ভালোবাসি মা-কে ভালোবাসা মা

সফিক চৌধুরী

মঙ্গলবার , ১৪ মে, ২০১৯ at ৬:২০ পূর্বাহ্ণ
30

মা-মানে একেবারেই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা-মমতা আর স্নেহের বিশাল এক ছায়া। মা মানে কোন কারণ ছাড়াই অনেক অনেক মায়া। ইসলাম ধর্ম মতে, ‘মায়ের পায়ের নীচে সন্তানের বেহেস্‌’। হিন্দু ধর্মের বৈদিক সাহিত্যের শেষ স্তর উপনিষদে পাওয়া যায়, ‘মাতৃ দেব ভব’ যার মানে দাঁড়ায়- ‘মা’ দেবী স্বরুপিনী। তেমনি খ্রিষ্টান ধর্মেও আমরা ‘মাতা মেরি’র বিশেষ পরিচয় পাই। কিন্তু, শুধু ধর্মের কারণে নয়, পৃথিবী’র আলো দেখার আগে থেকে যে মায়ের অন্ধকার জঠরে মা’কে তীব্র যন্ত্রণা দিয়ে সন্তানের ধীরে ধীরে বেড়ে উঠার শুরু আর জন্মের পর যে মায়ের অকৃত্রিম ভালোবাসা, স্নেহ আর মমতায় আমাদের বড় হয়ে উঠা, সেই প্রিয় মা’কে বছরের একটি দিন একটু অন্যভাবে সন্তানের ভালোবাসা প্রকাশে বিশ্বজুড়ে বিগত অনেক বছর ধরে বাংলাদেশসহ অধিকাংশ দেশে মে মাসের দ্বিতীয় রোববার পালিত হয়ে আসছে ‘মা দিবস’। যদিও কিছু মানুষের কাছে এরকম বিভিন্ন দিবস মানেই পুঁজিবাদি সমাজ ব্যবস্থায় দিবস কে পুঁজি করে ব্যবসায়ীদের পণ্য বিক্রির কৌশল মাত্র! তবে অ্যান এম জারভিস নামে আমেরিকান যে ভদ্রমহিলা ‘মা দিবস’ এর সূচনা করেন তিনি শুধু আমার-আপনার মতোই মায়ের প্রতি অগাধ ভালোবাসা আর পরম মমতা নিয়েই ভেবেছিলেন বছরে একটা দিন হোক না শুধু মায়ের জন্য!
বর্তমান বিশ্বে ‘মা দিবস’ পালনে যিনি কৃতিত্বের দাবিদার সেই আমেরিকান নাগরিক অ্যান এম জারভিস শুধু মায়ের সেবা করার চিন্তা থেকে নিজে বিয়ে থাও করেননি! তিনি উপলব্ধি করেন, তাঁর মায়ের মতোই সারা পৃথিবীতে এমন লাখো লাখো ‘মা’ আছেন যারা নিজের সব সুখ আর আনন্দকে বিসর্জন দিয়েছেন সন্তানের সুখের আশায়, কিন্তু বড় হয়ে যাওয়ার পর সন্তানদের অনেকেই মায়ের প্রতি ভালোবাসাপূর্ণ দায়িত্ব পালনে হই অসচেতন! তাই বছরে একটা দিন যদি শুধু মা’কে নিয়ে উদযাপন করা যায়, তবে সেই দিন অন্তত আমরা সন্তান হিসেবে মায়ের প্রতি আমাদের দায়িত্ব কতটুকু পালন করলাম তা নিয়ে ভাবনার সুযোগ পাব আর কোন কমতি থাকলে তা পূরণে নিজেদের আরও মনোযোগী করতে পারবো। খ্রিষ্টীয় ১৬০০ সালের দিকে ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডের মতো দেশেও যেসব তরুণ-তরুণীরা কাজের জন্য শহরের বাহিরে থাকতো, তারাও বছরের একটি নির্দিষ্ট রবিবারে মা-কে স্মরণ করে সেদিন মায়ের সাথে কাটানোর জন্য মমতাময়ী