‘ভোগের পাত্র ফেলরে ছুঁড়ে ত্যাগের তরে হৃদয় বাঁধ’

ফেরদৌস আরা রীনু

রবিবার , ১১ আগস্ট, ২০১৯ at ৯:২৮ পূর্বাহ্ণ
68

শান্তি আর ত্যাগের বার্তা নিয়ে বছর ঘুরে এলো পবিত্র ‘ঈদুল আযহা’। ভেদাভেদ ভুলে ভাতৃত্বের বন্ধনে মিলিত হওয়ার দিন ঈদুল আযহা। মুসলমানদের এই ঐতিহ্যময় দিনটি অনেক প্রাচীন। প্রতিবছর ত্যাগের শক্তিতে নব বলে বলীয়ান হওয়ার এক মাহেন্দ্রক্ষণ।
“ঈদুল আযহা” ইব্রাহীম (আঃ), বিবি হাজেরা এবং ইসমাঈলের পরম ত্যাগের স্মৃতি বিজড়িত উৎসব। এই পরিবারটি পৃথিবীর সকল মুসলিম জাতির জন্য ত্যাগের মহত্তম নিদর্শন। মানুষ আল্লাহ্‌র জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করবে, এই শিক্ষায় ইব্রাহীম (আঃ) এর পরিবার আমাদের জন্য উৎসর্গ করে গেছেন জন মানবহীন “মীনা” প্রান্তরে। হযরত ইব্রাহীমকে (আঃ) আল্লাহ্‌ নির্দেশ দিয়ে ছিলেন তাঁর সবচেয়ে প্রিয়বস্তু কুরবানি দিতে। স্নেহের পুত্র ইসমাঈল ( আঃ) ছিলেন হযরত ইব্রাহীম (আ:)এর সবচেয়ে প্রিয়। আল্লাহর নির্দেশে আপন পুত্রকে কুরবানি দেওয়ার জন্য হযরত ইব্রাহীম (আ:) উদ্যত হয়ে ত্যাগের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। মহান আল্লাহর নির্দেশে প্রিয় পুত্রের জায়গায় দুম্বা কুরবানি হয়ে যায়। প্রতিবছর যিলহজ মাসে মুসলিম জাতি পশু কুরবানির মাধ্যমে ইব্রাহীম (আ:) এর স্মৃতি স্মরণ করে এবং পশু কুরবানিরর সাথে সাথে নিজেদের পশুবৃত্তিকে কুরবানি দিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করে। ইসমাঈল ছোট বয়সেই বিশ্ববাসীকে আল্লাহর কাছে এক বাস্তব ও জলন্ত শিক্ষা প্রদান করেন। মূলত আল্লাহর কাছে নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দেওয়ার নামই হলো আত্মসমর্পণ। পিতা-পুত্র আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণের যে অনুপম আদর্শ স্থাপন করে গেছেন তা যেমন অতুলনীয়, তেমন চির অনুকরণীয়। এটি ইসলামের একটি “মহান নিদর্শন” যা সুন্নাতে ইব্রাহীম হিসেবে রাসুল্লাহ (সা) নিজে ঐ ত্যাগের আনুষ্ঠানিক অনুসরণকে বিশেষ মর্যাদা দিয়ে মদীনায় প্রতিবছর আদায় করেছেন এবং সাহাবীগণও নিয়মিতভাবে কুরবানি করেছেন। অতঃপর আজ পর্যন্ত সামর্থবান মুসলমানদের মধ্যে এটি চালু আছে।
“ঈদুল আযহার” দিনের প্রধান আমল কুরবানি। প্রচলিত অর্থে ঈদুল আযহার অর্থাৎ যিলহজ মাসের ১০ থেকে ১২ তারিখের মধ্যে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে “শারঈ তরীকায়” যে পশু জবেহ করা হয়, তাকে “কুরবানি” বলা হয়ে থাকে। পশু কুরবানির মাধ্যমে কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ,স্বার্থপরতা, পরনিন্দাকে অর্থাৎ অন্তরের পশু চরিত্রকে হত্যার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধির প্রয়াস চালানো।
ঈদুল আযহার মূল আহ্বান হলো সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ আনুগত্য প্রকাশ করা। সম্পদের মোহ ভোগবিলাসের আকর্ষণ, পরিবারের স্নেহ ভালোবাসা সকল প্রকার বব্ধন থেকে মুক্ত হয়ে নিজেকে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করে দেওয়ায় ঈদুল আযহার মূল শিক্ষা।