ভূমধ্যসাগরে মরণ খেলায়

কাজী রুনু বিলকিস

মঙ্গলবার , ২৫ জুন, ২০১৯ at ১০:৫৮ পূর্বাহ্ণ
19

আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছি তখন বিটিভিতে বেশ কিছু ভাল ইংরেজি সিরিয়াল দেখাতো, অ্যালেঙ হ্যালির রুটস অন্যতম। কোন্টাকিন্টের পরিবার নিয়ে গড়ে উঠা কাহিনী। এতে দেখানো হতো দাস প্রথার নির্মমতা। দাসদের জীবনের করুণ চিত্র তুলে এনেছিলেন। রুটস-দ্যা সাগা অব অ্যান আমেরিকান ফ্যামিলি অ্যালেঙ হ্যালি তার নিজের পূর্ব পুরুষের জন্ম ইতিহাস বর্ণনা করেছিলেন এই উপন্যাসে। এই উপন্যাসের ওপর ভিত্তি করে এই টিভি সিরিয়ালটি নির্মিত হয়।
ভূমধ্যসাগরে মরণ খেলা দেখে রুটস সিরিয়ালটির কথা মনে আসলো।
দূরের হাতছানি, অভাবের সাথে যুদ্ধ করা ক্লান্ত তরুণ স্বপ্ন দেখে যেভাবেই হোক ধনী কোন দেশে যেতে পারলেই জীবন বদলে যাবে। মায়ের হাসিমুখ দেখবে, বাবার দুশ্চিন্তাগ্রস্ত চেহেরায় স্বস্তির ছায়া পড়বে। ভাই-বোন পরিবারের সবাইকে নিয়ে গড়ে তুলবে একটি সচ্ছল পরিবার হয়তো দেখে নিজেরও একটি ছোট্ট সংসারের স্বপ্ন। এমন অবুঝ তরুণগুলো পথ খোঁজে পথ খুঁজতে গিয়ে পড়ে যায় দালাল চক্রের ফাঁদে। একদিন পা বাড়িয়ে দেয় অনিশ্চিত জীবনের পথে তারপর অসীম সাগরে ভাসতে ভাসতে আধমরা হয়ে স্বপ্ন দেখে তার মায়ের মুখের হাসির ঝিলিক ভাই বোন কিংবা সন্তানের সুখময় জীবন। এই তো আর একটু গেলেই সোনার হরিণ। অপার শান্তির দেশ।
সেই অপার শান্তির দেশে পৌঁছাতে পৌঁছাতে তার চলে যেতে হয় চির শান্তির দেশে। খাওয়া পরা আর জীবন যাপনের জন্য সেখানে কোনো অর্থের প্রয়োজন হয় না। উদ্বেগ উৎকণ্ঠা আশা নিরাশার দোলাচলে ভাসতে হয় না। আমাদের দেশ মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে। সারাদিন উন্নয়নের গল্প শুনি তবুও কেন এই হতভাগ্য মানুষগুলো ভূমধ্যসাগরে ভাসছে। মানব পাচারকারী চক্রের হাতে পড়ে কত সম্ভাবনাময় জীবন হারিয়ে যাচ্ছে, কত পরিবার নিঃস্ব হচ্ছে। কয়েক দিন আগে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়া তিউনেসিয়া উপকূলে নৌকা ডুবে অর্ধশত বাংলাদেশীর মৃত্যু হয়েছে। এই মৃত্যু সংবাদ পেতে না পেতে আবারও এত বেশি সংখ্যক বাংলাদেশীর ইউরোপ যাত্রার খবর সন্দেহাতীতভাবে উদ্বেগজনক। মানব পাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়ে ইউরোপে অভিবাসন প্রত্যাশী বাংলাদেশী লিবিয়ার ত্রিপলিতে পৌঁছান।
সেখান থেকে ভূমধ্যসাগরের ভয়ঙ্কর পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছাতে হয় ইউরোপে তাদের অনেকেরই তিউনিসিয়া উপকূলে সলিল সমাধি হয়। জীবন মৃত্যুর এই সংকটকে মানব পাচারকারী চক্র ‘গেইম’ নামকরণ করেছে। কারণ কিছু নৌকা ভাগ্যচক্রে উত্তাল ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পৌঁছে। আবার অনেকগুলো ডুবে যায়। ত্রিপলিতে মানব পাচারকারী চক্রগুলো ‘গেইম’ নামের টর্চার সেলও খুলেছে। গেইম ঘরে নির্যাতন চালিয়ে দেশের স্বজনদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা আদায় করা হয়। র‌্যাবের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায় মানব পাচারকারী বাংলাদেশী এসব চক্রের মূল হোতা হিসেবে কাজ করেন কথিত গুডলাক ভাই ওরফে নাসির উদ্দিন। লিবিয়ার ত্রিপলিতে বসে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এই চক্র শতাধিক সদস্যের মাধ্যমে মানব পাচার করে আসছে। বিনিময়ে লুটে নেয় কাড়ি কাড়ি অর্থ। (সূত্র-আমাদের সময়,১৯ শে মে, ২০১৯)
