ভেজাল ওষুধ বাজারজাতে বিক্রয় প্রতিনিধিরা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে কর্তৃপক্ষকে

মঙ্গলবার , ১৪ মে, ২০১৯ at ৬:১৭ পূর্বাহ্ণ
69

ভুয়া তথ্য দিয়ে চাকরিতে ঢোকা বিক্রয়কর্মীরা ভেজাল ওষুধ বাজারজাত ও জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎসহ আরো নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এতে করে ভোক্তার আস্থা ও সুনাম হারানোর পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকিতে রয়েছে বড় বড় ওষুধ কোম্পানিগুলো। পত্রিকান্তরে সম্প্রতি এ খবর প্রকাশিত হয়। খবরে বলা হয়, কুমিল্লার একটি গ্রামের চাষী পরিবারের সন্তান আনিছুর রহমান টেনেটুনে পেরিয়েছে মাধ্যমিকের গন্ডি। অভাবের সংসারে পড়াশুনায় আর মন দেয়া হয়নি। দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের মাধ্যমে জুটে যায় স্বল্প রোজগারে একটি চাকরি। অখ্যাত একটি আয়ুর্বেদিক প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ শুরু করেন চার বছর। এ চাকরির সুবাদেই দেশের শীর্ষস্থানীয় ওষুধ প্রস্তুতকারী বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও তার সখ্য গড়ে ওঠে। সে সূত্র ধরে বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে চাকরি পেয়ে যায় ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেডে। এর পর বদলে যায় তার জীবন। নিজ প্রতিষ্ঠানের ওষুধ বলে ভেজাল ওষুধ বাজারজাত করা শুরু করে সে। সম্প্রতিএমনই একটি চালান বাজারজাত করতে গিয়ে সে র‌্যাবের হাতে ধরা পড়ে। র‌্যাবের সদর দপ্তরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জানান, আনিসুর ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালের উৎপাদিত ক্যান্সারের ওষুধ ওসিসেন্ট ৮০ এর নকল মোড়ক বানিয়ে ভারত থেকে আনা নিম্নমানের ওষুধ বাজারজাত করতো। সহযোগীদের নিয়ে ইনসেপ্টার মোড়ক নকল করে ক্যান্সারের নকল ওষুধ বাজারে সরবরাহ করতো। ওসিসেন্ট ব্র্যান্ডের এক বাক্স ওষুধের বাজারমূল্য ১৫ হাজার টাকা হলেও ফার্মেসিগুলোতে সরবরাহ করা হচ্ছিল ৭ হাজার টাকায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের অনুসন্ধানে আনিসুরের জালিয়াতির বিষয়ে আরো তথ্য উঠে এসেছে। চাকরিতে যোগদানের সময় স্নাতক পাসের যে সনদ সে অফিসে জমা দিয়েছিল তা জাল। পিতার নাম ছাড়া ওই সনদের উল্লেখ করা সব তথ্যই ভুয়া বলে প্রমাণ পেয়েছেন তদন্তকারীরা।
যে কোন রাষ্ট্রে প্রত্যেক নাগরিকের অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান এই পাঁচটি মৌলিক অধিকার। স্বাস্থ্য ঠিক রাখার জন্য বিশেষতঃ অসুখে বিসুখে চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন হয় ওষুধের । কারণ চিকিৎসার প্রধান উপকরণ ওষুধ। মানুষের রোগমুক্তি ও বেঁচে থাকার সুপরিহার্য পণ্য এটি। এ কারণে ওষুধের উচ্চমান ও নির্ভেজালত্ব রক্ষা করা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু হতাশাজনক বিষয় হলো, দেশে এই অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের বাজারে বিরাজ করছে বিশৃঙ্খলা। নকল ও ভেজালের পাশাপাশি নিম্নমানের ওষুধে বাজার ছেয়ে গেছে। নকল ও ভেজাল ওষুধ বাজারজাতকরণে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী ও প্রতারক চক্র জড়িত বলে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এবার এক্ষেত্রে উঠে এসেছে ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিদের জড়িত থাকার কথা। প্রধানত ভুয়া তথ্যে যোগদানকারী বিক্রয় কর্মীরাই এ ধরনের অপকর্মে জড়িত হচ্ছে বেশি। উল্লিখিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভুয়া তথ্য দিয়ে চাকরিতে ঢোকা বিক্রয় প্রতিনিধিরা ওষুধ কোম্পানিগুলোকে বিপাকে ফেলে দিচ্ছে। প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে আনা নিম্নমানের ওষুধ বাজারজাত করছে তাদের অনেকেই। ভেজাল ওষুধ বাজারজাত হচ্ছে এদেশের নামকরা কোম্পানিগুলোর নকল মোড়কে। এতে ভোক্তার আস্থা ও সুনাম হারানোর সাথে সাথে আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকিতে পড়ছে ওষুধ কোম্পানিগুলো। সম্প্রতি ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালের উৎপাদিত ক্যান্সারের ওষুধ ওসিসেন্ট ৮০ এর নকল মোড়ক বানিয়ে ভারত থেকে আনা নিম্নমানের ওষুধ বাজারজাত করতে গিয়ে সহযোগীসহ প্রতিষ্ঠানটির এক বিক্রয় প্রতিনিধি র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হয়েছে। পুলিশী তদন্তে বেরিয়ে এসেছে ওই কর্মী ভুয়া সনদ ও তথ্য দিয়ে যোগ দিয়েছিল সংশ্লিষ্ট কোম্পানিতে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্যানুযায়ী শুধু ইনসেপ্টা নয়, ছোট-বড় সব ওষুধ কোম্পানিতে এ ধরনের ভুয়া তথ্য দিয়ে অনেক কর্মী কাজ করছে। তারা নকল ওষুধ বাজারজাত করার পাশাপাশি অর্থ আত্মসাতের মতো অপরাধেও যুক্ত হচ্ছে। ফলে তাদের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোসহ সাধারণ মানুষ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এভাবে আর চলতে দেওয়া যায় না। এ ধরনের অপরাধ বন্ধ করতে হলে দায়ী বিক্রয় প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
এবং ভবিষ্যতে কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে তথ্য যাচাই-বাছাইয়ে অধিকতর সচেতন ভূমিকা পালন করতে হবে। আমরা চাই, বিষয়টি আমলে নিয়ে কোম্পানিগুলোর আরো সচেষ্টতা। বাজারে ভেজাল ও নকল ওষুধ প্রতিরোধে সরকারেরও কঠোর অবস্থান নেওয়া দরকার। ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণ ও ভেজাল রোধের বিষয়টি তদারকির জন্য ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর নামে একটি স্বতন্ত্র, সরকারি সংস্থা রয়েছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, কিছু নৈমিত্তিক অভিযান বাদে সার্বিক ওষুধ বাজার তদারকিতে সংস্থাটির কার্যকর উদ্যোগ বড় একটা চোখে পড়ে না। ভেজাল ও নকল ওষুধ বন্ধ করতে হলে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের নজরদারি আরও বাড়াতে হবে। মাথায় রাখতে হবে ওষুধ এমন একটি পণ্য, যার সঙ্গে মানুষের জীবন-মরণের প্রশ্ন সরাসরি যুক্ত। এর গুণ ও মানের অতিসামান্য এদিক-ওদিক হলে মানুষের জীবন রক্ষার বদলে জীবনসংহারের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই নকল, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদন ও বিপণন মানুষকে হত্যার পর্যায়ে পড়ে। তাই এমন অপরাধ যারা করবে তাদের বিরুদ্ধে খুনের অপরাধের শাস্তির মতো কঠোর শাস্তির বিধানই কাম্য।

x