ভেজাল বিরোধী অভিযান বছরব্যাপী চালানো হোক

রবিবার , ১২ মে, ২০১৯ at ১০:২৮ পূর্বাহ্ণ
216

ভেজাল, নকল ও নিম্নমানের নানা পণ্যে ছেয়ে গেছে আমাদের দেশ। শিশুর গুড়ো দুধ থেকে বৃদ্ধের ইনসুলিন, রূপচর্চার কসমেটিক থেকে শক্তি বর্ধক ভিটামিন, এমন কি বেঁচে থাকার জন্য যা অপরিহার্য, সেই পানি এবং জীবন রক্ষাকারী ওষুধ পর্যন্ত এখন ভেজালে ভরপুর। গরিব থেকে ধনীর সন্তান, ভেজালের ভয়াবহতা থেকে নিরাপদ নয় কেউ-‘যেন ভেজালেই জন্ম, ভেজালেই বেড়ে ওঠা, ভেজালের রাজ্যেই বসবাস। মানুষের মৌলিক চাহিদার মধ্যে খাদ্য একটি প্রধান ও অন্যতম মৌলিক চাহিদা। জীবন ধারণের জন্য খাদ্যের কোনো বিকল্প নেই। সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রতিটি মানুষের প্রয়োজন বিশুদ্ধ ও পুষ্টিকর খাদ্য। আর এ বিশুদ্ধ খাদ্য সুস্থ ও সমৃদ্ধশালী জাতি গঠনে একান্ত অপরিহার্য। কিন্তু বাংলাদেশে বিশুদ্ধ খাবার প্রাপ্তি কঠিন করে ফেলেছে বিবেকহীন ব্যবসায়ী ও আড়তদার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও এদের নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খাচ্ছে।
গত ১০ই মে দৈনিক আজাদীর প্রথম পাতায় প্রকাশিত হয় ‘এত অভিযানেও লাগাম টানা যাচ্ছে না ভেজালের’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন। এতে বলা হয়েছে, রমজান মাসকে ঘিরে একটি অসাধু ব্যবসায়ী চক্র বরাবরই সক্রিয় থাকে ভেজাল পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে। লঘু সাজার কারণে নকল- ভেজালকারীদের দৌরাত্ম্য কিছুতেই থামছে না। অথচ নগরীতে রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা মাঠে নেমেছে। প্রতারণা এড়াতে তৎপর রয়েছে প্রশাসন। কিন্তু বাস্তবতা হলো- সরকারের নানামুখী উদ্যোগ ও প্রশাসনিক কঠোর তৎপরতা সত্ত্বেও ভেজাল খাদ্যপণ্যের উৎপাদন ও বাজারজাতকারী সিন্ডিকেটকে থামানো যাচ্ছে না। বছরজুড়ে ভেজাল পণ্য উৎপাদন ও বিক্রির রমরমা বাণিজ্য চললেও রমজান মাস ঘিরে এ তৎপরতা বহুগুণ বেড়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব খাদ্য ও ফলমূল থেকে কিডনি, পাকস্থলী ও মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এমনকি ক্যান্সারের ঝুঁকিও রয়েছে। ভেজাল ও মানহীন পণ্যের বিরুদ্ধে মাঝে মাঝেই ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালায়। অপরাধীকে জেল-জরিমানা দেয়। কিন্তু বন্ধ হয় না ভেজালের কাজ।
নানা সমস্যার গ্যাঁড়াকলে নিমজ্জিত বাংলাদেশের অন্যতম সমস্যা হলো ভেজাল। সংবাদপত্রের পাতা ভরে প্রতিনিয়তই প্রকাশিত হচ্ছে এ সম্পর্কিত নেতিবাচক সংবাদ। সেখানে চোখ রেখে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হতে হয় সর্বদা। ভাবনার অথৈ সাগরে ভেসে ভেসে চিন্তক মন খুঁজে ফেরে একটু স্বস্তির জায়গা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৪৫ লাখ মানুষ খাদ্যে বিষক্রিয়ার কারণে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়। আইসিডিডিআরবির এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীর পথ-খাবারের ৫৫ শতাংশে নানা ধরনের জীবাণু রয়েছে। এসব খাবার বিক্রেতাদের ৮৮ শতাংশের হাতেও নানাবিধ জীবাণু থাকে। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দেখা গেছে, পচন রোধে ব্যবহৃত ফরমালিন এখন মেশানো হচ্ছে মাছ, দুধ, মিষ্টি ও ফলে। বাহারি কৃত্রিম রং মেশানো হচ্ছে সবজি, ফল ও মিষ্টিতে। গুঁড়া মসলায় মেশানো হচ্ছে ইটের গুঁড়া ও কৃত্রিম রং। খাদ্য ও পানীয়তেও মেশানো হচ্ছে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর রং। আম, পেঁপে, কলা, টমেটো প্রভৃতি কৃত্রিমভাবে পাকাতে ব্যবহার করা হচ্ছে ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ইথ্রেল ইত্যাদি। শুঁটকি মাছে মেশানো হচ্ছে কীটনাশক ডিডিটি। এমনকি জীবন রক্ষাকারী ওষুধেও ভেজাল আতঙ্ক। ভেজালহীন কিছু খুঁজে পাওয়া বর্তমান বাস্তবতায় দুষ্কর।
ভেজালের বৃহৎ রাজ্যে অসহায় সাধারণ মানুষ। অনেকটা জেনে-শুনে-বুঝে সবাই হাতে নিচ্ছে ভেজাল মিশ্রিত যে কোন প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি। ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও ভেজাল নামক মনুষ্যসৃষ্ট ভয়াল দুর্যোগ থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখতে পারছে না কেউ। এক কথায় ভেজালে ভেজালে ছেয়ে গেছে চারপাশ। বাড়ছে রোগ-ব্যাধি, বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি। ভেজাল খেয়ে আস্তে আস্তে অকেজো হচ্ছে কিডনি, লিভার, পাকস্থলী, হৃৎপিণ্ডসহ শরীরের নানা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। শুধু তাই নয়, মরণ ব্যাধি ক্যান্সারও ডেকে আনছে এই ভেজাল খাবার। সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় হলো, এসব খাবার খেয়ে অধিকহারে নানাবিধ ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম, অর্থাৎ শিশুরা।
উপযুক্ত নজরদারি, কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং জনসচেতনতার অভাবে খাদ্যে ভেজালের মাত্রা ও পরিমাণ দুটোই বেড়ে চলেছে বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন। শুধু রমজানে নয়, বছরব্যাপী ভেজাল বিরোধী অভিযান চালানো হলে এর দৌরাত্ম্য কিছুটা কমে আসবে বলে তাঁরা মনে করেন।

x