ভাষা আন্দোলনের সংগ্রামী সৈনিক হালিমা খাতুন

ফেরদৌস আরা আলীম

শনিবার , ১৪ জুলাই, ২০১৮ at ৭:২৬ পূর্বাহ্ণ
19

১৯৫২’র ২১ শে ফেব্রুয়ারিতে আমতলার সমাবেশে মুসলিম গার্লস স্কুল ও বাংলাবাজার গার্লস স্কুল থেকে ছাত্রীদের আমতলায় নিয়ে আসার কাজটি করেছিলেন হালিমা খাতুন। ভাষা সৈনিকদের মিছিলে পুলিশের বর্বর হামলার ছবি তুলে রেখেছিলেন ছাত্ররা। বিভিন্ন পত্রিকা অফিসে সেছবি নিয়ে গিয়েছিলেন হালিমা খাতুনরা। ভাষা আন্দোলনে আহত ছাত্র জনতার জন্য অর্থ সংগ্রহের কাজে যে মেয়েরা অংশ নিয়েছিলেন হালিমা খাতুন তাঁদের পুরোভাগে ছিলেন। চাঁদা তোলার পাশাপাশি লিফলেট বিলি করা ও পোস্টার লেখার কাজও তাঁরা করেছিলেন।

৪০ সেরে ১ মণের হিসাব নিয়ে হিমশিম খাওয়া দিনে ৭ মণ দুধে এক ফোঁটা চনার নেতিশক্তির কথা খুব শুনতাম। আজ সভ্যভব্য সভ্যতার উত্তুঙ্গ দিনে তার কী ভয়ঙ্কর ফলিত রূপ দেখছি আমরা। যখন বিশ্বজুড়ে দাপিয়ে ক্রিকেট খেলছে এদেশের মেয়েরা, যখন নারী বান্ধব পরিবেশ থেকে কর্মক্ষেত্র, সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ার প্রত্যয় নিয়ে কথা ও কাজ হচ্ছে প্রচুর তখন নারী আন্দোলনের ঐতিহ্যবাহী স্বদেশে সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের ছাত্রদের ক্ষুব্ধ কোটা আন্দোলনে ছাত্রীদের অংশগ্রহণ এমন ন্যক্কারজনক হেনস্থার শিকার কেন হবে? এমন একটা মন খারাপ করা ভাবনা থেকে মনটাকে আষাঢ়ের মেঘের ঠিকানায় মুক্তি দিতে পারে ‘সর্বজয়া’র মতো লেখায় সঙ্কলনগ্রন্থকরুণা বন্দ্যোপাধ্যায় রচনাসমগ্র। এ মুক্তি আসলে আদৌ কোনও পলায়নপরতা নয়; নতুন প্রাণশক্তিতে, নতুন শপথে উজ্জীবিত হবার, নতুন মন্ত্র খুঁজে পাবার এ এক উজ্জ্বল ঠিকানা। করুণা বন্দ্যোপাধ্যায়।

