ভালোবাসার কবি

মমতাজ আলী খান

শুক্রবার , ১ মার্চ, ২০১৯ at ৭:০৪ পূর্বাহ্ণ
96

চট্টগ্রাম থিয়েটার ইনস্টিটিউটে ২০১৫ সালের ১১ জুলাই বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম সাংস্কৃতিক কেন্দ্র আয়োজিত কবি আল-মাহমুদের ৮০তম জন্ম বার্ষিকী উপলক্ষে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে বাংলা কাব্য জগতের সিংহ পুরুষ কবি আল-মাহমুদ যে ভাষণ দিয়েছিলেন তা উপস্থিত আমন্ত্রিত অতিথিদের অভিভুত করেছে। কবি আল-মাহমুদের এই ভাষণকে ঐতিহাসিক ভাষন বলে অনেকেই মনে করেন। কবির ৮০তম জন্মবার্ষিকীতে কবি আলমাহমুদকে সংবর্ধনা প্রদানে চট্টগ্রাম সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সভাপতি বিশিষ্ট ব্যাংকার ও লেখক আমিরুল ইসলাম ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সকল কবি সাহিত্যিকদের আন্তরিক প্রচেষ্টা কম ছিলো না।
কবি আল-মাহমুদ তার সৃষ্টি কর্মের অবদান স্বরূপ একুশে পদক ও বাংলা একাডেমি পুরস্কার সহ অনেক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন সেটি যেমন সত্য তেমনি চট্টগ্রামে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র আয়োজিত অনুষ্ঠানে কবিকে যে সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে সেটি ছিলো যথাযোগ্য এবং জন্ম বাষির্কী উপলক্ষ্যে কবি আল-মাহমুদের জীবনে এই এক বিরাট প্রাপ্তিও বটে।
কবি আল-মাহমুদ চট্টগ্রামের এই পাহাড়-ঘেরা, সাগর নদী পরিবেষ্টিত জন-জীবনের সাথে ছিলেন একাত্ন। কর্ম জীবনে চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষের জীবনের সাথে জীবন দিয়ে অনুভব করেছেন মানুষের ভালবাসা আর অনাবিল আন্তরিকতা। পত্র পল্লবে, ফুলেল সৌন্দর্যে আলোকিত হয়ে অতিথি হিসেবে তাঁর এ ভাষণে যে মৌলিক বিষয়গুলো পরিস্ফুটিত হয়েছে তা বিশ্লেষণের অপেক্ষা রাখে। তাঁর এ ভাষণে (ক) চট্টগ্রামে তাঁর ফেলে আসা জীবনের স্মৃতি, (খ) চট্টগ্রামের মানুষের আন্তরিক ভালবাসা, (গ) একজন কবির অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও সুখ-দুঃখের অনুভব, (ঘ) রাজনৈতিক সামাজিক এবং অর্থনৈতিক জীবনবোধ, (ঙ) সমাজে একজন কবির দায়বদ্ধতা ফুটে উঠছে।
৮০তম জন্ম বার্ষিকীতে কবি আল-মাহমুদ তাঁর ভাষণে বলেছিলেন, ‘‘ আমি দেশে-বিদেশে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কবিতা নিয়ে দাঁড়াতে পেরেছি। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শহরগুলোতে- যেমন নিউইয়র্ক, লন্ডন, দিল্লীসহ এর আশে পাশের অনেক শহরে আমি শ্রেষ্ঠ মঞ্চে দাঁড়িয়ে কবিতা পাঠ করেছি এবং সেসব কবিতা অনুদিত হয়েছে। যেখানে সাহিত্য, সংঘবদ্ধতা, যেখানে কবিদের জমায়েত হয়েছে জগতের সেসব শ্রেষ্ঠ জায়গায় আমি ঘুরেছি। হয়ত কবিতা পড়ছি মঞ্চে দাঁড়িয়ে, যে পরিচালনা করছে সে মেয়েটি আমাকে বলছে যে, মিস্টার মাহমুদ তুমি কি জান, এখানে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথ কবিতা পড়েছেন? এতে অবশ্যই আমার শরীরে শিহরণ খেলেছে, ভয়ও পেয়েছি। কিন্তু আমি পড়েছি।
