মঈনুল আলম : আমি যে গান গেয়েছিলেম

ড. মোহীত উল আলম

শুক্রবার , ৫ অক্টোবর, ২০১৮ at ৫:৫৯ পূর্বাহ্ণ
43

বইয়ের তাকে একটা কী বই খুঁজতে গিয়ে হাতে ঠেকল মঈনদার লেখা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কিছু গান ও কবিতার অনুবাদ, “রিমেম্বার আই স্যাং” শীর্ষক পাতলা বইটি। বুকটা খট করে মোচড় দিয়ে উঠল। জীবনকি এমনই! যে মানুষটা ছিল আমাদের পরিবারের মধ্যমণি, যে মানুষটা সাংবাদিক হিসেবে বিদেশ এবং দেশ জুড়ে খ্যাত ছিলেন, যে মানুষটা বড় মেয়ের অসুস্থতার কারণে বিদেশে পর্যন্ত চলে গেলেন স্থায়ীভাবে, আর যে মানুষটা ২০০৭-৮ সালের দিকে মাস কয়েকের জন্য দেশে এসে বের করেছিলেন রবীন্দ্রনাথের ওপর অনুবাদ গ্রন্থটি, যে গ্রন্থটির প্রকাশনা উৎসব হয়েছিলো ঢাকার ইউল্যাব বিশ্ববিদ্যালয়ে, সেই মানুষটা এখন নেই, আর সেটা জানিয়ে দিল আমাকে হালকা পাতলা একটি বই: “রিমেম্বার আই স্যাং।” “এই কথাটি মনে রেখ . . . / . . . আমি যে গান গেয়েছিলেম”্তকবিগুরুর এই গানটিরই ঐ বিশেষ চরণটির অনুবাদে মঈনদা বইটির নাম দিয়েছিলেন, এবং আজকে অমোঘভাবে তিনি যেন আমাদেরকে বলছেন, “বাদল, তোরা মনে রাখিস, আমি যে গান গেয়েছিলাম।”
কি গান গেয়েছিলেন, মঈনদা (মঈনুল আলম)?
তাঁর জন্ম ১৯৩৭ সালে। বাবার প্রথম স্ত্রী মারা যাবার পর আমার মায়ের ঘরে মঈনদা দ্বিতীয় সন্তান, কিন্তু প্রথম পুত্র। বাবার চোখে তাঁর ‘মঈন’ ছিল সে ছেলে যাঁকে তিনি বড় হওয়ার পর থেকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দেখতেন। মা ডাকতেন, ‘মায়া’। বাবা নিজে ছিলেন লেখক আর সাংবাদিক-সম্পাদক, তাঁর ছিল দৃঢ়চেতা এক অনিরুদ্ধ ব্যক্তিত্ব। সে তুলনায় মঈনদা ছিলেন একান্ত প্রতিভাধারী চঞ্চল হরিণ শাবকের ন্যায়। কিন্তু তারপরও বাবা মঈনদার সঙ্গেই সংসার আর জীবনের যাবতীয় বিষয় নিয়ে পরামর্শ করতেন। মঈনদা চোখের পলকে অনেক দূর দেখতে পেতেন। কিন্তু বাবার যেমন ছিল যে কোন বিষয়ে একটি সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গী, মঈনদার ছিল তার উল্টো। যে কোন ব্যাপারে মঈনদার সিদ্ধান্তগুলো আসত তাৎক্ষণিক, খন্ডিত কিন্তু অসম্ভব তীক্ষ্ণ একটি পর্যবেক্ষণ থেকে। ক্রিকেটের ভাষায় বললে, বাবা ছিলেন টেস্ট ক্রিকেটের মেজাজ নিয়ে, আর মঈনদার ছিল টি-টোয়েন্টির মেজাজ। দ্রুত, তীব্র, তীক্ষ্ণ তাঁর অবলোকন, কিন্তু বড়সর প্রেক্ষাপটে খানিকটা অনিশ্চিত। সেজন্য মঈনদাকে আমার কাছে সবসময় ভীরু হরিণ শাবকের মতো মনে হয়েছে। তাঁর জীবনভর ছোটাছুটিগুলো যেন কোন একটা অজানা ভয় থেকে উৎসারিত ছিল। বাবা যদি গুলির মুখে দাঁড়াতেন, মঈনদা গুলিতো দূরের কথা, গুলির শব্দ শোনা যায় সেরকম জায়গা থেকেও কয়েক মাইল দূরে থাকতেন।