নামটা খুব চেনা চেনা হলেও এ নামে তাঁকে চেনা আমাদের অনেকের পক্ষে সম্ভব নয়। বরং ‘সর্বজয়া’ নামে তিনি আমাদের খুব চেনা। ইনি সেই ‘সর্বজয়া’ করুণা যাঁকে তাঁর ‘রক্ত মাংসের শরীর দিয়ে, একটা জীবন্ত মন দিয়ে, নিজেকে মিশিয়ে দিয়ে গড়ে, সত্যজিত রায়ের হাতে একদিন তুলে দিয়েছিলেন। সর্বজয়া সত্যজিত রায়ের নির্মাণ নয় বরঞ্চ এ চরিত্রটি তাঁর হাতে করুণা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তুলে দেওয়া উপহার; অন্তত রচনা সমগ্রের ১ম খন্ডের প্রথম রচনা ‘সর্বজয়া’ পাঠের পর তাই মনে হয়। ১৯৪১ এ ইংরেজিতে এম.এ পাস করা, ১৯৪৩ এ রাজনীতির বাম ধারায় সক্রিয় সহপাঠী সুব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিয়ে করা এবং ভারতীয় গণনাট্য সংঘের একজন হয়ে কাজ করা করুণা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘দুনিয়ার সমস্ত মায়ের বেদনা একলা বহন করে’ হয়ে উঠেছিলেন সর্বজয়া। দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে ইন্দির ঠাকরুনের প্রতি নিষ্ঠুরতাতেও তিনি অসামান্য। কিন্তু এ গল্পের ঝাঁপি আজ বন্ধ করতেই হবে। বিভাগীয় সম্পাদক মনে করিয়ে দিলেন এবারের লেখাটা তাঁকে নিয়ে হতেই হবে। সবিস্তারে। করুণা বন্দ্যোপাধ্যায় মাথায় থাকুন; শ্রাবণের কোনও এক দিনে তাঁকে নিয়ে কথা হবে। আজ আমাদের কিংবদন্তী সেই নারীর কথা বলতে হবে যিনি ৮৬ বছর বয়সে গত ৩রা জুলাই আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন (ইন্না লিল্লাহিরাজেউন)। হালিমা খাতুন। প্রতিবছর একুশে উপলক্ষে তাঁকে আমরা স্মরণ করি ঠিকই, গেল একুশেতেও করেছি কিন্তু তাঁর কাছে সেভাবে কাউকে যেতে দেখিনি। কোনও অনুষ্ঠানে কখনও তাঁকে বৃত হতে দেখিনি। তিনি যে জীবন্ত কিংবদন্তী হয়ে এতদিন ছিলেন, তাও কি মনে ছিল? না থাকার মতো করেই তিনি ছিলেন অনেকদিন। জন্মেছিলেন বাগেরহাট জেলার বাদেকাড়াপাড়া গ্রামে, ১৯৩৩ সালের ২৫ শে আগস্ট তারিখে। এ গ্রামের মৌলবি আবদুর রহিম শেখ এবং দৌলতুন নেসা খাতুনের কন্যা হালিমা খাতুনকে মনে আছে এমন কেউ ওই গ্রামে আছেন কিনা জানি না। বাদেকাড়াপাড়া (তবলায় বোল বা তালের মতো নামের গ্রাম) প্রাথমিক বিদ্যালয়টি এখনও আছে নিশ্চয়ই। বহুকাল আগে সে স্কুলে জীবনের প্রথম পাঠ নিয়েছিলেন হালিমা খাতুন। আমাদের ভাষাআন্দোলনের সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে আছে, সে সংগ্রামের ইতিহাসে সোনার অক্ষরে লেখা আছে তাঁর নাম; সেস্কুলটি একুশে উদযাপনে তাঁকে স্মরণ করে কি?

ভাষাআন্দোলনের সময় তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগের এম এ ক্লাসের ছাত্রী। ১৯৪৭ সালে মনমোহিনী গার্লস স্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং বাগেরহাট প্রফুল্লচন্দ্র কলেজ থেকে ১৯৫১ সালে বিএ পাস করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। রাষ্ট্র ভাষা বাংলার দাবিতে ১৪৪ ধারা ভেঙে যে মিছিলটি প্রথম রাজপথে নামে সে মিছিলের প্রথম দলটি জুলেখা, নূরী, সেতারা ও হালিমা খাতুনের।

মেয়েদের আরও তিনটি দলের নেতৃত্ব অতঃপর একাকার হয়ে যায় ছাত্রদের খণ্ড খণ্ড দলের সঙ্গে। স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত হয় রাজপথ। এ সময় লাঠিপেটা ও কাঁদুনে গ্যাসের আক্রমণে মিছিল ছত্রভঙ্গ হয়। হালিমা খাতুন আশ্রয় নেন মেডিকেল কলেজে।

