ভাবা জরুরি

মাধব দীপ

শনিবার , ২ জুন, ২০১৮ at ১০:৩৩ পূর্বাহ্ণ
25

অবশ্য, ভারতে তৃতীয় লিঙ্গভুক্তদের আয়কর নিয়মে সংশোধনী এনেছে কেন্দ্র সরকার। ভারতে এখন রূপান্তরকামী ট্রান্সজেন্ডারদের স্বতন্ত্র ক্যাটেগরি হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে। যাঁরা প্যান কার্ডের (প্যান কার্ড হচ্ছেণ্ড পার্মানেন্ট একাউন্ট নাম্বার যা সাধারণত আয়কর পরিশোধকারীদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক বা কর্পোরেট পরিচয় তুলে ধরে) জন্য আবেদন করছেন, তাঁদের এই স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে।

বিবিসি’র ২৮ মে, ২০১৫এর একটি খবরে হঠাৎ চোখ আটকে গেলো। খবরটির শিরোনাম ‘ভারতে প্রথমবার একজন হিজড়া সরকারি কলেজের প্রিন্সিপাল’। খবরটিতে বলা হয়ণ্ড ভারতে এই প্রথম একজন হিজড়া বা তৃতীয় লিঙ্গের কোনও ব্যক্তি একটি সরকারি কলেজের প্রিন্সিপালের দায়িত্ব নিতে চলেছেন। এই সম্মান অর্জন করেছেন পশ্চিমবঙ্গের মানবী বন্দ্যোপাধ্যায়। তৃতীয় লিঙ্গভুক্ত কেউই আগে ভারতে এরকম কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে আসীন হননি। কিন্তু সেই ঐতিহ্য ভেঙে মানবী বন্দ্যোপাধ্যায় আগামী ৯ জুন পশ্চিমবঙ্গের কৃষ্ণনগর গভর্নমেন্ট কলেজের প্রিন্সিপালের দায়িত্ব নেবেন।

ফলোআপ খবরে জানা যায়ণ্ড শেষতক মানবী বন্দ্যোপাধ্যায় সেই কলেজের প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন ১৮ মাস। মানবীর দাবিণ্ড অনবরত তাঁকে তাঁর পরিচয় নিয়ে ‘হয়রানির’ কারণে সেই দায়িত্ব ছেড়ে দিতে তিনি বাধ্য হয়েছিলেন।

মানবী বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই অর্জনকে ভারতের তৃতীয় লিঙ্গভুক্তরা স্বাগত জানালেও তথাকথিত প্রথাগত সমাজব্যবস্থা সেটা টিকিয়ে রাখেনি। অবশ্য, ভারতে তৃতীয় লিঙ্গভুক্তদের আয়কর নিয়মে সংশোধনী এনেছে কেন্দ্র সরকার। ভারতে এখন রূপান্তরকামী ট্রান্সজেন্ডারদের স্বতন্ত্র ক্যাটেগরি হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে। যাঁরা প্যান কার্ডের (প্যান কার্ড হচ্ছেণ্ড পার্মানেন্ট একাউন্ট নাম্বার যা সাধারণত আয়কর পরিশোধকারীদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক বা কর্পোরেট পরিচয় তুলে ধরে) জন্য আবেদন করছেন, তাঁদের এই স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে।

যাই হোক, মনে পড়ে গেলোণ্ড আমাদের দেশের তৃতীয় লিঙ্গভুক্ত মানুষের কথা। আমরা কী দেখিণ্ড আমাদের চারপাশে? আমাদের দেশের আদমশুমারিতে তৃতীয় লিঙ্গভুক্ত সম্প্রদায় বরাবরই উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। পত্রিকায় নানাসময় পড়েছিণ্ড ঢাকঢোল পিটিয়ে জাতীয় আদমশুমারি ২০১১ হয়ে গেলেও সেখানে বরাবরের মতো দেশের হিজড়া সম্প্রদায়কে গণনায় উপেক্ষা করা হয়েছে। আদমশুমারির কর্মকর্তারা অনুল্লেখযোগ্য সংখ্যক হিজড়াকে গণনা করেছেন। বাংলাদেশের তৃতীয়লিঙ্গভুক্ত এই হিজড়া সম্প্রদায় বহুদিন যাবত আদমশুমারিতে এবং অন্যান্য দাপ্তরিক নথিপত্রে তাদের ‘অন্যান্য’ ক্যাটাগরিতে রাখার দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু কাজের কাজ হয়নি কিছুই।

বছর কয়েক আগেই ভারতে হিজরাদের স্বতন্ত্র ক্যাটেগরির দাবি পূরণ করেছে সে দেশের সরকার। নেপালেও একই পরিবর্তন আনা হয়েছে।

কিন্তু, আমাদের দেশে? হিজড়া হওয়ার কারণে তাঁদেরকে কেউ চাকরিতে নেয় না, কেউ ঘরভাড়া দিতে আগ্রহী হয় না। ভোটার তালিকায় তাঁরা কেউ ছেলে বা মেয়ে হিসেবে ভোটার হয়েছেন। চলমান জন্মনিবন্ধন কার্যক্রমেও তাদের হিজড়া হিসেবে নিবন্ধিত হওয়ার সুযোগ নেই। চরম অভাবঅনটনে, সামাজিকভাবে হাস্যরসের ‘পাত্র’ হয়ে তাঁরা দিনাতিপাত করছেন। প্রকৃতপক্ষে, আমাদের দেশের ন্যায় বৈষম্যমূলক হিজড়া সমাজব্যবস্থা পৃথিবীর আর কোন দেশে আছে কিনা আমার জানা নেই। অন্যান্য দেশের হিজড়ারা তাদের পরিবারের সঙ্গেই বসবাস করেন। কিন্তু, আমাদের দেশে দেখি এর উল্টোচিত্র। বাধ্য হয়েই জীবিকার তাগিদে এঁরা ‘চাঁদাবাজি’ করছেন বলেও অভিযোগ পুরনো।

প্রকৃতপক্ষে ণ্ড পৃথিবীতে কখন থেকে হিজড়াদের আবির্ভাব হয়েছে তা সঠিক জানা যায়নি। তবে নৃতত্ত্ববিদদের মতে, যখন থেকে পৃথিবীতে মানব জাতির আবির্ভাব তখন থেকেই হিজড়ার আবির্ভাব। আশার কথা হচ্ছেণ্ড হিজড়াদের নিয়ে বেসরকারি পর্যায়ে কাজ করছে কয়েকটি সংগঠন। এর মধ্যে রয়েছে বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন, সুস্থ জীবন, বাঁধন হিজড়া সংঘ, লাইট হাউস, দিনের আলো ইত্যাদি সংগঠন। কিন্তু, রাষ্ট্রযন্ত্র কি সিরিয়াসলি এঁদের অধিকারের ব্যাপারে শক্তিশালী ভূমিকা রাখবে না? রাখা কি উচিত নয় এখনই?

x