কবিতা কী? আমার যেটা ধারণা, কবিতা হল স্বপ্ন। বাস্তবতার মধ্যে মানুষ বাস করতে পারে না। শুধু রূঢ বাস্তবতার মধ্যে বসবাস করতে পারে না। ধরুন, বাংলাদেশে এই যে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, মানুষ কিছুটা স্বপ্নে, কিছুটা বাস্তবে বাস করে। আর আমার কাজ হলো এই কিছুটা যে স্বপ্নে বাস করে, সেই স্বপ্নটা নির্মাণ করা। এটাতো কবির কাজ’’। এই পর্যায়ে কবি আল-মাহমুদ যেন অন্তর থেকে তাড়িত হয়ে বাকরুদ্ধভাবেই কিছুঅষ্পষ্ট, কিছু কান্নার শব্দযোগে অশ্রুসিক্ত চোখে ব্যাকুলভাবেই বলে ফেল্লেন, ‘‘সবচেয়ে আমার কাছে যেটা মধুরতর মনে হয়েছে সেটা হলো মানুষকে ভালবাসা। মানুষকে যে ভালবাসে তাকে যত কষ্টই স্বীকার করতে হোক না কেন, একটা সময় আসে তখন সে প্রতিদান পেয়ে যায়। আমার সম্ভবত মনে হচ্ছে যে আমি একবারও ব্যর্থ জীবন কাটাইনি।
কবি আল-মাহমুদ তাঁর ভাষণে আরো বলেছিলেন, ‘‘আমার সাহিত্যে কী আছে? আমি কিছু প্রতিদানওতো পেয়েছি। এই যে আপনারা যে বিরাট অনুষ্ঠান করলেন এটাতো আমি কখনও চিন্তা করিনি। এরকম তো মানুষ দেখতে দেখতে লিখতে লিখতে চলে যায়। এরি মধ্যে কেউ হাত তুলে বলে ওঠে, ভালবাসি। এই যে ভালবাসার খেলা, এটা নিয়ে আমি বারবার পথে প্রান্তরে ঘুরে বেড়িয়েছি। আমার সাহিত্যের কী আছে আমি খুব বিবেচনা করে খতিয়ে ও বাজিয়ে দেখেছি। কী আছে সেখানে? হ্যাঁ, আছে মানুষকে ভালবাসার কথা, প্রেম, দয়া ও সিমপ্যাথি। এ বিষয়গুলোকে আমি আমার সাহিত্যের সাথে জড়িয়েছি ওতপ্রোতভাবে এবং এগুলো আমি পূর্ণকরে তুলেছি। এটা অবশ্যই সহজ কাজ নয়। জীবনের দিকে যখন তাকাই তখন মনে হয় যে, একেবারই আমি ব্যর্থ বা বৃথা সময় কাটাইনি। আমি দেখলাম সেদিন আমার সাত খন্ড রচনাবলী প্রকাশিত হয়েছে, একখন্ড তৈরি হয়ে আছে। আমি দেখেতো বিস্ময়ে অভিভূত। এত লিখেছি আমি। এই লেখালেখি, দেখাদেখি, বিনিময়, আমি আবারও বলছি, আপনাদের এই শহরে এসেছিলাম কবিতার ভিখারীর মত, আর রাজা হয়ে শহর থেকে ফিরে গিয়েছিলাম।
অনেকে বলেন, কবিরা যা বলে তা করে না, কিন্তু আমি প্রতিশ্রুতি অনেক মিটিয়েছি। তবে সব প্রতিশ্রুতি আমি পূরণ করতে পারিনি। অনেক ঋণ আছে আমার। এমনকি জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আমার মনে হয় যে, সব ঋণ শোধ করা আমার পক্ষে সম্ভবও না। যাদের কাছ থেকে ঋণ, ভালবাসা গ্রহণ করেছি তারা আমাকে ক্ষমা করে দিবেন। আর যাদের ঋণ শোধ করেছি সেটা না হয় থাক। এইতো একজন কবির জীবন। আপনারা হয়তো যেটা প্রত্যক্ষ দৃষ্টিতে দেখতে পান না আমি সেটাও দেখেছি। এদেশের কাতরানি, এদেশের দুঃখ কষ্ট, জনগণের হাহাকারের মধ্যে আমি বাস করেছি, শিখেছি এবং লিখেছি। আমার লেখা যদি আপনারা মনোযোগ দিয়ে পাঠ করে থাকেন তাহলে দেখবেন মানুষের ক্রন্দন ধ্বনিকেও আমি কবিতা করে তুলতে সক্ষম হয়েছিলাম। এটা আমার দাবি। কেউ হয়তো হেসে উড়িয়েও দিতে পারে। আবার কেউ মানতেও পারে। এই হলো আমার জীবনের কথা। জীবন