ভোটের ট্রেন এবং ‘চট্টলবিস্ময়’

মোস্তফা কামাল পাশা

মঙ্গলবার , ১৮ ডিসেম্বর, ২০১৮ at ১০:৪৩ পূর্বাহ্ণ
39

নির্বাচনী ট্রেন জোরেসোরে চলতে শুরু করেছে। পৌষের শীত জেঁকে বসার আগেই ভোট উত্তেজনার পারদ চড়তে শুরু করেছে। ইলেকশান এসপ্রেসওয়েতে এখনো বেজায় জট! প্রার্থীজট সামালে কাহিল নাঙলের মালিক দারুণ ভাগ্যবান নবতিপর রাজনীতিক জে, এরশাদ সিঙ্গাপুরে গায়েব! অন্যদিকে নির্বাচনী আমেজ জমে উঠার আগেই দেশজুড়ে সহিংসতার মাত্রা পাল্লা দিয়ে বাড়ছে! কয়েকটি লাশ পড়ার পাশাপাশি হামলা, ভাংচুরের ঘটনাও বাড়ছে। এটা কোনভাবেই শুভ লক্ষণ নয়। বিএনপি-জামাত- ঐক্যফ্রন্টের অভিযোগ, বেছে বেছে তাদের নেতা, প্রার্থী ও কর্মীদের উপর হামলা, মামলা, নির্বাচনী প্রচারে বাধা দেয়া হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন কোন ব্যবস্থাই নিচ্ছেনা। জমছে প্রচুর অভিযোগের স্তূপ। মহাজোট এবং আওয়ামী লীগ কিন্তু বিপরীত অবস্থানে। এদিকে ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের অনুষ্ঠানে স্মৃতিসৌধের বাইরে ঐক্যফ্রন্ট নেতা ড. কামাল ও রবের গাড়িতে হামলার অভিযোগ উঠেছে। আবার ড.কামাল সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় জোটে যুদ্ধাপরাধী দল জামাতের অবস্থান সম্পর্কে প্রশ্ন আসলে মেজাজ হারান। তিনি সংশ্লিষ্ট সংবাদ কর্মীর পরিচয় জেনে নিয়ে দেখে নেয়ার হুমকি দেন। এই প্রশ্নের জন্য কত টাকা পেয়েছে, এনিয়েও মন্তব্য করেন। শুধু তাই না, তিনি ‘চুপ- খামোশ’ এর মতো অশোভন শব্দও ব্যবহার করেন। তাঁর ভিডিও ক্লিপটি এখন ভাইরাল, ঘুরছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। অশীতিপর অসুস্থ প্রাজ্ঞ নেতাটি মেজাজ না হারালে এ’ রকম আচরণ করতেন কিনা, ভাবতে কষ্ট হয়। অবশ্য পরে মাফ চেয়ে প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন। তো,নির্বাচনী ট্রেনের শেষ ইষ্টিশন ছুঁতে মাত্র কয়েক দিন বাকি। নির্বাচন যাতে শান্তিপূর্ণ ও অবাধ হয়, এটাই ভোটারদের একমাত্র চাওয়া। সরকার পরিবর্তনে গণ মানুষের ভাগ্য বদলের আহামরি কিছু ঘটবে, এমন আকাশ-কুসুম স্বপ্ন কেউ আর দেখেনা। কিন্তু ভোট উৎসবে যাতে দানবের থাবা এবং চলমান উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় হঠাৎ ব্রেক না পড়ে এ’ ব্যাপারেও সতর্কতা জরুরি। ভোটের জোর হাওয়ার সাথে চট্টগ্রামের মানুষের মনে একজন বিরল নেতার কথা বেশি করে মনে পড়ছে। তাঁর অভাব তীব্র হয়ে উঠছে দিন দিন। তিনি হচ্ছেন প্রয়াত চট্টল কিংবদন্তি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। তিনি বেঁচে থাকলে চট্টগ্রামের ভোটের মাঠে নতুন নতুন মাত্রা ও রং যোগ হতো। আরো বেশি প্রাণিত হতো কর্মী-সমর্থকরা।
চট্টগ্রাম বা চিটাগং নাম আসার সাথে সাথে এই মানুষটির নাম সঙ্গে সঙ্গে ঘাই দেয়! দেশে-বিদেশে পৃথিবীর সব প্রান্তে! যারা বাংলাদেশকে চিনে-জানে তারা বন্দর নগরী চট্টগ্রামের নাম শুনলে মহিউদ্দিন চৌধুরীকে নিয়ে আগ্রহ দেখাবেই। অবিশ্বাস্য হলেও এই সত্য উড়িয়ে দেয়া অসম্ভব!
