ভার্চুয়াল জগতে নারীর উপস্থাপন

অনামিকা চৌধুরী

শনিবার , ৯ জুন, ২০১৮ at ৯:০৯ পূর্বাহ্ণ
41

ভাবতে অবাক লাগে, এসব সাইট অনলাইনে চালু থাকে কীভাবে? সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল কি এসবের কিছুই দেখেন না? আর ফেসবুক লাইভে কোনো মেয়ে এলেই ছেলেদের কেনো এভাবে ‘জাত’ চেনাতে হবে? পুরুষদের এই আত্মসম্মানবিনাশী প্রবণতা বন্ধ হবে কবে?

আচ্ছা, ভার্চুয়াল জগতের কিছুকিছু সহজগম্য প্লাটফর্মে নারীর উপস্থাপন কেমন? বিশেষ করে, ফেসবুকের ‘লাইভ’ ফিচারটি নিয়ে এবং বিভিন্ন অনলাইন সাইটে ‘ভিডিও চ্যাট’ ও ‘ভয়েস চ্যাট’ নিয়ে লেখার চিন্তা করছি অনেক দিন থেকেই। সন্দেহ নেই, অনলাইন প্রযুক্তির উৎকর্ষ আমাদের আটপৌরে জীবনকে অনেক বৈচিত্র্যময় করে তুলেছে। বলতে গেলেণ্ড ফেসবুক বা এজাতীয় অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো এখন মানুষের ‘ভার্চুয়াল মিলনমেলার আসর’। যেখানে বাবামাভাইবোনশ্বশুরশাশুড়িস্ত্রীস্বামীশত্রুমিত্রচেনাঅচেনাজানাঅজানাআপনপর সবাই একেঅপরের বন্ধু (!)। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে এসবের যেমন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি রয়েছে তেমনি এর ব্যবহারকারীদের মনের গহীনে লুকিয়ে থাকা ‘অসামাজিক মানোভাব’ উস্‌কে দিতেও এসবের জুড়ি মেলা ভার। কোথাও জানি পড়েছিলাম একজন কবি লিখেছিলেনণ্ড ‘যখন মানুষের বুকের বন্ধু কমে, তখন বাড়ে ফেসবুকের বন্ধু’। সত্যিই বলেছিলেন তিনিণ্ড কথাটি মনে ধরেছিল বেশ।

যাই হোকণ্ড এভাবে কথার খই ভাজতেভাজতে লেখার দৈর্ঘ্য বাড়ানোর উদ্দেশ্য আমার নেই। বলছিলামণ্ড ফেসবুকের ‘লাইভ অপশন’ এবং অনলাইনের বিভিন্ন ‘ভিডিও চ্যাট’ করা যায় এমন কিছু বাংলাসাইট নিয়ে লিখব। ইদানীং বেশ লক্ষ করছিণ্ড ফেসবুকে আমার পরিচিতঅপরিচিত অনেকেই ফেসবুকের ‘লাইভ’ অপশনটি ব্যবহার করছেন। যাদের চেহারা আমি আমার ‘নিউজ ফিডে’ ‘লাইভ’ দেখছি তাদের অনেককেই আমি চিনি না। কারণ, আমার ফ্রেন্ডলিস্টে থাকা কেউ যদি আমার অপরিচিত কারও ‘লাইভ চ্যাট’ শেয়ার করেন তবে তা স্বাভাবিকভাবেই আমার ফেসবুকের ‘নিউজ ফিডে’ চলে আসবেণ্ড এটাই নিয়ম।

