ভিআইপিনামা !

সালমা বিনতে শফিক

মঙ্গলবার , ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ১০:৫৩ পূর্বাহ্ণ
97

এক
অস্ট্রেলিয়ায় সাত বছরের পাট চুকিয়ে পাকাপাকি দেশে ফিরে এলাম যেদিন, সেদিন অপ্রত্যাশিতভাবে ভিআইপি প্রবেশদ্বার দিয়ে দেশের মাটিতে পা রাখি। এমনটা আগে কখনও হয়নি। কর্তা গিন্নি দুজনে দুই দুইটা পিএইচডি নিয়ে ফিরে আসছি বলে ভিআইপির মতো প্রবেশাধিকার লাভ, তা ভাবার অবকাশ নেই। আসল ব্যাপার হচ্ছে প্রতিবেশী ভাবী। তাঁর কোন এক ভিআইপি আত্মীয়ের কল্যাণে সবসময় ওনারা ঐ প্রবেশদ্বার ব্যাবহারের সুযোগ পেয়ে যান। তাঁর সফরসঙ্গী হিসেবে নয় হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়ার সুবাদে কিছুক্ষনের জন্য ভিআইপির স্বাদ লাভ করার এক অসামান্য সুযোগ এসে গেল।
বিমান থেকে অবতরণ করেই তাপানুকুল ছোট্ট গাড়িতে আরোহণ। মুহূর্তে চলন্ত সিঁড়ির গোঁড়ায়। পলকেই পৌঁছে যাই সংরক্ষিত কামরায়, যেখানে কেবল ভিআইপিগন প্রবেশ করতে পারেন। আজ এই বিমানে বোধ করি আর কোন ভিআইপি আগমন করেননি। পুরো কক্ষে আমরাই। কন্যাসমেত আমরা তিনজন, আর সেই ভাবীর আত্মীয় পরিজন। মেয়েকে নিয়ে হাতমুখ ধুতে যাই। লাগোয়া স্নানঘর তকতক করছে। গরম ঠাণ্ডা পানির সুব্যবস্থা। আহ একটু স্নান করতে পারলে বেশ হতো। কি আর করা, এখনই ছুটতে হবে। সেবাদান কারী কয়েকজন দণ্ডায়মান সম্মুখে। সবার পাসপোর্ট বুঝে নিয়ে ঢাকায় প্রবেশের সিল ছাপ্পড় লাগিয়ে নিয়ে আসেন চোখের নিমিষে। অথচ এ কাজ করতে লম্বা লাইনে দাঁড়াতে হত নিদেনপক্ষে দুই ঘণ্টা। হয়রানির কথা নাইবা বলি। সব বুঝে নিয়ে ভাবী ও তাঁর আত্মীয়দের অনেক ধন্যবাদ জানিয়ে ভিআইপি কক্ষ ত্যাগ করি। এক একটা কাঁচের দরজা পার হই, একটু একটু করে টের পাই উষ্ণতা, ঢাকার উত্তাপ। বিমানবন্দরের কোলাহল কর্ণগোচর হয় একটু পরে। বাক্সপেঁটরা সংগ্রহের জন্য পা বাড়াই লাগেজ বেল্টের দিকে। ভাবীদের কর্মচারী এসেছেন সঙ্গে করে যাতে ভাবীর লাগেজ আমরা তাঁকে চিনিয়ে দিতে পারি। ভিআইপি বলে তাঁকে আর এমুখো হতে হলনা। ভাবীর ভিআইপি আত্মীয়ের নির্দেশে এক কর্মচারী আমাদের সঙ্গে লেগে থাকলেন আভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর পর্যন্ত। এ যাত্রায় ঢাকা শহরে রাত কাটাতে হলনা। গন্তব্য সোজা চট্টগ্রাম।
দুই
বন্ধু সহকর্মী সমেত একবার ঢাকায় গিয়েছিলাম এক সম্মেলনে যোগ দিতে। ফেরার দিন ভোর সকালে আমাদের জন্য সবুজ রঙের সিএনজি ডেকে এনেছিল পান্থনিবাসের এক কর্মী। আমাদের সঙ্গী হয়েছিল সে চট্টগ্রামের রেলগাড়িতে ওঠার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত। পথিমধ্যে সময় বাঁচানোর জন্য ও সবুজ গাড়ির চালককে ‘শর্টকাট’ নিতে পরামর্শ দেয়। কিন্তু ফটকের মুখে উর্দিপরা দ্বাররক্ষী আঁটকে দেন আমাদের বাহন। বড় গলায় ঘোষণা দেন- এটা ‘ভিআইপি’ রোড। আমাদের পাশ দিয়ে সাঁই সাঁই করে চকচকে কিছু গাড়ি চলে গেল সেই ফটক দিয়ে। সেইসব গাড়ির আরোহীদের পরিচয়ও জানতে চাননা দ্বাররক্ষী। পান্থনিবাসের সেই কর্মী গজগজ করে রেগেমগে- বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কি তবে ‘ভিআইপি’ নন? যাই হোক। ঘুরপথে গেলেও রেলগাড়ি ধরতে তেমন অসুবিধা হয়নি। ঠিক সময়মতোই বাড়ি পৌঁছে যাই। ‘ভিআইপি’ হলেই কি আগেভাগে পৌঁছাতাম?