কীভাবে? বঙ্গবন্ধু ও জননেত্রী শেখ হাসিনার পর একজন বাঙালি রাজনীতিকের নাম কেন এভাবে ছড়িয়ে পড়ল দশ দিগন্তে? প্রশ্নের উত্তর জানতে কিংবদন্তিতুল্য এই নেতার জীবন নিয়ে বড় ক্যানভাসে নিখুঁত গবেষণা দরকার। হবে বলে মনে হয়না! কারণ এরমধ্যে তাঁর জীবনকাল ও প্রয়াণের পর যে’সব গ্রন্থ বা স্মারকগ্রন্থ বের হয়েছে, এগুলো ফরমায়েশি। তাই আপসকামীতা, অলঙ্কার ও ফেনার ভীড়ে আসল মহিউদ্দিন চৌধুরী ডুবে গেছেন। তোষামোদ আর বাড়তি অলঙ্কারের মিশেলে মিথ-ফিকশন হয়, প্রামাণ্য জীবনচিত্র বা ইতিহাস নয়। এ’ছাড়া তাঁর প্রামাণ্য জীবনচিত্র রচনায় আরো কিছু নাজুক বাধার প্রাচীর ডিঙাতে হবে। সমকালে এমন দুঃসাহসী অভিযাত্রী কেউ নেই। নামে-গুণে-খ্যাতি-কীর্তিতে বরেণ্য জনরাতো একদমই নন! এটা ঠিক, কোন ইতিহাসই পূর্ণাঙ্গ নয়। ইতিহাসের নামে যা কিছু আমরা গিলছি বা গিলবো সবখানেই আপস,ফেনা আর অলঙ্কার কমবেশি আছেই। চট্টল কিংবদন্তির একদম বেশি-বেশি!
ইতিহাস গ্রন্থ নিয়ে একটা উদাহরণই যথেষ্ট, ইতিহাসের বরপুত্র বা কন্যারা কেউ সাধারন মানুষ নন-সবাই দেবতা বা ফেরেশতা! তাঁরা আপনার আমার মতো খানাপিনা, ওয়াসরুম করেন না! সত্য মিথ্যা চর্চা বা অন্যায়-অবিচার কখনো না! তাঁদের মানবিক কোন দোষত্রুটি আপনি খুঁজেই পাবেন না! এমন হয় নাকি! কখনো না। অবশ্য রচয়িতা যদি নির্মোহ তথ্য ও সত্যের মানদন্ডের উপর বেশি জোর দেন, তাহলে পুরো না হলেও ব্যাক্তিটার জীবন ও কর্মের একটা মোটামুটি ধারণা পাঠক পেয়ে যান। মহিউদ্দিন চৌধুরীর মত একজন মানুষ চট্টগ্রামবাসীর হৃদয়জুড়ে সিংহাসন গেঁড়ে বসে কীভাবে পুরো বিশ্বে সৌরভ ছড়িয়েছেন, তা এক বিস্ময়ও বটে। চট্টগ্রামের এই ‘বিস্ময়বালক’ চিরতরে চলে গেছেন, গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর ২০১৭ দিবাগত রাত তিনটায়। চট্টগ্রাম প্রকৃত অর্থেই তাঁর মহাপ্রয়াণের পর কেমন জানি ফাঁকা হয়ে গেছে। শুধু চশমাহিল নয়, পুরো চট্টগ্রামকেই এখন নেতৃত্বহীন ফাঁকা ফাঁকা লাগে। অবিশ্বাস্য শূন্যতার অদৃশ্য বিশাল এক কালো ক্যানভাস ঢেকে ফেলেছে চট্টগ্রামকে! শূন্যতার হাহাকার মাথা কুটছে বাতাসে!
না, এই শূন্যতা কেবল আমার নয়! যারা তাঁর নিবিড় সাহচর্য পেয়েছেন। বা মাত্র একটা দিন তাঁর সঙ্গ পেয়েছেন। হোক সেটা তেতো বা মিষ্টি, তিনি কোনদিনই এই মানুষটাকে মন থেকে মুছে ফেলতে পারবেন না। এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী রূপকথার যাদুকর বা সম্মোহন বিদ্যার এঙপার্টও নন! তবুও তাঁর সঙ্গ, সান্নিধ্য যে কোন মানুষকে সম্মোহিত করতোই! এ নিয়ে কোন যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যাও নেই।
তাঁর বিশাল কর্মযজ্ঞ বা ভালমন্দ নিয়ে লম্বা কাহিনী ফাঁদার ইচ্ছে নেই। এসব অনেক হয়েছে-হবেও। নিজেও করেছি। তাই নয় কোন চর্বিত চর্বণ। নির্বাচনী মাঠও তাঁর অভাবে রঙ বর্ণহীন! এখন আমরা সৃষ্টিকর্তার কাছে একটা আকুতিই জানাতে পারি—
“হে পরোয়ার দিগার, আমাদের আর অসহ্য শূন্যতা ও কথামালার ফেনার মাঝে ভাসিয়ে রেখোনা! বিকল্প একজন মহিউদ্দিন চৌধুরী দাও, যাঁকে আকড়ে ধরে চট্টগ্রামের মানুষ ভরসা-আশ্বাস-আস্থা ও বিশ্বাসের একটা পোক্ত ঠিকানা খুঁজে পাবে”!

- Advertistment -