ভ্যালেন্টাইন পোকার কামড়

মোস্তফা কামাল পাশা

মঙ্গলবার , ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ at ৫:০৩ পূর্বাহ্ণ
99

ভালবাসা দিবসের জন্ম বৃত্তান্ত জানেন না তিনি। না জানলেও ক্ষতি নেই। মানেন না তিনি। কারণ ভালবাসা দিবস মানে তার কাছে পকেট কাটা দিবস। ছেলেমেয়েরা আগের দিন হাতিয়েছে লাখ দুই। বসন্ত উৎসবের নামে। বাসন্তি উৎসবের সাজসজ্জা, আয়োজন, পোশাক, ফুল, বন্ধুবান্ধবীদের উপহার, বিশেষ পানাহারের নামে এই চাঁদাবাজি। তিনি একজন ভিআইপি। তাও পলিটিক্যাল। স্কুল জীবনে মায়ের হাতে টিফিন খরচ জুটতো মাত্র এক আনা পয়সা। এখন তো আনাও নাই, নাই পয়সা। স্কুল টিফিন টাইমে পাউডার গুলে এক বাটি দুধ দেয়া হতো। ছুটির পর এক আনার চিনাবাদাম বা লজেন্স কিনে খাওয়া। অবশ্য ষাট দশকের এক আনা বা ৬ পয়সা এখনকার দশ টাকারও বেশি। ঠিক আছে, ধরে নিলাম দশ টাকা। ভিআইপি রোশন পাটোয়ারি মনে মনে হিসাব করেন, তাহলে দু’লাখ টাকা কেন? তার ছেলে মেয়ের সংখ্যা ৮। জনে ১০ টাকা করে পেলে ৮০ টাকা পায়। তাহলে কেন দু’লাখ টাকা? কোথায় দু’লাখ আর কোথায় আশি হঠাৎ আঙুলে তীক্ষ্ন ব্যথার ছ্যাঁকা খেয়ে চমকে ওঠেন তিনি। অন্য মনষ্কতায় ফিল্টার পুড়ে সিগারেটের আগুনের আকস্মিক ছ্যাঁকায় লেজাটা ছুঁড়ে ফেলেন তিনি। কাছেই খাস খাদেম বশির ওৎ পেতেই ছিল। সে তাড়াতাড়ি ঝকঝকে গ্লাস টাইলস থেকে পোড়া লেজাটা তুলে এসট্রেতে গুঁজে দেয়। পাটোয়ারি সাহেব রাজনৈতিক অভ্যাগতের ঝাক পাবলিক ড্রয়িংরুম ছাড়ার পর হাল্কা লাঞ্চ শেষে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। কোত্থেকে কোন ফাঁকে ভালবাসার ফুসকুড়িটা মগজে ঢুকেছে বুঝতেই পারেননি। শালার ছ্যাঁকা খেয়ে দিবা বিশ্রামটাই কড়া ব্রেক খেয়ে বসল। তিনি চেইন স্মোকার। সচিবালয়ের অফিসেও একসেট এসট্রে থাকে। কেবিনেট মিটিং এবং বিশেষ বিদেশি অতিথিদের সামনে সংযম পালনে বাধ্য হন। বিশ্রামের ব্রেক ফেইল করায় ভাবনার গতি মোড় ঘুরায়। দিনে ক’স্টিক সিগারেট পোড়েন, হিসাব কষার চেষ্টা করেন। কষ্টসাধ্য চেষ্টা। নেট হিসাব অসম্ভব। গ্রসে ৫০/৬০ স্টিকতো হবেই। বিদেশি সিগারেটের ২০ স্টিকের প্যাক ২৫০ টাকা। তিন প্যাকেট ৭৫০ টাকা। মানে মাসে সিগারেট খাতে তাঁর খরচ ২৫ হাজার টাকার মতো। এবার একটু স্বস্তি পান পাটোয়ারি সাহেব। সিগারেটের বাইরে অন্যান্য বিনোদন খাতে তাঁর মাসিক খরচ লাখ দেড়েকের কম না। তাহলে, ছেলেমেয়েদের দু’লাখ টাকার বাসন্তি প্যাক চলনসই বলা যায়। কিন্তু আজকে আবার হ্যাপা আছেভালবাসা দিবসের কাফফারা! আবারো লাখ দুই যেতে পারে। কিন্তু ভালবাসা দিবসটা কি বস্তু! তাঁর পিএস না পিএ কে যেন বলেছে ভালবাসা দিবস মানে ভ্যালেন্টাইনস ডে। রোম থেকে আমদানির মাল। কোন এক বুড়ো সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন পাদ্রির ব্যর্থ প্রেমের গপ্পো। গপ্পোগাথা মনে তুলে রাখার মতো অতো স্পেস কই! কিন্তু খ্রিশ্চান পাদ্রি ব্যাটার প্রেমের জন্য এত আয়োজন কেন? কেন রাষ্ট্রীয় তথা জনগনের সম্পদের এতো অপচয়? কে এমন একটা বাজে দিন জাতির ঘাড়ে চাপিয়ে দিল? শালাকে ৩২ ধারার যে কোন উপধারায় ১৪ শিকের ভেতরে ঢুকাতে হবে। নতুন সিগারেটের সুখটান দিতে দিতে পাটোয়ারি সাহেবের ব্রেনে আছড়ে পড়ে ঘেন্নার তীব্র ঢেউ। ‘কেন ব্যাটা বদমাশের হাড্ডি! আমাদের লাইলিমজনু, শিরিফরহাদ ছিলনা। ওদের নিয়ে ভালবাসা দিবস হয়না, তাহলে কেন খ্রিশ্চান পাদ্রি বেটারে নিয়ে টানাটানি’। সিগারেটটা মাঝপথে থাকতেই এসট্রেতে ঘাড় মটকে দিতে দিতে গজরাতে থাকেন পাটোয়ারি। সিদ্ধান্ত নেন, সামনের পার্লামেন্ট সেশনে এ’নিয়ে একটা হেস্তনেস্ত করবেন তিনি।

