ভাষা শহীদ সালাম

রেজাউল করিম

বুধবার , ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৮:৩১ পূর্বাহ্ণ
63

বাংলা ভাষার অবস্থান নিয়ে বাঙালির আত্ম-অম্বেষায় যে ভাষাচেতনার উন্মেষ ঘটে, তারই সূত্র ধরে তৎকালীন পূর্ববঙ্গের রাজধানী ঢাকায় ১৯৪৭ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরে ভাষা-বিক্ষোভ শুরু হয়। ১৯৪৮ সালের মার্চে এ নিয়ে সীমিত পর্যায়ে আন্দোলন হয় এবং ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তার চরম প্রকাশ ঘটে। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে যেকজন তরুণের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিল সালাম তাদের অন্যতম। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনের রাস্তায় সরকারের জারি করা ১৪৪ ধারা অগ্রাহ্য করে ছাত্র-জনতা। বাংলা ভাষার দাবিতে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে বাংলা ভাষাভাষী। এতে ছাত্রদের সাথে যোগ দেয় সর্বস্তরের জনতা। মিছিলে মিছিলে প্রকম্পিত হয়ে উঠে বাংলার রাজপথ।
আবদুস সালাম সে বিক্ষোভ মিছিলে স্বপ্রণোদিতভাবে অংশগ্রহণ করেন। আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার সঙ্গে সালামও ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজপথে নেমে পড়লে মিছিলে পুলিশ নির্বাচারে গুলি চালায়। পুলিশের গুলিতে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ গুলিবিদ্ধ হন অনেকে। গুরুতর আহত অবস্থায় আবদুস সালামকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সালামের ম্যাসের কাজের বুয়ার ছেলে তেজগাঁ নাবিস্কুতে কর্মরত সালামের ভাতিজা মকবুল আহম্মদ ধনা মিয়াকে জানান তার চাচা সালাম গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। মকবুল ছুটে যান সালামের আরেক জেঠাতো ভাই হাবিব উল্লাহর কাছে। তারা দুজনে মিলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসে দেখেন, পেটে গুলিবিদ্ধ হয়ে সালাম সংজ্ঞাহীন অবস্থায় বারান্দায় পড়ে আছেন। তারা ২১ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় টেলিগ্রামে সালামের বাবা ফাজিল মিয়াকে সালামের গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাটি জানান। ফাজিল মিয়া তার অন্য এক ছেলেকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেলে ছুটে আসেন। পর দিন সকাল ৯টার দিকে বেশ কিছু ছাত্র সালামের যথাযথ চিকিৎসা না করার অভিযোগে হাসপাতালে বেশ কিছুক্ষণ হট্টগোল করেন। মকবুল ও হাবিব উল্লাহ হাসপাতালে আসা যাওয়ার মধ্যে থাকলেও সংজ্ঞাহীন সালামের বিছানার পাশ থেকে তার বাবা কোথাও আর যাননি। বাবার উপস্থিতিতে হাসপাতালেই ২৫ ফেব্রুয়ারি আবদুস সালাম মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। ২৬ ফেব্রুয়ারি বিকেলে সালামের লাশ আজিমপুর গোরস্থানে দাফন করা হয়।
