ভালোবাসার রঙে আঁকা দুর্নিবার প্রেমের ছবি: লাভ স্টোরি

শৈবাল চৌধূরী

মঙ্গলবার , ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৪:৩৭ পূর্বাহ্ণ
111

কিছু বই একবার পড়লেই অনেক দিন মনে থাকে। কিছু গান একবার শুনলেই কানে লেগে থাকে অনেক দিন। তেমনি কিছু ছবি একবার দেখলেই চোখে ভেসে থাকে দিনের পর দিন। আমার কাছে তেমন একটা ছবি ‘লাভ স্টোরি’। ছবিটি আমি দেখি ১৯৮৮ সালে চট্টগ্রামের রিদম প্রেক্ষাগৃহে। আজ ৩১ বছর পরেও পুরো ছবিটি আমার মনে গেঁথে আছে। জীবনের মধুরতম এক স্মৃতি হয়ে।
লাভ স্টোরি চিত্রনাট্যের বাংলা অনুবাদ ছাপা হয়েছিল সাপ্তাহিক বিচিত্রায়। সম্ভবত ১৯৭৭ কি ৭৮ সালে। অনুবাদ করেছিলেন সাযযাদ কাদির। সঙ্গে ছাপা হয়েছিল সিনেমাটির অনেক স্থির চিত্র। মনে থাকার মতো অনুবাদ আর চোখে লেগে থাকার মতো গেটআপ। সেই থেকে ছবিটা দেখার বাসনা ছিল। কয়েক বছরের মধ্যেই ভিসিআরে সিনেমা দেখার চল শুরু হলেও এই ছবিটি অনেক খুঁজেও পাইনি। অপেক্ষা করতে হয় আরো অনেক দিন।
লাভ স্টোরি প্রখ্যাত মার্কিন কথা সাহিত্যিক এরিখ সেগালের লেখা চিরসবুজ প্রেমের উপন্যাস। ১৯৭০ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত দি লেডি’জ হোম জার্নাল পত্রিকার ভ্যালেন্টাইন্স ডে সংখ্যায় উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত হওয়ার পরপরই উপন্যাসটি তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়ে যায়। অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই এটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় এবং সর্বোচ্চ বিক্রিত উপন্যাসের স্থান দখল করে। প্রকাশের পরবর্তী ৪১ সপ্তাহ ধরে নিউইয়র্ক টাইমস ম্যাগাজিনের বেস্ট সেলার্স বুকের তালিকায় শীর্ষস্থানে থাকে লাভ স্টোরি। কয়েক মাসের মধ্যেই উপন্যাসটি বিশ্বজুড়ে ২০টি ভাষায় অনূদিত হয়।
১৯৭০ সালের ফেব্রুয়ারিতেই হলিউডের প্যারামাউন্ট পিকচার্স এরিখ সেগালকে লাভ স্টোরি চলচ্চিত্রায়নের বিষয়ে প্রস্তাব দেয়। এরিখ রাজি হওয়ার পর তারা তাকে ছবিটির চিত্রনাট্য রচনার অনুরোধ জানায়। এরপর আর্থার হিলারের পরিচালনায় ‘ লাভ স্টোরি; চলচ্চিত্রটি তৈরি হয় এবং ১৯৭০ সালের ১৬ ডিসেম্বর মুক্তি পায়। উপন্যাসের মতো চলচ্চিত্রটিও মুক্তির পরপরই সারা মার্কিন দেশ জুড়ে আশাতীত দর্শকপ্রিয়তা অর্জন করে। ২.২ মিলিয়ন ডলারের স্বল্প বাজেটে নির্মিত ছবিটি ১৩৬.৪ মিলিয়ন ডলার আয় করে। ছবির কলাকুশলীদের অধিকাংশই ছিলেন নবীন। বিশেষ করে প্রধান দুই অভিনেতা অভিনেত্রী।