মায়ের জন্য কিছু না কিছু উপহার নিয়ে বাড়িতে ফিরে আসতো। যাই হোক, ১০ মে, ১৯০৮ সালে অ্যান এম জারভিসের অনুরোধে তাঁর মা অ্যানা রিস জারভিসের সম্মানে পূর্ব ভার্জিনিয়ার গ্রাফটনের একটি গির্জায় এবং ফিলাডেলফিয়া ও পেনসিলভেনিয়াতে পালিত হয় প্রথম আনুষ্ঠানিক ‘মা দিবস’। যদিও আমেরিকাতে ১৯১৩ সালের মে মাসে ‘মা দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয় এবং ১৯১৪ সালের ৮ মে অন্য এক অনুমোদনে মে মাসের দ্বিতীয় রোববার ‘মা দিবস’ পালনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হয়, যা আজ বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে পালিত হচ্ছে।
এতো গেল ‘মা দিবস’ পালনের পিছনের কথা। যদিও মা-সন্তানের সম্পর্ক কোন দিবসের বেড়াজালে আটকে থাকার নয়, এ এমনই এক সম্পর্ক যেখানে থাকে মায়ের প্রতি সন্তানের শ্রদ্ধা মেশানো নীরব ভালোবাসা আর সন্তানের প্রতি মায়ের নিঃস্বার্থ অপার স্নেহ-মায়া-মমতা। আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে যদিও একটা সময় পর্যন্ত বাবার সাথে সন্তানের অনেক ক্ষেত্রেই একটু দূরত্ব রয়ে যায়, কিন্তু ‘মা’ সেতো সবসময়ই চিরন্তন কাছের মানুষ। ‘মা’ শুধু একটি শব্দের সামান্য উচ্চারণ নয়, ‘মা’ মানে আশা-ভরসা আর ভালোবাসার শেষ আশ্রয়স্থল। বলা হয়, একজন ‘মা’ হচ্ছেন সন্তানের প্রথম সবকিছুর শিক্ষা ও দিক্ষা ‘গুরু’। কারন, গুরু শব্দ ভাগ করলে দেখা যায় – ‘গু’ মানে হচ্ছে অন্ধকার আর ‘রু’ মানে আলো! মায়ের অন্ধকার জঠরে থেকেও আমরা বেঁচে থাকি আর মায়ের মাধ্যমেই আমরা প্রথম পৃথিবীতে আলোর মুখ দেখি। এখান থেকেই আমাদের জীবনের আলো দেখার শুরু, এরপর জীবনের বাঁকে বাঁকে মায়ের বাকি শিক্ষার কথা আর নাইবা বললাম। কিন্তু, ইদানিংকালের আমরা যৌথ পরিবার থেকে বেরিয়ে একক পরিবারে অভ্যস্ত, যেখানে অনেকের কাছেই বৃদ্ধ বাবা-মা মানেই এক উটকো ঝামেলা! মা’কে হারানো এক সন্তান সেদিন বলছিলেন, ‘আমার আম্মা যখন মারা যান তখন তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় আশি বছর। আমিও এখন মধ্যবয়স্ক, আর তিনি বেঁচে থাকাকালীন শেষ বয়সে তিনি কোনো কিছুই তেমন মনে রাখতে পারছিলেন না, তবুও উনাকে দেখলেই কেমন যেন মনে সাহস পেতাম, আমার প্রতি উনার ভালোবাসা-মমতা-স্নেহ ভীষণ অনুভব করতাম, কিন্তু উনাকে হারিয়ে এখন আমার শুধুই শূন্যতা। আম্মাকে কবরে নামাতে গিয়ে বুক ফেটে কান্না আসছিল, কী করে এখানে থাকবেন আমার প্রিয় আম্মা!’
