মতলুব জেঠা, পুরনো চার্চ আর ঘনিয়ে আসা সন্ধ্যা

লুসিফার লায়লা

মঙ্গলবার , ৩০ এপ্রিল, ২০১৯ at ৭:০৪ পূর্বাহ্ণ
38

গলির মুখের মূল সড়কটা ধরে সামনে এগুলেই একটা চার্চ। পুরনো, শ্যাওলা পড়া ইটের গাঁথুনি চার্চটার দিকে তাকালে যীশুকে এমন একলা মনে হয় আমার ! ইচ্ছে করে যীশুর ভালোবাসার আশ্রয় হয়ে উঠি। অথচ রোজ রবিবার আসে তো এখানে অনেকে যীশুর প্রেম এবং করুণা কামনা করতে । মাঝে মাঝে একটা মাতাল পাগল আসে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে এই পুরনো চার্চটার দরজায়। কি যেন বিড়বিড় করতে করতে মাঝে মাঝে চিৎকার করে বলে ফিরিয়ে দাও, ফিরিয়ে দাও বলছি.. .। আমি সে-মাতালটার দিকে তাকিয়ে ভেবেছি এমন কি যা এত আকুল হয়ে চায় সে! ভাবতে গিয়েই মনে হয়েছে একটা কিছু নয়, এমন অজস্র আছে আমার যা আমি বার বার ফিরে চাই আকুল হয়ে চাই। আমার একটা দুর্দান্ত শৈশব আছে দুরন্ত প্রেমিকের মতো যার মুখ। সে-মুখের উপর এই সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসা শীত মেদুর দিনের লালচে আভা পড়ে যেন দারুণ উজ্জ্বল। তার গলায় রঙিন রত্নের মালায় খচিত আমার নানা মুহূর্ত, আমার বুকের ভেতর ভীষণ যত্নে রাখা সব মুখ। শৈশব নামের সে প্রেমিককে বহুবার ফিরে ফিরে চাই, ফিরে ফিরে ডাকি। প্রেম থেকে গেছে জীবন জুড়ে কিন্তু প্রেমিক মিলেছে একবারই ভারী অল্প সময়ের জন্যে। যতবার ফিরে তার মুখ দেখতে গেছি কিছু না কিছু সে উজাড় করেছে আমার কোলের কাছে। যেন সে এইভাবেই জানাতে চেয়েছে তার চিরকালীনতা। আজ যখন সমস্ত দিনের শেষে এসে দাঁড়িয়েছি তার সামনে সে তার রতন হার থেকে উজাড় করেছে মতলুব জেঠার মুখ । বিস্ময়ে ভেবেছি এত পুরনো ধুলোর আস্তরণ সরিয়ে এমন একটা মুখ সামনে এসে দাঁড়ালে আজকের আমির গোপন ইচ্ছে আলো পেতে চায় কি করে? সে-গল্প পরে জুড়ছি । খুব ছেলেবেলায় আমাদের পুরনো বাড়ির পেছনের বারান্দায় আসতেন মতলুব জেঠা । একা আসতে পারতেন না অন্ধ মানুষটা, সাথে নাতিকে নিয়ে আসতেন । কেবল এক কাপ চা খেতে আসতেন বলেই জানতাম তখন। অন্ধ একজোড়া চোখ শূন্যে মেলে দিয়ে বারান্দায় বসতেন। কুশল বিনিময়টুকু না হলে জাগতিক নিয়ম সারা হয়না তাই সেটার দায় সারতেন খুব অল্পতে। এরপরে আস্তে খুলে যেত তার বাঙের মুখ। আর তিনি শুরু করতেন খুব নিচু স্বরে। যেন শোনাতে চান না সবাইকে, কেবল যার কাছে সে সব অমূল্য তার জন্যেই কেবল বলতে চান। আমাদের বাবা ছাড়া সে অমূল্য বুঝবার ক্ষমতা কারো ছিল না তখন। আর আমরা হয়তো মাঝে মাঝে কেবল শোনার আনন্দে কান পেতেছি, অমূল্য জেনে নয় গল্প বলিয়ে মতলুব জেঠা, মুখে মুখে গল্প ফেরি করে বেড়াতেন। অৎস্র সব গল্প মুখে মুখে বানাতেন আর শোনাবার ইচ্ছে নিয়ে মাঝে মাঝে আসতেন আমাদের পেছনের বারান্দায়। রূপকথা নয় সেগুলো, রোজকার জীবনের নানা উপসর্গকে কুড়িয়ে নিয়ে শব্দের জালে এক একটা গল্প বাঁধতেন। যখন গল্প বলতেন তখনও চোখ দুটো অসীমের দিকেই পেতে রাখতেন। যেন দূরে কোথাও কেউ আছে যে কান পেতে আছে। মুখের ভাবটুকু কেবল শব্দের ভার অনুযায়ী বদলে