প্রধান দুটি চরিত্র অলিভার বারেট ও জেনিফার ক্যাভিলেরি যাদের প্রেমকে কেন্দ্র করে লাভ স্টোরি ছবিটি আবর্তিত, এই দুটি তরুণ প্রণয়ীর চরিত্রে অভিনয় করেন নবাগত রায়ান ও’নীল ও এ্যালি ম্যাক্‌গ্র। অন্যান্য চরিত্রে ছিলেন জন মার্লে, রে মিলান্ড, টমি লী জোনস, এন্ড্রু ডানকান, ওয়াকার ড্যানিয়েলস। এদের সকলের মর্মস্পর্শী অভিনয় প্রতিটি চরিত্রকে জীবন্ত করে তোলার ফলে ছবিটিকে কেবল বিয়োগান্তক রোমান্টিক নয় মানবিক আবেদনে পরিপূর্ণ এক চলচ্চিত্রে পরিণত করেছে।
লাভ স্টোরির কারিগরি সংগঠনও যথেষ্ট সুসংহত। এরিখ সেগালের চিত্রনাট্য তার উপন্যাস অবলম্বনে হলেও চলচ্চিত্র ভাষায় ঋদ্ধ। রিচার্ড ক্রাটিনার দৃষ্টিনন্দন চিত্রগ্রহণ ছবিটিকে হৃদয়গ্রাহী করে তুলেছে। তেমনি গতিশীলতা এনে দিয়েছে রবার্ট সি. জোনসের সুগ্রথিত সম্পাদনা যা ছবিটির দৈর্ঘ্য সীমিত করেছে মাত্র ১০০ মিনিটে। আর লাভ স্টোরির অসাধারণ সম্পদ ফ্রান্সিস লেই-এর হৃদয় ছোঁয়া আবহ সঙ্গীত যার জন্যে তিনি অস্কার পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছিলেন।
লাভ স্টোরি উপন্যাস ও চলচ্চিত্র পরবর্তী প্রায় এক দশক এতটাই জননন্দিত ছিল, এরিখ সেগাল ১৯৭৭ সালে এর দ্বিতীয় পর্ব ‘অলিভার’স স্টোরি’ লিখতে অনেকটা বাধ্য হন। এটি লাভ স্টোরির মত না হলেও বেশ পাঠক প্রিয়তা পায়। ১৯৭৮ সালে প্যারামাউন্ট পিকচার্সের প্রযোজনায় অলিভার’স স্টোরি চলচ্চিত্রায়িত হয় জন কর্টির পরিচালনায়। এ ছবিতেও অলিভারের চরিত্রে অভিনয় করেন রায়ান ও’নীল। ছবিটি শুরু হয় জেনিফারের অন্ত্যোষ্টিক্রিয়ার দৃশ্য দিয়ে। এ ছবিতে জেনিফারকে হারিয়ে অলিভারের হতাশ ও অসহায় জীবনের বিয়োগান্তক কাহিনীর চিত্রায়ন দেখা যায়। তবে ছবিটি লাভ স্টোরির মতো দর্শকপ্রিয়তা অর্জনে সক্ষম হয় নি।
লাভ স্টোরি অস্কারে শ্রেষ্ঠ ছবি, চিত্রনাট্য, পরিচালনা, অভিনেতা, অভিনেত্রী, পার্শ্ব অভিনেতা (জন মার্লে) ও সঙ্গীতের জন্যে মনোনীত হলেও পুরস্কার পায় কেবল সঙ্গীতে।
তবে গোল্ডেন গ্লোব প্রতিযোগিতায় লাভ স্টোরি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র, পরিচালনা, অভিনেত্রী (অ্যালি ম্যাকগ্র), চিত্রনাট্য ও সঙ্গীতের জন্যে পাঁচটি পুরস্কার জয় করে। এছাড়া ১৯৭০ ও ৭১ এ বিশ্বের বিভিন্ন উৎসবে ছবিটি প্রদর্শিত হয়। আমেরিকান ফিল্ম ইনস্টিটিউট সেরা একশো ছবির তালিকায় এ ছবিকে স্থান দেয়। তাদের মতে, ‘খড়াব ঝঃড়ৎু ধ ঃৎধমবফু ভরষস পড়হংরফবৎবফ ড়হব ড়ভ ঃযব সড়ংঃ জড়সধহঃরপ ভরষস.্থ
লাভ স্টোরির কাহিনী রেখা খুব সাদামাটা। চরিত্রের সন্নিবেশও খুব কম। এ ধরনের উপন্যাসও অনেক দেখা যায়। কিন্তু উপন্যাসটি লেখার ধরন, ঘটনার বিন্যাস ও চরিত্রের চলাচল মিলে খুবই সিনেমাটিক। ফলে ছবিটিও হয়ে উঠেছে চিত্তাকর্ষক।
