ভালো থাকুক আপনার হৃদয়

ডা. মোহাম্মদ ফজলে মারুফ

শনিবার , ১৭ আগস্ট, ২০১৯ at ৮:০২ পূর্বাহ্ণ
212

আমাদের শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর মধ্যে একটি হলো হৃদপিণ্ড। তাই এটিকে সুস্থ, সবল রাখার জন্য আমাদের অবশ্যই সচেতন হতে হবে। তা না হলে এটির দুর্বলতা আমাদের সামগ্রিক শারীরিক ও মানসিকভাবেও দুর্বল করে ফেলবে। শরীরের গুরুত্বপূর্ণ এ অঙ্গটির গুরুত্ব সম্পর্কে আমরা জানলেও অনেকেই এটির যত্নের ব্যাপারে সঠিকভাবে মনোযোগ দিই না। তাই আসুন জেনে নেয়া যাক হৃদপিণ্ড ভালো রাখার কিছু খাবারের নাম ও স্বাস্থ্যাভ্যাস।
মাছ
সপ্তাহে অন্তত দুইদিন মাছ খাবেন। কিছু মাছে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ওমেগা-৩, যেমন স্যালমন ও টুনামাছ। নিয়মিত খাবেন মলা, কাচকি, টাকি, বেলে ইত্যাদি ছোট মাছ। এছাড়াও বেছে নিতে পারেন পাবদা, শিং, কৈ ও মাগুর মাছ। ইলিশ মাছ বেশি করে খাবেন কারণ এতে উপকারী চর্বি ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড বেশি পরিমাণে থাকে। হাইব্রিড মাছগুলো খাওয়া এড়িয়ে চলুন। যে মাছগুলো খাওয়া বাদ দেবেন সেগুলো হলো পাঙ্গাস, হাইব্রিড তেলাপিয়া, রুই। গবেষকরা মনে করেন, সামুদ্রিক মাছ হৃদপিণ্ডের সুস্থতা রক্ষায় সহায়ক। নদীর মিঠা পানির বড় মাছের চর্বি বাদ দিয়ে শুধু মাছটুকু খাওয়া যাবে।
কাঠবাদাম
কাঠবাদামের মনো স্যাচুরেটেড ফ্যাট, প্রোটিন ও পটাশিয়াম আপনার হৃদপিণ্ড ভালো রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কাঠবাদামের ভিটামিন ‘ই’ হৃদপিণ্ডের বিভিন্ন রকম রোগ হওয়ার আশঙ্কা দূরে রাখে। কাঠবাদামে থাকা ম্যাগনেসিয়াম হার্ট অ্যাটাক প্রতিরোধ করে এবং পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। তাই খেতে পারেন আমন্ড, ছোলা এবং আখরোট ফল।
সুর্যমুখী তেল এবং সুর্যমুখী বীজ
সূর্যমুখী তেল ভিটামিন ‘ই’ সমৃদ্ধ যা শরীরের এন্টি-অক্সিডেন্ট হিসাবে কাজ করে। এটি সরাসরি হৃদরোগ প্রতিরোধ এবং আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। হৃদপিণ্ডকে ভালো রাখতে হলে খাবারে তেলের পরিমাণ কমিয়ে দিন। এন্টি-অক্সিডেন্ট ও ভিটামিন ‘ই’ সমৃদ্ধ সূর্যমুখী তেল গ্রহণ করলে আপনার ত্বক সূর্যের ক্ষতিকারক রশ্মি থেকে সুরক্ষিত হবে। তাছাড়া এই তেল হাঁপানি, আর্থ্রাইটিসের তীব্রতা কমাতেও বিশেষ ভূমিকা রাখে।
শিম
করোনারি হার্ট ডিজিস কমাতে সহায়ক ম্যাগনেশিয়ামপূর্ণ শিম, শস্য এবং সবুজ পাতাবহুল শাক-সবজি। এসব খাবার স্ট্রোক এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতেও সাহায্য করে।
সয়াফুড
সয়াবিন থেকে তৈরি খাবারকে সয়া ফুড বলা হয়ে থাকে। সয়া দুধ, সয়া বিন, টফু ইত্যাদি প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় রাখার চেষ্টা করুন। এই খাবারগুলো শরীর থেকে কোলেস্টেরল এবং অস্বাস্থ্যকর ফ্যাট দূর করে। সয়া ফুড কেবল কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখে তা নয়, ভাস্কুলার ফাংশন নিয়ন্ত্রণেও সাহায্য করে। তাই খাবার মেন্যুতে পর্যাপ্ত পরিমাণে সয়াবিন রাখুন। সয়াবিন ভালো করে সেদ্ধ করে খান কারণ হজমে সাহায্যকারী এনজাইম ট্রিপসিনের কার্যকলাপ কিছুটা ব্যাহত করে সয়াবিন। আঁশসমৃদ্ধ সয়াবিন হৃদপিণ্ডের জন্য খুব ভালো। প্রতি ১০০ গ্রাম সয়াবিনে পাওয়া যায় ৪৩ গ্রাম প্রোটিন।
আমলকি
আপনার হৃদপিণ্ডকে ভালো রাখার জন্য আমলকি অবশ্যই সবচেয়ে ভালো ওষুধ হিসেবে কাজ করবে। প্রায় সব ধরনের কার্ডিওভাস্কুলার রোগ প্রতিরোধ করার এক অদ্ভূত ক্ষমতা রয়েছে আমলকির।
অলিভ অয়েল
ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমানো ও ক্যান্সার প্রতিরোধের পাশাপাশি দুর্বল হৃদপিণ্ডের রোগীদের জন্য অলিভ অয়েল খুবই উপকারী। এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দুর্বল হার্টের জন্য জ্বালানি হিসেবে প্রয়োজনীয় চর্বির যোগান দেয় অলিভ অয়েল।
