ভূমি অধিগ্রহণ ও নির্মাণ কাজ চলছে সমানতালে

চাক্তাই-কালুরঘাট রিং রোড : ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকার প্রকল্প দ্রুত শেষ করতে চায় সিডিএ

সবুর শুভ

রবিবার , ১৩ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৮:২২ পূর্বাহ্ণ
1262

নির্মাণ কাজের ভরা মৌসুমে কর্ণফুলীর তীর ঘেষা ‘রিং রোডের’ নির্মাণ ও ভুমি ‘অধিগ্রহনের’ কাজ সমানতালেই চলছে। ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকার এ প্রকল্প বাস্তবায়নে চলতি শুষ্ক মৌসুমেই অধিকাংশ কাজ সম্পন্ন করতে চায় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। একারণে একদিকে চলছে ভুমি অধিগ্রহণের মতো জটিল কাজ। অন্যদিকে চলছে রিং রোড প্রকল্প বাস্তবায়নের মূল কাজ। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ অফিস ও প্রকল্প এলাকায় গিয়ে মিলেছে এসব তথ্য।
এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক ও সিডিএ’র নির্বাহী প্রকৌশলী রাজীব দাশ বলেন, নগরীর বড় একটি অংশের মানুষের স্বপ্নের প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য ভুমি অধিগ্রহণ ও রিং রোড নির্মাণের কাজ একসাথেই চলছে। যাতে এক কাজের কারনে আরেকটি থেমে না থাকে।
সিডিএ থেকে পাওয়া সর্বশেষ (গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত) তথ্য অনুযায়ী, ভুমির ক্ষতিপূরণ সংক্রান্তে ৬০০টি আবেদন পড়েছে। আরো আবেদন আসবে। এর মধ্যে ৩টি আবেদনের উপর বিস্তারিত শুনানী অনুষ্ঠিত হয়েছে ইতোমধ্যে। সিডিএ’র ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল ইসলামের নেতৃত্বে ৮ জনের একটি প্যানেল এসব আবেদনের উপর শুনানী করছেন। প্রকল্পের তথ্য মতে, রোডের জন্য ভূমি অধিগ্রহন/ক্রয় করা হবে ৬৯ দশমিক ৫০ হেক্টর (এক হেক্টর=৬.২২৯১০৮৭৯৬২৯৬৩ কানি)। আর জলাধারের জন্য অধিগ্রহণ/ক্রয় করা হবে ১২ হেক্টর জায়গা।
নগরীর বড় একটি অংশকে জলাবদ্ধতামুক্ত করার লক্ষ্যে গৃহীত ২ হাজার ২৭৫ কোটি ৫২ লাখ ৫৫ হাজার টাকার এ প্রকল্পের কাজ শুরু হয় গত অক্টোবরে। ‘কর্ণফুলী নদীর তীর বরাবর চাক্তাই খাল থেকে কালুরঘাট সেতু পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ’ শিরোনামে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। চাক্তাই থেকে কালুরঘাট পর্যন্ত কর্ণফুলী নদীর তীর ঘেঁষে ৮ দশমিক ৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ রিং রোড কাম বাঁধ নির্মাণে চলছে মাটি ভরাট। একইসাথে খালের মুখে রেগুলেটর স্থাপনের কাজও চলছে । আগামী তিন মাসের মধ্যে কর্ণফুলী থেকে পাঁচ কোটি ঘনফুট মাটি উত্তোলনের পাশাপাশি ১২টি খালের মুখে রেগুলেটর স্থাপনের লক্ষেও চলছে কাজ। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ১২ কোটি ঘনফুট
মাটি উত্তোলন হবে কর্ণফুলী থেকে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ২৫ এপ্রিল একনেকে অনুমোদন পাওয়ার আগে মাত্র তিন মাসের মধ্যে প্রকল্পের ডিপিপি, প্ল্যানিং কমিশনের অনুমোদন, প্রি-একনেক শেষ হয় প্রকল্পটির। গত অক্টোবরে শুরু হওয়া কাজের সর্বশেষ অগ্রগতি হিসেবে পূর্ব বাকলিয়া চেয়ারম্যানঘাটার শেষসীমা পর্যন্ত কল্পলোক আবাসিক এলাকার পেছনে নদীর তীরে সাইট অফিস নির্মাণের কাজ চলছে। একইসাথে চলছে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নদী থেকে উত্তোলিত মাটি দিয়ে ভরাটের কাজও। প্রকল্পে চিহ্নিত স্পটগুলোতে রেগুলেটর বসানোর কাজ চলমান।
