মনিকা রাধা : নিখোঁজ অথবা অপহরণের ৪৫ দিন

মাধব দীপ

শনিবার , ২৬ মে, ২০১৮ at ৪:০৫ পূর্বাহ্ণ
234

First they came for the Communists,/ and I didn’t speak up,/ because I wasn’t a Communist./ Then they came for the Jews,/ and I didn’t speak up,/ because I was not a Jew./ Then they came for the Catholics,/ and I didn’t speak up,/ because I was a Protestant./ Then they came for me,/ and by that time there was no one/ left to speak up for me.

গত ১২ এপ্রিল চট্টগ্রামের লিটল জুয়েলস স্কুলের গানের শিক্ষিকা মনিকা বড়ুয়া রাধা (৪৬) নগরীর লালখান বাজার এলাকা থেকে নিখোঁজ হন। পরদিন তাঁর স্বামী দেবাশীষ বড়ুয়া নগরীর খুলশী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন (জিডি নং৬২২)। জিডি করার পর পুলিশের তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না থাকায় গত ২৮ এপ্রিল দেবাশীষ বড়ুয়া একটি অপহরণ মামলা দায়ের করেন। তাতে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়। কিন্তু আজ ৪৫ দিন পার হতে চললেও এ পর্যন্ত পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থা মনিকার কোনও হদিস পায়নি।

নিখোঁজ অথবা অপহৃত এই গানের শিক্ষিকার সন্ধান পেতে বা উদ্ধারে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ পর্যন্ত চাওয়া হয়েছে স্বজনদের পক্ষ থেকে। ৫ মে বিকালে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে মনিকা রাধার দ্রুত সন্ধান ও পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানানো হয়। মানববন্ধনে মনিকার পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণিপেশার লোকজন ও সচেতন নাগরিকরা অংশ নেন। আগের দিন শুক্রবার ঢাকায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনেও মানববন্ধন এবং সমাবেশ থেকে একই দাবি জানানো হয়।

মনিকার সন্ধান পেতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ তদন্তে নিয়োজিত বিভিন্ন সংস্থাকে আরও তৎপর হওয়ার আহ্বান জানানো হয় উভয় মানববন্ধনে (সূত্র: ৬ মে, ২০১৮ ইং)। পত্রিকা ও অন্যান্য গণমাধ্যমের বরাতে এই খবর দেশের প্রায় সব সচেতন মানুষই জানেন।

কিন্তু কী ঘটেছে-মনিকা রাধার কপালে? এই আলোচনায় সুনির্দিষ্টভাবে না যাওয়া গেলেও মনিকার ফিরে না আসা বা উদ্ধার না হওয়ার ঘটনায় আমাদের রাষ্ট্রীয় নির্লিপ্ততা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এই ঘটনার আফটারম্যাথ কী? এ নিয়েও ভাবা জরুরি।

পত্রিকায় প্রকাশ, গত ১২ এপ্রিল বাংলা নববর্ষের একদিন আগে নগরীর লালখান বাজার এলাকা থেকে নিখোঁজ হন মনিকা। গোয়েন্দা তথ্যমতে, মোবাইল ফোনের রেকর্ড অনুযায়ী সর্বশেষ তাঁর অবস্থান ছিল সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে লালখান বাজার মোড়ে। ওই সময় তিনি তাঁর স্বামী দৈনিক পূর্বকোণের ক্রীড়া সাংবাদিক দেবাশীষ বড়ুয়ার সঙ্গে মোবাইলে কথা বলেন। এরপর থেকে তাঁর ফোন বন্ধ। কোনো ধরনের খোঁজও মিলছে না (সূত্র: কালের কণ্ঠ, ৪ মে ২০১৮ ইং)

মনিকার স্বামী ইত্তেফাককে বলেছেন, গত ১২ এপ্রিল দুপুর আড়াইটার দিকে টিউশনিতে যাওয়ার কথা বলে মনিকা বাসা থেকে বের হয়ে যায়। এ সময় বাসায় আমাদের দুই মেয়ে ছিল। তারা বলেছে, তাদের মা খালি হাতেই বের হয়ে গেছে। এরপর সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজ নিয়েও তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি (সূত্র; দৈনিক ইত্তেফাক, ২১ এপ্রিল ২০১৮ ইং)