কিন্তু্তকিন্তু, তাঁর ছিল আশ্চর্য বহুমাত্রিক প্রতিভা। অংকনে, আলোকচিত্রে, পোশাক তৈরি এবং প্রকাশনা শিল্পে। আর লেখক ও সাংবাদিকতো তিনি ছিলেনই। আর তাঁর গানের গলা ছিল না, কিন্তু উচ্চাঙ্গ সংগীতের বিরাট সমঝদার ছিলেন তিনি।
আমাদের পরিবারে প্রথম দিকে ১৯২০ থেকে ১৯৪০ পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার দিকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হতো না। পরিবারের সদস্যরা যে যার জন্মগত সৃজনশীলতার চর্চায় আপনা-আপনি বড় হয়ে উঠছিল। আমার চাচা ওহীদুল আলম বিএবিটি পাস ছিলেন, আমার জ্যেষ্ঠতম ভ্রাতা সাইফুল আলমও বিএ পাস ছিলেন এবং তিনি আগ্রহভরে তাঁর নামের পাশে ডিগ্রিটা উল্লেখও করতেন। আমার আরেক চাচা কবি দিদারুল আলমের একান্ত বন্ধু ছিলেন আবুল ফজল। দিদারের ১৯২৯ সালে ২৬ বছর বয়সে যহ্মারোগে অকাল মৃত্যু হয়। আবুল ফজল তাঁর জীবনস্মৃতি রেখাচিত্র গ্রন্থে এ প্রসঙ্গটা এনেছেন এবং বলেছেন যে হৃদয়ের বন্ধুর অনুপস্থিতিতে তিনি বন্ধু-বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক রাখার নৈতিক তাগিদ বোধ করলেন। ওহীদুল আলমের মাধ্যমে বাবার কাছে প্রস্তাব পাঠালেন আবুল ফজল যে তিনি তাঁর বড় মেয়ে উমরতুল আলমকে বিয়ে করতে চান। আবুল ফজল প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর, দ্বিতীয়বার বিবাহ করলে সে স্ত্রীও মারা গেলে, আমাদের বাড়িতে প্রস্তাব পাঠনোর কালে তিনি বিপত্নীক ছিলেন। উমরতুল আলম তাঁর আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ঊর্মি-তে লিখেছেন, প্রস্তাব আসার পর বাবা মেয়েকে ডেকে তাঁর মতামত চান। বড় বুবু একদিন সময় চান বাবার কাছে। তারপর ‘হ্যাঁ’ বলেন। বলা বাহুল্য, বড় বুবু আবুল ফজলের চেয়ে আঠার বছরের ছোট ছিলেন। আমার বাবাও আমার মায়ের চেয়ে আঠার বছরের বড় ছিলেন। তখনকার দিনে স্বামী-স্ত্রীর বয়সের পার্থক্য গড়পরতা এরকমেরই ছিল। কিন্তু বাবা যে বড় বুবুর মতের অপেক্ষা করলেন, এটাই আলম পরিবারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য যে পরিবারের যে কোন সদস্য তার ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশের ব্যাপারে সম্পূর্ণ স্বাধীন।
আলম পরিবারে আবুল ফজলের আগমন অন্য একটি নতুন মাত্রা যোগ করে। আবুল ফজল ছিলেন ব্যক্তিগত জীবনে খুব শৃঙ্ক্ষলাপ্রবণ মানুষ এবং তাঁর সঙ্গে আত্মীয়-পরিমণ্ডলের মধ্যে ঘোরাফেরার সুবাদে এবং তাঁর যাবতীয় গ্রন্থ পড়ে আমার ধারণা হয় যে তিনি ব্যক্তিমানুষের চেয়েও সামাজিক কাঠামোতে বেশি বিশ্বাস করতেন। একটা মানুষকে যদি কোন একটা প্রতিষ্ঠিত সামাজিক ছাঁচে ফেলে দেওয়া যায়, তা হলে তার সাফল্য নিশ্চিত, এরকম একটি যুক্তিনির্ভর ধারণা আবুল ফজলের