ভোট ভাবনা

ফেরদৌস আরা আলীম

শনিবার , ১২ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৪:৫৩ পূর্বাহ্ণ
16

দিনটি যাই হোক তারপর একে একে কেটে গেল আরও কিছুদিন। কিন্তু নির্বাচন নিয়ে আলোচনার এখনও শেষ হলো না। ঘরে ঘরে, হাটে-বাটে, পথে-ঘাটে, কাগজে-কলমে, রেডিও-টেলিভিশনে কথা চলছে তো চলছে। ভূমিধস বিজয়ের বিস্ময়ের চমক আর সরে না।

সবাই জানেন গড় আয়ু বেড়েছে আমাদের। বাড়তি আয়ুর শেষ সীমা অতিক্রমনের পর থেকে যে কোনও বিশেষ কাজে হাত দেবার সঙ্গে সঙ্গে মনে হয় এটিই শেষ কাজ কি? এবং কাজটা সুসম্পন্ন হলে মনে হয় শেষ ভালো তো সব ভালো যদি সত্যি হয়, তবে বেশ হয়। ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮’র সকাল দশটায় পথে নেমে সে কথাটাই মনে এল। এই ভোট শেষ ভোট নয় তো? ফিরতি পথে মনে হয়েছিল শেষটা ভালো হলো কি?
শহরের এ মাথা থেকে ও মাথায় যেতে হবে ভোট দিতে; রিকশা ছাড়া গতি নেই। বয়সের ভাটিবেলার কথা ভেবে পুরনো এলাকা ছেড়ে নতুন নিবাসে আসার পর নির্বাচন কমিশন সমীপে ঠিকানা বদলের আবেদন করিনি; এ তারই খেসারত। রাজমেজাজে নীলফামারীর রিকশাচালক। তার ভোটের তাড়া নেই। ‘ম্যালা টেকা-পইসা লাগে। মুই না গেইলেও হামার ভোট ঠিকই দেওয়া হইছে। খবর পাচ্ছি।’ আমার প্রশ্নের উত্তর এভাবেই দিল সে। ভোট দিয়ে খানিকটা পথ পায়ে হেঁটে দেখতে গেলাম পদ্মবনের পদ্মকে। আমাদের পুরনো ভাড়াবাড়ির মালিকপত্নী। সম্প্রতি হারিয়েছেন প্রেমিক-স্বামীকে যিনি তাঁর নামে বাড়ির নাম রেখেছেন পদ্মবন। অনেকটা সময় কাটিয়ে ফেরার পথে ভোটকেন্দ্রের সামনে একই দৃশ্য। ভোট কেন্দ্র এত সুনসান হয়? পেশাগত কারণে একাধিক নির্বাচনের কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত থাকতে হয়েছিল। শহরের গণ্যমান্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে অপেক্ষমাণ ভোটারদের সঙ্গে, ভোটকেন্দ্রে নানান দায়িত্বে থাকা সকলের সঙ্গে এবং নিজেদের এবং অন্যদলের এজেন্টদের সঙ্গেও হাসিমুখে কথা বলতে দেখেছি। অত্যন্ত ধীরগতিতে প্রসন্নতা ছড়াতে ছড়াতে তাঁরা আসতেন এবং দ্রুত গতিতে ভোটকেন্দ্র ছেড়ে যেতেন। তাঁরা কে কোন দলের এ চিন্তাটা কারও মাথায় আসতো না বলেই শোভন-অশোভন কোনও মন্তব্য কখনও শুনিনি। ভোটকেন্দ্রের ভেতরে-বাইরে প্রাণের উত্তাপ দেখেছি দিনমান। সবশেষে ব্যালট বাক্স উপুড় করে স্তূপাকৃতি কাগজগুলোর ভাঁজ খুলে মার্কামাফিক ভাগ বসানো হতো। সে এক অন্যরকম আনন্দমুখর পরিবেশ। সে আনন্দের কণামাত্র আভাসও কেন মিলছে না সেকথা ভাবতে ভাবতে ঘরে ফিরেছি। আমাদের গলিপথে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে মনে হলো পেছনে ফেলে এলাম এক বিষণ্ন শহর। দৈনিক কাগজের সাপ্তাহিকীর পাতায় সেলিনা হোসেনের ধারাবাহিক উপন্যাসের ‘বিষণ্ন শহর’ এ নয়। প্রতিদিনের চেনা শহরটাকে আজ বড় অচেনা মনে হলো। এ গল্প গত বছরের (মানে সেদিনের) ৩০ ডিসেম্বরের। দিনটি ছিল উৎসবমুখর পরিবেশে দারুণ একটি নির্বাচনের দিন অথবা স্মরণকালের সেরা একটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের দিন। দিনটি যাই হোক তারপর একে একে কেটে গেল আরও কিছুদিন। কিন্তু নির্বাচন নিয়ে আলোচনার এখনও শেষ হলো না। ঘরে ঘরে, হাটে-বাটে, পথে-ঘাটে, কাগজে-কলমে, রেডিও-টেলিভিশনে কথা চলছে তো চলছে। ভূমিধস বিজয়ের বিস্ময়ের চমক আর সরে না। প্রথম আলো ডেস্ক থেকে বিদেশি গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে আমাদের নির্বাচন নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। তার শিরোনামটি আমাদের সে বিস্ময়ের বার্তা ধারণ করেছে। শিরোনামটি হচ্ছে, ‘বিজয় ঘটনাচক্রে নয়, তবে মাত্রা অবিশ্বাস্য।’
