মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস নির্মাণে সাহিত্যবিশারদের অবদান

মুহাম্মদ ইসহাক চৌধুরী

শুক্রবার , ১২ অক্টোবর, ২০১৮ at ৭:৪২ পূর্বাহ্ণ
28

অষ্টাদশ শতাব্দীতে বহিরাগত ঔপনিবেশিক শক্তির কাছে পরাজিত ভারতের মুসলমানরা শক্তি হারা অভিমান ক্ষুব্ধ হয়ে শতবর্ষ কাটিয়ে দেয়ার পর ঊনবিংশ শতাব্দীতে তাঁদের মধ্যে নবজাগরণের চেতনা আসতে থাকে। তখন হিন্দু সমাজ পাশ্চাত্য শিক্ষার আলোকে প্রদীপ্ত হয়ে উঠেছে। মুসলিম নবজাগরণের উন্মেষে মুসলমান সমাজে দেখা দিল তাঁদের প্রাচীন ঐতিহ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করার আগ্রহ। কারণ শক্তি হারা হয়েছে বটে, ঐতিহ্য হারা যেন না হয়। কথায় বলে-
‘যে যাহা চায়, সে তাহা পায়,
খোদায় কয় মোর কি যায়’।
সময় ১৮৬৮ সন। স্যার জন লরেন্স প্রাচীন পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করার জন্য এশিয়াটিক সোসাইটির ওপর দায়িত্ব ভার অর্পণ করেন। উক্ত প্রতিষ্ঠানের পক্ষ হয়ে রাজা রাজেন্দ্র লাল মিত্র সংস্কৃত পুঁথি সংগ্রহে মনোনিবেশ করেন। ১৮৯১ সনে তিনি মৃত্যুবরণ করায় উক্ত পদে অধ্যাপক হরপ্রসাদ শাস্ত্রীকে নিয়োগ দেন। তিনি কিন্তু সংস্কৃত পুঁথির সঙ্গে বাংলা পুঁথিও সংগ্রহ করতেন। তার সময় পণ্ডিত বিহারী প্রমুখ সংগ্রাহকও পুঁথি সংগ্রহ করতেন। এ সংগ্রহের সাহায্যে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস নির্মাণ করেন অধ্যাপক হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, ড. দীনেশ চন্দ্র সেন প্রমুখ সাহিত্য ব্রতী মনীষীরা। এঁদের অনুরূপ প্রক্রিয়ায় রচনা প্রকাশের মধ্য দিয়ে এ মত প্রচার হলো যে, মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য সৃষ্টি ও পুষ্টি দানে একমাত্র হিন্দু কবি-সাহিত্যিকগণই আত্মনিয়োগ করেছিলেন। এ মতের বিরোধিতাও কেউ করেনি!
এ সময় যে ক’জন মুসলিম সাহিত্য সেবীর আবির্ভাব হয়েছিল এঁদের মধ্যে মুসলিম ঐতিহ্য উদ্ধার প্রয়াসী হিসেবে শিক্ষাবিদ, সংগ্রাহক, সংরক্ষক, সংকলক, আবিষ্কর্তা, প্রাবন্ধিক সাহিত্য সমালোচক, সম্পাদক মুন্‌্‌সী আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ এক উজ্জ্বল নক্ষত্র রূপে দৃশ্যমান হয়েছিলেন বাংলা সাহিত্য ভুবনে। তিনিই সংগ্রহ কাজে নিজেকে আত্মনিয়োগ করে খুব অল্প সময়ের মধ্যে বেশকিছু প্রতিভাবান কবি ও এঁদের কাব্য আবিষ্কারের মাধ্যমে সুধী সমাজে পরিচয় প্রদানে সমর্থ হয়েছিলেন এবং কবি-সাহিত্যিকদের প্রধান রচনাসহ নাম-পরিচয় হলো পঞ্চদশ শতকে শাহ মুহাম্মদ সগীর বিরচিত ‘ইউসুফ জোলেখা’, শেখ শাহ জৈনদ্দীন বিরচিত ‘রসুল