তিন
মেয়ে আর মেয়ের বাবাকে নিয়ে বেড়াতে গিয়েছিলাম বোনের বাড়ি। সমুদ্রের ধারে সুপারি বাগান ঘেরা অপূর্ব সুন্দর এক জায়গায় ঘরকন্না পেতেছে আমার বোন। বিকেলে ঘুরতে গিয়েছিলাম আশপাশ দেখব বলে। ফেরার পথে সন্ধ্যা নামলে রিকসায় চেপে বসি তড়িঘড়ি ঘরে ফেরার আশায়। উর্দিপরা নিরাপত্তারক্ষীগণ থামিয়ে দেন রিকশা। নামিয়ে দেন রাস্তা থেকে। মহাসড়ক ফেলে গাছগাছড়াদের পাশে আশ্রয় নেই রিকশাসমেত। একটু পর বাঁশি বাজাতে বাজাতে আমাদের পাশ দিয়ে সাঁই সাঁই করে চলে যায় গাড়ির বহর; খোলা জীপগাড়ি, কালো কাঁচ দেওয়া বদ্ধ জীপ, ছোট গাড়ি, গোটা বিশেক মোটরবাইক। মাটি কাঁপিয়ে চলে যায় বিশাল সেই গাড়ির বহর। খোলা গাড়িতে হৈ হৈ রৈ রৈ করে যুবকের দল, আকাশ ফাটিয়ে উঁচু আওয়াজের হিন্দি গানের সুর ভেসে আসে বদ্ধ গাড়ির ভেতর হতে। এক সময় শান্ত হয় জনপদ। আমাদের মতো সড়কের নিচে আশ্রয় নেওয়া মানবসন্তানরা আস্তে আস্তে মাথা তুলে বাড়ির পথ ধরে। মেয়ে জানতে চায়- ওরা কারা? রিকশাচালক জবাব দিলেন, ওঁরা ‘ভিআইপি’। এ পথ দিয়ে হরহামেশাই তাঁরা চলাফেরা করেন এমন মহাসমারোহে, সাধারণ মানুষকে রাস্তা থেকে নামিয়ে দিয়ে। রিকশাচালককে তাই এক মুহূর্তও ভাবতে হলনা ওঁরা কারা, তার জবাব দিতে। আমার মেয়েতো জানেনা ‘ভিআইপি’ কারা, ‘ভিআইপি’ শব্দের অর্থই বা কি। ও বলে দেয় ‘ভিআইপি’ মানে কি ভেরি ইডিয়ট পার্সন? ওদের জন্য আমাদেরকে এভাবে পথ ছেড়ে জঙ্গলে নামতে হল।
চার
কোন এক সাপ্তাহিক ছুটির দিনে মেয়েকে নিয়ে গিয়েছিলাম বইয়ের দোকানে। সন্ধ্যা নামার আগেই সিএনজি চালিত সবুজ অটোরিকশা নিয়ে বাড়ি ফিরছিলাম। কিছুদূর যাবার পর পথ আঁটকে দিল উর্দিধারি নিরাপত্তারক্ষী। “পথ বন্ধ সব বন্ধ নেতা আসছেন” ুসুমনের সেই গানের মতো। একে একে ঘুরে যায় সব গাড়ি। বিকল্প পথ ধরে। আমরা খুব কাছাকাছি এসে পড়েছিলাম। বিকল্প পথটা বড় ঘুরোপথ। কি আর করা ! সিএনজি চালক সহানুভূতি দেখান। ঘুরিয়ে নিয়ে অন্য পথে চলেন আমাদের নিয়ে। বাড়ির কাছে আসতে না আসতে আবারও বাধা। যাওয়া যাবেনা ওপথে। নিরাপত্তারক্ষীকে অনুনয় জানাই- আমার ঘর সামনেই। অন্য পথ ধরে এই রাত্রিবেলায় কোথায় যাবো! অসহায় বোধ করেন উর্দিপরা কর্মী। হুকুমের চাকর তিনি। আমাদের মা মেয়েকে নিরাপদে বাড়ি পৌঁছার অনুমতি দিয়ে চাকরী খোয়াবেন তিনি! ক্ষমা চেয়ে বলেন, হেঁটে হেঁটে চলে যান আপা। অল্প একটুতো পথ। সত্যি পথ খুব বেশী না। আধ মাইলের মতো। কিন্তু হাতে ভারী বইয়ের ঝোলা। খানা খন্দে ভরা রাস্তা। ধুলাবালির কথা নাইবা বলি। সিএনজি ছেড়ে দিয়ে চালককে কিছু টাকা বাড়িয়ে দেই। কিন্তু তিনি ফিরিয়ে দেন পাওনা থেকে আরও কিছু। গন্তব্যে আমাকে পৌঁছাতে পারেননি