ভাষা শহীদ বরকত

রেজাউল করিম

বুধবার , ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৬:১৩ পূর্বাহ্ণ
94

বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথ রক্তে রঞ্জিত হয়। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ছাত্র-জনতা, সেই মিছিলে পাকিস্তানি পুলিশ নির্বিচারে চালায় গুলি। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার শহীদ হন। তখন শরীরে জ্বর থাকা সত্ত্বেও ছটফট করতে লাগলেন মাহবুব উল চৌধুরী। চট্টগ্রামে বসে তিনি লিখলেন-‘ওরা চল্লিশজন কিংবা আরো বেশি/ যারা প্রাণ দিয়েছে ওখানে-রমনার রৌদ্রদগ্ধ কৃষ্ণচূড়ার গাছের তলায়/ ভাষার জন্য, মাতৃভাষার জন্য/ যারা প্রাণ দিয়েছে ওখানে/ আলাওলের ঐতিহ্য/ কায়কোবাদ, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের/ সাহিত্য ও কবিতার জন্য/ যারা প্রাণ দিয়েছে ওখানে/ পলাশপুরের মকবুল আহমদের/ পুঁথির জন্য/ রমেশ শীলের গাথার জন্য/ জসীমউদ্‌দীনের ‘সোজন বাদিয়ার ঘাটের’ জন্য/… সেই চল্লিশটি রত্ন যেখানে প্রাণ দিয়েছে/ আমরা সেখানে কাঁদতে আসিনি/ যারা গুলি ভরতি রাইফেল নিয়ে এসেছিল ওখানে/ যারা এসেছিল নির্দয়ভাবে হত্যা করার আদেশ নিয়ে/ আমরা তাদের কাছে/ ভাষার জন্য আবেদন জানাতেও আসিনি আজ/ আমরা এসেছি খুনি জালিমদের ফাঁসির দাবি নিয়ে।’ (‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’)।
পুলিশের গুলিতে শহীদ হন আবুল বরকত। তিনি ১৯২৭ সালের ১৩ জুন মুর্শিদাবাদ জেলার ভরতপুর থানার বাবলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ডাক নাম আবাই। তাঁর পিতার নাম সামসুজ্জোহা এবং মাতা হাসিনা বিবি। আবুল বরকতের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সূচনা হয় বাবলা বহড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তিনি ১৯৪৫ সালে তালিবপুর হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং ১৯৪৭ সালে বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। ভারত বিভাগের পর ১৯৪৮ সালে তিনি ঢাকায় আসেন। ১৯৫১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রি লাভ করেন এবং এমএ শেষ পর্বে ভর্তি হন।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে বিক্ষোভরত ছাত্র-জনতার উপর পুলিশ গুলিবর্ষণ করে। আবুল বরকত গুলিবিদ্ধ হলে তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেয়া হয়। কিন্তু অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে রাত আটটায় হাসপাতালে তিনি শাহাদত বরণ করেন। ঐদিন মোট কতজন শহীদ হন তার সঠিক সংখ্যা অজানা। কারণ অনেক শহীদের লাশ মর্গ হতে মিলিটারি ও পুলিশ লুকিয়ে ফেলে। বরকতের লাশটিও সেদিন মর্গ থেকে সরিয়ে ফেলেছিল পুলিশ। আবুল বরকতের মামা আব্দুল মালেক ছিলেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের অ্যাসিস্ট্যান্ট একাউন্টস অফিসার। আর তাঁর এক আত্মীয় সরকারের উচ্চপর্যায়ে কর্মরত ছিলেন। তার নাম আবুল কাসেম। তারা দু’জনে তদবির করে পুলিশের কাছ থেকে বরকতের লাশ উদ্ধার করেন, তবে শর্তসাপেক্ষে। কাউকে হস্তান্তর নয়, সোজা দাফন করে ফেলতে হবে। ২১ ফেব্রুয়ারি রাত ১০টার দিকে পুলিশের কড়া নজরদারির মধ্যে আজিমপুর পুরাতন কবরস্থানে লাশ দাফন করা হয়।