বিজয়’, শেখ মোজ্জাম্মেল বিরচিত ‘নীতি শাস্ত্র বার্তা’, ষোড়শতকে মুহাম্মদ কবিরের ‘মধুমালতী’, সৈয়দ সুলতানের ‘নবী বংশ’ শাবারিদ খাঁর ‘বিদ্যাসুন্দর’, শেখ ফয়জুল্লার ‘গোরক্ষ বিজয়’, সপ্তদশ শতকে কাজী দৌলতের ‘সতী ময়না ও লোড়চন্দ্রানী’, দৌলত উজির বাহরাম খাঁর ‘লাইলী মজনু’, মুহাম্মদ খানের ‘মক্তল হোসেন’, কবি সম্রাট আলাউলের ‘পদ্মাবতী’সহ আরো পাঁচটি কাব্য, আবদুল নবীর ‘আমির বিজয় হামজা’ অষ্টাদশ শতকে শেখ চান্দের ‘রসুল বিজয়’, আবদুল হাকিমের ‘লালমতি সয়ফল মুলক’, নাওয়াজিস খাঁর ‘গোলে বকাওলী’, নসরুল্লাহ খানের ‘শরীয়ত নামা’ আমির হামজার ‘মধুমালতী’, আলী রজার ‘জ্ঞান সাগর’ প্রমুখ মহাজনের রচিত কাব্যগুলো আলোচনা দ্বারা তিনি প্রমাণ করে দিয়েছিলেন- মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্য সৃষ্টি ও পুষ্টি দানে হিন্দু মুসলমান উভয়ের প্রচেষ্টা কাজ করেছে। এ প্রসঙ্গে ড. দীনেশ চন্দ্র সেন তাঁর সুবিখ্যাত ‘বঙ্গ ভাষা ও সাহিত্য’ নামক সাহিত্যের ইতিহাস গ্রন্থে উক্ত মন্তব্যের আলোকে লিখেছিলেন ‘বাঙালি হিন্দুর ন্যায় মুসলিম সমাজেরও একটি বিরাট প্রাচীন সাহিত্য আছে কিন্তু সেই সাহিত্যের সাথে বিশেষভাবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন সাহিত্যবিশারদ সাহেব’।
এ মহান জাতীয় অমর কীর্তি আবিষ্কারক সাহিত্য বিশারদ ১৮৭১ সনের ১১ অক্টোবর মঙ্গলবার রাত দ্বি-প্রহরে পটিয়া উপজেলার অন্যতম প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী সুচক্রদণ্ডী গ্রামের এক উচ্চ মধ্যবিত্ত মল্ল বংশীয় এক সম্ভ্রান্ত মুন্‌্‌সী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্ব পুরুষ শেখ হাবিলাস খাঁ মল্ল গৌড়াগত (১৫৩৮-৩৯ খৃ.)। তাঁরই নামের স্মারক স্বরূপ নামকরণ হয়েছে ‘হাবিলাসদ্বীপ’। এটি পটিয়া উপজেলার একটি ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন গ্রাম। সম্ভবতঃ মুহাম্মদ আবদুল কাদের ওরফে কাদির রাজা সুচক্রদণ্ডী গ্রামে এসে বসতি স্থাপন করেন। তিনি শিক্ষিত ছিলেন। তিনি তার ছেলে সামাদ আলীর জন্য কাজী দৌলত বিরচিত ‘সতীময়না-লোর চন্দ্রানী’ কাব্যের অনুলিপি তৈরি করেছিলেন। পরিবারের কেউ নিরক্ষর ছিলেন না। বংশ পরম্পরায় লেখাপড়ার চর্চা ছিল বলে আরবি-ফার্সি ও বাংলা পাণ্ডুলিপির বই পত্রের সংগ্রহ ছিল।