লাভ স্টোরি জেনিফার ও অলিভারের গল্প। অলিভার ব্যারেট বিত্তশালী পরিবারের তরুণ। আমেরিকার ইস্ট কোস্ট ফ্যামিলি, যেটি সে দেশের একটি ধনাঢ্য একটি পরিবার, অলিভার সেই পরিবারের একমাত্র উত্তরাধিকার। সে হার্ভার্ড কলেজে আইন বিষয়ে পড়তে আসে। অলিভার আইস হকি খেলায় অত্যন্ত চৌকষ। মার্জিত রুচির অধিকারী অলিভার দেখতেও অতি সুদর্শন। জেনিফার ক্যাভিলেরি কর্মজীবী নিম্নবিত্ত পরিবারের তরুণী। সে ধ্রুপদী সঙ্গীত নিয়ে পড়াশোনা করে রেডক্লিফ কলেজে। দু’জনের পরিচয় হয়। জেনিফার অলিভারের চাইতে বয়সে একটু বড়। সে প্রেমে পড়ে অলিভারের। অলিভারও ধীরে ধীরে জেনিকে ভালোবেসে ফেলে। তাদের সম্পর্ক নিবিড় হয়ে ওঠে। জেনি স্বপ্ন দেখে প্যারিসে গিয়ে ধ্রুপদী সঙ্গীতে আরো উচ্চতর পড়াশোনা করে বড় শিল্পী হওয়ার। কিন্তু অলিভার তাকে অত দূরে যেতে দিতে চায় না। জেনিরও অত সঙ্গতি নেই প্যারিসে যাবার। অলিভার তার ধনী বাবা মাকে জেনিফার সম্পর্কে জানায়। সে তার বাবাকে অনুরোধ করে জেনিকে একটু সহযোগিতা করার জন্যে। বাবা তো রাজী হনই না, বরং জেনিকে ছেড়ে যেতে আদেশ দেন এবং অলিভারের সমস্ত খরচপত্তর বন্ধ করে দেবার হুমকি দেন। জেনিফার আর অলিভার অপেক্ষা করতে থাকে।
গ্র্যাজুয়েশনের পর অলি আর জেনি বিয়ে করে। পরিবার থেকে বিতাড়িত অলি জেনিকে নিয়ে সংগ্রাম শুরু করে। জেনি সঙ্গীত শিক্ষকের চাকরি নেয়। অলি পরীক্ষায় তৃতীয় হয়। সে নিউইয়র্কের প্রখ্যাত একটি আইন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যোগ দেয়। ভালোই চলতে থাকে দিনগুলো। কিন্তু জেনি সন্তান সম্ভবা হতে পারে না যা দুজনেরই প্রত্যাশা। চিকিৎসা করাতে গিয়ে জেনির ক্যান্সার ধরা পড়ে যা চিকিৎসক জেনির কাছে গোপন রেখে অলিকে জানান। অলি জেনিকে প্যারিসে নিয়ে যেতে চায় এবার। কিন্তু জেনি রাজী হয় না। জেনির অসুখ ক্রমশঃ বাড়তে থাকে। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করায় অলিভার। অলি এবারেও বাবার কাছে যায়। বাবার কাছ থেকে অনেক কষ্ট করে কিছু টাকা নিয়ে সে জেনির কাছে ফিরে আসার জন্যে রওনা দেয়। এদিকে জেনির দরিদ্র পিতাও কন্যাকে দেখতে আসে হাসপাতালে। অসহায় পিতার কাছে বিদায় নেয় জেনি। অপেক্ষা করতে থাকে অলিভারের আসার আশায়। অলিভার ফিরে আসে। কিন্তু সে আর জেনিফারকে ফিরে পায় না। কারণ ততক্ষণে জেনিফার তাকে ছেড়ে চিরতরে চলে গেছে। ইতোমধ্যে অলিভারের বাবার মনও নরম হয়। তিনি জেনির চিকিৎসার জন্যে হাসপাতালে ছুটে আসেন। কিন্তু এসে দেখেন জেনিফার আর নেই। দেখেন পুত্র অলিভারের ভেঙে পড়ার দৃশ্য। অনুতপ্ত পিতা বেদনার্ত পুত্রের পাশে এসে দাঁড়ান। বলেন, ‘ও ধস ংড়ৎৎু্থ। কিন্তু অলিভার বলে, ‘খড়াব-খড়াব সবধহং হবাবৎ যধারহম ঃড় ংধু ুড়ঁ ধৎব ংড়ৎৎু্থ.
নিঃসঙ্গ অলিভার একাকী বেরিয়ে পড়ে তুষারাবৃত শ্বেতশুভ্র প্রান্তরে, যেখানে হাসপাতালে নেবার দিনে জেনিফার স্কেটিং করছিলো, তখনো সে তার অসুস্থতার বিষয়ে কিছুই জানতো না, তুষার শীতল বিস্তীর্ণ প্রান্তরে অলিভার জেনিফারের স্মৃতিকে খুঁজে ফেরে . . .

x