প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজের দ্রুততা সম্পর্কে প্রকৌশলী রাজীব দাশ বলেন, চাক্তাই শাহ আমানত সেতু থেকে বলিরহাট পর্যন্ত দীর্ঘ এ এলাকায় মাটি ভরাটের কাজ সম্পন্নের টার্গেট রয়েছে শুষ্ক মৌসুমেই। কারন প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজের এটি ভরা মৌসুম। একইসাথে এখন চলছে ৬টি খালের (১২টি খালের মধ্যে) মুখে রেগুলেটর বসানোর কাজও। সড়কটি ২০২০ সালের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে বলে জানান সিডিএ’র এ কর্মকর্তা। সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রকল্পটি বাস্তরায়িত হচ্ছে বলে জানা গেছে। সমুদ্র সমতল থেকে ২৪ ফুট উঁচু, রোডের নিচে ২৫০ ফুট চওড়া ও রোডের উপরিভাগে ৮০ ফুট চওড়া এ সড়ক। সিডিএ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৫ সালে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন মাস্টারপ্ল্যানে কালুরঘাট থেকে শাহ আমানত ব্রিজ পর্যন্ত সড়ক নির্মাণের কথা উল্লেখ করা হয়। এরই ভিত্তিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে উদ্যোগী হয় সিডিএ। এরপর নগরের অপ্রতুল অবকাঠামোগত অসুবিধা চিহ্নিত করতে ২০০৬ সালে সমীক্ষা পরিচালনা করে জাপান ব্যাংক ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (জেবিআইসি)। সমীক্ষায় দুটি রিং রোড ও ছয়টি শাখা রোড নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়। এ সমীক্ষাটিও প্রকল্প গ্রহনে বিবেচনা করা হয়। ২০০৮ সালে ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান হয়েছে।
জোয়ার ও বৃষ্টির পানিতে বর্তমানে নগরীতে যে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে তা আর হবে না। আগ্রাবাদ, নিউমার্কেট ও কোতোয়ালী এলাকার যানবাহনসমূহ শহরের ভেতরের সড়কগুলো ব্যবহার না করে কর্ণফুলীর তীরবর্তী এ সড়ক দিয়ে অল্প সময়ে নগরীর উত্তর ও উত্তর পূর্বদিকে যাতায়াত করতে পারবে। তা ছাড়া শহরের উত্তর ও উত্তরপূর্ব অংশ ও কাপ্তাই হতে যানবাহনগুলো শহরের প্রধান সড়কসমূহ বাইপাস করে শাহ আমানত সেতু ব্যবহার করে দক্ষিণ চট্টগ্রামের আনোয়ারা, বাঁশখালী ও কঙবাজারে দ্রুতসময়ের মধ্যে পৌঁছে যাবে। অনুরূপভাবে দক্ষিণ চট্টগ্রামের যানবাহনগুলো শহরের উত্তর ও উত্তরপূর্বদিক এবং কাপ্তাই অভিমুখে অল্প সময়ের মধ্যে পৌঁছে যাবে। যানজট থেকে নগরবাসীর মুক্তি মিলবে অনেকাংশে। কঙবাজারগামী যানবাহনগুলো ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে ডিটি বায়েজিদ সংযোগ রোড দিয়ে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ হয়ে প্রস্তাবিত সড়ক দিয়ে শাহ আমানত সেতু ব্যবহার করে সহজে চলে যেতে পারবে। একইভাবে ঢাকাগামী যানবাহনগুলোও নগরের মাঝখানের সড়ক এড়িয়ে সহজে যাতায়াত করতে পারবে।
সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা বলছেন, প্রকল্পের আওতায় নদীর ভেতরের অংশে বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য ঢালু করে প্রতিরোধক বসানো হবে। আর চার লেনের এই রোডটির সঙ্গে খাজা রোড, কেবি আমান আলী রোড ও মিয়াখান রোড যুক্ত হবে। সুতরাং এখানকার মানুষও এ রোডের সুবিধা পাবে। এছাড়া চাক্তাই খালের মুখ থেকে কালুরঘাট সেতু পর্যন্ত সিটি আউটার রিং রোড অর্থাৎ রিভার ড্রাইভকে ঘিরে ব্যাপক কর্মসংস্থান হবে। চট্টগ্রাম শহরে জলাবদ্ধতা লাঘব ও বৃহত্তর বাকলিয়ার যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ সার্বিক উন্নয়নের জন্য মাইল ফলক হিসেবে কাজ করবে প্রকল্পটি। কর্ণফুলীর তীর ঘেঁষে উঁচু এ সড়কটির অভ্যন্তরে বিস্তীর্ণ পরিত্যক্ত জায়গাগুলোতেই শুরু হবে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড, গড়ে ওঠবে পর্যটন স্পট। কর্ণফুলী ও চট্টগ্রাম শহরের মিতালীতে সম্ভাব্য অপরূপ শোভা দর্শনে দেশ বিদেশের পর্যটকরা এখানে ভিড় জমাবেন। এ চিত্র অবশ্য এখন থেকেই দেখা যাচ্ছে। ছুটির দিনে বিনোদনপ্রেমী মানুষ প্রকল্প এলাকায় ভিড় জমাচ্ছেন।

x