মুন্‌্‌সী করিমের পিতার নাম শেখ নূরুদ্দীন মুন্‌্‌সী (১৮৩৮-১৮৭১ খৃ.) এবং পিতামহের নাম নবী চৌধুরী। তাঁর মাতার নাম মিশ্রিজান চৌধুরী। এ রত্নধারিনী মহিলা পটিয়ার পাইরোল গ্রামের প্রজা হিতৈষী জমিদার-প্রখ্যাত পাঠান তরফদার দৌলত হামজা বংশের মেয়ে। এ দৌলত হামজা খাঁর পৌত্র ফকির কামদর আলী চৌধুরী। তাঁরই পুত্র উমেদ আলী চৌধুরী হলেন মুন্‌্‌সী করিমের মাতামহ। এ সূত্রে প্রখ্যাত প্রাচীন পুঁথি পাণ্ডুলিপির ও লোক সাহিত্যের মৌলিক সংগ্রাহক আবদুস সাত্তার চৌধুরী তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র। যিনি সাহিত্য বিশারদ সাহেবের পুঁথি সংগ্রহ কর্মের একমাত্র দীক্ষাপ্রাপ্ত উত্তরাধিকারী হয়ে প্রায় দু’হাজার পুঁথি পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করে যেতে সমর্থ হয়েছিলেন।
শিশু আবদুল করিমের জন্মের তিন মাস পূর্বে পিতা ইন্তেকাল করেন। ফলে পিতামহের স্নেহে বড় হয়ে উঠেন। বংশের ঐতিহ্যমতে বাড়িতেই তাঁর বাংলা ও আরবি-ফার্সি হাতে খড়ি হয়। যথাসময়ে তিনি ভর্তি হন স্বগ্রামের মধ্যবঙ্গ বিদ্যালয়ে। এ সময় পিতামহ নবী চৌধুরী মৌরসী সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত না হবার জন্য তার এক পুত্র আইনুদ্দীন মুন্‌্‌সীর মেয়ে বদিউন্নেসার সঙ্গে মাত্র এগার বছর বয়স কালে ১৮৮২ সনে আবদুল করিমের বিয়ে হয়। ১৮৮৮ সনে সতের বছর বয়সে তিনি মাকেও হারালেন। তিনি গ্রামের স্কুলের পাঠ চুকিয়ে পার্শ্বস্থ পটিয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এ কিশোর বালক ছাত্র অবস্থায় ‘সাপ্তাহিক অনুসন্ধান’ পত্রিকার গ্রাহক হন।
নবম শ্রেণির ছাত্র থাকালীন সময়ে তিনি সাময়িক পত্রিকার গ্রাহক হতে থাকেন। এ সময় তিনি ‘হোপ’ নামক সাপ্তাহিক ইংরেজি পত্রিকাসহ মোট আটখানা পত্রিকার গ্রাহক হন। ক্রমান্বয়ে তিনি নানা নামের চল্লিশ খানা পত্রিকার নিয়মিত গ্রাহক হয়ে পাঠক জীবন অব্যাহত রেখেছিলেন। তাঁর পিতামহ নবী চৌধুরীর নিকট রক্ষিত এক রাশ পাণ্ডুলিপি থেকে কাজী দৌলত বিরচিত ‘সতীময়না-লোর চন্দ্রানী’ কাব্যের পাণ্ডুলিপি আবিষ্কার করেন। তখন তিনি দশম শ্রেণির ছাত্র মাত্র। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি প্রাচীন বাংলা অক্ষরের সাথে পরিচিত হয়ে ওঠেন। ফলে এ থেকেই তাঁর পুঁথি সংগ্রহ ও পাঠ উদ্ধারের সুপ্ত প্রতিভা ক্রমে বিকশিত হতে থাকে। ১৮৯৩ সনে তিনি দ্বিতীয় বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চট্টগ্রাম কলেজে এফ-এ (আইএ) ক্লাসে ভর্তি হন। এখান থেকে ১৮৯৫ সনে এফ-এ কোর্স সমাপ্ত করে চট্টগ্রাম মিউনিসিপাল বিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় যোগ দেন। এখান থেকে চলে গিয়ে সীতাকুণ্ড মধ্য ইংরেজি স্কুলের প্রধান শিক্ষক পদে ১৮৯৫-৯৬ এক বছর দায়িত্ব পালন করেন। পরে ১৮৯৬-৯৭ সময়কালে চট্টগ্রাম জজ আদালতে ‘এপ্রেন্টিস বা শিক্ষানবীশ থাকার পর তিনি বদলি হয়ে আসেন পটিয়া মুন্সেফ আদালতে। ১৮৯৮ সনে করিম সাহেবকে কবি নবীন সেন চট্টগ্রাম কমিশনার অফিসে কেরানি পদে নিযুক্তি দিয়ে শহরে নিয়ে আসেন। এ সময় সাপ্তাহিক ‘জ্যোতি’ পত্রিকায় পুঁথি সংগ্রহের বিষয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রচারের কারণে চাকরি হারা হন।