ছিল। ওপরে ওঠার সামাজিক সিঁড়িটা সম্পর্কে আবুল ফজল কখনো অবচেতন ছিলেন না। সেজন্য তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে খুব মূল্য দিতেন এবং আমাদের পরিবারে তাঁর আগমনের পর প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ বাড়ে। আবার আমার বাবা, তাঁর শ্বশুর মাত্র ছিলেন পাঁচ বছরের বড়। দু’জনেই সাহিত্য চর্চা করতেন এবং তৎকালীন কলকাতা ও পূর্ববঙ্গের বিদগ্ধজন সমাজে লেখক-সাহিত্যিক অনেকেই ছিলেন দুজনের কমন বন্ধু। দিদারের একান্ত বন্ধু হবার কারণে কবি নজরুল দিদারের বড় ভাই হিসাবে বাবাকে ডাকতেন, ‘মহবুব দা।’ আবার এই ‘মহবুব দা’ সম্বোধন করেই বেগম সুফিয়া কামাল বাবাকে খুব সুন্দর সুন্দর চিঠি লিখতেন এবং সম্ভবত আবুল ফজলকেও কবি সুফিয়া কামাল চিঠি লিখতেন। তাঁদের আরো কমন বন্ধু ছিলেন আব্দুল কাদির, কাজী মোতাহের হোসেন, জসীমউদ্দিন এবং অন্নদাশংকর রায়। অন্নদাশংকর রায় বাবার মৌলিক সৃজনশীল গদ্যের একান্ত ভক্ত ছিলেন, বলতেন বাবার লেখায় ‘এলিমেন্টাল’ অর্থাৎ একান্তই মৌলিক শক্তি নিহিত ছিল। বাবার সঙ্গে তিনি সর্বতোভাবে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করতেন এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর বাংলাদেশের ওপর একটি মোটা বই লিখেন, যেটি উৎসর্গ করেন বাবাকে।
আবুল ফজলের কাঠামোভিত্তিক চিন্তার উল্টোদিকে ছিল বাবার জীবনদর্শন। তিনি ব্যক্তিমানুষের মৌলিক চিন্তা, স্বকীয় সক্ষমতাকে অসম্ভব মূল্য দিতেন। ব্যক্তিমানুষের সাহস, উদ্যম, প্রচেষ্টা এগুলির প্রতি বাবার অতিশয় অনুরক্তি ছিল। বাবা কোন জিনিসকে ছোট মাপের মধ্যে দেখতে পেতেন না। ডর-ভয় এগুলি কোনদিন তাঁর মধ্যে দেখিনি। তাঁর অনেক সাহসী কাজ ও সিদ্ধান্ত আমাদের পবিবারের মধ্যে গাথার অবয়ব পেয়েছে। তাই আমার দুলাভাইয়ের কবি ছেলে আবুল মোমেন যখন শীলা দাশকে বিয়ে করার মতো যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছিলো, তখন স্বাভাবিক কারণেই পিতা হিসেবে আবুল ফজল একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন। মোমেন আসল নানার কাছে, নানা তাকে এবং শীলাকে নিয়ে আদালতে গিয়ে বিয়ে করিয়ে নিয়ে আসলেন।
মঈনদা অত্যন্ত প্রতিভাবান শ্যালক হিসেবে আবুল ফজলের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠলেন, বড়বুবুও তাঁকে খুব স্নেহ করতেন। কিন্তু বিএসসি পরীক্ষা দিতে গিয়ে অংক পরীক্ষার দিন মঈনদা পরীক্ষা হল থেকে ঘন্টা ফুরোনোর অনেক আগেই কলেজ থেকে বের হয়ে পড়েন। সরাসরি আসলেন বড় বুবুর (উমরতুল ফজল) কাছে। পকেট থেকে আমার চাচাতো বোন নার্গিস উল আলমের ছবি দেখিয়ে বললেন, তিনি আর পড়াশুনা করবেন না, নার্গিসকে বিয়ে করবেন, আর বুবু যেন বাবার কাছে কথাটা পাড়েন। ততোদিনে আবুল ফজলের প্রভাবে বড়বুবুও বেশ খানিকটা শৃঙ্খলাপ্রবণ হয়ে পড়েছেন এবং ভাইকে খানিকটা অনুশাসনও করলেন। কিন্তু মঈনদা এককাট্টা, নার্গিসকেতো বিয়ে করবেনই এবং পড়াশুনা করবেন না, সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেবেন।
