ভয়ংকর ভুতূড়ে শহর

আরিফ রায়হান

বুধবার , ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৬:২৫ পূর্বাহ্ণ
209

ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির জন্য ভারতবর্ষ যেমন বিখ্যাত ঠিক তেমনি ভৌতিক, জাদুটোনা, মন্ত্র-তন্ত্র এবং নানা রহস্যের জন্যও দেশটির নাম উচ্চারিত হয় সর্বাগ্রে। উল্লেখিত বিষয়ে নানা ঘটনায় ভরপুর ভারত। এরমধ্যে অন্যতম রাজস্থানের ভানগড়ের ভৌতিক কিংবদন্তি। শুধু ভানগড়ই নয়, কুলধারা নামে রাজস্থানের আরও একটি গ্রাম যেটির ভৌতিক ঘটনা আজও মানুষকে শিহরিত করে। প্রতিবছর বিশ্বের নানা দেশ থেকে অসংখ্য ভ্রমণপ্রেমী মানুষ বেড়াতে যান রাজস্থানে। রাজস্থানের জয়সলমীর শহর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে পরিত্যক্ত এক ছোট্ট শহর কুলধারা। যেখানে কেউ যায় না। অভিশপ্ত এই শহরে গেলে কেউ প্রাণ নিয়ে ফিরে আসে না।
প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর কুলধারা গ্রামটি এক রাতের মধ্যে কিভাবে ‘অভিশপ্ত’ হয়ে গেল, সেই কাহিনী শুনে আজও মানুষ শিহরিত হয়। ৮৪টি ছোট ছোট সমপ্রদায়ভিত্তিক গ্রাম নিয়েই গড়ে উঠেছিল কুলধারা। ১২৯১ সালের যোধপুরের পালিওয়াল ব্রাহ্মণরা এই গ্রামের পত্তন করেন। সেই সময় কুলধারা ছিল এক হাজার ৫ শত মানুষের সমৃদ্ধ এক জনপদ। রাজস্থানের আশেপাশে মরু অঞ্চল হওয়ার পরও কুলধারায় ছিল না জলের সমস্যা। আবহাওয়াও ছিল বেশ অনুকূল। ফলে কুলধারায় খাদ্যশস্যের কোনো অভাব ছিল না। পালিওয়াল ব্রাহ্মণরা কৃষি কাজে বেশ অভিজ্ঞ ছিল। গ্রামটি কৃষি এবং বাণিজ্যের জন্য বেশ সুপরিচিত। উন্নতমানের স্থাপত্য ও অসংখ্য মন্দির ছিল কুলধারায়। রাজস্থানের এই সুন্দর এলাকা ১৮২৫ সালে রাখি পূর্ণিমার রাতে পুরোপুরি ফাঁকা হয়ে যায় এবং একই সাথে গায়েব হয়ে যায় এক হাজার ৫শত মানুষ। সাত শতক ধরে এই গ্রামে বসবাস করার পর কেন এক রাতে এই অঞ্চলের মানুষ পালিয়ে গিয়েছিল এর পেছনের কাহিনী থেকে জানা যায়, প্রায় দু’শো বছর আগে জয়সলমীরে সেলিম সিং নামে এক অত্যাচারী দেওয়ান ছিলেন। কর আদায়ের জন্য তিনি নানা অত্যাচার শুরু করেন। এরইমধ্যে সেলিম সিংয়ের দৃষ্টি পড়ল কুলধারার গ্রামপ্রধানের সুন্দরী কন্যার উপর। ব্রাহ্মণদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে ব্যর্থ হয়ে যায় তার স্বপ্ন। তখন তিনি বিয়ে হলে এই ৮৪ টি গ্রামের মানুষকে আকাশচুম্বী কর দেয়ার শর্ত জুড়ে দেন। তার এই শর্তের পরেও কুলধারা প্রধান রাজি হননি। একদিকে করের বোঝা এবং অন্যদিকে গ্রাম প্রধানের কন্যাদান এই দুই চাপের মুখে পড়ে কুলধারার মানুষ। একদিন তারা একত্রিত হয়ে নিজেদের আত্মসম্মানকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ওই রাতেই তারা সবাই গ্রাম ছেড়ে চলে যায় চিরদিনের জন্য। তবে যাওয়ার আগে কুলধারা গ্রামের মাটিকে গ্রামবাসীর প্রত্যেকে অভিশাপ দিয়ে যায়। তিল তিল করে গড়ে ওঠা জনপদ কুলধারা রাতারাতি হয়ে পড়ে ভৌতিক গ্রামে। সেদিনের পর থেকে কুলধারাতে কেউই নতুন করে আবাসস্থল গড়ে তুলতে পারেনি, কেউ দখলও করতে পারেনি কোনো জায়গা। যারাই চেষ্টা করেছে, তারাই শিকার হয়েছে নির্মম মৃত্যুর।
সেলিম সিং এর পর নতুন করে গ্রাম বসানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু কেউ সেই গ্রামে রাত কাটাতে পারত না। যারা কাটাত তাদের মৃত্যু হতো। মৃত্যুর কারণও জানা যেত না। এরপর থেকে নানা কাহিনী প্রচার হতে থাকে। তবে অধিকাংশ লোকই মনে করে কুলধারার অধিবাসীদের অভিশাপের কারণেই আর কেউ এই এলাকায় বসতি স্থাপন করতে পারেনি। ফলে আজও কুলধারা এক পরিত্যক্ত নগরী হয়ে পড়ে রয়েছে।
এদিকে কুলধারাকে নিয়ে গবেষকরা নানারকম গবেষণাও চালিয়েছিলেন। তাঁদের গবেষণায় এমন কিছু বিষয় উঠে আসে যার কোনও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। ২০১৩ সালে দিল্লির প্যারানর্ম্যাল সোসাইটির কিছু সদস্য রাত কাটাতে গিয়েছিলেন কুলধারায়। তাদের অভিজ্ঞতা মোটেই ভালো ছিল না। ক্ষণে ক্ষণে বদলে যেতে থাকে তাদের চারপাশের আবহাওয়া। এই কনকনে ঠাণ্ডা আবার এই অসহ্য গরম। তাদের কয়েকজনকে পেছন থেকে ধাক্কা দেয় কেউ! আবার পিছনে ফিরে তাকালে ধারে কাছে কাউকে দেখা যায় না। গভীর রাতে শোনা যায় কান্নার আওয়াজ। সকালে তারা দেখতে পান, গাড়ির কাঁচে ছোট্ট শিশুর হাতের ছাপ। ৫০০টি স্থানে পরীক্ষা চালিয়ে এইরকম বেশ কিছু অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন তারা।
কুলধারার আশপাশের এলাকাগুলো দিন দিন উজ্জ্বল হলেও অতল গহ্বরে হারিয়ে যায় কুলধারা। ভারত সরকার কুলধারাকে হেরিটেজ নগরী হিসেবে ঘোষণা করেছে।

x