এবারে নারীর কথায় আসা যাক। স্বাধীনতার পর এবারের নির্বাচনে এ যাবৎ কালের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক নারী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। এ সংখ্যাটি মাত্র ৬৮। স্বাধীনতার পর এবারই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক নারী নির্বাচিত হয়েছেন। এ সংখ্যাটি মাত্র ২২। সংখ্যাটি যত তুচ্ছই হোক না কেন, অগ্রগতিটি নারীর নিজস্ব লড়াইএর ফল। ২০০৮ সালের রাজনৈতিক দলবিধির কথা মনে করিয়ে দিই। সেখানে ২০২১ সালের মধ্যে প্রতিটি দলের তৃণমূল থেকে শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত এক তৃতীয়াংশ পদে নারীর থাকার বা নারীকে রাখার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ছোট-বড়, ডান-বাম, কেউ সে বিধান গ্রাহ্য করেনি। একই বছর (সেই ২০০৮ এ) আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার রূপকল্প ২০২১ এ ‘রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনে নারীর সমান সুযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালের নারীনীতি পুনর্বহাল ও কার্যকর করা হবে, বৈষম্যমূলক আইনসমূহের সংস্কার করা হবে এবং সংসদে প্রত্যক্ষ ভোটে নারীর জন্য ১০০ আসন সংরক্ষণ করা হবে’ বলা হয়েছিল। সেসব অঙ্গীকার বা প্রতিশ্রুতির ধারে কাছে গত ১০ বছরে তাঁরা নিজেরাও গিয়েছেন কিনা জানি না তবে এটুকু আমরা জানি যে ২০১৮ সালের জুলাই মাসে (৮ জুলাই) জাতীয় সংসদে আগামী ২৫ বছরের জন্য ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনে অপ্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচনের ব্যবস্থা রেখে নারীর জন্য মূল্যবান আইন পাশ করা হয়েছে। অর্থাৎ আগামী ২৫ বছর এ নিয়ে ক্ষমতাসীন কোনও দলকেই আর মাথা ঘামাতে হবে না। সত্যিই তো! তাতে লাভটা কি আর সময়ই বা কোথায়? টানা তৃতীয়বারের মতো বিজয়ী দলের নতুন সরকারের সামনে উন্নয়নের পথ অন্তহীন এবং কাজ অসংখ্য। দলমত নির্বিশেষে দেশের বিজ্ঞ ও বিশিষ্টজনেরা এই নিয়ে মোট ৪ বারের মতো বিজয়ী আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, মনোবল, দূরদর্শিতা ও নেতৃত্বগুণের যে ভূয়সী প্রশংসা করে যাচ্ছেন সেতো এমনি এমনি নয়, অকারণ স্তাবকতাও নয়। তবে বড় দুঃখে দুঃখী নারীর মনে হতেই পারে যে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন বিষয়টিকে প্রকারান্তরে উপেক্ষা করার কারণেই তাঁর ওই গুণগুলি বিজ্ঞজনদের চোখে বেশি করে ধরা পড়েছে। আজ সর্বোচ্চ সংখ্যক নির্বাচিত নারীর (২২ জন) সঙ্গে ৫০ যোগ দিয়ে মোট ৭২ জন করা হলেও পাকিস্তান, নেপাল এমনকি আরব আমিরাতের নারী সাংসদের চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে আমাদের নারী, জাতীয় সংসদে। অবশ্য অপ্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত ৫০ জনের বিশেষ সম্মানের কথা ভাবলে তাঁদের অন্যরকম গুরুত্বের কথাও হয়তো ভাবতে হয়। কারণ এরা জনপ্রতিনিধিদের ভোটে নির্বাচিত, আমজনতার ভোটে নয়।
