ভালোবাসি

রমজান আলী মামুন

শুক্রবার , ২৭ জুলাই, ২০১৮ at ৬:৪১ পূর্বাহ্ণ
36

বাইরে ঝড়ের তাণ্ডব। থেকে থেকে টিনের চালে শিলাবৃষ্টির কান ঝালা করা বিশ্রি শব্দ। একটু আগে বিদ্যূৎ চলে গেছে। নিকষ কালো আধারে জানালার শার্সি দিয়ে বৃষ্টির পানি অনায়াসে ঘরে ঢুকছে।

করিমন রান্না ঘর থেকে হাঁক পাড়ে ‘সাহেব, জানালাটা লাগিয়ে দিন। ঘর ভিজে যাচ্ছে তো। ’ কিন্তু কে শোনে কার কথা। করিমনের ডাক বাতাসে মিলিয়ে যেতেই সাহেব আরেকটি সিগারেট ধরায়। এ সময়ে তার খুব চায়ের তেষ্টা পেয়েছে। সে যখন অফিস থেকে এসে কাপড় চোপড় ছাড়িয়ে বারান্দার ইজি চেয়ারে বসে ক্লান্তিতে চোখ মুদে থাকতো। তখন চটজলদি টুং টাং শব্দ করে শর্মিলা তার জন্যে কড়া লিকারের এক কাপ গরম চা এনে হাতে ধরিয়ে দিতো। সাহেব চুকচুক করে চা খেতো। আর শর্মিলা মায়াবি চোখে মুখে কথার খই ভাজতো। ক্লান্তি দূর হতেই ফুরফুরে মেজাজে একেবারে কাছ ঘেষে দাঁড়িয়ে সাহেবশর্মিলাকে আলতো করে বুকে জড়িয়ে ধরতো।

– ‘এই, কী হচ্ছে এসব। ছাড়ো, ছাড়ো। চুলোয় ভাত চড়িয়ে এসেছি। পুড়ে যাবে তো।’

-‘প্লিজ আরেকটু থাকো না লক্ষ্নীটি। আমরা তো স্‌্েরফ দু’জন মানুষ। ভাত পুড়ে গেলে না হয় হোটেল থেকেই আনিয়ে নেবো।’

-‘কী কথার শ্রী দেখো রে বাপু! হোটেল থেকে ভাত এনে বউকে খাওয়াচ্ছো শুনলে মানুষ কী বলবে?’

-‘মানুষের কথায় কী এসে যায়। আমি তো শুধু তোমাকেই ভালোবাসি বউ।’

আরেকদিন। তখনো বাইরে তুমুল বৃষ্টি। কাক ভেজা হয়ে ঘরে ঢুকেছিলো শাহেদ। কলিংবেল টিপতেই দরোজা খুলে তোয়ালেটা এগিয়ে দেয় শর্মিলা। শাহেদ খেয়াল করে শর্মিলাও ভিজে টইটুম্বুর। বৃষ্টির পানি তার চুল বেয়ে টুপটুপ করে ঝরছে।

-‘ এ্যাই, তুমি ভিজলে কেমন করে?

-‘বারে তুমি ভিজতে পারলে, আমি পারবো না কেন?’

-‘ আরে পাগল, আমি তো ছাতা না নিয়ে বোকামির জন্যে ভিজেছি। তুমি ভিজলে কোন দুঃখে?’

-‘প্লিজ,রাগ করো না লক্ষ্ণীটি। মন চাইলো তো তাই বাইরে গিয়ে একটু ভিজেছি।’

-‘যদি জ্বর হয়, তখন কী করবে?’

-‘এক আধটু বৃষ্টিতে ভিজলে জ্বর হয় না গো?’

– ‘তোমার যা ইচ্ছে তাই করো, আমি আর কিচ্ছু বলবো না।’

-‘ তোমাকে আর কিচ্ছু বলতে হবে না। এই কান ধরছি বাপু,এবার তুমি মাথাটা তোয়ালেটা দিয়ে ভালো করে মুছে বারান্দায় বসো গিয়ে। আমি তোমার জন্য লেবু চা করে আনছি।’ পাঁচ মিনিটের মাথায় শর্মিলা হাঁচি দিতে দিতে চা নিয়ে হাজির। শাহেদের সামনে এসে মাথাটা কুর্নিশ করে বলে, ‘ বাদশাহ নামদার লেবু চা টা গ্রহণ করে আমাকে কৃতার্থ করুন।’ এরপর কী শর্মিলার ওপর শাহেদ রাগ করে থাকতে পারে? হুহু করে হেসে ওঠে চায়ের কাপ শুদ্ধ শর্মিলাকে বুকে টেনে নেয় শাহেদ।