ড্যাড, আজ কিন্তু পাঁচ লাখ দিতে হবে।’ হঠাৎ করে ছেলেমেয়েদের হল্লায় ভাবনার দড়িটা ছিঁড়ে যায়। ‘কিসের পাঁচ লাখ’? গর্জে ওঠেন পাটোয়ারি। অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে পাঠরত মেঝো মেয়ে ন্যান্সি দলনেতা। ড্যাডের হুঙ্কারে থমকে যায়। বুঝতে পারে না কী জবাব দেবে। এই সুযোগে ভূমিকম্পের দ্বিতীয় ধাক্কা।

-‘জান ভালবাসা দিবস খ্রিশ্চান পাদ্রি ভ্যালেন্টাইনের। এটা আমদানি করেছে এক ছাগলা বুড়া। এটা পালন করা শরীয়ত বিরোধী’। দম নিতে একটু কমা টানেন পাটোয়ারি। এই সুযোগে পালের গোদা অর্থাৎ গৃহকত্রীর রুমে প্রবেশ। তিনি পাটোয়ারিকে কথার মাঝেই আটকে রেখে বলেন, ‘ছেলেমেয়েদের সাথে রাগারাগি করছো কোন আক্কেলে? সারাদেশ ভ্যালেন্টাইন জোয়ারে দোল খাচ্ছে। ওরা খাবেনা! ওরা যা চায়, খালাস করো জলদি’। ‘তাই বলে পাঁচ লাখ টাকা? পাটোয়ারি সাহেব ততক্ষনে পিনফোটা বেলুন। ‘হ্যাঁ পাঁচদশ যা চায়, তাই দেবা।