বরকতের জন্ম ভারতে হলেও তিনি সম্ভবত ঢাকাকে ভালোবাসতেন, রূপসী বাংলার প্রতি ছিল অপার টান। সেজন্য ঢাকার রাজপথ তাঁর রক্তে রঞ্জিত। ‘মোদের
মোদের গরব, মোদের আশা/ আ-মরি বাংলা ভাষা/ (মাগো) তোমার কোলে, তোমার বোলে/ কতই শান্তি ভালোবাসা/ কি যাদু বাংলা গানে, গান/ গেয়ে দাঁড় মাঝি টানে/ গেয়ে গান নাচে বাউল, গান/ গেয়ে ধান কাটে চাষা।’ বরকতের জন্য আমরা বাংলা ভাষায় কথা বলি। আদরের বড় ছেলে আবুল বরকত ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের মিছিলে শহীদ হওয়ার পর তার বাবা-মা সিদ্ধান্ত নেন ঢাকায় আসার, যাতে অন্তত প্রতি বছর আজিমপুরের কবরস্থানে ঘুমিয়ে থাকা ছেলেকে একটু আদর করে আসতে পারেন। ১৯৬৩ সালের জুলাইয়ে বরকতের বাবা শামসুজ্জোহা ভুলু মিয়া ভারতে মারা যাওয়ার পরের বছর মা হাসিনা বানু ১৯৬৪ সালে আংশিক সম্পত্তি বিনিময় করে ভারত থেকে এদেশে চলে আসেন। নিবাস গড়ে তুলেন গাজীপুর মহানগরের চান্দনা গ্রামের ‘বাবলা বিথী’তে। শহীদ বরকতের একমাত্র ভাই আবুল হাসনাত রোগাক্রান্ত হয়ে ১৯৬৮ সালে সেপ্টেম্বরে এখানেই মারা যান। তার ৩ ছেলে ও ৩ মেয়ে। বরকতের চার বোনই মারা গেছেন ইতোমধ্যে। বরকতের ছোট ভাই আবুল হাসনাতের সন্তানরাই এখন আঁকড়ে ধরে আছেন ভাষা শহীদ বরকতের ব্যক্তিগত স্মৃতি। গাজীপুরের চান্দনা গ্রামে এখন বসবাস করছেন বরকতের তিন ভাতিজা এবং তাদের সন্তানরা। বরকতের মা হাসিনা বানু ১৯৮২ সালের এপ্রিলে এ বাড়িতেই মারা যান। গাজীপুরের জয়দেবপুর, পূবাইল ও কালিয়াকৈরসহ বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বরকতের অন্যান্য আত্মীয় স্বজন।
ভাষা শহীদ বরকতকে আগামী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে এবং ভাষা আন্দোলনের প্রকৃত ইতিহাস সংরক্ষণে রাখতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের পাশে শহীদ আবুল বরকত স্মৃতি জাদুঘর ও সংগ্রহশালা নির্মাণ করা হয়। জাদুঘরটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জহুরুল হক হলের দ্বিতীয় গেইট পলাশী মোড়ে অবস্থিত। পাঁচ কাঠা জমির উপর নির্মিত জাদুঘরটি ২০১২ সালের ২৫ মার্চ উদ্বোধন করা হয়। জাদুঘরটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। স্মৃতি জাদুঘরের ভবনের সম্মুখে স্থাপন করা হয় আবুল বরকতের প্রতিকৃতি। দ্বিতল বিশিষ্ট ভবনটি নিচতলায় বরকতের ব্যবহৃত জিনিসপত্র ও ছবি আছে। শহীদ বরকতের ব্যবহৃত হাতে লেখা চিঠি, স্মৃতিচিহ্ন, হাতঘড়ি, একুশে পদক ও ডকুমেন্টারি ফিল্মও রয়েছে জাদুঘরটিতে। ভেতরে ভাষা আন্দোলনের সময় তোলা বেশকিছু ছবির পাশাপাশি বরকতের দুটো ছবি আছে। মুর্শিদাবাদ জেলার বরকতের বাড়ির ছবি। সেই সময়ের কিশোর বরকতের ছবি রয়েছে। ভাষা আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে ঘটে যাওয়া মিছিল, সভার আলোকচিত্র, ভাষা শহীদদের আলোকচিত্র, প্রিয়জনের কাছে লেখা চিঠি ইত্যাদি সংরক্ষিত রয়েছে। এছাড়া এ জাদুঘরের দ্বিতীয় তলায় রয়েছে একটি সমৃদ্ধ লাইব্রেরি। বাংলাদেশ সরকার তাঁকে একুশে পদকে ভূষিত করে।

x