সরাসরি ভোটের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সাহস যাঁরা করেন সেসব নারীর জন্য আমরা গর্ববোধ করি। এবারের নির্বাচনে বিজয়ী জাসদের শিরীন আখতার যখন নারীদের নির্বাচনে জিতে আসাটা কঠিন ব্যাপার বলে মন্তব্য করেন এবং তাঁর নিজের যুদ্ধের কথা বলেন তখন এই চট্টগ্রাম বিভাগে ৫ শতাধিক পুরুষ প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামা ২০ জন নারীকে অভিনন্দন জানাতেই হয়। অবশ্য বিজয়ী শাহীন আকতার চৌধুরীর মতো যাঁরা বিশেষ সুযোগ প্রাপ্ত তাঁদের কথা ভিন্ন। শপথ গ্রহণ শেষে শাহীন আখতার চৌধুরী বলেছেন তাঁর প্রথম কাজ কক্সবাজারকে ইয়াবামুক্ত করা। তাঁর পাশে তখন হাসিমুখে দাঁড়ানো তাঁর সেই স্বামী যাঁর ইয়াবাগত অযোগ্যতা তাঁকে যোগ্যতা দিয়েছে। ওই দৃশ্য দেখে কক্সবাজারের যুবলীগ সভাপতির একটি উক্তি হয়তো অনেকেরই মনে পড়ে থাকবে। তিনি বলেছিলেন ইয়াবার অভিযোগে সাংসদ বদিকে দলের মনোনয়ন না দেওয়ায় মানুষ খুশি। কিন্তু তাঁর স্ত্রীকে মনোনয়ন দেওয়া হলে এটা হবে যে লাউ সেই কদু। (দৈনিক প্রথম আলো, ২৩.১১.২০১৮)
নির্বাচন হয়। হবে আবারও। হতে থাকবে। আমরা ভোট দেব। ভোটের সঙ্গে ভোট রঙের নানা কৌতুক থাকবে। লাউ-কদুরাও নির্বাচিত হবে। কিন্তু কোনও কারণেই ২০০১ এর নির্বাচনের বলি পূর্ণিমারা যেন আর ফিরে না আসে এটুকু আমরা চেয়েছিলাম। অথচ স্মরণকালের সেরা নির্বাচনের দিবাগত রাতেই পূর্ণিমা ফিরে এল। কাকে, কোথায় ভোট দিলাম এ অপরাধে পূর্ণিমা হতে হলো সুবর্ণচরের চার সন্তানের এক জননীকে। ২০০১ এর কিশোরী পূর্ণিমা আর চল্লিশের এই নারীর মধ্যে বিস্তর ব্যবধান। ভোট না দিয়েও শুধু সংখ্যালঘুত্বের অপরাধে নৃশংস এক ধর্ষণযজ্ঞের শিকার হয়েছিল পূর্ণিমা। সুবর্ণচরের এই জননী ধানের শীষে ভোট দেবার অপরাধে একই বর্বরতার শিকার হলেন। মহাজোটের মহাবিজয়ের কপালে কলঙ্কতিলক এঁকে দিয়েছে এ ঘটনা। নির্বাচনের দিনগত রাতের ঘটনা। কিন্তু মামলা হয়েছে দু’দিন পরে। নির্দেশদাতাকে বাদ দিয়ে বাদবাকীদের কারও কারও নাম এসেছে শুরুতে। কিন্তু সজ্ঞান সচেতন ধর্ষিতা। নির্দেশদাতা চেনামুখের মানুষ। তাছাড়া তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে দলমত নির্বিশেষে সকল মানুষ। জাতীয় মানবাধিকার সংগঠন, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, রাজনৈতিক দল, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহীদের অনেককে ভরসা হিসেবে পেয়েছেন ওই নিগৃহীতা জননী। ফলে সুবর্ণচর থানা-পুলিশের গড়িমসি সে ধোপে টিকলো না। ইতোমধ্যে সরকারের খাস জমির কিছুটা বরাদ্দও পেয়েছেন তিনি। দেশব্যাপী মানববন্ধন, গণপর্যবেক্ষণ ইত্যাদি একদিকে অন্যদিকে যাত্রাপথের সূচনায় ভাবমূর্তি নিষ্কলুষ রাখার দায় রয়েছে দলের, সরকারের। আমরা নির্ধারিত দিবসসীমার মধ্যে অথবা সম্ভব হলে দ্রুত বিচারের দৃষ্টান্ত চাই। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।

- Advertistment -