ঠিকাছে, তুমি যখন বলছো’। ফ্যাঁসফেসে শোনায় তুখোড় ভিআইপি পাটোয়ারির দরাজ কণ্ঠ। মায়ের হাজিরায় হাজার টাকার পাঁচ পাঁচটা টাটকা বান্ডিল নিয়ে ততক্ষণে ছেলেমেয়ের দল বাবার গালে আধা ডজন চুমো খেয়ে হাওয়া। বায় বাঘিনী স্ত্রীও এক ফাঁকে কক্ষ ত্যাগ করেন। এদিকে পাটোয়ারি সাহেব রিমোট টিপে টাইম মেসিনে চেপে ফিরে যান অতীতে। কলেজ জীবনেই তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। প্রথমে বামধারায়। কিন্তু ওদের রুটিন, কঠিন বইপত্র, কম্যুনিস্ট ইশতেহার ইত্যাদি খটমটে জিনিস হজমে সমস্যা হতো। তাই ৬ দফা যখন তুঙ্গে তিনি যোগ দেন ছাত্রলীগে। তারপর থেকে মিছিলমিটিংহ্মোগানে উত্তাল বন্ধুর পথ পেড়িয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব জাতির অবিসংবাদিত নেতা। রাজপথে মিছিলমিটিংয়ে থাকলেও পাটোয়ারি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেননি। স্বাধীনতার পর রক্তের টগবগে আকর্ষণে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রীদের মশাল হাতে নেন। অস্ত্রও এসে যায় হাতে। প্রথম প্রথম শ্রেণি সংগ্রামের টানে খুনখারাপি অগ্নি সংযোগে অংশ নেন। ’৭৫ এর আগস্ট ট্রাজেডির পর চাপে পড়লেও দ্রুত সামলে নেয় দলনেতারা। তারপর ৭ নভেম্বরের পাল্টা কপাল খুলে যায়। কিন্তু খুবই ক্ষনস্থায়ী ক্ষমতার এই ঝিলিক। দলের মিলিট্যান্ট প্রধান কর্নেল তাহেরসহ সিনিয়র নেতারা সবাই সামরিক খোয়াড়ে আটকা পড়েন। এরপরের ইতিহাস বড়ই বেদনারযন্ত্রনার। পাটোয়ারি অবশ্য চালু জিনিষ! নানা ঘাটের ঘোলা পানি খেয়ে নব্বই দশকের মাঝামাঝি নৌকায় চাপেন। এর আগেই তিনি ‘বীর মুক্তিযোদ্ধার’ সনদও বের করে নেন। তকলিফ পোহাতে হয়নি। পুরানো কমরেডরা সব ব্যবস্থা আগেই করে দেন। নৌকায় চড়ে খুব দ্রুতই নিজের এবং অনুসারিদের ভাগ্যের চাকা বদলে ফেলেন। গরু গাড়ির চাকা থেকে প্লেনের নিখুত চাকা। মাশাহ আল্লাহ পাটোয়ারি সাহেব এখন মতার কেন্দ্রবিন্দুতে। সরকারি দলের বড় পদও অলঙ্কৃত করছেন। পার্লামেন্টে তুখোড় বক্তা হিসাবে নাম কিনেছেন। ওজারতিও আছে। কোত্থেকেকীভাবে যেন নামেবেনামে বেশুমার টাকাও আসছে। প্রকাশ্য কোন ব্যবসা না থাকলেও দেশেবিদেশে তাঁর নামেবেনামে অসংখ্য ব্যবসা। সম্পদটাকা শুধু বাড়ছেই। দেশে মিডিয়া ব্যবসায়েও বড় লগ্নি আছে তার। তার টাকা ও ব্যবসার হিসাব রাখে কয়েক ডজন বিশ্বস্ত সহচর। কে কোন ব্যবসা বা ব্যাঙ্ক হিসাব অপারেট করে, তা অন্যজনের অজানা। পাটোয়ারি সাহেবের অপ্রকাশ্য ব্যবসা সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করেন তাঁর ডাকসাইটে অর্ধাঙ্গিনী। ব্যবসার রিমোট তাঁর হাতে। এ’নিয়ে পাটোয়ারি সাহেব নিশ্চিন্ত। তিনি রাজনীতি করেন। কর্মীসমর্থকদেশবাসীর খেদমতে সার্বক্ষণিক নিজকে উৎসর্গ করে দিয়েছেন। কিন্তু সমস্যা; ভ্যালেন্টাইন পাদ্রির পোকাটা ব্রেনের কেন্দ্র জুড়ে বসে আছে! ওটা কোনভাবেই ডিলিট করতে পারছেন না তিনি।

x