বড়বুবু অত্যন্ত প্রতিভাবান ছোট ভাইয়ের আবদার ফেলতে না পেরে বাবাকে কথাটা জানালেন। আমার বাবা মানুষের কোন ইচ্ছাকে কোনদিন না বলতেন না। বললেন, ওহীদতো আমার ছোট ভাই, ওর মেয়ে বিয়ে করছে মইন, অসুবিধা কি। বড়বুবুর খুব ব্যক্তিত্ব ছিল। তিনি চাচা ওহীদুল আলমকে ডেকেও রাজি করালেন। আমার গুন্নিমা (চাচি) মোটেও রাজি ছিলেন না। ফলে বিয়ের আনুষ্ঠানিক কথাবার্তা বড়ুবুবুর বাসায় আবুল ফজলের তত্ত্বাবধানে নিষ্পত্তি হয়।
মঈনদার তখন ১৯/২০ বছর বয়স, নার্গিস ভাবীর ১১। কিন্তু বিয়ে সম্পন্ন হয়ে গেল। ১৯৫৭ সাল। আমি তখন চার বছর বয়সের, কিচ্ছু মনে নেই। আমার বড় কিন্তু মঈনদার ছোট অন্য ভাইবোনদের বুক চিড়ে কি একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এল! মঈনদা মেট্রিক প্রথম বিভাগে এবং আই এস সি দ্বিতীয় বিভাগে পাস করার সময় বাবার চাকরির শেষ নাগাদ তিনি পরিবারসহ ঢাকায় ছিলেন। মঈনদার চিত্রাঙ্কনে অতিশয় সহজাত প্রতিভা দেখে শিল্পী জয়নুল আবেদিন তাঁর একাডেমিতে (পরবর্তীকালে ঢাকা আর্ট কলেজ) মঈনদাকে ভর্তি করানোর জন্য বাবাকে পরামর্শ দিলেন। তৎকালীন নামকরা শিল্পী কাশেম সাহেবও চেয়েছিলেন মঈনদা আর্ট কলেজে ভর্তি হোক। চাকরি শেষে বাবা পরিবার নিয়ে চট্টগ্রামে একেবারে চলে আসায় নাকি অন্য কোন কারণে জানি না, মঈনদার আর আর্ট কলেজে পড়া হয় নি। কিন্তু তাঁর রং তুলি থেমে থাকেনি। বাবা চাকরি থেকে অবসর নিয়ে “জমানা” পত্রিকা প্রকাশ করতে শুরু করলেন। মঈনদা চাকরি নিলেন ইস্টার্ন এগ্‌জামিনার নামক একটি ইংরেজি পত্রিকায়। কিন্তু পাশাপাশি “নয়া জমানা” নামক একটি ত্রৈমাসিক সম্পাদনা করতে লাগলেন, যেখানে কালো পেলিক্যান কালি দিয়ে আশ্চর্য সব রাজনৈতিক কার্টুন আঁকতে লাগলেন। এরপর রং তুলি দিয়ে তাঁর ছবি আঁকা দেখে আমরা বুঝতে পারতাম, অনেক নামকরা শিল্পির চেয়েও তাঁর আঁকা ভালো ছিল। ইন্দিরা গান্ধীর একটি প্রতিকৃতি মঈনদা এঁকেছিলেন। এত বক্ষ্যমান ছিল সেটা, রঙে রঙে যেন ইন্দিরা গান্ধীর আগ্নেয় ব্যক্তিত্ব প্রকাশ হয়ে পড়ছিল। ঢাকাস্থ ভারতীয় দূতাবাস সম্ভবত সেটি মঈনদার কাছ থেকে উপহার হিসেবে পায়। ফরাসী বিপ্লবের ওপর ভিত্তি করে মঈনদা একটি বড়সর প্রতিকৃতি এঁকেছিলেন, যেটির ক্যাপশন ছিল, “লিবার্টি” এবং যেটি ফরাসী বিপ্লবের ২০০ বছর পালন উপলক্ষে তিনি প্যারিসে নিয়ে যান এবং সেখানে প্রদর্শন করেন।