আমাদের ভাষা আন্দোলনে নারীর অংশগ্রহণ ও অবদান ঐতিহাসিক সত্য। ১৯৫২’র ২১ শে ফেব্রুয়ারিতে আমতলার সমাবেশে মুসলিম গার্লস স্কুল ও বাংলাবাজার গার্লস স্কুল থেকে ছাত্রীদের আমতলায় নিয়ে আসার কাজটি করেছিলেন হালিমা খাতুন। ভাষা সৈনিকদের মিছিলে পুলিশের বর্বর হামলার ছবি তুলে রেখেছিলেন ছাত্ররা। বিভিন্ন পত্রিকা অফিসে সে ছবি নিয়ে গিয়েছিলেন হালিমা খাতুনরা। ভাষা আন্দোলনে আহত ছাত্র জনতার জন্য অর্থ সংগ্রহের কাজে যে মেয়েরা অংশ নিয়েছিলেন হালিমা খাতুন তাঁদের পুরোভাগে ছিলেন। চাঁদা তোলার পাশাপাশি লিফলেট বিলি করা ও পোস্টার লেখার কাজও তাঁরা করেছিলেন। হালিমা খাতুন এভাবেই ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস কন্যা হয়েছিলেন। ১৯৫৩ সালে ইংরেজিতে এম এ পাস করার পর তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এম এ করেন। খুলনা করোনেশন স্কুলে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে শিক্ষকতা জীবনে তাঁর প্রবেশ। আর কে গার্লস কলেজ এবং রাজশাহী গার্লস কলেজে অধ্যাপনার পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে যোগদান করেন। ১৯৬৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নর্দার্ন কলোরোডা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিশু শিক্ষা বিষয়ে পিএইচ ডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৯৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে অবসর নেবার পর দু’বছর জাতিসংঘের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন তিনি। পাশাপাশি, দীর্ঘ জীবনের অধিকাংশ সময়ে কর্মজীবনের সমান্তরালে একটা সৃজনশীল জীবন তাঁর ছিল। সম্ভবত ভাষাআন্দোলনে গৌরবের অংশভাক ছিলেন বলেই বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে দ্বিতীয় বারের মতো সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জনের ইচ্ছেটি তাঁর হয়েছিল। সেই সঙ্গে শিশু বিষয়ক গবেষণা তাঁর সৃজনশীলতাকে বিশেষ করে ছড়ার ক্ষেত্রে সোনার আলোয় উদ্ভাসিত করেছিল। ছোটদের জন্য গল্প ও ছড়ার এক বিশাল ভুবন তৈরি করেছিলেন তিনি। শিশু সাহিত্যে তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতির যথাযোগ্য প্রচারপ্রসার হয় নি। মূল্যায়নও হয়নি। ঠিক যেমন ‘ভাষা আন্দোলনের প্রথম সারির এই লড়াকু সৈনিক হয়েও জীবদ্দশায় তিনি লাভ করতে পারেন নি একুশে পদক’। (কামাল লোহানী, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব)

লিখতে গেলাম ধানের কথা

হয়ে গেলো গানের খাতা

আঁকতে গেলাম সবুজ পাতা

হয়ে গেলো মনের কথা।

ধরতে গেলাম তরুলতা

হয়ে গেল কথকতা।

এমন সব সোনার পংক্তিতে যিনি প্রচুর ছড়া সাজিয়েছেন তাঁর কিছু বইএর নাম স্মরণ করি। ভুতুর সকাল, ধনুকের গুণ, যুক্তবর্ণের সেপাই সাস্ত্রী, ছোটদের সেরা গল্প, বাচ্চা হাতির কাণ্ড, গল্পগুলো মজার, মন মাতানো এক ডজন, পাখি রক্ষা অভিযান, মিনার শ্রেষ্ঠ গল্প, পরীর মেলা, বনের ধারে আমরা সবাই, বাঘভালুকের মন ভালো নেই, বাঘের গলায় হাড়, মুন্নীর স্কুল, রসকদম, টগরদের অভিযান সবচেয়ে সুন্দর ইত্যাদি ইত্যাদি। দৈনিক সমকালের ঘাসফড়িং পাতার আশিক মোস্তফার কাছে ঋণ স্বীকার করে ড. হালিমা খাতুনের আর একটি ছড়ার উদ্ধৃতি দিয়ে শেষ করছি।

একটা ছড়া লিখেছিলাম

নদীর বাঁকেতে

একটা ছড়া শুয়েছিলো

বই এর তাকেতে।

নদীর ধারের ছড়া এসে

বই এর তাকে বসলো

আকাশ থেকে হাজার তারা

ঝাঁকে ঝাঁকে খসলো।

x