বড়ই কঠিন। তবে একপক্ষ হয়ে চলেছি আমি। সাহিত্যের জন্য আমি সব ছেড়েছি। লোভ-লালসা, এসব ত্যাগ করে আমাকে চলে আসতে হয়েছে। কারণ সাহিত্য সাহিত্যিকের দৃঢ় চরিত্র। আমি সেটা মনে রেখেছিলাম এবং সেটা মনে রেখেই আমি চেষ্টা চালিয়ে গেছি। আমার যে একেবারে লোভ-লালসা নেই তা না। আমি লোভে কম্পমান হয়েছি। কিন্তু যেতে যেতে লোভের দিকে যাইনি। চলে এসেছি নইলে জীবনটা হয়তো এভাবে কাটাতাম না। অন্যভাবে কাটাতে পারতাম। তা আমি করিনি। আমি আমার জীবন নিয়ে জুয়া খেলিনি। ধ্রুব সত্যটা আমি লালন করেছি। একটা কবিতা কী দিতে পারে এটা ভাবতে ভাবতে বলি, কবিতা কী না দিয়েছে? যারা আমার সাথে লেখালেখি শুরু করেছিলেন তাদের কথা আমার মনে পড়ে। কবি শামসুর রাহমান, কবি শহীদ কাদরী অনেকে। আপনারা হয়তো জানেন না, শামসুর রাহমান ব্যক্তিগতভাবে আমার খুব কাছের বন্ধু ছিলেন। তিনি আমার বাসায় আসতেন, বসে থাকতেন। কোথাও যাওয়ার জন্য যখন আমার বাসার নিচে গাড়ি আসত। তখন তিনি বলতেন, বাদ দেন, এবং আমার বউকে ডেকে বলতেন, এই চা দাও। তিনি উঠতে চাইতেন না। এটার মানে কী? এটার মানে হলো, শামসুর রাহমানকে যারা পাহারা দিয়ে রাখতো, তাদের কাছ থেকে শামসুর রাহমান একদিন বা কয়েক ঘন্টার ছুটি পেয়েছেন। সেই ছুটিতে তার হৃদয়ের যে অনুভূতি তিনি সেটা প্রকাশ করেছেন। আজ তিনিও চলে গেলেন। শহীদ কাদরী সাহেব বিদেশে আছেন। অসুস্থ, আরও মারাত্নক রোগ। দেশে আসলে মরে যাবেন কারণ তার অনেক চিকিৎসা করতে হয়। সেই তুলনায় আল্লার রহমতে আমি বেশ ভালই আছি। এখনও চলাফেরা করতে পারি। এখনও চট্টগ্রামে এসে বক্তৃতা করতে পারি।
মানুষের যে লড়াই বিশ্বব্যাপী চলছে, তা একটা দিক থেকে দেখলে হবে না। সব দিকে ফোকাস করে চোখ কান খোলা রাখতে হবে। এগিয়ে যেতে হবে মানুষের মত। মানুষের চেয়ে মহৎ যোদ্ধা আর কেউ নাই। মানুষকে নিয়ে লিখতে হলে, ভাবতে হলে নতুন একটা পৃথিবীর দাবি করতে হয়। আর সেই পৃথিবীর দাবি করছে অসংখ্য তরুণ-তরুণী। অবশ্যই সেটা একদিন বাস্তবে রূপায়িত হবে। এ বিশ্বাস আমি লালন করি। আমি লিখেছি এবং লিখে চলছি সততার সাথে কিছু কবিতা, গল্প-উপন্যাস ইত্যাদি। এ কাজগুলো আমিতো করছি এবং সেটা দলিল হয়ে আছে’’।।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অঙ্গনে কবি আল-মাহমুদের যে অবস্থান তা স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত। কেবলমাত্র বাংলাদেশ ও তার ভৌগোলিক সীমারেখায় আর নির্দিষ্ট করে ধরে রাখা যায়নি, বরং বাংলা ভাষাভাষী ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ভাষা গবেষকদের কাছে বঙ্গ আগেই আল-মাহমুদের দৃষ্ট সাহিত্যকর্ম সমাদরে স্থান করে নিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কবি কাজী নজরুল ইসলামের ক্ষুরধার লেখনি ত্রিশ দশকের বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের কাছে যে উদ্যম ও প্রেরণার জোয়ার এনে দিয়েছে তা সত্য জেনেও কাজী নজরুল ইসলামের খ্যাতি ও সুনাম অর্জনের পথে অনেক বাধা-বিপত্তি, ধর্মান্ধতা ও সর্বোপরি সাম্প্রদায়িক চেতনার বেড়াজালে তাঁকে বার বার প্রশ্নবিদ্ধ হতে হয়েছে। কাজী নজরুল ইসলাম অসাম্প্রদায়িক চেতনার একজন কবি হিসেবে হিন্দু-মুসলিম ধর্মবর্ণের ভেদাভেদ ভুলে কেবলমাত্র মানুষ পরিচয়ের বৃহত্তর ক্ষেত্রকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের বন্ধনে একটি সুন্দর সমাজ গঠনে তার লেখনি চালিয়ে গেছেন।