অপরাধের দিক থেকে মানব পাচার হচ্ছে সংঘবদ্ধ অপরাধ। শুধু সংঘবদ্ধ অপরাধই নয় পাচারকারী ও সংশ্লিষ্টরা পাচারের একজন ভিকটিমের সাথে কয়েক ধরনের অপরাধও করে। ভিকটিমের সাথে প্রতারণা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌন নির্যাতন, মুক্তিপণ আদায়, খাদ্য ও চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত করা, শ্রম দাসে বাধ্য করা, শরীরের অঙ্গ বিক্রি করা, যুদ্ধে ব্যবহার করা এমনকি মেরে ফেলতে দ্বিধা করে না।
মানব পাচারকে এখন নব্য দাস প্রথার সাথে তুলনা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ওয়ার্ক ফ্রি ফাউন্ডেশনের গত বছর
প্রকাশিত এক রিপোর্টে দেখা যায় ২৪.৯ মিলিয়ন মানুষ নব্য দাস প্রথার শিকার। বর্তমান বিশ্বে মানব পাচারকে অত্যধিক লাভজনক ব্যবসা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মানব পাচার নিশ্চয়ই আর দশটি অপরাধের মত ঘৃণ্য কিন্তু এই অপরাধের সাথে দেশে যে অসহনীয় বেকারত্বের যোগসূত্র আছে তা সরকার অস্বীকার করতে পারে না।
এই শতাব্দীতে মিয়ানমার থেকে নিরাপত্তার খোঁজে সাগরে ভেসে আসা রোহিঙ্গাদের ছবি এখনো বিশ্ববাসীর চোখে ভাসছে। তবে এই ধরনের বেপরোয়া অভিযাত্রা সবচেয়ে বেশী দেখা যাচ্ছে ভূমধ্যসাগর এলাকায়। কয়েক বছর আগে সিরিয়ার যুদ্ধ যখন তুঙ্গে তখন ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপীয় সৈকতে ভেড়ার জন্য মরিয়া আরব ও উত্তর আফ্রিকার উদ্বাস্তুদের মাঝ দরিয়ার মারা পড়তে দেখা যায়। এই উদ্বাস্তুরা প্রধানত গৃহযুদ্ধ জর্জরিত সিরিয়া, সোমালিয়ার নাগরিক অথবা লিবিয়া আল জেরিয়া বা মিশরের।
এসব অভিবাসন প্রত্যাশীর নিরাপত্তা বিবেচনায় নেওয়া সভ্যতার দায়।
মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে পাচার সংক্রান্ত মামলাগুলো পৃথকভাবে পরিচালনার জন্য পৃথক ট্রাইব্যুনালের কথা বলা হলেও আইন প্রণয়নের অর্ধযুগ পরেও কোন ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়নি। মানব পাচারের ব্যাপকতা রোধ করতে হলে প্রথমত দেশে বিরাট কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে। এবং পাচারকারীদের আইনের আওতায় এনে বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে। কতভাবে মৃত্যুর ফাঁদ তৈরি করে রেখেছে দুর্বৃত্তের দল। কত সমস্যায় জর্জরিত এই দেশ তবুও এমন মৃত্যু কারো কাম্য হতে পারে না। সোনার হরিণ ধরার প্রত্যাশায় ভূমধ্যসাগরের বুকে এমন মরণ খেলার শিকার হবে আমাদের দেশের অসহায় তরুণেরা তা মেনে নেওয়া যায় না। আমরা আশা করব সরকার মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠিন কঠোর ব্যবস্থা নেবে।

x