মঈনদা প্রথম জীবনে জলরং দিয়ে ছবি আঁকতেন, যার অপূর্ব সাক্ষ্য বহন করছে পারিবারিক হাতে-লেখা সাহিত্য পত্রিকা, “রাঙা-তুলির আঁচড়”্তযেটির তিনটি সংখ্যা সবিহ উল আলমের তত্ত্বাবধানে পঞ্চাশের শেষের দিকে বের হয়। পরিণত বয়সে মঈনদা কেবলই তৈলচিত্র আঁকতেন। শুনেছি কানাডায় শেষ বয়সে তাঁর কামরায় বসে তিনি প্রচুর ছবি এঁকেছেন। আশা করছি, সেগুলি একসময় আমরা সংরক্ষণ করতে পারব।
ইস্টার্ন এগ্‌জামিনার পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন মাসওয়ানি সাহেব, অবাঙালি। মঈনদাকে তিনি একদিন বলেছিলেন, মঈন, যে শব্দটা তোমার কলমের ডগায় আসছে, বুঝবে সে শব্দটা পাঠকের মনেও আসছে। ঐভাবেই লিখবে। মঈনদাকে দেওয়া তাঁর সম্পাদকের ঐ উপদেশটি আমিও লেখার ক্ষেত্রে মেনে চলি।
মঈনদা যেমন কোনরকম প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান ছাড়া ভালো চিত্রশিল্পী হয়েছিলেন, তেমনি ইংরেজিতে অনার্স এম এ না করেও তিনি খুবই ভালো ইংরেজি জানতেন। এটি হয়েছিল তাঁর ছোটবেলা থেকে ইংরেজি উপন্যাস পড়ার কারণে। মঈনদার ব্যক্তিগত পাঠাগার ছিল ইংরেজি বইয়ে ঠাসা। আমার বন্ধু ইংরেজির প্রফেসর গোলাম সারোয়ার চৌধুরী আমাকে প্রায় বলতেন, মোহীত ভাই, মইন ভাই রাইটস একসেলেন্ট ইংলিশ।
মঈনদা নিজেই একটি ইংরেজি সাপ্তাহিক সম্পাদনা করেছেন দীর্ঘ নয় বছর: “দ্য কনজিউমার-ইকোনোমিস্ট”। সেটির তিনি ছিলেন প্রকাশকও। ইত্তেফাক পত্রিকার তিনি ছিলেন চট্টগ্রাম আবাসিক প্রতিনিধি। রিগ্যান-গোর্ভাচেভের শীর্ষ বৈঠকের সময় মঈনদাকে ইত্তেফাক পাঠান ওয়াশিংটনে। ১৯৮৭ সাল। মঈনদা চমৎকারভাবে শীর্ষ সম্মেলনটির প্রতিদিনের অগ্রগতি ইত্তেফাকে পাঠাতে থাকেন, যেটি ঐ সময়ের ইত্তেফাকের প্রতিদিনের শীর্ষ শিরোনাম হয়। এ বৈঠকটি নিয়ে মঈনদা ইংরেজিতে একটি বই লেখেন, “ট্রায়াম্ফ ইন দ্য আফটারনুন” নামে, যেটি হোয়াইট হাউজে প্রেসিডেন্ট রিগানের বরাবরে শুভেচ্ছা কপি পাঠালে তিনি মঈনদাকে এর প্রত্যুত্তরে ধন্যবাদ জানিয়ে চিঠি দেন। আরো অবাক কাণ্ড, মঈনদা “আ কাইট ইন দ্য এ্যাজুর” নামক একটি ইংরেজি উপন্যাস লিখে ফেললেন, এবং বইটা প্রকাশিত হলে আমরা সেটি পড়ে আশ্চর্য হয়ে গেলাম। এত সুন্দর ইংরেজি, এত চমৎকার প্লট, বিষয়টি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় দুর্ভিক্ষ প্রপীড়িত পটিয়ার একটি গ্রামে একটি ভদ্র পরিবারের কষ্টসহিষ্ণু জীবনযাপনের ওপর। বইটির ওপর একটি আলোচনা সভায় আবুল মোমেন বললেন যে এটি মঈনুল আলমের একটি বড় কাজ। এর আগে মঈনদা বাবার উপন্যাস “মফিজন” ইংরেজিতে অনুবাদ করে ছাপান, “বালাডস অব আ বেঙ্গলি বেল” নাম দিয়ে। বাবার “মফিজন” নিয়ে মঈনদার আগ্রহের শেষ ছিল না। তিনি এটির চিত্রনাট্য লেখেন “হীরামণ” নাম দিয়ে। তখন পাকিস্তান আমলের শেষের দিকে। চিত্ত চৌধুরীকে দিয়ে তিনি সিনেমাটি নামান। কবরী নায়িকা হয়, আর ভাগ্নে আবুল মঞ্জুর (আবুল ফজল/উমরতুল ফজলের বড় ছেলে।) হয় নায়ক।