এভাবে ‘লাইভ চ্যাট’ করা, ফেসবুক বন্ধুদের সাথে কথা বলামতবিনিময় করা, পরিচিতঅপরিচিতদের সাথে নানা ধরনের মিথস্ক্রিয়ায় জড়ানোণ্ড এসবের কোনোটিতেই আমার আপত্তি নেই। কিন্তু কোনো মেয়ে ইউজার যখন এই ‘লাইভ চ্যাটে’ আসেনণ্ড তখন সেখানে ‘এমন সব অশোভন, অশ্লীল, রগরগে, আপত্তিকর’ শব্দ ও বাক্যে চ্যাটস্ক্রিন ভরে যায় যে মনটা বিষিয়ে ওঠে। আমরা কতোটা ধার্মিক, ভালো, সৎ, চরিত্রবান তারুণ্যের প্রতিনিধিত্ব করছি খোদ দেশে এবং বিদেশেণ্ড সেটা তখন বেশ স্পষ্ট হয়ে যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই লাইভচ্যাটের মেয়েটি সেসব কমেন্ট এড়িয়ে যান কিন্তু তাতেও বিপত্তি কমে না, বরং আরও আপত্তিকরঅশ্লীল শব্দের বাণ ছুঁড়ে মারা হয় তখন। সবমিলিয়ে ‘লাইভ চ্যাটে’ আসাটা তখন একধরনের বিড়ম্বনা ও বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করে তার জন্য। কিছুদিন আগে দেখলামণ্ড একটি মেয়ে তার ছোটো ভাইকে সাথে নিয়ে ‘লাইভ চ্যাটে’ এসেছেন হয়তো এই আশায় যেণ্ড পাশে একজন ‘পুরুষ’ থাকলে, তিনি হয়তো এ ধরনের বিড়ম্বনার কম শিকার হবেন (পুরুষকে নারীর ‘যথার্থ নিরাপত্তাদাতা’ মনে করা আর কী!)। কিন্তু না, বিধিবাম! ঘটলো উল্টো। বরং, তখন মেয়েটির সাথে তার ছোটো ভাইকে জড়িয়েই শুরু হলো নানা ধরনের অসভ্যঅশোভন খিস্তিখেউড়ণ্ড যা এখানে লেখাও সম্ভব নয়।

কথা হচ্ছেণ্ড এরা কারা? কারা এধরনের পরিস্থিতি তৈরি করছে? খেয়াল করলে দেখা যাবে এদের শতভাগই হচ্ছে তরুণ তথা পুরুষতন্ত্রের অদম্যঅনমনীয় প্রতিনিধি। অথচ কই, এর বিপরীতে যখন কোনো পুরুষ ‘লাইভ চ্যাটে’ আসেন তখন তো কোনো নারী বা মেয়ে এ ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করেন না তার জন্য। পুরুষতন্ত্রের এই ভোগকাতরহিংস্র মানসিকতার বিস্তার যেনো দিনদিন বেড়েই চলছে। প্রকৃতপক্ষে, প্রযুক্তির যে কোনো ধরনের অগ্রগতির সুফল নারীপুরুষ সবাই পাবেনণ্ড এটাই স্বাভাবিক। কিংবা বলা যায়ণ্ড এটা তো এমন নয় যে, ফেসবুকের ওই ‘লাইভ অপশন’ ফিচারটি শুধু পুরুষদের জন্য, নারীদের জন্য নয়! তবে, কবে পুরুষদের বোধোদয় হবে? লাইভ চ্যাটে ‘পুরুষালি ওই বিকৃত থাবা’ থেকে কোনো মেয়ে কবে নিস্তার পাবে?

.