তাই। এতো দুর্ভোগের মাঝেও চোখে পানি এসে যায় ছোট কাজ করা মানুষটার বদান্যতা দেখে। তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে এক হাতে বইয়ের ঝোলা আর অন্য হাতে মেয়েকে ধরে পথে নামি। মেয়ে বারবার মনে করিয়ে দেয়, কেন ওকে নিয়ে এসেছি এই দেশে। অস্ট্রেলিয়ায় থাকার দিনগুলোতে কেউতো এভাবে পথে নামিয়ে দেয়নি। নিরুত্তর নির্বাক আমি মেয়েকে আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরে পা চালাই। পথঘাট ততক্ষণে আবছা অন্ধকার।
উল্টোদিক থেকে ধেয়ে আসছে জনস্রোত। শহরের নামি বিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে এসেছিল শত শত শিশু কিশোর। সঙ্গে তাদের বাবা-মা। নিজস্ব পরিবহন ছিলনা আশি ভাগ প্রতিযোগীর। সাধারণের জন্য বরাদ্দ রিকশা, সিএনজি, টেম্পুর প্রবেশ আপাতত নিষিদ্ধ এই তল্লাটে। কারণ ‘নেতা আসছেন’। পরীক্ষা শেষে অতঃপর দুর্ভোগ চরমে ওঠে ক্ষুদে পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের। অনেকের হাতে ভারী ব্যাগপত্র। দুধের শিশুও ছিল অনেকের কোলে। বাড়িতে রেখে আসার অবস্থা ছিলনা হয়তো। এই মানবঢল পাড়ি দেই আমরা স্রোতের প্রতিকূলে। কারণ আমার নিবাস সেই নামি বিদ্যালয়ের কাছেই। বাড়ির ফটকে প্রবেশের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত মানুষের দুরবস্থা দেখে যেতে হল অসহায় চোখে। পুরোপুরি রাত নামার আগেই ঘরে ফিরে আসি। শুকরিয়া খোদার কাছে। না জানি ক্ষুদে পরীক্ষার্থীরা সব ঠিকঠাক মতো বাড়ি ফিরতে পেরেছে কিনা। রাস্তা উন্মুক্ত হতে আরও ঘণ্টা তিনেক লাগার কথা। ততোক্ষণে ভিআইপি মহোদয় তাঁর অতি গুরুত্বপূর্ণ কার্য সমাধা করে ফিরে যাবার কথা।
বারবার ঘুরেফিরে একটা কথাই মনে আসছে। আমার বাংলাদেশ কি তবে ভিআইপি দের জন্য স্বর্গরাজ্য! এই দেশের রোদ- বৃষ্টি, ধুলা-বালি, কালো ধোঁয়া, বিষাক্ত হাওয়া, কিছুই স্পর্শ করেনা ওঁদের। তাপানুকুল সুরক্ষিত বাহনে চড়ে রাজপথ পাড়ি দেন তাঁরা। তবুও কীটপতঙ্গ সাফ করার মতো করে আমাদের মতো সাধারণ মানুষদের পথ আঁটকে দেয় নিরাপত্তা প্রহরী। জনদুর্ভোগ নিয়ে ভাবেননা কেউ, অথচ জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সংগ্রাম করে যান জীবনভর। এঁরাই আমাদের মহান নেতা!
‘একবার ত্যাজি এ সোনার গদি, রাজা মাঠে নেমে যদি হাওয়া খায়। তবে রাজা শান্তি পায়’- বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের সৃষ্ট অমর চরিত্র গুপি গায়েনের গলায় যাদু ছিল। সঙ্গতে ঢোল নিয়ে ছিলেন বাঘা বাইন। ওঁদের দুজনের পরিবেশনা মন্ত্রমুগ্ধ করে দিত শ্রোতাদের। রাজা প্রজাকে নিমিষে দাঁড় করিয়ে দিত এক কাতারে। গুপি বাঘা ফিরে এসো আরেকবার, এই বাংলায়।

x