মুক্তিযুদ্ধ আলম পরিবারে ব্যাপকভাবে ঢোকে। আমার ছোট ভাই সাযেদ আর ভাইপো শাহেদ (এখন মৃত) মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়। অন্যদিকে মঈনদা সীমান্ত পাড়ি দেন মার্চের শেষের দিকে কিংবা এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে। ১৯৭৬ সালে মঈনদার সরাসরি তত্ত্বাবধানে বাবার মুক্তিযুদ্ধের ওপর রচিত সাড়ে সাতশ পৃষ্ঠার বই বাঙািলর মুক্তিযুদ্ধের ইতিবৃত্ত (এর প্রথম নামটি ছিল রক্ত: আগুন: অশ্রুজল স্বাধীনতা) বের হলে মঈনদা এর ভূমিকায় বলেন যে ২৫শে মার্চের গভীর রাতে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার তারবার্তাটি ইপিআর হেডকোয়ার্টারের মাধ্যমে তাঁর হস্তগত হয় এবং তিনি আব্দুল হান্নানসহ চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতৃবৃন্দের কাছে এর সাইক্লোস্টাইলড কপিটি সরবরাহ করেন। বদরুদ্দিন উমর তাঁর একটি কলামে ঐ রাতে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি এরকম একটি কথা বলতে গিয়ে মঈনুল আলমের দাবিটিও প্রত্যাখ্যান করেন। মঈনদার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর কিছু একটা যোগাযোগ ছিল। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ঘটা তাঁর নানা সংলাপের কথা তিনি গৃহ আড্ডায় বলতেন।
ফেইসবুক আসার পর মঈনদা ফেইসবুকে নিজের নামে একটা এ্যাকাউন্ট খোলেন, এবং তাঁর অনেক আপলোডের মধ্যে আমার প্রিয় ছিল তাঁর ক্যামেরায় তোলা আমাদের পরিবারের পুরোনো দিনের ব্ল্যাক এ্যান্ড হোয়াইট যুগের ছবিগুলি। তাঁর রং আর তুলির মতো, তাঁর ইংরেজির মতো মঈনদার ছিল আলোকচিত্রে সহজাত প্রতিভা। আমাদের পুরোনো প্রজন্মের অনেকের ছবি মঈনদার কল্যাণে আমাদের কাছে এসে গেছে। চট্টগ্রাম ক্লাবের সংস্কৃতির সঙ্গে মঈনদা অপরিচিত ছিলেন না। সে সময়কার একটি শাদা-কালো ছবি মঈনদা একদিন আপলোড করলেন। চট্টগ্রাম ক্লাবে বহুজাতিক কী একটি সাংস্কৃতিক সম্মেলন হচ্ছিলো। মঈনদা আর নার্গিস ভাবী এক নাইজেরিয়ান দম্পতি সেজে সে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, তারই ছবি। নাইজেরিয়ার প্রতি আকর্ষিত হবার কারণ ছিল, তখন কিছুদিন মাসুদ ওলাবেশি আজালা নামক এক বিশাল বপুর কৃষ্ণাঙ্গ সাংবাদিক চট্টগ্রাম বেড়াতে এসে মঈনদার ওপর ভর করেন। মঈনদার বাহন তখন একটা ভেসপা স্কুটার। মঈনদার পেছনে ঐ বিশাল মনুষ্যদানব ভেসপায় চেপে দুপুরে আমাদের কাজীর দেউড়ির বাসায় ভাত খেতে নামছে এটা দেখে আমরা ছোটরা কি যে মজা পেতাম!
