ভুলে ভরা রক্তের বাঁধন না হয় যেন দুখের কারণ

ডা. মু. জামাল উদ্দিন তানিন

বৃহস্পতিবার , ১৩ জুন, ২০১৯ at ৫:১০ পূর্বাহ্ণ
1251

মেডিকেল কলেজের প্রথম বর্ষ থেকেই তুমুল পড়াশোনার চাপের মধ্যেও পরিচিত-অপরিচিত নানান রোগী নিয়ে হাসপাতাল বা আমাদের সম্মানিত স্যারগণের চেম্বারে যেতে হত। নানান ওষুধ আর টেস্ট এর জন্য দৌড়াদৌড়ির পাশাপাশি একটা ব্যাপার নিয়ে খুব সমস্যা হত যখন রোগীর রক্ত দরকার হত। সব সময় দেখতাম রোগীর আত্মীয়-স্বজনদের থেকেই রক্ত যোগাড় করার চেষ্টা হচ্ছে। অপরিচিত লোকের রক্ত থেকে বিভিন্ন ইনফেকশন যাতে না ছড়ায় সে জন্যই এই চেষ্টা। আর রক্ত দিলে রোগীগণ বাহ্যিকভাবে খুব দ্রুত ভাল বোধ করতে থাকেন। সন্তান মা বাবাকে বা স্বামী স্ত্রীকে রক্ত দিয়ে নিজেরাও দায়িত্ব পালন করতে পেরে ভাল বোধ করেন। যদিও অনেক রোগীর আত্মীয়-স্বজনকেই ওনাদের থেকে রক্ত নিতে চাই বললেই উল্টো হাওয়া হয়ে যেতে দেখতাম। তখন মানবতার টানে সম্মানিত ডাক্তার বা মেডিক্যাল স্টুডেন্টগণ থেকেই রক্ত যোগাড় করা হত অপরিচিত সব মানুষের জন্য। সত্যি বলতে কি রোগীকে রক্ত দেওয়া খুব সাধারণ একটা ব্যাপার মনে হতে লাগল।
কিন্তু ছয় বছরের এমবিবিএস শেষ করার পর যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (প্রাক্তন পিজি হাসপাতাল) রক্তরোগ বিভাগে পাঁচ বছরের এমডি কোর্সে পড়াশোনা করছি তখন বুঝতে শুরু করলাম আমরা যেভাবে রক্ত আদান প্রদান করছি তা আসলেই বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের মেডিক্যাল জ্ঞানের সাথে সংগতিপূর্ণ নয়। আমাদের রক্তদানে অনেক সময়ই উপকারের চেয়ে ক্ষতি বেশি হয়, মূল্যবান রক্তের অপচয় হয়, অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। রক্ত দিতে খুব সহজ মনে হলেও এটা আসলে শরীরে অঙ্গ ট্রান্সপ্লান্ট এর মতই জটিল একটি ব্যাপার।
তাই সাধারণ মানুষ ও সম্মানিত চিকিৎসকগণ সবার জন্যই রক্ত সঞ্চালন সংক্রান্ত কিছু ব্যাপার নিয়েই আজকের কথা:
১. বাস্তবতা হল রক্ত না দিয়ে ওষুধ দিয়েই চলতে পারে। হিমোগ্লোবিন কম মানেই রক্ত দেওয়া যাবে বা দিতে হবে এমন নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ঔষধ বা ইঞ্জেকশনই যথেষ্ট। রক্ত হল একেবারেই শেষ অবলম্বন। ২. যে কোন ক্ষেত্রেই রক্ত কমার কারণ বের করা খুব জরুরি। এর আগেই রক্ত বা ওষুধ দিয়ে দিলে এই কারণ বের করা কঠিন হয়ে যায়। ফলে ধরা পরার আগেই রোগ বেড়ে গিয়ে রোগীর ক্ষতি হতে পারে। ৩. রক্তের মধ্যে একটি প্রয়োজনীয় উপাদানের সাথে অপ্রয়োজনীয় উপাদান, কোটি কোটি জানা অজানা এন্টিজেন এন্টিবডি থাকে যা মানব শরীরে নানা বিরূপ প্রতিক্রিয়া করে। ৪. হাল্কা শরীর চুলকানো থেকে শুরু করে প্রাণঘাতী নানা সমস্যা (শ্বাসকষ্ট, কিডনি নষ্ট, হার্ট ফেইল, এইডস, হেপাটাইটিস এবং অন্যান্য) হতে পারে রক্ত সঞ্চালনের কারণে। ৫. প্রচলিত হোল ব্লাড এখন অচল বলা চলে। লাল রক্ত বা আরবিসি’র (জইঈ) জন্য আরসিসি বা পিসিভি( জঈঈ/চঈঠ) আর অনুচক্রিকা বা প্ল্যাটলেটের জন্য প্ল্যাটলেট; এভাবেই রক্তরোগ বিশেষজ্ঞগণ রক্ত দিতে বলেন। ৬. গর্ভবতী মা, অপারেশন এর রোগীগণ এবং বয়স্ক রোগীগণ অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় রক্ত সঞ্চালন পান। হিমোগ্লোবিন