এই বৃষ্টিস্নাত দিনেই শর্মিলা কাউকে কিছু না বলে তার জীবন থেকে অনেক দূরে হারিয়ে যায়। এরপর অনেক আষাঢ় এলো গেলো। হৃদয়ের গভীরে কালবোশেখীর তান্ডব ক্ষত ছড়ালো, কিন্তু শর্মিলা শাহেদের জীবনে আর ফিরে এলো না। শর্মিলার হঠাৎ অন্তর্ধান শাহেদকে একেবারে নিঃস্ব করে দিলো। শর্মিলার জায়গায় আর কোন রমণীকে স্থান দিতে পারে না শাহেদ। করিমন ফের ডাক পাড়ে, ‘সাহেব খেতে আসুন।’ কিন্তু সেদিকে শাহেদের ভ্রুক্ষেপ নেই। শর্মিলার অন্তরালে শাহেদের পুরো জীবনটাই পাল্টে গেলো। তার খাওয়াদাওয়ার কোন ঠিক ঠিকানা নেই। ফিরে রাত করে। করিমন খুব ভোরে এসে বিছানা বালিশ ঠিক করে দেয়। মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সিগারেটের শেষ অংশটুকু ঝাড়ু দিয়ে মুছে সাফ করে রান্নার কাজে লেগে যায়। এ রুটিন ওয়ার্কটুকু শর্মিলা ভাবী থাকা থেকেই করিমনের কাজ। কিন্তু এখন কার জন্য রান্না করবে করিমন? সকালে শাহেদ খালি পেটে চা টুকু খেলেও লাঞ্চ বক্সে দেয়া দুপুরের ভাতটুকু অফিস থেকে ঠিক ওভাবেই ফেরত আসে সন্ধ্যায়। কোন সময় অফিসের পিয়নকে ভাতটুকু দিয়ে দেয় শাহেদ। সন্ধ্যায় শাহেদ বাসামুখী হলে তারপর রাতের কাজটুকু সেরে করিমনের ছুটি। কোন সময় শাহেদের আসতে দেরী হলে ঘড়ির কাঁটা দেখে করিমন প্রস্থান করে। পরদিন সকালে এসে করিমন দেখে টেবিলে বাসনকোসন তেমনি পড়ে রয়েছে। গতকাল অফিসে নিয়ে যাওয়া টিফিন বক্স ভর্তি লাঞ্চটুকুও পড়ে আছে। ওসব কিছু এতোটুকু ও ছুঁয়ে দেখেনি শাহেদ। তা দেখে করিমনের মনটা ছ্যাৎ করে ওঠে।বউ শর্মিলার জন্য শাহেদের অন্তরে যে অসীম ভালোবাসা সে ভালোবাসার দামটুকু দেয়নি শর্মিলা ভাবী। কী এক অদৃশ্য আহ্‌বানে প্রাণপ্রিয় স্বামীকে ছেড়ে কোথায় যে হারিয়ে গেলো শর্মিলা ভাবী তা করিমনের কাছে আজো রহস্যাবৃত হয়ে থাকলো। গ্রামের স্কুলে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছে করিমন। করিমনের রূপে মুগ্ধ হয়ে গ্রামেরই তাগড়া নওজোয়ান শফিক তার পিছু নিয়েছিলো। প্রথমে পাত্তা না দিলেও একসময়ে শফিককে ভালো লেগে যায় করিমনের। বাবা ছিলেন হতদরিদ্র। একটি সুপাত্রের প্রস্তাব পেতেই বিয়ের তোড়জোড় শুরু করলেন। উপায় না দেখে ভালোবাসার পাত্র চালচুলোহীন শফিকের হাত ধরেই অজানা গন্তব্যে পা বাড়ালো করিমন। করিমনকে বিয়ে করে শহরের বস্তির একটি ছাপড়ায় তুললো শফিক। বেশ কয়েক মাস ভালোই চলছিলো তাদের দাম্পত্য জীবন। করিমনের কোল জুড়ে এলো একটি ফুটফুটে শিশু। কিন্তু হায় সুখ বেশিদিন সইলো না করিমনের। প্রথম দিকে শফিক কুলি মজুরের কাজ করতো। এরপর রিক্সা। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই শফিককে টাকার নেশায় পেয়ে বসেছে। কিছু মন্দ মানুষের সাথে মিশে নেশার ব্যবসায় সে নিজেকে জড়িয়ে ফেলে। করিমনের করুণ আকুতি শফিককে ভুল পথ থেকে এতোটুকু নিভৃত করতে পারেনি। একদিন পুলিশ এসে বস্তি থেকে আরো কয়েকজনের সাথে শফিককেও তুলে নিয়ে যায়। শফিকের সাজা হয়ে যায় পাঁচ বছরের। করিমন যেনো চোখে আঁধার দেখে। কী করবে সে ছো্‌ট্ট শিশুটিকে নিয়ে। তাকে খাওয়াবে কী? তার দুঃখ দেখে শেষে বস্তিরই সখিনা খালা তাকে এ কাজটি ধরিয়ে দেয়। এবং ছোট্ট দুধের বাচ্চাটিরও দেখভাল করে করিমন বাসায় না আসা পর্যন্ত।