কুরবানির পশুর রক্ত,মাংস কোনো কিছুই আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, পৌঁছে কেবল তাক্বওয়া বা আল্লাহভীতি। কুরবানির পশুর ররক্ত মাটি স্পর্শ করার পূর্বেই আল্লাহর কাছে তার ছওয়াব ধার্য হয়ে যায়। কুরবানীর পশুর গলায় ছুরি দেওয়ার সময়ে ইব্রাহীমের মানস সন্তান্দের হৃদয়তন্ত্রী সেই ঈমান ও ত্যাগের সুরে অনুরণনিত না হলে,দেহ আর মনের পরতে পরতে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণের আকুল আগ্রহ উদ্বেলিত না হলে কুরবানি উৎসব কেবল মাংস খাওয়ার উৎসবে পরিণত হয়। কুরবানি কেবল পশু কুরবানি নয়, নিজের পশুত্ব,নিজের ক্ষুদ্রতা, নীচতা,স্বার্থপরতা, দীনতা, আমিত্ব ত্যাগের কুরবানি। ঈদুল আযহার সময় হজ পালনকালে মুসলিমের পশু কুরবানি তাওহীদী নির্দেশে অঙ্গীভূত এবং তা একই সঙ্গে আল-কুরআনে আল্লাহ্‌ কর্তৃক ঘোষিত মানব জাতির ইমাম ইব্রাহীমের প্রিয় পুত্র কুরবানির চরম পরীক্ষা প্রদানও আদর্শ চেতনার প্রতীকী রূপ।
পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মুসলমানের ন্যায় আমাদের দেশে যিলহজ মাসের ১০ তারিখ যথাযথ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য পরিবেশে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনায় পবিত্র ঈদুল আযহা পালন করা হয়। ধনী-দরিদ্র,উঁচু-নীচু সকলে একই কাতারে দাঁড়িয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দুই রাকাত নামাজ আদায়ের মাধ্যমে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলে যায়। পরস্পর কুশল বিনিময় করে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়। জীবনকে স্বাচ্ছন্দ্যময় ও আন্তরিক মহানুভবতায় পরিপূর্ণ করে। এর পর আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য হালাল অর্থে কেনা পশু কুরবানির মাধ্যমেই তা সম্পন্ন হয়। কুরবানি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। কিন্তু মানব সমাজে এখন কুরবানির এই মর্মবাণী স্মরণ থাকে না। বরং ত্যাগের সাধনার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে ভোগ, বিলাস, অপচয়। ঈদুল আযহা শুধু ভোগের অনুষঙ্গ নয়। আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তাঁর নির্দেশিত পন্থায় নির্ধারিত পশু তাঁর নামে উৎসর্গ করা।
পৃথিবীর যে সকল দেশে মুসলমান আছে সকলে ওয়াজিব হিসেবে স্থানীয় পরিবেশ-পরিস্থিতির আলোকে ঈদুল আযহার উৎসব পালন করে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রয়েছে এই উৎসবের বিভিন্ন নাম। আমাদের দেশে কুরবানির পশু হিসেবে যেমন গরু-ছাগলের প্রাধান্য তেমনি একেক দেশে একেক পশুর প্রাধান্য। কুরবানির ক্ষেত্রে প্রতিটি দেশের স্বকীয়তা থাকলেও মুসলিম দেশগুলোতে এর পদ্ধতি প্রায় অভিন্ন।
ঈদ উৎসব একটি সামাজিক উৎসব। সমষ্টিগতভাবে আনন্দের উৎসব। কুরবানি চিরশুদ্ধির এবং পবিত্রতার মাধ্যম। ঈদুল আযহার শিক্ষা হবে আমরা শুধু কুরবানির সময়ে গরিব-দুঃখী মানুষকে খাওয়ানোর কথা না ভেবে বছরের বাকি দিনলোতেও তাদের মনে রাখব। এর লক্ষ্য হবে সকলের সাথে সদ্ভাব,আন্তরিকতা এবং বিনয়, নম্র আচরণ করা। সামর্থবান মুসলমানদের কর্তব্য হবে যারা অসুখী এবং দরিদ্র তাদের জীবনে সুখের ছোঁয়া দিয়ে তাদের দারিদ্র্যের কষাঘাত দূর করার চেষ্টা করা। সমগ্র মুসলমান ঈদুল আযহার ত্যাগের শিক্ষা,চেতনা ও আদর্শ লালন করে বিভেদ ভুলে সংহতি স্থাপন করবে। সকল বৈরিতাকে দূরে ঠেলে সোনালি ভোরের প্রত্যাশায় উজ্জীবিত হয়ে উঠবে আমাদের এই ত্যাগের উৎসব। আমাদের কণ্ঠে থাকবে কবি নজরুলের বাণী—‘তোরা ভোগের পাত্র ফেলরে ছুঁড়ে-ত্যাগের তরে হৃদয় বাঁধ’।
লেখক : প্রাবন্ধিক , শিক্ষক

x