ভূমি রেজিস্ট্রেশন সেবা ডিজিটাল হচ্ছে না কার স্বার্থে?

মামুনুল হক চৌধুরী

বৃহস্পতিবার , ১১ অক্টোবর, ২০১৮ at ৬:৩২ পূর্বাহ্ণ
160

ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে ও জনগণকে সহজে সেবা দিতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা প্রকৃত ডিজিটাল সেবা চালু করেছে। এর মাধ্যমে ভোগান্তি ছাড়া জনগণ সহজে সেবা পাচ্ছে, কমছে দুর্নীতিও। কিন্তু ভূমি রেজিস্ট্রেশন সেবা এখনও ডিজিটাল হয়নি। ফলে ভূমি রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত তথ্য, সেবা সহজে পাওয়া যায় না। এতে হয়রানি, ভোগান্তিতে পড়তে হয় সেবা গ্রহীতাকে।
জানা গেছে, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, দমন ও অপরাধী সনাক্তকরণে ‘ক্রাইম ডেটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (সিডিএমএস) এবং সিটিজেন ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (সিআইএমএস)’ সফটওয়্যারের মতো বাংলাদেশ পুলিশ প্রযুক্তিগত উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর ফলে কারও বিরুদ্ধে কোন থানায় মামলা থাকলে তার বিবরণ কয়েক মিনিটের মধ্যেই বের করতে পারে পুলিশ। শুধু তাই নয়, ড্রাইভিং লাইসেন্স, পাসপোর্ট ও জাতীয় পরিচয়পত্র ইত্যাদি দ্রুত যাচাই করা যায় তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায়। এর বাইরে কোন নাগরিকের নামে কয়টি গাড়ির নিবন্ধন আছে, কোন কোন ব্যাংকে কয়টি ব্যাংক হিসাব আছে, সেসব হিসাবে কত টাকা আছে, তার নামে কতটি সিম নিবন্ধিত আছে- সব তথ্যই এখন খুঁজে বের করা যায় কয়েক মিনিটের মধ্যে। আয়কর প্রদানকারী নাগরিক হলে সেই তথ্যও বের করা যায় খুব সহজেই। দেশের প্রায় সব নাগরিক সেবাই এখন তথ্য প্রযুক্তির আওতায় এসেছে, ডিজিটাল হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ভূমি রেজিস্ট্রেশন সেবা। একজন নাগরিকের সব তথ্য খুব সহজেই খুঁজে পাওয়া গেলেও তার নামে কী পরিমাণ সম্পদ রেজিস্ট্রেশন হয়েছে সে তথ্যের সন্ধান পেতে এখনো হাঁটতে হবে সেকেলে পন্থায়। অনুমান নির্ভর কৌশলে সংশ্লিষ্ট রেজিষ্ট্রেশন অফিস বছর পর বছরের ক্রমিক নম্বরের বালাম বই পড়ে খুঁজে বের করতে হয় সম্পদ রেজিস্ট্রেশনের তথ্য। ফলে জ্ঞাত আয় বর্হিভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে অনুসন্ধান বা তদন্তে নেমেও সম্পদের খোঁজ পায় না দুদক। কিংবা সম্পদের দলিল রেজিস্ট্রি হলেও প্রভাব বিস্তার করে রেজিস্ট্রেশন অফিসের সংশ্লিষ্ট রেকর্ড অফিসারের কাছ থেকে সম্পদ রেজিস্ট্রেশনের তথ্য নেই, এমন সার্টিফিকেট লিখে নিয়ে রক্ষা পান কেউ কেউ- এমন অভিযোগও আছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আয়করদাতা হিসেবে নিবন্ধিত হওয়ার পর আয়কর দাতা সনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএন সার্টিফিকেট দেয়া হয়। একইভাবে কোন প্রতিষ্ঠান কোম্পানী আইনে নিবন্ধিত হওয়ার পর কোম্পানীর নিবন্ধন সার্টিফিকেট দেয়া হয়। এসব সার্টিফিকেটে একটি কিউআর (কুইক রেসপন্স) কোড থাকে। অ্যান্ড্রয়েড ফোনে থাকা কিউআর কোড স্ক্যানার অ্যাপস ব্যবহার করে সহজেই জানা যায় এটির নিবন্ধন বিষয়ক সত্যতা। দলিল নিবন্ধনের পর হাতে লেখা একটি নিবন্ধন সংক্রান্ত রশিদ দিলেও কিউআর কোড সম্বলিত ডিজিটাল কোন সার্টিফিকেট দেয়া হয় না। ফলে ভুয়া দলিল তাৎক্ষণিকভাবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই। এতে তৈরি হয় প্রতারণার সুযোগ।
জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি রতন কুমার রায় বলেন, দেশ হিসেবে আমাদের এগিয়ে যেতে হলে সব সেবা ডিজিটাল করতে হবে। সব ধরনের তথ্য অবশ্যই থাকতে হবে উন্মুক্ত এবং সহজলভ্য। এতে দুর্নীতির কমবে, মানুষ হয়রানি ছাড়াই সেবা পাবে। ভূমি রেজিস্ট্রি-সংক্রান্ত সব তথ্য সহজে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে এ সংক্রান্ত সব সেবা ডিজিটাল করা জরুরি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবীর চৌধুরী বলেন, সরকারি যে সব সেবাদান প্রক্রিয়া মানুষের শারীরিক সংশ্লিষ্টতা কমিয়ে ডিজিটাল করা সম্ভব হয়েছে, সেখানে ঘুষ কমেছে। বিষয়টি সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ ধারণার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। আমরা আশা করব, সেবা খাতের যেখানেই সম্ভব, সেখানেই যন্ত্রনির্ভরতা বাড়াতে হবে। ভূমি রেজিস্ট্রিতে ডিজিটাল সেবা চালু করা গেলে সেখানে কাজে স্বচ্ছতা আসবে।
এবিষয়ে বক্তব্য নেয়ার জন্য চট্টগ্রামের জেলা রেজিস্ট্রার নাজমা ইয়াছমিনকে ফোন করে পাওয়া যায়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জেলা রেজিস্ট্রার অফিসের কর্মকর্তা বলেন, বর্তমানে ভুমি রেজিস্ট্রেশনের সব কিছুই চলছে পুরনো পদ্ধতিতে হাতে কলমে। রেজিস্ট্রেশনের জন্য দাখিল করা দলিল একটি নির্দিষ্ট বালাম রেজিস্ট্রারে হাতে লিখে লিপিবদ্ধ করে রাখা হয়। এরপর মূল দলিল দিয়ে দেয়া হয়। কোন কারণে লিপিবদ্ধ হওয়া বালামের ক্ষতি হলে অনুলিপি দেয়া কঠিন হয়ে যায়। বর্তমানে রেজিস্ট্রেশনের জন্য দাখিল করা দলিল স্ক্যান করে কম্পিউটারে বা নির্দিষ্ট ডাটা সার্ভারে রাখা যায়। এমনকি মুল দলিল হস্তান্তরের আগে সত্যায়িত ফটোকপি সংরক্ষণের সুযোগ থাকলেও তা করা হয় না। অদৃশ্য কারণে দেশের সবখাতে প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগলেও বাদ পড়েছে ভুমি রেজিস্ট্রেশন। অনেক বালাম রেজিস্ট্রার ছিঁড়ে গেছে, অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে লেখা। দ্রুত ডিজিটালাইজড করা না হলে এখাতে বিপর্যয় নেমে আসবে। ভুমি বিরোধ বাড়বে। জালিয়াত চক্রের দৌড়াত্ম বাড়বে।

x