করিমন রান্নাঘর থেকে গুটি গুটি পায়ে শাহেদের কক্ষে ঢুকলো। দেখে খোলা জানালা দিয়ে বৃষ্টির পানি ঢুকে বারান্দা জলমগ্ন হয়ে আছে। তাড়াতাড়ি জানালার হুক লাগিয়ে করিমন একটি বালতি এনে কাপড়ের সাহায্যে মেঝে থেকে পানি গুলো সরিয়ে নেয়। ঢিম লাইটের টিমটিমে আলোয় করিমন দেখে, আধো ঘুম আধো জাগরণে সাহেব বিছানায় শুয়ে থেকে যন্ত্রণায় ছটফট করছে। মনে হচ্ছে সাহেবের খুব কষ্ট হচ্ছে। এই মুহূর্তে কী করবে করিমন? কিছুক্ষণ ভেবে করিমনের মনে হলো তার কিছু একটা করা দরকার। পরক্ষণে সমস্ত ভয়,ডর,লজ্জ্বা, পাপবোধ মন থেকে ছুঁড়ে ফেলে মানবিকতার পাশে এসে দাঁড়ালো করিমন। সাহেবের একেবারে কাছে গিয়ে কপালে হাত রাখলো। দেখলো, প্রচন্ড জ্বরে সাহেবের গা পুড়ে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি গামলা ভর্তি পানি এনে কপালে জলপট্টি দিতে লাগলো করিমন। কিছুক্ষন পর শাহেদের চৈতন্য কিছুটা ফিরে এলে করিমন বলে, ‘ আপনার জন্য গরম গরম দুধ নিয়ে আসি সাহেব?’

হঠাৎ শাহেদের মনে হলোহৃদয়ের গহিন গভীর থেকে আবছা ঘন কালো ভেজা চুলে তার পাশে কেউ এসে বসলো। এবং করুণ কন্ঠে বললো,‘লক্ষ্ণীটি আমি তোমার কাছে ফিরে এসেছি। আমাকে তুমি ক্ষমা করো’। করিমনকে জড়িয়ে ধরে অস্পষ্ট স্বরে শাহেদ বলে,‘শর্মিলা ওভাবে বলছো কেন? তুমি তো কোন দোষ করোনি।’সাহেবের আচরণে করিমন হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে যায়। দুই সেকেন্ড পর তন্ময়তা ভাঙতেই এক ঝটকায় সাহেবের বাহুবন্ধন থেকে মু্‌ক্তো হয়ে করিমন একটু দূরে সরিয়ে নেয় নিজেকে। তারপর কাতর স্বরে বলে ওঠে, ‘ সাহেব এ কী করছেন আপনি? আমি শর্মিলা ভাবী নই, আমি আপনার বাসার কাজের বুয়া।’ হঠাৎ বিদ্যুৎ তাড়িত হওয়ার মতো শাহেদের সম্বিত ফিরে এলো। হ্যাঁ, তাই তো। এ তো শর্মিলা নয়। যাকে, পরম মমতায় একটু আগে আগলে ধরেছিলো শাহেদ, সে আর কেউ নয়, তার বাসার বিশ্বস্ত কাজের বুয়া করিমন। শাহেদ ভাবে, তবে কী শর্মিলা সবকিছুর সাথে সাথে তার দৃষ্টি শক্তি ও চিনিয়ে নিয়ে গেছে!

x