অতপর তিনি পুনরায় ১৮৯৯ সনে আনোয়ারা মধ্য ইংরেজি স্কুলে প্রধান শিক্ষক হয়ে শিক্ষকতায় ফিরে আসেন। আর শিক্ষকতার পাশাপাশি শুরু হলো গাঁ-গ্রামে রক্ষিত প্রাচীন পুঁথি সংগ্রহের কাজ। ১৯০৭ সনে চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্কুল পরিদর্শক কার্যালয়ে কেরানির পদে যোগদান করেন। দীর্ঘদিন চাকরির পর এ বিভাগ থেকে ১৯৩৪ সনে অবসর গ্রহণ করেন এবং ষাট ঢাকা হিসেবে প্রতি মাসে পেনশন লাভ করেন। সরকার থেকেও সাহিত্যিক বৃত্তি পেতেন ৬০ টাকা। সরকারি চাকরি ছাড়াও তিনি অবসরকালে এক নাগাড়ে দশ বছর ইউনিয়ন বোর্ডে প্রেসিডেন্ট হিসেবে সমাজ সেবা করে গেছেন।
সাহিত্য চর্চায় সাহিত্যবিশারদ : শিক্ষক করিম সাহেব পারিবারিক গ্রন্থাগারে রক্ষিত পুঁথি পত্র ঘাটতে গিয়ে সন্ধান পান চণ্ডীদাসের পদাবলীর। এগুলো তিনি ১৯৯৫ সনে হুগলি থেকে প্রকাশিত ‘পূর্ণিমা’ পত্রিকায় ‘অপ্রকাশিত প্রাচীন পদাবলী’ শিরোনামে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করেছিলেন। বলা যায়, এ থেকে তার বাংলা সাহিত্য চর্চার সূত্রপাত ঘটে। পদাবলী প্রকাশের মধ্যে দিয়ে তিনি সাহিত্য জগতে সুপরিচিত হয়ে ওঠেন। এ সময় তিনি ‘আলো’ নামক পত্রিকায় ‘কবিবর সৈয়দ আলাওল’ নামে প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। এটা প্রকাশিত হয় ১৩০৭/১৮৯৯ সনে। সুসাহিত্যিক রাজদূত শরৎচন্দ্র দাস লেখা পড়ে মন্তব্য করেছিলেন কালে এ বালক একজন যশস্বী লেখক হইতে পারিবে’।
মুন্‌্‌সী আবদুল করিম মাস্টার সাহেবই সর্বপ্রথম ১৯০১-০২ সনে আলাওল ও দৌলত কাজীর পরিচয় শিক্ষিত সমাজে উপস্থিত করেছিলেন। ১৯০১ সনে তার প্রথম সম্পাদিত পুঁথি ‘রাধিকার মানভঙ্গ’ প্রকাশিত হয়।
সাহিত্য জগতে তাঁর খ্যাতির কারণেই পত্রিকার মর্যাদা ও গুরুত্ব বৃদ্ধির জন্য ১৯০৩ সনে প্রকাশিত ‘নবনূর’ পত্রিকা আত্মপ্রকাশ কালে সম্পাদকের ভূমিকা পালনের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। একই কারণে ১৯১৪ সনে ‘সাধনা’, ১৯১৮ সনে ‘সওগাত’, ১৮১৯ সনে ‘কোহিনূর’ ও ‘পুজারী’ পত্রিকাসহ আরো চারখানা পত্রিকার সাময়িকভাবে সম্পাদক ছিলেন।