কবি আল-মাহমুদের বেলায় কম কী? যিনি মহৎ সাহিত্য সৃষ্টির কবি ও লেখক, তাঁর ক্ষেত্রেও অনেক প্রশ্ন অনেক বিতর্ক থেমে থাকেনি। তিনি একাধারে নীরবে নিভৃতে সাহিত্য চর্চার কাজটি চালিয়ে গেছেন। থামেনি তার লেখনি। পাঠক সমাজ চমৎকৃত হয়েছেন। পাঠকের চাহিদা পূরণে কবি আল মাহমুদ সৃষ্টি করেছেন অনবদ্যসাহিত্য। কি গল্পে, কি কবিতায় কিংবা উপন্যাসে। সব ক্ষেত্রেই ভিন্নধর্মী স্বাদ।
তিতাসের কুলে শ্যামল সবুজ গাঁয়ের কথা, জেলে পাড়ায় মানুষের সুখ-দুঃখের অনুভূতি অথবা তার মায়ের নোলক হারিয়ে যাওয়া মানিক হারানোর শাশ্বত বাংলার বুকে কাব্য রচনা করেছেন। মায়ের নোলক খুঁজতে তিনি কখনোই সিস্ফনী সঙ্গীতের আবহে যাননি। যাননি কোন বিদেশি রেস্টুরেন্ট কিংবা নষ্টালজিয়া কবলিত কোন অন্ধকার গুহায়। কবি আল-মাহমুদ তাঁর জন্মভূমির নদীমাতৃক বনবাদাড়ে, তিতাস নদীর বাঁকে, সারা বাংলাদেশের পাখ-পাখালী, সবুজ বন, ফুল-পাখীদের কাছে প্রশ্ন রেখেছেন। কিশোর কবিতা হলেও ‘‘নোলক’’ কবিতার বিষয় ও বক্তব্য বাংলা কবিতা রচনার ক্ষেত্রে এ এক অনবদা সৃষ্টি।
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবনের প্রতি পরতে পরতে যে মানবিক আশা-আকাঙ্ক্ষা, সুখ-দুঃখের খুঁটিনাটি বিষয়-আশয় তা তাঁর কাব্যে, ছোটগল্পে এবং উপন্যাসে প্রধান উপজীব্য হিসাবে স্থান করে নিয়েছে। আর এ জন্য আল মাহমুদ বাংলা কাব্যে সাধারণ মানুষের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য। অন্যদিকে আরেকটি বিষয় এখানে উল্লেখযোগ্য তা হচ্ছে আল মাহমুদ চিন্তাচেতনার যতখানি কাব্যমন্ডিত ঠিক ততখানি পরিপূর্ণ বিশ্বাসী মানুষ।
আজকাল সাধারণ্যে একধরনের ভাব-বিলাসি মানসিকতার কবি আছেন। মিডিয়ার সহজলভ্য প্রচার ও প্রচারনায় তারা প্রায়শই কবি কিংবা গবেষক হিসেবে পরিচিত। দু-চারটি বই যে প্রকাশিত হয়নি তা নয়। পাঠক বোধের কাছে কতখানি যে সব লেখার ভাব ও বিষয় গ্রহণীয় তার হিসেব-নিকেশ সহজেই অনুমেয়। প্রশ্ন হলো- যে সাহিত্য মানবিক মূল্যবোধের ধারে কাছে নেই, নৈরাজ্যবাদী সে সাহিত্য কেবল লেখনি হিসেবে লাইব্রেবিতে স্তূপাকারেই পতিত থাকবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। যিনি কবি তিনি স্বভাবতই সুন্দর মনমানসিকতার মানুষ হবেন। কবি তো আকাশ থেকে পতিত কোন নক্ষত্র নন যে-পৃথিবীর সব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য বর্জিত হবেন। যিনি তার শৈশবের নদী-নালা, পথ-ঘাট, নানা মানুষের সুখ-দুখের পাঁচালী জানাবেন না, নিজস্ব ্‌ৈবভব, প্রোথিত শেকড়ের সন্ধান করলেন না, তিনি কেমন কবি?