মঈনদার সঙ্গে বিদেশী কূটনীতিকদের সম্পর্ক সবসময় ভালো ছিল। কাজীর দেউড়ির দোতলার বাসায় মঈনদার কাছে আমেরিকান দূতাবাসের শ্বেতাঙ্গ এবং কৃষ্ণকায় প্রতিনিধির যেমন দাওয়াত খেতে দেখেছি, তেমনি রুশ কনসুলেটের লোকজনকেও বাসায় আসতে দেখেছি। পশ্চিমা সংস্কৃতির অনুসরণে মঈনদার বাসায় পার্টিও হতো। এক অর্থে আমার ভাইটি ছিল্তনিজের অজান্তেই্তপশ্চিমা সংস্কৃতির একজন বিরাট সমঝদার। তিনি পশ্চিমা গান এত শুনতেন, ছোটবেলা থেকেই আমাদের তাই পঞ্চাশ/ ষাট/ সত্তর দশকের বিশ্বব্যাপী নাম করা গায়ক-গায়িকাদের গান শোনা হয়ে গেছিল। আমি নিজে কনি ফ্রান্সিস, জর্জিয়া জিবস, পল আংকা, হ্যারি বেলাফোন্টে, ডিউক এলিংটন, ন্যাট কিং কোল, নিল ইয়াং, ফ্যাংক জাপ্পা, এলভিস প্রিসলি, জোয়ান বাএজ, বব ডিলান, সাইমন এবং গারফানকেল এঁদের লং প্লে মঈনদার দোতলায় সে ষাট সত্তর দশকে শুনেছি। রবীন্দ্র সংগীতের লং প্লের মধ্যে মঈনদার কালেকশনে ছিল “শ্যামা,” “চিত্রাঙ্গদা,” “বর্ষামঙ্গল” এবং পঙ্কজ, হেমন্ত এঁদের লং প্লে।
মঈনদা নার্গিস ভাবীকে সেতার ধরিয়ে দেন, ফলে নার্গিস ভাবী সেতারবাদক হিসেবে একটা পর্যায়ে ওঠেন।
সাংবাদিক হিসেবে মঈনদা প্রথিতযশাতো ছিলেনই, তাঁর রিপোর্টিংএর স্টাইল ছিল গল্পের আকারে তথ্য প্রদান করা। তাঁর ইত্তেফাকে ঢোকার সময় সে ১৯৬০ সালের ৩১ শে অক্টোবর পতেঙ্গার বিধ্বংসী তুফানের সচিত্র সংবাদ এক রাতেই তাঁকে সাংবাদিক হিসেবে বিখ্যাত করে দেয়। তাঁর প্রহসনমূলক সংবাদ, “শুক্কুইর যে হডে রে” ছিল একটি এ্যাটম বোমা তৎকালীন আইয়ুব শাহীর রাজনীতির হালচালের ওপর। সাংবাদিক হিসেবে মঈনদা বড় বড় রাষ্ট্রীয় দাওয়াত পান যথাক্রমে ফিলিপাইন (১৯৭৪), যুক্তরাজ্যের সেন্টা্রল অফিস অব ইনফরমেশন কর্র্তৃক (১৯৭৫), ইউ এস ইন্টারন্যাশন্যাল ভিজিটরস প্রোগ্রামের আওতায় প্রেসিডেন্ট ফোর্ড কর্তৃক আমন্ত্রিত (১৯৭৫), (উল্লেখ্য যে অনুরূপ একটি প্রোগ্রামের আওতায় বাবাও আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ারের আমন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ করেন ১৯৫৯ সালে), ১৯৭৯ সালে অঝঊঅঘ জোট অন্তভুক্ত দেশগুলো ভ্রমণ করেন। ১৯৮৫ সালে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে ভ্রমণ করেন পশ্চিম জার্মানি, যেখানে একটি বক্তৃতায় তিনি উল্লেখ করেন যে দুই জার্মানি এক হবেই। ১৯৮৬ সালে এ্যালিয়ন্স ফ্রান্স কর্তৃক আমন্ত্রিত হয়ে তিনি ফ্রান্স ভ্রমণ করেন। ১৯৯৩ সালে যান জাপান। এ ছাড়া ১৯৭৫ সালে আমন্ত্রিত হয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতার ওপর বক্তৃতা করেন।
সাংবাদিকতার ওপর তাঁর লিখিত বই “কলমের সৈনিক” (২ খণ্ড), এবং তাঁর উপন্যাস “বেনতাগ্রি” খুবই সুখপাঠ্য।