সাহিত্য বিশারদ সাহেব ১৯০১ সনে সাহিত্য পরিষদ পত্রিকার সাথে জড়িত হন। ফলে তাঁর অনেক রচনাই সাহিত্য পরিষদ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এগুলোর মধ্যে প্রাচীন কবি, পুঁথি-পাণ্ডুলিপি ও চট্টগ্রামের ছড়া বিষয়ক ক’টি প্রবন্ধ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পরিষদ কর্তৃক ১৯০১ হতে ১৯২৪ সনের মধ্যে ‘রাধিকার মানভঙ্গ’, ‘গোরক্ষ বিজয়’, ‘জ্ঞানসাগর’ প্রভৃতিসহ মোট নয়খানা প্রাচীন কাব্য সাহিত্য বিশারদ সাহেবের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। তিনিই মুসলমানদের সর্বপ্রথম প্রাচীন বাংলা পুঁথির সম্পাদক। সাহিত্য বিশারদের সাহিত্য সেবায় আকৃষ্ট হয়ে ১৯০৯ ‘চট্টল ধর্মমণ্ডলী’ তার সাহিত্য কর্মের স্বীকৃতি স্বরূপ তাঁকে ‘সাহিত্য বিশারদ’ উপাধি দিয়ে সম্মান দেখিয়েছিলেন। ১৯২০ সনে নদীয়ার ‘সাহিত্য সভা’ ‘সাহিত্য সাগর’ উপাধিতে বিভূষিত করে তার বিদ্যাবত্তা ও গবেষণার প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়েছিল। এছাড়া বাংলার সর্বস্তরের মানুষ বিদ্যাসাগর বললে যেমন পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্রকে বুঝেন, তদ্রুপ সাহিত্য বিশারদ বললেও মুন্‌্‌সী আবদুল করিমকে বুঝিয়ে থাকেন। তাঁকে নিয়ে অনেকেই লিখে আসছেন। এঁদের মধ্যে যিনি প্রথম লিখেছেন, তিনি শ্রীযুক্ত কবি জীবেন্দ্র কুমার দত্ত। লেখাটি ১৯০৫ সনে কোহিনূর পত্রিকার বৈশাখ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। এটার একটি সমালোচনা প্রকাশ হয়েছিল ধূমকেতু পত্রিকায়। চরিতাখ্যানটির এক স্থলে লেখক লিখেছেন-‘মৌলবী আবদুল করিমের ন্যায় ব্যক্তি বঙ্গভাষার অতি আদুরের ধন, এতাদৃশ্য ব্যক্তিবর্গই জগতের নমস্য। ভগবান মৌলবী সাহেবকে দীর্ঘজীবন দান করুন’। সত্যিই তিনি দীর্ঘজীবন লাভ করেছিলেন।
সাহিত্য বিশারদ দেশের নানা উচ্চতর শিক্ষা-সংস্কৃতি বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে সংবর্ধনা লাভ করেছেন শুধু তা নয়, এসব প্রতিষ্ঠানের সভ্যপদ ও সাহিত্য বিষয়ক সভা সমিতির সভাপতির দায়িত্বপ্রাপ্ত হতেন। যেমন বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য পরিষদ, মুসলিম শিক্ষা সমিতি, কুমিল্লা সাহিত্য সভা, চট্টগ্রাম প্রদর্শনী সাহিত্য সম্মিলন প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
সাহিত্য বিশারদ সুদীর্ঘ ষাট বছরের সাধনায় মধ্যযুগের ১৫০ জন মুসলিম কবি ও তাঁদের রচনা আবিষ্কার করে অমর হয়ে আছেন। উদ্ধারকৃত সব রচনা মিলে তাঁর সংগ্রহ দাঁড়ায় প্রায় দু’হাজার। তাঁর এ সংগ্রহ উপহারে প্রদত্ত হয়ে সংরক্ষিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পুঁথিশালায়। এখানে রয়েছে ছয় শত মুসলিম পুঁথি। রাজশাহীর বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামে উপহারে দেয়া হয়েছে ৪৫০টি হিন্দু রচিত পুঁথি এবং বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদেও অনেকগুলো পুঁথি প্রদান করা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদত্ত পুঁথিগুলো প্রদান পূর্বকালে তিনি একটি সংকলন গ্রন্থ প্রণয়ন করেছিলেন। এটি উক্ত প্রদত্ত ছ’শ পাণ্ডুলিপির পরিচয় নিয়ে লেখা। তাই এটার নাম হয়েছে ‘পুঁথি পরিচিতি’। এটি তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র ড. আহমদ শরীফ সাহেবের সম্পাদনায় ১৯৫৮ সনে ঢা. বি. বাংলা বিভাগের পক্ষ থেকে অধ্যক্ষ আবদুল হাই প্রকাশ করেন। এখানে উল্লেখ্য যে, সাহিত্য বিশারদের পুঁথি সম্পাদনা কর্মের সুযোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে ড. আহমদ শরীফই প্রধান ব্যক্তি। যার সম্পাদনায় ৩০টিরও বেশি মুসলিম কবির কাব্য সম্পাদিত হয়ে বাংলা একাডেমি কর্তৃক প্রকাশিত হয়েছে। সাহিত্য বিশারদের শেষ লেখা কবি আলাওল বিষয়ক প্রবন্ধ ‘এটা সাপ্তাহিক ‘সোনার বাংলা’ সাহিত্য পত্রিকায় ১৯৫৩/১৩৬০ সালের ভাদ্র সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।
সাহিত্য বিশারদের জীবনব্যাপী পাঠের উদ্দেশ্যে সংগৃহীত প্রায় চার হাজার সংখ্যক বিভিন্ন নামের সাময়িক পত্রিকা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার-পুঁথিশালায় প্রদত্ত হয়েছে। এগুলো তাঁর মৃত্যুর পঁচিশ বছর পর ড. আহমদ শরীফ উপহার হিসেবে প্রদান করেছিলেন। আজ এগুলো ঘেঁটে শিক্ষক-গবেষকবৃন্দ স্ব স্ব বিষয়ের জন্য তথ্য সংগ্রহ করে চলছেন। তাঁর দীর্ঘ জীবনের ফলস্বরূপ তিনি বাংলার মুসলমানকে ‘ইসলামাবাদ’ ও আরকান রাজসভায় বাংলা সাহিত্য গ্রন্থ দুটি এবং প্রায় ছয় শতাধিক গবেষণামূলক প্রবন্ধ দান করেছেন। সবশেষে প্রকাশিত হলো তাঁর শ্রেষ্ঠ অমর সাহিত্য কর্ম আলাওল বিরচিত ‘পদ্মাবতী’ কাব্যের সম্পাদিত গ্রন্থ। এ কাব্যটির সম্পাদিত পাঠ নির্মাণে ৩৯টি পাণ্ডুলিপির তুলনামূলক সাহায্য নিয়েছেন। এটি অনেককাল বরেন্দ্র মিউজিয়ামে প্রকাশের অপেক্ষায় থাকার পর পরিশেষে ১৯৭৭ সনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সাহিত্য সমিতির পক্ষ থেকে ড. আনিসুজ্জামান কর্তৃক প্রকাশিত হয়। উল্লেখ্য তিনি আলাওল রচিত পদ্মাবতী প্রভৃতি কাব্যের ১০৪ খানা পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করে আলাওল সাহিত্য গবেষণা নির্মাণ করেন। তিনি এ সাধনায় ব্রতী থেকে একদিন ১৯৫৩ সনের ৩০ সেপ্টেম্বর বুধবার ফজরের নামাজান্তে কোরআন তেলাওয়াতের পর লিখতে বসেছেন চট্টগ্রামের প্রাচীন বিস্মৃত ইতিহাসের কাহিনী। এ অবস্থায় বেলা সাড়ে ১০টায় তিনি ইন্তেকাল করেন।

x