মনীষাকে স্বাগত জানাই

ফেরদৌস আরা আলীম

শনিবার , ২৮ জুলাই, ২০১৮ at ৭:২৩ পূর্বাহ্ণ
1486

মনীষা যদি (আল্লাহ করুন) কোনওভাবে জিতেও যায় ওর হাত ধরে সমাজতন্ত্র এসে যাবে এমনটা ভাবার মতো বোকা আমরা কেউ নই। তবে একজন মনীষা যে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে, গলা খুলে কথা বলছে এতেই আমরা আনন্দিত। সাম্যের পৃথিবী সাম্যের গান গেয়ে পাওয়া গেলে কবির চেয়ে বড় যোদ্ধা আর কে হতে পারে? কোনও যাদুমন্ত্রে সাম্য আসবে না। আইনের শাসন সাপেক্ষও এটি নয়। একা মনীষা প্রেরণামাত্র। আমরা তাকে স্বাগত জানাই।

শ্রাবণ এখন যখন তখন ঘনঘোর। এমন দিনগুলো নিশ্চয়ই গানের বা কবিতার। সুরের বা ছন্দের। কিন্তু সেই যে একটি সন্ধ্যা, গুণে গুণে আজ থেকে ঠিক ৭ দিন আগে, সেদিনও শনিবার, ফুলকি মিলনায়তনে জমাট একটি সন্ধ্যায় আমরা যারা শিক্ষাবিদ ও রবীন্দ্র গবেষক উষারঞ্জন ভট্টাচার্যের বক্তৃতা শুনেছি (আবুল ফজল স্মারক বক্তৃতা) তারা কিন্তু বুঝেছি এমন দিন হতে পারে বক্তৃতারও। কি বলেছিলেন তিনি? তিনি বলেছেন, রবীন্দ্রনাথকে আশ্রয় করে অতি সাধারণ মাটির ঘরের মাটির মানুষটিও মানবীয় মর্যাদায় মহীয়ান হয়ে উঠতে পারে ঠিক যেমন সিন্ধু বারোয়াঁর তান আকবর বাদশাহ আর হরিপদ কেরানীকে এক আসনে বসিয়ে দেয়, রাজপথ আর এঁদো গলিকে একাকার করে দেয় বা দিতে পারে। কত যে বিনয়ের সঙ্গে প্রাজ্ঞ এই ঋজু মানুষটি একাধিকবার সময় চেয়ে নিয়ে কথা বললেন সেও শেখার বিষয় ছিল আমাদের অনেকের। তাঁর কথা তো শেষ হলো কিন্তু এ বয়সে ছুটে গিয়ে তাঁকে তো আর বলা যায় না যে, আহা! কী শোনালেন আপনি! তবে হ্যাঁ, পাশে পেয়েছিলাম তাঁর সঙ্গিনীকে। সে স্নিগ্ধ মালবিকার দুটো হাত দু’হাতে জড়িয়ে নিয়ে বলেছি, পেলাম, আমরা ধন্য হলাম, তাঁকে জানাবেন।

উষারঞ্জন ভট্টাচার্যের বক্তৃতার ঘোর কাটতে না কাটতে পেলাম মনীষাকে। স্থানকালপাত্রপরিবেশপ্রেক্ষাপট যোজন যোজন দূরের কিন্তু মনে হলো একই সুরে বেজে চলেছে মনীষা। চিকিৎসক মনীষা চক্রবর্তী বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদপ্রার্থী। একমাত্র এবং প্রথম নারী তিনি যিনি মই প্রতীক নিয়ে আসন্ন মেয়র নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বরিশালের মনোরমা মাসীমা (বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী) এবং রানী ভট্টাচার্যের (ভাষা আন্দোলনের নেত্রী) সান্নিধ্যধন্য মনীষা, সমরেশ মজুমদার ও ম্যাক্সিম গোর্কি পড়া মনীষা বরিশাল মেডিকেল কলেজ থেকে চিকিৎসাশাস্ত্র এবং ৩৪তম বিসিএস উত্তীর্ণ মনীষা, সরকারি চাকরিতে নিয়োগপত্র হাতে পাওয়া মনীষা সব ছেড়ে ছুড়ে মাটির কাছে, মাটির মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন।

ঠিক যে সময়টাতে চট্টগ্রামের ফুলকিস্থ একে খান মিলনায়তনে বসে আমরা উষারঞ্জন ভট্টাচার্যের বক্তৃতা শুনছি ঠিক সেই সময়ে বরিশাল নগরীর ফকিরবাড়ি সড়কের জেলা বাসদ কার্যালয়ে বসে আসন্ন (৩০ জুলাই ২০১৮) সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের একজন প্রার্থী হিসেবে) দৈনিক সমকালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মনীষা বলেন, নগরীতে শিক্ষিত ও তরুণ নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণ করার জন্যে তো বটেই সেই সঙ্গে প্রচলিত রাজনীতির ধারায় নারীর অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা থেকেও তার এই প্রার্থিতা। মনীষা জানাচ্ছেন সর্বস্তরের মানুষের গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছেন তিনি। তাঁর জন্য প্রচারণায় নেমেছে মেয়েরা। মাইকিং করছে মেয়েরা। উটকো বা উল্টোপাল্টা কথা তিনি কানে তুলছেন না।