দ্রুত অনেক বেশি কমে না গেলে, হার্ট ফুসফুসের সমস্যা না থাকলে বা অপারেশন খুব ইমারজেন্সি না হলে ওষুধই যথেষ্ট। রক্ত সঞ্চালন রোগীর এমনকি গর্ভের বাচ্চারও ক্ষতি করতে পারে। ৭. থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসা মানেই কেবল রক্ত দিতে হবে এটি ভুল ধারণা। রক্তদানের আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে অতিরিক্ত বা অপ্রতুল রক্তসঞ্চালন রোধ ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞগণের তত্ত্বাবধানে নিয়মিত আনুষঙ্গিক চিকিৎসা নিলে রোগীগণ সুস্থ মানুষের মতই জীবনযাপন করতে পারেন। ৮. বাবা মা, বাচ্চা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে রক্ত দিবেন না। এটি রোগীর জটিল ধরনের কিছু ক্ষতি করতে পারে। ৯. নিকটাত্মীয় নয় বন্ধুদের থেকে রক্ত নিন। ১০. একাধিক সন্তান এবরসন, এমআর হলে
মহিলাদের থেকে রক্ত নিবেন না। ১১. মহিলাদের থেকে প্ল্যাটলেট নিবেন না। ১২. শরীরে ট্যাটু থাকলে রক্ত নিবেন না।
১৩. নিয়মিত রক্তদাতাদের শরীরে আয়রন দেখতে হবে। (সিরাম আয়রন নয়।) ১৪. রক্তের গ্রুপ ভাল ল্যাবে পরীক্ষা করবেন। অনেক সময় গ্রুপ ভুল হয়। রক্তের গ্রুপ নানা রোগের কারণেও ভিন্নতা দেখায়। ১৫. গ্রুপ মিলে গেলেও জটিলতা হতে পারে। ১৬. প্ল্যাটলেট ও হিমোগ্লোবিন দুটোই কম থাকলে আগে প্ল্যাটলেট দিতে হবে। আগেই লাল রক্ত দিলে রোগীর বাহ্যিক বা আভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ শুরু হবে বা রক্তক্ষরণ বেড়ে যাবে। ১৭. প্ল্যাটলেট অনেক বেশি না কমলে (রোগীর অবস্থা অনুযায়ী ) বা এক্টিভ ব্লিডিং না থাকলে প্ল্যাটলেট দিতে হয় না। ডেঙ্গু আর নানা ক্যান্সার রোগীগণের জন্য এটি খুব জরুরি কথা। ১৮. প্ল্যাটলেট সবসময় দ্রুত দিতে হবে শুরু থেকেই। রিয়েকশন হচ্ছে কিনা আস্তে আস্তে দিয়ে দেখার সুযোগ নেই। আস্তে দিলে প্ল্যাটলেট নষ্ট হয়ে যায়। ১৯. ডিআইসি (উওঈ) মানেই ফ্রেশ ফ্রোজেন প্লাসমা (ঋঋচ) নয়। এটা অনেক সময় আগুনে ঘি ঢালার মত হতে পারে।(ডিআইসি একটি জটিলতা যেখানে রোগীর রক্ত জমাট বাঁধার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে আর রক্তক্ষরণ হতে থাকে। রোগীর শত ব্যাগ পর্যন্ত লাল, সাদা রক্ত বা প্লাসমা ও প্ল্যাটলেট লাগতে পারে।) ২০. সামান্য খাবার কম খাওয়া থেকে শুরু করে ক্যান্সার জাতীয় জটিল রোগে রক্ত/হিমোগ্লোবিন কমে যেতে পারে। তাই রক্ত কমার কারণ বের করতে যথাযথ বিশেষজ্ঞগণের শরণাপন্ন হওয়া আবশ্যক। একজন মানুষের দৈনন্দিন ঘরোয়া কাজ, স্কুল কলেজের পরীক্ষার ফল কিংবা অফিসের কাজ সব কিছুর উপর রক্ত স্বল্পতার প্রভাব রয়েছে। শিশুদের রক্ত স্বল্পতা পরবর্তী জীবনে নানা স্থায়ী খারাপ প্রভাব ফেলে। তাই হালকাভাবে না নিয়ে আর কথায় কথায় রক্ত না দিয়ে সম্মানিত বিশেষজ্ঞগণের তত্ত্বাবধানে সুন্দরভাবে কারণ নির্ণয় করে চিকিৎসা করলে রোগীরা অধিক উপকৃত হতে পারেন।
মনে রাখতে হবে রক্ত যেমন জীবন বাঁচায় তেমনি অনিরাপদ ও অপ্রয়োজনীয় রক্ত জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। তাই আসুন আবেগতাড়িত না হয়ে বিজ্ঞানসম্মতভাবে বিশেষজ্ঞগণের তত্ত্বাবধানেই কেবল রক্ত সঞ্চালনের সিদ্ধান্ত নিই।
লেখক : রক্তরোগ ও রক্তক্যান্সার বিশেষজ্ঞ

x