মনিকার বিষয়ে তাঁর স্বামী দেবাশীষ আরও বলেন, আমাদের দাম্পত্য জীবনে কোনো সমস্যা ছিল না। পারিবারিকভাবেও কখনও সমস্যা ছিল না। কেন কী কারণে সে নিখোঁজ, এ ব্যাপারে আমরা কিছু বুঝতে পারছি না। মনিকার বোন মণ্টি বৈষ্ণবও বোনের খোঁজ না পেয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, দিদি যেদিন নিখোঁজ হন, সেদিন বাসা থেকে বের হওয়ার সময় প্রেসারের ওষুধটিও তাঁর সঙ্গে ছিল না, নিজের চশমাটিও সে নেয়নি, টাকাও তেমন ছিল না। সে কোথায় আছে, কী অবস্থায় আছে, তা নিয়ে আমরা ভীষণ চিন্তায় আছি (সূত্র: আরটিভি অনলাইন রিপোর্ট, ৩ মে ২০১৮ ইং)

মনিকার বড় মেয়ে নগরীর একটি কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণির ছাত্রী। ছোট মেয়ে একই প্রতিষ্ঠানের অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে নিয়োজিত কর্তাব্যক্তিরা বলছেনণ্ড মনিকাকে উদ্ধারের জন্য তাঁদের সবরকমের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি নগর গোয়েন্দা পুলিশও ঘটনাটি তদন্ত করছে। কিন্তু, কাহাতক অপেক্ষা করবে মনিকার পরিবার? এর ফলোআপ কী? কিছুই এখন আর আমরা জানি না। এ বিষয়ে ফলোআপ করার সামাজিক দায়িত্ব থেকে যেনো ছুটি নিয়ে নিয়েছে গণমাধ্যমও।

আচ্ছা, মনিকা কে ছিলেন? একজন গানের শিক্ষিকা? একজন মা? একজন সাংবাদিকের স্ত্রী? কারও বোন? কারও কন্যা? অথবা তাঁর সঙ্গে কি কারও কোনও শত্রুতা থাকতে পারে? কোনোটিরই উত্তর হয়তো যথেষ্ট নয়ণ্ড তাঁর অপহৃত হওয়ার ক্ষেত্রে। আর যদি তিনি নিখোঁজই হোন আমাদেরই অজ্ঞাত কোনো অভিমানে? তবে ৪৫ দিন পার হতে চললেও সবার আগে একজন মা কীভাবে এভাবে সন্তানের থেকে দূরে থাকতে পারে?

সে যাই হোক, মনিকা রাধার ফিরে আসাটা বা উদ্ধার হওয়াটাই এসব প্রশ্নের জট খুলতে পারে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর হলেও এই প্রশ্নের পাক খুলে যেতে পারে। এর আগে আমরা দেখেছিণ্ড বেলা’র সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, সাংবাদিক উৎপল দাস, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক মোবাশ্বের হাসান সিজারসহ দেশ জুড়ে অনেকেই নিখোঁজ বা অপহৃত হয়েছেন। তাঁরা ফিরেও এসেছেন বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় উদ্ধারও হয়েছেন।

তাহলে, মনিকাও কি ফিরে আসবেন না কিংবা উদ্ধার হবেন না? এর পিছনে কী কারণ থাকতে পারেণ্ড আবারো এই প্রশ্নে না গিয়ে যদি বলিণ্ড একজন গানের মানুষের প্রয়োজন রয়েছে এই সমাজে। একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে তাঁকে উদ্ধারের সম্পূর্ণ দায়িত্ব রাষ্ট্রেরণ্ড তাঁকে না পাওয়া পর্যন্ত নানাভাবে প্রতিবাদ জারি রাখা জরুরি সচেতন নাগরিকেরণ্ড তবে কি এসব বেশি চাওয়া হবে? একজন গানের শিল্পী এভাবে দিনেদুপুরে ‘হাওয়া’ হয়ে যাবেণ্ড আর সমাজে তাঁর ফিরে আসার দাবির মিছিল তুলবে তাঁর স্বজনরাই কেবল? সচেতন মানুষ হিসেবে কি আমাদেরও দায়িত্ব নেই?

