ভেজাল-নকল ওষুধের কারবারিদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে

বুধবার , ২৩ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৫:১১ পূর্বাহ্ণ
74

জীবন রক্ষাকারী বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দামি ওষুধে ভেজালের কারণে হুমকির মুখে পড়েছে জনস্বাস্থ্য। বিশ হাজার কোটি টাকার ওষুধের বাজারে বিভিন্নভাবে ভেজাল ও নকল ওষুধ ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে। বিদেশের একশ’টি দেশে বাংলাদেশের ওষুধের সুনাম থাকলেও দেশীয় বাজারে ভেজাল ওষুধ পুরো সেক্টরের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। দৈনিক আজাদীর গত ১৮ জানুয়ারি এ খবর প্রকাশিত হয়েছে।
খবরের বিবরণে বলা হয়, দেশের খ্যাতনামা একটি ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান দৈনিক আজাদীর সঙ্গে গত ১৭ জানুয়ারি আলাপকালে এ প্রসঙ্গে বলেন, বছর কয়েক আগেও বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় ওষুধের ৮০ শতাংশ আমদানি করতে হতো। দেশে ওষুধ শিল্পের বিকাশের ফলে বর্তমানে বিদেশ থেকে ওষুধ আমদানি মাত্র আড়াই থেকে তিন শতাংশে নেমে এসেছে। বর্তমানে দেশের চাহিদার ৯৭ ভাগেরও বেশি ওষুধ দেশের কারখানাগুলোতেই উৎপাদিত হচ্ছে এবং বিশ্বের একশটিরও বেশি দেশে বাংলাদেশ ওষুধ রপ্তানি করছে। বর্তমানে বছরে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার ওষুধ রপ্তানি করছে। দেশে ওষুধ প্রস্তুতকারী ২৬৯টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে উল্লেখ করে সূত্র বলেছে, এসব কারখানায় ব্র্যান্ডের প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন ধরনের ওষুধ এবং ওষুধ তৈরির কাঁচামাল উৎপাদন করছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, পাবনা, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এসব কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে। এসব কারখানার অনেকগুলোই আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত। এসবে আন্তর্জাতিক মানের ওষুধ উৎপাদিত হয়। এ ধরনের বিশ্বমানের ৪২টি কারখানায় উৎপাদিত প্রায় এক হাজার কোটি টাকার ওষুধ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ছাড়াও জাপান, কোরিয়া, আফ্রিকা, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়। প্রতিবছরই রপ্তানি বাড়ছে। দীর্ঘদিন ওষুধ শিল্পের সাথে জড়িত উক্ত কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশের ওষুধের ওপর বিশ্বের বহু দেশের মানুষের আস্থা রয়েছে। কিন্তু বিদেশি বাজারের ইমেজ ও অভ্যন্তরীণ বাজারে ধরে রাখা কঠিন হয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে উক্ত কর্মকর্তা বলেন, দেশের বিভিন্ন খ্যাতনামা কোম্পানির প্রচলিত ব্র্যান্ডগুলো নকল করে বাজারে ছাড়া হচ্ছে। নামের সাথে এমনভাবে অদল-বদল করে দেয়া হচ্ছে যে সাধারণ মানুষ বুঝতে পারছেন না যে নকল ওষুধ খাচ্ছেন। ভেজাল ওষুধ খেয়ে টাকা গচ্ছা যাওয়ার চেয়েও বড় সমস্যা হচ্ছে ওষুধে কাজ করছে না। ফলে শরীরে দ্রুত রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। ডায়াবেটিস, ক্যান্সারের মতো রোগের ওষুধও নকল হচ্ছে, বিশেষ করে দামি ওষুধ নকল-ভেজাল করে সংঘবদ্ধ চক্র কোটি কোটি টাকা মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে। সংঘবদ্ধ চক্রের সঙ্গে এক শ্রেণির ফর্মেসি মালিকেরাও জড়িত। সস্তায় ভেজাল ওষুধ কিনে চড়া দামে বিক্রি করে তারাও মোটা অংকের টাকা কামাচ্ছে।
ডায়াবেটিসের জন্য ইনসুলিন অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি ওষুধ। বেশ দামিও। সময়মতো মাত্রানুযায়ী শরীরে না গেলে রোগী মারা যাওয়ার আশঙ্কাই বেশি। অথচ বাজারে ভেজাল ইনসুলিনের ছড়াছড়ি নানাভাবে প্রচলিত ব্র্যান্ডের ইনসুলিনগুলোর সাথে দু-একটি এধার ওধার করে দিয়ে হুবহু একই ধরনের ইনসুলিন কিনছেন; শরীরের ভেতর ঢুকিয়েও দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু কাজ করছে না। একইভাবে অ্যান্টিবায়োটিকের বিভিন্ন ক্যাপসুলও ভেজাল করা হচ্ছে। ভেজাল ওষুধ খেয়ে মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা বাড়ছে। মারাও যাচ্ছেন অনেকে।
দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত খবরটি দেশের জনস্বাস্থ্য ও জনগণের জন্য কতটা হানিকর তা কারো অজানা নয়। এভাবে মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া কতটা যে ভয়ংকর তা আর বুঝিয়ে বলার দরকার নেই। দামি দামি ওষুধগুলো ভেজাল করে মানুষকে প্রতারিত করছে একাধিক সংঘবদ্ধ চক্র। এভাবে ভেজাল ওষুধের বিস্তার চলতে দেওয়া যায় না। উল্লিখিত খবরটিতে বলা হয়েছে, এসব সংঘবদ্ধ চক্রের সাথে বিভিন্ন ফার্মেসি মালিকেরাও জড়িত। সস্তায় ভেজাল ওষুধ কিনে চড়া দামে বিক্রি করে তারা বাড়তি ফায়দা হাসিল করছে। এসব মালিকদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা একান্ত প্রয়োজন। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হয় না বলেই চক্রগুলো ভেজাল-নকল ওষুধ তৈরি করে এবং বাজারজাত করতে সাহসী হয়। মনে রাখা দরকার পকেটমার পকেট কাটলে শুধু টাকাটা যায়, কিন্তু ভেজাল ওষুধে টাকাও যায়, জীবনও যায়। ভেজাল ওষুধের ছড়াছড়ি রোধ করতে হলে নিয়মিত অভিযান চালাতে হবে ওষুধ প্রশাসনকে। ওষুধ প্রশাসনের বাহিনী না হলে, সাধারণ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে এ কাজ করা অনেকটা অসম্ভব। কারণ, সাধারণ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আসল কোনটা, ভেজাল কোনটা তা ধরতেও না পারে। ওষুধ প্রশাসনের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাহিনীর সদস্য হলে তারা অনায়াসে আসল-ভেজাল ওষুধ চিহ্নিত করতে পারবেন। ভেজাল ওষুধের বিস্তার রোধ করতে হলে সরকারি সংস্থাগুলোর সাড়াশি অভিযান জরুরি। ভেজাল ওষুধের কারবারিরা মানুষ খুন করার মতো জঘন্য অপরাধ করছে। তাই তাদের শাস্তি সেই মতো হওয়া উচিত। নকল-ভেজাল ওষুধের কারবারিদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে প্রয়োজন হলে নতুন আইন বা আইনের সংশোধন করা যেতে পারে। আমাদের প্রত্যাশা, সরকারের নীতিনির্ধারকেরা বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করে যথোচিত পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

x