‘ভুলে’ খুন হন রিকশাচালক রাজু

খুনের ঘটনায় আটক সবাই মাদকাসক্ত

আজাদী অনলাইন

বৃহস্পতিবার , ১৬ মে, ২০১৯ at ৯:০৫ অপরাহ্ণ
715

কারাগারে বন্দি এক মাদক ব্যবসায়ীর ‘নির্দেশ ছিল’ মফিজ নামে তার এক সহযোগীকে খুন করার কিন্তু বাসায় ঢুকে ‘ভুল করে’ হামলা চালানো হয় পাশের রুমে থাকা রিকশাচালক রাজুর ওপর। তাদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে প্রাণ হারান ওই যুবক।

নগরীর ডবলমুরিং থানার হাজীপাড়া এলাকায় রিকশাচালক খুনের ঘটনায় আটজনকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়া সবাই সদ্য কৈশোর পেরোনো এবং তাদের সবাই মাদকাসক্ত। বিডিনিউজ

আজ বৃহস্পতিবার (১৬ মে) এক সংবাদ সম্মেলনে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার আমেনা বেগম সাংবাদিকদের বলেন, ‘মফিজ নামে এক ব্যক্তিকে খুন করতে গিয়ে খুন করা হয় রিকশাচালক রাজুকে। কারাগারে বন্দি ছগির হোসেন নামে এক মাদক ব্যবসায়ীর নির্দেশে তারা এ হত্যাকাণ্ড ঘটায়।’

এ হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তাররা হলো শিমুল দাশ (২০), তানভীর হোসেন ওরফে সিফাত (১৮), মো. সুজন ওরফে মধু (১৮), মো. রাকিব হোসেন ওরফে শাহ রাকিব, নূর নবী (১৮), মেহেদী হাসান রুবেল (১৮), ওসমান হায়দার কিরণ (১৮) ও সেলিনা আক্তার শেলী (৩৫)।

এদের মধ্যে শেলী খুনের ‘নির্দেশদাতা’ ছগিরের স্ত্রী এবং কিরণ তাদের ছেলে। হত্যাকাণ্ডে জড়িত অভিযোগে শুক্কুর নামে আরেকজনকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।

সংবাদ সম্মেলনে আমেনা বেগম বলেন, ‘ছগির আগ্রাবাদ হাজীপাড়া এলাকায় মফিজ নামে একজনকে দিয়ে ইয়াবা ব্যবসা করতেন। গত ২৭ এপ্রিল নগর গোয়েন্দা পুলিশের হাতে ৫১৯টি ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হয় ছগির। গ্রেপ্তারের পর তার সন্দেহ হয় মফিজের তথ্যে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।’

ছগির গ্রেপ্তার হওয়ার কিছুদিন পর শিমুল, সিফাত, রাকিব ও পলাতক শুক্কুর কারাগারে গিয়ে নিয়ম মেনে ছগিরের সঙ্গে দেখা করেছিলেন।

‘তখন সে মফিজকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিল,’ বলেন অতিরিক্ত কমিশনার আমেনা বেগম।

এরপর আরও কয়েকবার কারাগারে তাদের দেখা হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের আগের দিন সোমবার ছগিরের স্ত্রী শেলী, শিমুল, শুক্কুর ও রাকীব দেখা করেছিল ছগিরের সাথে। এ সময় সে দুই-একদিনের মধ্যে মফিজকে হত্যা করার জন্য আবারও নির্দেশ দেয়।’

গ্রেপ্তারদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে পুলিশ কর্মকর্তা আমেনা বেগম বলেন, ‘ওই দিন (১৩ মে) রাতে ছগিরের স্ত্রী শেলী, ছেলে কিরণ, শুক্কুর, শিমুল, রাকিব ও সিফাত মফিজের বাসার সামনে যায়। এ সময় সবাই মিলে পরামর্শ করে কীভাবে মফিজকে হত্যা করা হবে। সেখানে শেলী শুক্কুরকে এক হাজার টাকা ও কিরণকে একটি কিরিচ দেয়। এছাড়াও রাকিবকে চাইনিজ কুড়াল ও সিফাতকে ছুরি দেয় কিরণ। রাতে শেলী ও কিরণ বাসায় চলে আসার পর মঙ্গলবার ভোরে শিমুল, শুক্কুর, রাকিব, সিফাত ও সুজন মিলে মফিজকে মারার উদ্দেশ্যে বাড়িতে প্রবেশ করে। আর নুরনবী ও রুবেল বাইরে পাহারায় থাকে।’

তিনি বলেন, ‘আধাপাকা ওই বাড়িতে আলাদা আলাদা কক্ষ বিভিন্ন জনকে ভাড়া দেয়া হয়। মফিজ যে কক্ষে থাকেন তার পাশের কক্ষেই থাকতেন রিকশাচালক রাজু। তারা বাড়িতে ঢুকেই মফিজের রুম মনে করে রাজুর রুমে ঢোকে এবং আশপাশের রুমগুলো বাইরে থেকে আটকে দেয়। রাজুকে শরীরের বিভিন্ন অংশে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে তারা পালিয়ে যায়।’

ডবলুমরিং থানার পরিদর্শক (তদন্ত) জহির হোসেন বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়া তরুণদের মধ্যে শিমুল অন্ধকারে মফিজ ভেবে রাজুকে প্রথম ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে। পরে সবাই মিলে তাকে কুপিয়ে করে পালিয়ে যায়। পরে রাজুকে কয়েকজন লোক উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ২২ বছর বয়সী রাজু আহমেদ।‘

এই পুলিশ কর্মকর্তা জানান, রাজুর ওপর হামলার সময় পাশের ঘরেই ছিলেন মফিজ। শব্দ শুনে তিনি ঘর থেকে বের হতে গিয়ে দরজা বন্ধ থাকায় বের হতে পারেননি।

এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নেমে ওই এলাকায় একটি নির্মাণাধীন ভবনে মাদক সেবনের বিভিন্ন আলামত দেখতে পান বলে জানান পরিদর্শক জহির।

জহির হোসেন বলেন, ‘ওই ভবনটিতে ছগিরের ছেলে কিরণও গ্রেপ্তারদের সাথে বসে গল্প করত। সেখান থেকে আমরা জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কিরণকে আটক করে থানায় নিয়ে আসি। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডের সাথে তার মা শেলী ও বাবা ছগিরের পরিকল্পনা ও নির্দেশের তথ্য বেরিয়ে আসে।’

তিনি জানান, বুধবার রাত পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে মুহুরিপাড়া ওয়ার্ড কাউন্সিলরের অফিসের কাছ থেকে শিমুল, নুরনবী, রাকিবকে এবং সুজন ও সিফানকে পানওয়ালাপাড়া, আর রুবেলকে বাদামতলী থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পরে তাদের দেখানো স্থান পানওয়ালাপাড়া নবী কলোনীর মাঠের কাছের ঝোপ ও পুকুর থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত কিরিচ, চাইনিজ কুড়াল ও ছুরি উদ্ধার করে পুলিশ।

হত্যাকাণ্ডে দোষ স্বীকার করে শিমুল, সিফাত, রাকিব ও সুজন মহানগর হাকিম আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানান পরিদর্শক জহির।

x