‘ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ/ দুপুরবেলার অক্ত/ বৃষ্টি নামে, বৃষ্টি কোথায়/ বরকতেই রক্ত/ হাজার যুগের সূর্য তাপে/ হাজার যুগের সূর্য তাপে/ জ্বলবে, এমন লাল যে/ প্রভাত ফেরীর মিছিল যাবে/ ছড়াও ফুলের বন্যা/ বিষাদগীতি গাইছে পথে/ তিতুমীরের কন্যা/ চিনতে না কি সোনার ছেলে/ ক্ষুদিরামকে চিনতে/ রুদ্ধশ্বাসে প্রাণ দিল যে/ মুক্ত বাতাস কিনতে/ পাহাড়তলীর মরণ চূড়ায়/ ঝাঁপ দিল যে অগ্নি/ ফেব্রুয়ারির শোকের বসন/ পড়ল তারই ভগ্নী/ প্রভাতফেরী, প্রভাতফেরী/ আমায় নেবে সঙ্গে/ বাঙলা অমার বচন/ আমি জন্মেছি এই বঙ্গে।’ (‘একুশের ছড়া’ : আল মাহমুদ)।
শহীদ আবদুস সালাম ফেনী জেলার দাগনভুঁইয়া উপজেলার লক্ষণপুর গ্রামে ১৯২৫ সালের ২৭ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। লক্ষণপুরের বর্তমান নাম সালাম নগর। তাঁর পিতার নাম মোহাম্মদ ফাজিল মিয়া এবং মাতার নাম দৌলতের নেছা। তিনি স্থানীয় মাতুভূঁইয়া করিমুল্লা জুনিয়র হাই স্কুলে নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেন। এরপর চাকরির সন্ধানে ঢাকায় আসেন। পূর্ব পাকিস্তান সরকারের ডিরেক্টরেট অব ইন্ডাস্ট্রিজ বিভাগে পিয়ন হিসাবে চাকরি পান। চার ভাই ও তিন বোনের মধ্যে আবদুস সালাম ছিলেন সবার বড়। সালাম দেখলেন, ওরা (পাকিস্তানি জান্তা) মায়ের ভাষায় কথা বলতে দেবে না। বার বার বলা হচ্ছিল-‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।’ তখন সালামের মতো বাঙালিরা গর্জে উঠে-‘না’।
২০০০ সালে বাংলাদেশ সরকার ভাষা শহীদ আবদুস সালামকে মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করেন। এই শহীদের নামে নামকরণ করা হয় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অন্যতম যুদ্ধ জাহাজ বিএনএস সালামের। ফেনী স্টেডিয়ামের নাম পরিবর্তন করে ২০০০ সালে ভাষা শহীদ সালাম স্টেডিয়ামে রূপান্তর করা হয়। দাগনভূঁইয়া উপজেলা মিলনায়তনকে ২০০৭ সালে ভাষা শহীদ সালাম মিলনায়তন করা হয়। তাঁর নিজ গ্রাম লক্ষ্মণপুরের নাম পরিবর্তন করে সালাম নগর রাখা হয়। এই মহান ভাষা শহীদের নামে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি আবাসিক ছাত্র হল ভাষা শহীদ আবদুস সালাম হল প্রতিষ্ঠা করা হয়।
আশ্চর্য হলেও সত্য আবদুস সালামের কোনো ছবি নেই। বর্তমানে ব্যবহৃত শহীদ সালামের ছবিটি ভাস্কর রাসার উদ্যোগে শিল্পী সাহজাহান আহমেদ বিকাশের মাধ্যমে তৈরি করা হয়। ১৯৯৯ সালে একটি প্রামাণ্য চিত্রের পরিকল্পনা করেন। ভাস্কর রাসা ‘অস্তিত্বের শেকড়ে আলো’ শিরোনামে প্রামাণ্য চিত্র নির্মাণ করেন। ভাস্কর রাসার অন্যতম সহযোগী ছিলেন সহকারী পরিচালক রানা সিদ্দিকী। শিমুল, সমীরসহ স্থানীয় জনগণ তাঁকে সহযোগিতা করেন।
‘রফিক…সালাম…আর…বরকত…জব্বার/ ফিরে-ফিরে আসে-হাসে ভাসে চেখে সব্বার/ কচি-কচি ফুলগুলো ঝরে গ্যালো অকালে/ সারি-সারি নর-নারী চলে কোথা সকালে/ লালে-লাল বেসামাল একুশের ক্ষণেতে/ মন্দিরে-মসজিদে মানুষের মনেতে/ আদরের ভাই ওরা হীরা-মণি মরকত/ রফিক…সালাম…আর…জব্বার…বরকত।’ (‘রফিক সালাম আর বরকত জব্বার’ : ভবানীপ্রসাদ মজুমদার)।
সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউরের আত্মত্যাগ বাঙালি জাতিকে আত্মপরিচয়ের সন্ধান এনে দেয়। ভাষার জন্য প্রাণ একমাত্র বাঙালি জাতিকে দিতে হয়েছিল। বিশ্বে এমন নজির দ্বিতীয়টি নেই। ভাষা আন্দোলনের পথ বেয়ে আসে বাংলাদেশের স্বাধীনতা।

x