নাকি, লাগাতার বিচারহীনতার সংস্কৃতি ক্রমাগত আমাদেরকে অসুস্থ করে তুলছে? অস্থির করে তুলছে? এভাবে কি আমাদের চেতনা ও চৈতন্যে ক্রমাগত ভয় ঢুকানো হচ্ছে? যার পরিণতিতে আমরা হয়ে পড়ছি কেবলই সাধারণ মানুষ? বাঁচলেই কি কিংবা না বাঁচলেই কি? থাকলেই কি কিংবা না থাকলেই কি? কারও কোনো রা নেই। এভাবে চলছে বলেই হয়তোণ্ড আমরা আজ বাস ও ট্রেনে চড়তে ভয় পাই, ভাবিণ্ড কখন রাজনৈতিক ককটেল আর ঢিল এসে প্রাণ কেড়ে নেয় আমারণ্ড কে জানে? একা একা হাঁটতে ভয় পাইণ্ড ভাবি, যদি সন্ত্রাসীর ছোঁড়া গুলি এসে বিদ্ধ হয় আমার বুকে! আজ অধিকার আদায়ের মিছিলে যেতে ভয় পাইণ্ড ভাবিণ্ড আমার কী, আমি তো আছি বেশ। কাজে বাসার বাইরে বের হলে, বাসার স্বজনরা ফেরার অপেক্ষায় থাকতেথাকতে ভাবতে থাকে যেণ্ড মনে হয় আমি যুদ্ধে যাচ্ছি। জানে না তার সন্তান ফিরবে কিনা।

রাস্তার পাশে জটলা তো দেখেছেন- যেখানে একজন মানুষ মরে পড়ে আছে দুর্ঘটনায় . . .। আর এর চারপাশে অনেকগুলো মানুষ দাঁড়িয়ে থেকে ‘তামাশা’ দেখছে। ভাবি না- আমার পরিণতিও এমন হতে পারেণ্ড যেকোনো সময়- যে কোনো দিন। তবুও তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সাহস করতে পারি না। পাছে- আমাকে যদি জীবনভর পুলিশি ‘হয়রানির’ মধ্যে পড়তে হয় এই ভয়ে। আমি কি সেই মানুষ- আমার সামনে কোনো অপরাধ, অন্যায় হলে আমি নির্লিপ্ত থাকি এই ভেবে যে- আমার তো কিছু হচ্ছে না!

নাকি আমরাও – মানে এই সাধারণ জনতা- খুব তাড়াতাড়িই পরিস্থিতির সাথে ‘ইউজ টু’ হয়ে যাচ্ছি! ঘটনাটা ঘটার পর কিছুদিন বিরক্তি ঝারলাম, ক্ষোভ ঢাললাম সোশ্যাল মিডিয়ায়, মানববন্ধনসমাবেশ করলাম, বিবৃতি দিলাম। ব্যস। পরদিন পত্রিকায় পড়লাম, কিছু ধন্যবাদ মেসেজ দিলাম, কিছু কল করলাম- তারপর ভাবলাম- আমার কিছু হয়নি- আমার নিকটাত্মীয় কারও কিছু হয়নি- সুতরাং চুপ থাকাই শ্রেয় এই মানবিক দুর্যোগে। আর এরপর পরিস্থিতিকে মোকাবেলা করার পরিবর্তে এর সাথে এডজাস্ট হয়ে গেলাম!

কথা হচ্ছে- এতোকিছুর পরও আমরা কেনো এখনো জেগে উঠছি না? কিছুই বলছি না? কারণ, আমার কেউ এখনও নিখোঁজ হয়নি- এই জন্য। তবে কি এর জন্যও আমাদের অপেক্ষা করতে হবে? তবেই আমি এসবের প্রতিবাদে নামবো? কেবল তখনই প্রতিবাদটুকু আমার কাছে জায়েজ মনে হবে? রাষ্ট্রের কাছে জায়েজ মনে হবে? এটা কোনোমতেই গ্রহণযোগ্য নয়। হতে পারে না। এমনটা ভাবা যায় না।

মনিকা হয়তো জানতেন না- ১২ এপ্রিল বাসা থেকে বের হয়ে আর ফিরবেন না তিনি। জানলে তিনি বাসা থেকে ওষুধ নিয়ে বেরোতেন। প্রচুর টাকা নিয়ে বের হতেন। এক কথায় না ফেরার ‘বন্দোবস্ত’ করে বেরোতেন। হয়তো ফিরবেন বলেই তিনি বেরিয়েছিলেন। কিন্তু ফেরেন নি। ৪৫ দিনেও না। কোথায় তিনি? কোথায় একজন গানের শিল্পী? একজন মা? একজন বোন? একজন স্ত্রী? একজন কন্যা? সর্বোপরি, একজন সাধারণ মানুষ?

তাঁর ফেরা কিংবা তাঁকে উদ্ধারের প্রতীক্ষায় যে তাঁর দুই মেয়ে ও স্বজনরা? আমরা?

হে রাষ্ট্রশক্তি, শুনতে কি পাচ্ছো।

x