এবার আসা যাক অনলাইনের বিভিন্ন সাইটে ‘ভিডিও চ্যাট’ এবং ‘ভয়েস চ্যাট’ নিয়ে। ভার্চুয়াল বন্ধুত্ব তৈরির জন্য এ ধরনের ‘লাইভ চ্যাট’ বেশ উপভোগ্য এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এ ‘লাইভ চ্যাটকে’ ঘিরে বাংলাভাষায় দাঁড়িয়ে গেছে অসংখ্য ‘মেয়েকে ভোগ্যপণ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠাকারী’ অনেক ওয়েবসাইট। এসব সাইটের যেনো কোনো ‘মাবাপ’ নেই অর্থাৎ এসবের এডমিন কারা, কোথা থেকে পরিচালিত হচ্ছে, কেনো পরিচালনা করছে, এদের মিশনভিশন ইত্যাদি কিছুই লেখা নেই এতে। কিন্তু অলিখিত ভিশন বা মিশন যেণ্ড অসুস্থ প্রজন্ম তৈরিতে উৎসাহিত করা তা বোঝা যায় সহজেই। এসব সাইটে এমনভাবে বন্ধুত্ব তৈরির আবেদন থাকে যে তা আমলে না নেওয়াটা বেশ কঠিনণ্ড অন্তত আমাদের দেশের মতো মূল্যবোধহীন অধিকাংশ তরুণের জন্য। অনুসন্ধান করলে হয়তো দেখা যাবেণ্ড এসবের মালিক বা এডমিন প্যানেলে রয়েছে মুনাফামুখী এবং বিকৃত মস্তিষ্কের কোনো পুরুষ বা পুরুষের দল, যারা আইটিতে বেশ দক্ষ কিন্তু ধ্বংসোণুুখ চেতনায় ভরপুর তাদের মন ও মগজ।

কথা না বাড়িয়ে একটা উদাহরণ দিই। আলোচ্যধারার একটি বাংলা ওয়েবসাইটের শুরুতেই লেখা আছেণ্ড ‘এ স্বাগতম! চ্যাট করুন মেয়েদের সাথে বিনামূল্যে, শুধুমাত্র সত্যিকারের মেয়েদের সাথে যোগাযোগ করুন ১০০% নিশ্চয়তায়!’ সাইটটিতে ঢুকলেই আপনার চোখ হয়ে যাবে চড়কগাছ। এর বিজ্ঞাপনের ভাষা এমন যে এখানে মেয়ে মানেই হচ্ছে ভোগ্যপণ্য আর অনিবার্যভাবে সবপুরুষই এখানে খদ্দের। সাইটটির বিভিন্ন স্থানে বক্স আকারে লিখা আছেণ্ড ‘আপনি চান মেয়ে/ আমাদের এখানে আছে মেয়ে/ আর কোনো ভীতিকর পুরুষ নয়’; ‘মেয়েদের দেখুন এবং শুধুই মেয়েদের’; ‘আর দেখতে হবে না পুরুষদের/ শুধুই নারী সবসময়/ মজা করুন’; ‘হাজার হাজার লাস্যময়ী নারী/ অপেক্ষায় আছে আপনার সাথে চ্যাট করতে’; ‘১০০% ফ্রি/ লুকানো কিছু নেই/ বরং দ্রুত আর সহজ যোগাযোগ’; ‘বিদ্যুৎ গতির সংযোগ/ চ্যাট করো যার সঙ্গে ইচ্ছেণ্ড নারী, সমকামী, উভকামী, কৌতূহলী’; ইত্যাদি ইত্যাদি।

উপরন্তু, সাইটটিতে বলা হয়েছে, ‘…তখন আপনি শুধু নারীদের সঙ্গেই যোগাযোগ করার সুযোগ পাবেন, আর কখনো ওয়েবক্যামে কোন পুরুষকে আপনার দেখা লাগবে না। বেশিরভাগ মেয়ের সঙ্গে চ্যাট করে আপনি যৌন শিহরণ লাভ করবেন। সাইটটির অন্য এক জায়গায় শ্লোগান হিসেবে দেওয়া আছেণ্ড ‘যৌন আবেদনময়ী নারীরা শুধু একটি ক্লিকের দূরত্বে!’

ভাবতে অবাক লাগে, এসব সাইট অনলাইনে চালু থাকে কীভাবে? সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল কি এসবের কিছুই দেখেন না? আর ফেসবুক লাইভে কোনো মেয়ে এলেই ছেলেদের কেনো এভাবে ‘জাত’ চেনাতে হবে? পুরুষদের এই আত্মসম্মানবিনাশী প্রবণতা বন্ধ হবে কবে?

x