পারিবারিক ঐতিহ্যের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য মঈনদার মধ্যে পুরোপুরি ছিল: আড্ডা না মারা, অযথা সময় নষ্ট না করা, এবং পরচর্চা না করা। সাথে ছিল পারিবারিক ঐতিহ্য অনুযায়ী পরিশ্রম করার ক্ষমতা। মঈনদা শারীরিক এবং মানসিক কী যে পরিশ্রম করতেন এটা আমার নিজের চোখে দেখা। মনে হয় না তিনি চার-পাঁচ ঘণ্টার বেশি ঘুমাতেন। মঈনদা অর্থকড়ির ব্যাপারে খুব সৎ ছিলেন, এটিও একটি পারিবারিক ঐতিহ্য।
তবে আয়ু নিয়ে, শরীর নিয়ে বার্ধক্যের সময় তাঁর মধ্যে একটা অবসেশন তৈরি হয়। আমার বাবা বেঁচেছিলেন তিরাশি বছর, আর আমার চাচা ওহীদুল আলম অর্থাৎ তাঁর শ্বশুর বেঁচেছিলেন আটাশি বছর। তিনিও দীর্ঘজীবনের প্রত্যাশী হয়ে খাওয়া-দাওয়া এক অদ্ভুত নিয়মে করতে লাগলেন। ২০১২ সালে ঢাকায় আমার বাসায় থাকার সময় আবিষ্কার করলাম সেটা। খুকুকে বললেন, খাওয়ার সময় জলপাই রাখতে হবে আর প্রচুর ডাল। জলপাই মিশিয়ে হাত ডুবিয়ে প্রায় ডাল খেতেন। আমি একটু কি বলতে গেলাম, আমাকে মৃদু ধমক দিয়ে বললেন, ইউ আর টকিং টু সামবডি অন এইজিং হু ইজ সিনিয়র টু ইউ বাই সিক্সটিন ইয়ারস। আমি ভাবলাম, তাইতো, আছে মৃত্যু তালে তালে, সেখানে কে কাকে উপদেশ দেয়!
কামাল দুলাভাই আর অলদু আপা ঘটনাক্রমে মঈনদার মৃত্যুর সময় টরোন্টোতে ছিলেন। তাঁরা ফিরে এসে বললেন, মঈনদার খুব শান্ত মৃত্যু হয়েছে। মঈনদা একাশি বছর পেয়েছিলেন।
লেখার শেষে আবার “রিমেম্বার আই স্যাং” গ্রন্থের প্রসঙ্গে আসি। বইটির পুরো শিরোনাম: “রিমেম্বার আই স্যাং: আ বুকে অব পোয়েমস এ্যান্ড লিরিকস অব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।” বইটির প্রচ্ছদ মঈনদার নিজের করা রবীন্দ্রনাথের একটি প্রতিকৃতি। বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে বাবাকে। মঈনদার নিজের তোলা বাবার একটি অসামান্য ছবি ছাপিয়ে তার নীচে লিখেছেন: “মাই ইনফিনিট গ্র্যাটিচিউড টু মাই ইলাসট্রিয়াস ফাদার, মাহবুব উল আলম, হু ফার্স্ট রেড টু আস টেগোরস পোয়েম ‘দ্য লাস্ট বো’ এ্যান্ড স্যাং টু আস টেগোরস ব্রম্মা সং ওয়েন আই ওয়াজ এইট ইয়ারস ঔল্ড (১৯৪৫)।” মঈনুল আলম, টরোন্টো, কানাডা, নভেম্বর ২২, ২০০৭।
তারপর অনুবাদক হিসেবে মঈনদার দুই পৃষ্ঠার একটি ভূমিকা, এবং সূচিপত্রে ৩৫টি অনূদিত গান এবং কবিতার তালিকা। হালকা সবুজ রঙের সফট জ্যাকেটের কাভারে ৮০ পৃষ্ঠার বইটি টইটম্বুর, ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয় ২০০৮ সালের জানুয়ারি মাসে।
এখানে মঈনদার করা “আমি যে গান গেয়েছিলেম” গানটির অনুবাদ পরিবেশন করলাম।
Remember it, in your this merriment and play,
I sang when withering leaves shed away.
On sere grass in the deserted forest
Ignored and negelected, on my own
I sang when withering leaves shed away.
Remember, ye traveller in daylight
that I travelled in the night
holding the evening lamp in my hand.
When I was called from the other bank
I set out on a broken raft,
I sang when withering leaves shed away.

x