কবি আল-মাহমুদের এখানেই স্বীকৃতি। তাঁর প্রতিটি রচনা ও স্বকীয় সৌন্দর্য্য পরিপূর্ণ। তাঁর কাব্য গ্রন্থের নামকরণের দিক চিন্তা করলেই অবাক হতে হয়। লোক-লোকান্তর, কালের কলস, মায়াবী পর্দা দুলে উঠে, সোনালি কাবিন, উড়াল কাব্য, বখতিয়ারের ঘোড়া তাঁর কাব্য জগৎকে বিশাল রত্ন ভান্ডারে পরিপূর্ণ করেছে।
উপন্যাসের বেলায়ও কম যাননি-ডাহুকী, কাবিলের বোন, উপমহাদেশ, কবি ও কোলাহল, পুরুষ সুন্দর, নিশিন্দা, নারী, মরু-মুষিকের উপত্যকা, যে পারো ভুলিয়ে দাও, আগুনের মেয়ে, চেহারার চতুরঙ্গ এসব উপন্যাসে রাজনৈতিক, সামাজিক জীবন ও মানুষের আশ-আকাঙ্ক্ষার ঘর সংসার, অথনৈতিক টানা-পোড়েন কোনটাই বাদ পড়েনি।
আল মাহমুদ শৈল্পিক সত্ত্বার একজন সার্থক ছোট গল্পকার হিসেবে সিদ্ধহস্ত। গল্পের ধরন-ধারণ, চরিত্র-চিত্রনে কিংবা গ্রাম-বাংলার সাধারণ মানুষের সংলাপ প্রয়োগে এক অনবদ্য গল্পকারের পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর রচনায়। পানকৌড়ির রক্ত, সৌরভের কাছে পরাজিত, গন্ধবণিক, জলবেশ্যা, নদীর সতীন, আরো অনেক গল্পে খেটে যাওয়া মানুষের ঘর-দোর, তার চেনা পথ-ঘাট গ্রাম-গঞ্জের জেলেদের বাচন ভঙ্গিতে আল মাহমুদ এক অপরূপ চিত্রধারা ফুটিয়ে তুলাতে সক্ষম হয়েছেন।
বর্তমান প্রজন্মের আবৃত্তিকারদের মুখে যেমন রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের কবিতা সর্বজনের কাছে সুখপাঠ। তেমনি জসীম উদ্দীন, ফররুখ আহমদের কবিতার রস ঘরে ঘরে সমাদৃত। এ ক্ষেত্রে কবি আল-মাহমুদ কোন অংশে কম নয়। ্‌আল-মাহমুদের কবিতা এখন মুখে মুখে উচ্চারিত। আল-মাহমুদকে নিয়ে আর বিতর্কের সময় নেই। আল-মাহমুদ বাংলা কবিতায় স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন অনেক আগেই। আগামীর যাত্রাপথে নিঃসন্দেহে কোন গবেষকদের গবেষণা কর্মে, কবির জীবনদর্শন, কাব্যচিন্তা এবং সর্বোপরি একজন কবির জীবন আদর্শের মূলধারা নির্মাণে আল-মাহমুদ গ্রহণযোগ্য হবেন।
কবি আল মাহমুদ আজ আর নেই। থাকলেও কেবলই তার কবিতা ও সাহিত্য কর্মের শাণিত শব্দমালা সোনালী কাবিনের রৌদ্র ঝলকের সুদীপ্ত পথের দিশা। বখতিয়ারের ঘোড়ার মতো তেজস্বীয়তার সোনালী সম্ভার। কবি ্‌আল মাহমুদ চরচিত হবে কাব্যমোদি পাঠক ও গবেষকদের মাঝে। শ্রেষ্ঠ ও শ্রেষ্ঠতার বিচারে যে যাই বলুন তাতে কিছু যায় আসে না। সেই বিচার বিশ্লেষণে কবি আহসান হাবিব, কবি ফররুখ আহমদের মতো কবি কাব্য সৃষ্টির সোনালী দিনের চমক বাংলার কাব্য জগতে শেষ হয়নি হবেও না। ঠিক তেমনি আল-মাহমুদও বেঁচে থাকবেন সমান্তরাল ভালবাসার কবি হিসেবে আমাদের মাঝে চিরন্তন।

x