সাধারণত একটি হৃদপিণ্ড তার স্বাভাবিক সংকোচন ও প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি নেয় শরীরে জমা চর্বি থেকে কিন্তু দুর্বল হৃদপিণ্ড এই চর্বি গ্রহণ করতে পারে না। ফলে হৃদপিণ্ড শুধু ভালোভাবে কাজ করতে পারে না তাই নয় বরং গ্রহণ করতে না পারা চর্বি জমে হৃদপিণ্ডের ধমনীতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। অলিভ অয়েলে থাকা ওলিয়েট নামের এক ধরনের উপকারী ফ্যাটের সহায়তায় দুর্বল হৃদপিণ্ড সহজেই প্রয়োজনীয় চর্বি গ্রহণ করতে পারে।
হলুদ, রসুন, আদা, লালমরিচ
হৃদপিণ্ডের অসুখে কার্যকরী ভূমিকা রাখে হলুদ। এতে এমন এক এন্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে যা প্রদাহজনিত আক্রমণের বিরুদ্ধে কাজ করে।
রসুন কার্ডিওভাস্কুলার রোগ হওয়ার ঝুঁকি কমায় এবং প্রাকৃতিকভাবেই এটা হৃদপিণ্ডের ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এটা শুধু রক্ত চলাচলকেই স্বাভাবিক রাখে না একইসাথে হৃদপিণ্ডকেও সুস্থ রাখে।
আদা এমন একটি ওষুধি উদ্ভিদ যা রক্তনালীকে বিশ্রাম দেয় এবং রক্ত প্রবাহকে চালু রাখতে সাহায্য করে। হৃদপিণ্ডের অসুখের বিরুদ্ধে এন্টি ফ্ল্যামেটরি হিসেবেও যুদ্ধ করে আদা।
লাল মরিচ হৃদপিণ্ডের সঠিক ওষুধের কাজ করে। এটা হৃদপিণ্ডের জন্য পুষ্টিকর খাবারও বটে কারণ হৃদপিণ্ডের জন্য এর প্রভাব কাঁচামরিচ থেকে ভালো।
সবুজ চা
হৃদপিণ্ডের জন্য সবচেয়ে বেশি ওষুধের কাজ করে সবুজ চা। এটা শুধু রক্তের শিরাকেই সচল রাখে না শিরাকে রক্ষাও করে। গবেষকদের ধারণা, রক্তনালীর উপর সবুজ চায়ের প্রভাব রয়েছে। নিয়মিত সুবজ চা পান করলে রক্তনালী শিথিল হয় এবং রক্তচাপের পরিবর্তন হলেও তা স্বাভাবিক থাকতে পারে। এর ফলে রক্ত জমাট বেঁধে হার্ট অ্যাটাক হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।
পুদিনা পাতা
এটি হৃদপিণ্ডের জন্য অত্যন্ত কার্যকরী। পুদিনা রক্তের শিরায় অক্সিজেন চলাচলে সাহায্য করে এবং হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়।
হৃদপিণ্ডের স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য আরো কিছু জিনিস মেনে চলা উচিত। যেমন:
শরীরচর্চা
প্রতিদিন আধ ঘণ্টা সময় রাখুন। ব্যস্ততার ফাঁকে এই আধ ঘণ্টা শরীরচর্চা করুন। শরীরচর্চা হতে পারে হাঁটা, হতে পারে সিঁড়ি দিয়ে উঠানামা করা বা অন্য কিছু। আলাদা করে সময় না পেলে সহজ উপায় হলো অফিসে উঠার সময় লিফট ব্যবহার না করে সিঁড়ি ব্যবহার করুন।
ধূমপান নয়
যারা প্রচুর ধূমপান করেন তাদের জন্য ধূমপান ত্যাগ করা বেশ কষ্টসাধ্য। তারপরও আপনার হৃদপিণ্ড ভালো রাখার জন্য আপনাকে ধূমপান ছাড়তেই হবে। ধূমপান না করলে হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ ঠিক থাকবে।
অ্যালকোহল থেকে দূরে
অ্যালকোহল থেকে দূরে থাকুন। অ্যালকোহল বেশি মাত্রায় নিলে রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বেড়ে যায়। হৃদপিণ্ডের যেকোনো সমস্যা তৈরি করে এই ট্রাইগ্লিসারাইড। সুস্থ হৃদপিণ্ডের জন্য আরো যেসব বিষয় মেনে চলবেন সেগুলো হলো, ওজন কমান, দূষিত বায়ু এড়িয়ে চলুন, কম চর্বি যুক্ত খাবার খান, এনার্জি ড্রিংকস থেকে দূরে থাকুন, হাতের মুঠোর ব্যায়াম করুন, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করুন, সময়মতো ঘুমান, গান শুনুন। এসব ভালো অভ্যাস আপনার হৃদপিণ্ডের পাশাপাশি পুরো শরীরকেই ভালো রাখতে সাহায্য করবে।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, কার্ডিওভাস্কুলার সার্জন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ

x