আমাদের ছোটবেলায় গ্রামের বাড়িতে আমরা দেখেছি ঘরের কোণের মাচায় রাখা চালের মটকার পাশে মাটির হাঁড়িতে প্রতি বেলার ভাতের চাল থেকে এক মুঠো চাল রেখে দেওয়া হতো। সপ্তাহান্তে এ চাল মক্তবমাদ্রাসার কিশোরবালকেরা তাদের ঝোলায় করে নিয়ে যেত। এতেই চলত গ্রামের মক্তবমাদ্রাসা। পাবনার খায়রুন্নেসা খাতুন (রোকেয়ার সমকালে) মুষ্টি ভিক্ষার চালে চালাতেন মেয়েদের স্কুল। শতাধিক বছর পরে নির্বাচনী ব্যয় মেটানোর জন্য গত ডিসেম্বরেই (দলীয় সিদ্ধান্ত জানার পরপর) দু’শটি মাটির ব্যাংক মনীষা তুলে দিয়েছেন দলের কর্মী, সমর্থক, শ্রমিক, রিকশাগ্যারেজ, হোটেলরেস্তোরাঁ এবং সমমনাদের বাসাবাড়িতে। আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবেরা সাহায্য করছেন। নগরীতে তাঁর জন্য মাইকিং এ অটোরিকশা ও ইজিবাইকের চালক ভাড়া নেন না। বরং রুটিন করে এঁরা নিজেরাও প্রচার কাজে অংশ নেন। এসব কিছুই কিন্তু এমনি এমনি হয়নি। নগরীর ছয়টি বস্তিতে মনীষা সপ্তাহে একদিন বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দিয়ে আসছেন। তাছাড়া নগরীর বিভিন্ন স্থানে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পে তাঁর চিকিৎসা কার্যক্রম চলে।

নির্বাচনী হলফনামায় দুই লক্ষ ত্রিশ হাজার টাকা ব্যয়ের অঙ্গিকার মনীষার; তার বেশি খরচের প্রশ্নই আসে না। অন্য প্রতীকধারী পদপ্রার্থীদের পক্ষে চোখ ধাঁধানো আলোকসজ্জা, অভ্রভেদী রঙিন তোরণ বা বিশালাকৃতি প্রতীকসজ্জায় তাঁর কিছুই আসে যায় না। শুধু নির্বাচন কমিশনের চোখে এসব কিছুই পড়ে না দেখে তিনি অবাক হন।

নির্বাচনের ফলাফল কি হবে আমরা জানি না। (অথবা ভালোই জানি) কিন্তু স্বপ্ন দেখছি আমরা। আমরা ভাবছি মনীষা শুধু একটি নারী নন। মনীষা একবচন নন কিছুতেই। মনীষা নারীমাত্রও নন। মনীষা মানুষ। আর মানুষ তো মানুষেরই জন্য। মনীষা তাই বলতে পেরেছেন এবং বলে চলেছেন একটি কথা। ভোটের খরচ যুগিয়ে এবং ভোট দিয়ে জনগণের পক্ষের সৎ, যোগ্য, নীতিবান প্রার্থীকে নির্বাচিত করুন, আপনার বিবেককে রক্ষা করুন।’ বরিশাল মহানগরী আওয়ামী লীগের সভাপতি মনীষার প্রার্থীতাকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন এবং তাঁকে শুভকামনা জানিয়েছেন কারণ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাঁর দলীয় নেতাদের নারীর পক্ষে কথা বলতে উদ্বুদ্ধ করে চলেছেন। মহানগর বিএনপি’র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বলেছেন দেশের দুই প্রধান দলের শীর্ষে যাঁরা রয়েছেন মনীষা তাঁদের পথে পা রেখেছেন।