আমরা তো নিশ্চিত জানি, যে কোন উৎসব তা ঈদ/পূজা-পার্বণ যাই হোক না কেন তা এলেই মা’কে হারানো সন্তানেরা নিজের কান্না লুকাতে পারেন না! মা-বাবাকে সালাম করে তাঁদের থেকে পাওয়া দোয়া ও আশীর্বাদ তাতো সন্তানের পরম পাওয়া। ভাবতে নিজেকে ভীষণ সৌভাগ্যবান ও গর্বিত মনে হয় আমরা ভাই- বোনেরা এখনও আমাদের প্রিয় মা-বাবা’র স্নেহধন্য। এখনও তাঁরা আমাদের মাঝে আলো ছড়িয়ে বেঁচে আছেন। সেদিন চট্টগ্রামের ডাঃ খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষিকা সেলিনা আক্তার তাঁর মা’কে নিয়ে বলতে গিয়ে বলেন, “আমাদের প্রিয় মায়ের কথা বলতে গিয়ে বাবা’র কথা আগে একটু বলতেই হয়। আমাদের প্রিয় বাবা আমাদের জন্য তাঁর নিজের সবটুকু সময় ব্যয় করেছেন দুটো চাকুরির পেছনে, সরকারি চাকুরির পড়ে বিকাল পাঁচটা থেকে রাত এগারোটা/সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত আরেকটি পার্ট টাইম চাকুরি করতেন। বাবা বলতেন, আমি এক চাকুরি দিয়েই তোমাদের পাঁচ ভাই-বোনকে হয়তো মানুষ করতে পারবো, কিন্তু তাতে সততার সাথে চলা হয়তো সম্ভব হবে না! আর তোমাদেরকে যাতে কেউ কখনোই তোমাদের বাবা’র সততা নিয়ে কিছু বলতে না পারে। বলা যায়, এ’রকম অবস্থায় আমাদের পড়াশোনাসহ ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার একক দায়িত্ব পড়ে অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের প্রিয় মায়ের উপর। যদিও তখনকার দিনের মায়েদের বেশিরভাগই ছিলেন অক্ষর-জ্ঞানহীন, তবে আমাদের মায়ের কিছুটা লেখাপড়া ছিল যদিও তা বলার মতো কিছু ছিলো না। কিন্তু, তিনি তাঁর ভালোবাসা, চেষ্টা আর শ্রম দিয়ে চেষ্টা করেছেন আমাদেরকে সত্যিকারের শিক্ষিত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে। আমাদের প্রিয় ‘মা’ অন্য সব মায়েদের মতোই নিজের আরাম-আয়েশ ভুলে আমাদের ‘মানুষ’ করে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। আমাদের ‘মা’ তাঁর সব সুখ আর আনন্দকে বিসর্জন দিয়েছেন আমাদের ভবিষ্যৎ সুখের আশায়। আজ আমাদের প্রিয় আম্মা গর্ব করে বলতে পারেন, তাঁর বড় ছেলে একজন শিশু বিশেষজ্ঞ (চিকিৎসক), দুই মেয়ে মাস্টার্স, বি-এড, এম-এড সব পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়ে দেশের নামকরা দুটো মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা, তাঁর মেজ ও ছোট ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে একজন ব্যাংক কর্মকর্তা আরেকজন বেসরকারি চাকুরিজীবি। আম্মা এখন প্রায় সত্তুর ঊর্ধ্ব। মাঝে মাঝেই কেমন যেন অসুস্থ হয়ে পড়েন, তখন আমরাও ভীষণ ভয় পেয়ে যাই।” এমন সব মায়েদের প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা ও আন্তরিক ভালোবাসা। মা’কে নিয়ে আমার এই লেখার শেষে সব সন্তানের প্রতি আজ একটিই নিবেদন, মায়ের প্রতি আমাদের সন্তানদের সত্যিকার ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও মমতা জাগ্রত হোক। প্রতিটা দিন হোক মমতাময়ী ‘মা’ময়। আমাদের প্রত্যাশা, আমাদের এখনও বেঁচে থাকা মায়েরা বেঁচে থাকুন ভালো থাকুন আরও শত সহস্র বছর। আর ঐ দূর আকাশের তারা হয়ে যাওয়া সব ‘মা’ ওপারে ভীষণ শান্তিতে থাকুন সবসময়।

x