন্নির বাসায় ইফতার করবে। এরপর সবাই মিলে শপিং করতে যাবে। নির্ধারিত দিনে অতনু ও মৌ একমাত্র সন্তান নিমিকে নিয়ে তিন্নির বাসায় এলো। আর তিন্নির ছেলে রুনের সাথে নিমির বেশ জমে গেল। বড়দের গল্পসল্পের এক ফাঁকে ফ্লাওয়ার ভাস ভাঙার শব্দ এলো। চারজনই আওয়াজটা শুনে থমকে গেল। তিন্নি ও মৌ পাশের রুমে গিয়ে যা দেখল। তাতে মৌ- তো অস্থির হয়ে উঠল আর তিন্নি হাসতে লাগল। বাচ্চাদের কিছুই না বলে তিন্নি ডাকতে লাগল, ‘অতনু দেখে যাও।’ আসলে রুন ও নিমি দুজনের চুল টেনে ধরেছে আর ফুঁসছে। রুন বলছে, আমি ভাঙিনি, নিমি বলছে, ‘তুমি ধাক্কা দিয়েছ।’ উত্তরাধিকার বুঝি এভাবেই জীবনের চাকা ঘোরাতে থাকে।
ইফতারির পর ওরা যখন বের হয়, কোত্থেকে মনু পাগল এসে পথরোধ করে। মৌ ও নিমি চিৎকার দিয়ে পিছিয়ে যায়। সে আওয়াজের কিছুই ঢুকে না মনুর কানে। সে এগিয়ে এসে রুনের মাথায় হাত রেখে বলে ‘বাদল, আমার বাপ ভালা আছস?’ রুন বরাবরে মতোই তার হাতটা ধরে বলে, ‘ভাল আছি, আংকেল।’ মনু পাগল কিছুই না বলে সরে যায়। মৌ আতংকিত স্বরে বলে আপা, এই পাগল রুনের গায়ে হাত দেয় এটা তুমি এলাউ কর কীভাবে? তিন্নি মায়াবী কন্ঠে বলে, ‘মনু কিছু করবে না ভাবী। এক বছর আগে ডেলিভারির সময় ওর বউ মারা যায়। সেই থেকে ও পাগল হয়ে গেছে। মনু ও তার বউ আমাকে খুব ভালবাসত। ওরা ভেবেছিল, ওদের ছেলে হবে আর তার নাম রাখবে বাদল। মানুষের জীবন। মার্কেট ঘুরতে ঘুরতে রাত বেড়ে যায়। হঠাৎ ছোট্ট রুন বলে উঠে ‘আব্বু, মনু আংকেলের জন্য একটা শার্ট নিয়ে যাই?’ চারজন বয়স্ক মানুষ নাড়া খায় ওর কথায়। তিন্নি সাথে সাথে জবাব দেয়, নাও। তুমি পছন্দ করে নাও। রুন খুব আগ্রহ নিয়ে শার্ট খুঁজতে থাকে। মৌ বলে উঠে, আপা মনু কি শার্ট পরবে? তিন্নি বলল, ‘নাও পরতে পারে। কিন্তু রুনের ফিলিংসটা আমার ভাল লেগেছে।’ অতনু বলে উঠল, ‘তিন্নি ছোটবেলায় এরকম ছিল। মনে আছে তিন্নি? একটা বেড়ালকে দুধ খাওয়ানোর জন্য… তিন্নি হাসতে হাসতে বলে, হ্যাঁ, তোমার গ্লাসের দুধ দিয়ে ফেলেছিলাম। ঠিক সেসময় নিমি ডাক দিয়ে বলে, ‘রুন, মনু আংকেলের জন্য এই শার্টটা নেয়া যায় না?’ রুন ফিরেও না দেখে বলে, ‘ঠিক আছে মা ওটা নিয়ে যাই?’ অতনু ও তিন্নি দুজন দুজনের দিকে চেয়ে হেসে ফেলে।
অতনুর বাসা আরেকটু সামনে বলে ওরা মার্কেট থেকে ফিরে প্রথমে তিন্নির বাসার সামনে এসে দাঁড়ায়। জোছনায় ছেয়ে আছে চারপাশ। প্রতিরাতের মত মনু পাগল দেয়ালে হেলান দিয়ে চেয়ে আছে আকাশের দিকে। রুন ও নিমি এগিয়ে গিয়ে শার্টটি বাড়িয়ে দেয়। রুন বলে উঠে, ‘আংকেল, তোমার জন্য এনেছি, তুমি ঈদের দিন পরবে, কেমন?’ শূন্য চোখে মনু তাকায় রুনের দিকে, রুন শার্টটি তার কোলের উপর রাখে। মনু পাগল উঠে দাঁড়ায়। হাত রাখে রুনের মাথায় আর বলে, ‘বাদল কই গেছিলি বাজান? বাদল….আমার বাদল” রাতের নিস্তব্ধতাকে খান খান করে গলা ফাটিয়ে কাঁদে মনু পাগলা। দূর থেকে আসা কুকুরের গোঙানি, সেই কান্না, জোৎস্নামাখা। রাত আর অশ্রুসিক্ত চারজন মানুষকে কেমন অপার্থিব করে তোলে।

x