ছোট হয়ে যাওয়া পৃথিবীর চারপাশ দেখেশুনে আমরাও খুব আশাবাদী। খোদ আমেরিকার রাজনীতিতে বার্নি স্যান্ডার্স (নিজেকে সমাজতন্ত্রী বলতে যিনি ভয় পাবার দিনেও যিনি ভয় পান নি বা বিব্রত হননি) আজ আর একা নন। চলতি বছরে মধ্যবর্তী নির্বাচনে নিজেদের সমাজতন্ত্রী পরিচয় দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে দলের মনোনয়ন পেয়েছেন কয়েক ডজন প্রার্থী। এঁরা কেউ কংগ্রেসে, কেউ অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে কেউ বা স্থানীয় পরিষদে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। নিজেদের ডেমোক্রেটিক সোস্যালিস্ট পার্টির সদস্য বা সমর্থক বলে পরিচয় দিচ্ছেন এঁরা। ২০১৬ য় এঁদের সংখ্যা ৭০০০ থেকে আজ ৩৭০০০ এ উন্নীত হয়েছে। অবাক করা যে ঘটনাটি সেখানে ঘটে গেলমনীষাকে ভেবেই বলছি, মাত্র ২৮ বছর বয়সে (মনীষাও ঠিক ওই বয়সী; ২৮ কাঁটায় কাঁটায়) আলেকসান্দ্রিয়া ওকাসিও কোরতেস মার্কিন কংগ্রেসের জন্য ডেমোক্রেটিক পার্টির বাছাই পর্বের নির্বাচনে অবিশ্বাস্য এক বিজয় অর্জন করে ফেলেছেন। যে আসনটিতে তিনি মনোনয়ন পেয়েছিলেন ১৯ বছর ধরে সে আসনে একটানা দখলে রেখেছিলেন দলের প্রভাবশালী নেতা জোসেফ ক্রাউলি। আজ এক সামান্য বারপরিচারিকার ফেসবুক ও টুইটারের মাধ্যমে পাঁচদশ ডলার করে তোলা চাঁদার টাকার নির্বাচনে ১৫ লক্ষ ডলার নির্বাচনী ব্যয় করা ক্রাউলি হেরে গেলেন, ভাবা যায়? আলেক সান্দ্রিয়া শুধু বলেছেন, নির্বাচিত হলে তিনি সবার স্বাস্থ্য ও শিক্ষার জন্য লড়বেন।

আমরা অহর্নিশি শুনতে পাচ্ছি উন্নয়নের মহাসড়কে এসে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে আমরা এও জানি যে ধনীদরিদ্রে বৈষম্য আমাদের দেশেও ক্রমবর্ধমান সারা দুনিয়ার মতো। খোদ আমেরিকায় ৫০ শতাংশ মানুষের গড়পড়তা ৮ বার্ষিক আয় যখন ১৬ হাজার ডলার তখন সর্বোচ্চ ১ শতাংশের এই আয় ১৩ লক্ষ ডলার। ৫০ বছর আগে এই ১ শতাংশের নিয়ন্ত্রণে ছিল দেশের ১০ শতাংশের সম্পদ। আজ এঁদের দখলে রয়েছে ২০ শতাংশের সম্পদ। আমাদের দেশে বৈষম্যের স্বরূপ বোঝার জন্য অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি বোঝার বা কোনও পরিসংখ্যান খোঁজার প্রয়োজন নেই। উন্নয়ন আমরা নিশ্চয়ই চাই। সেইসঙ্গে এও চাই যে সব ধরনের বৈষম্য বিলুপ্ত হোকধনীদরিদ্রের, শিক্ষিতঅশিক্ষিতের এবং নারীপুরুষের। আমরা উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে এও চাই যে উন্নয়নের প্রসাদ সকলেই পাক।

আলেকসান্দ্রিয়া তাঁর উজ্জ্বল চোখের ভাষায় শুধু নয়, খোলাখুলি একটি সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। তাঁর সংগ্রাম ন্যায়ের পক্ষে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সংগ্রাম। লেবেল সেঁটে এ সংগ্রামকে পথভ্রষ্ট বা পথচ্যুত করার চেষ্টা চলবে। সে বিষয়ে সকলকে সচেতন থাকতে হবে। এ লড়াইটিকে গণতান্ত্রিক বা সমাজতান্ত্রিক যে নামেই ডাকা হোক এর লক্ষ্য কিন্তু একটাই। বেঁচে থাকার আনন্দ সবার জন্য চাই। মানুষে মানুষে এমন আকাশপাতাল বৈষম্যের অবসান চাই। মনীষা যদি (আল্লাহ করুন) কোনওভাবে জিতেও যায় ওর হাত ধরে সমাজতন্ত্র এসে যাবে এমনটা ভাবার মতো বোকা আমরা কেউ নই। তবে একজন মনীষা যে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে, গলা খুলে কথা বলছে এতেই আমরা আনন্দিত। সাম্যের পৃথিবী সাম্যের গান গেয়ে পাওয়া গেলে কবির চেয়ে বড় যোদ্ধা আর কে হতে পারে? কোনও যাদুমন্ত্রে সাম্য আসবে না। আইনের শাসন সাপেক্ষও এটি নয়। একা মনীষা প্রেরণামাত্র। আমরা তাকে স্বাগত জানাই।

x