যেত। চোখ দুটো একইরকম স্থির আর শূন্য, গল্পের রংটুকু ধরা থাকত ঠোঁটের কোনায়। কেউ শুনুক না শুনুক গল্প বলা চলত, ওনার সেই গল্প বলার ভেতর বাসার সেই পেছনের বারান্দায় বাজার, রান্না, পানির বিল, অসুখবিসুখ যাবতীয় সংসারের খুঁটিনাটির লেনদেন চলত। তাতে তাঁর গল্প বলায় ছেদ পড়ত না একদম। মাঝে মাঝে কেবল চুমুক দিয়ে চা খেতেন সেটাও খুব কায়দা করে গল্পের অংশের মতোই। একসময় বেলা বাড়ত, উনিও আস্তে আস্তে গুটিয়ে আনতেন তার শব্দের বেছানো জাল। গল্প শেষ হবার পরেও কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকতেন, যেন এই এতক্ষণ ধরে বলা গল্পটা নিজের ভেতর গুছিয়ে তুলে রাখতে সময় নিতেন। তারপর আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়িয়ে এক হাতে লাঠি আর অন্য হাতটা নাতির ঘাড়ের উপর রেখে ফিরে যেতেন। উনি চলে যাবার পরেও অনেকক্ষণ বাতাসে সেই গল্পের রেশ ভেসে বেড়াত। বহুবহু দিন মাস গড়িয়ে গিয়েছে মতলুব জেঠা নেই, ওনার অসাধারণ সব গল্পও আর কোথাও নেই। কিন্তু মার্কেজ পড়তে গিয়ে আমার খুব মতলুব জেঠাকে মনে পড়ত। মার্কেজ তার দিদিমার গল্পের ঝাঁপি থেকে তার নিজের লেখার রসদ খুঁজে নিতেন বলেই এমন মনে হত কিনা আমি জানি না। এই সব মুখে মুখে গল্প ফেরি করা গল্পকারদের গল্পের ঝাঁপি থেকেই অসামান্য সব গল্প তৈরি হয়েছে, কিন্তু গল্পকারদের নাম মুছে গেছে গল্পের ইতিহাস থেকে। একটা সময় পর্যন্ত প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে গল্পগুলো মুখে মুখেই ফেরি হয়ে ফিরেছে। কত শত গল্প তৈরি হয়ে আবার হারিয়েও গেছে । লিখে রাখবার দরকার কেউ ভেবে দেখেনি তখন। অনেক বছর পরে ঠাকুর বাড়ির মেয়েরা এই সব মুখে মুখে ফেরা গল্পগুলো সংগ্রহ করতে শুরু করেন। সেই সংগ্রহের একটা বড় অংশের যোগানদাতা ছিলেন রবি ঠাকুরের স্ত্রী মৃণালিনী দেবী। তার বলা সেইসব গল্পের বাঙ থেকে কুড়িয়ে অবন ঠাকুর লিখেছিলেন ক্ষীরের পুতুল। এখনও অনেক আদিবাসী সমপ্রদায়ে এমন মুখে মুখে তৈরি করা গল্পের প্রচলন আছে । কেউ কেউ সেসব গল্প সংগ্রহ করেন বলে শুনেছি কিন্তু শোনার সুযোগ হয়নি। অনেকদিন আগে এদেশে আসার পর পর একবার এদেশের আদিবাসীদের কালচারাল সোসাইটির এক অনুষ্ঠানে বয়সের ভারে নুজ্য এক আদিবাসী নারীকে দেখেছি তার নিজের সমপ্রদায়ের বয়ে আনা গল্পের সাথে নিজের গল্প জুড়ে দিয়ে গল্প বলতে। শুরুতেই লিখেছিলাম গোপন ইচ্ছের আলো পাবার কথা, মতলুব জেঠা সেই আলোর প্রদীপের সলতে উসকে দেয়া মানুষ। আজকে এই সময়ে এসে যখন নিজের লেখক সত্তাকে শানাতে চাই তখন মনের কোনো অচেতনে বসে মতলুব জেঠা ইন্ধন দেন জানি না। এই হিম ঝরা সন্ধ্যায় পুরনো চার্চের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে পাগলটা যখন ফিরিয়ে দাও বলে আকুল হচ্ছে আমি তখন চুপি চুপি আমার শৈশবের হাত ধরতে আসি। বলতে আসি এই অবিচ্ছেদ্য প্রেম তোমার সাথে আমার তার কারণ এমন সব হীরক চূর্ণের দ্যুতিতে তুমি উজ্জ্বল। শৈশব হেসে আমার কোলের কাছে ঘুমিয়ে পড়ে আবার কোনো মাহেন্দ্র ক্ষণে জেগে উঠবে বলে।

x