ভাবনায় একুশ

কাজী রুনু বিলকিস

মঙ্গলবার , ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ at ৫:০৮ পূর্বাহ্ণ
83

অনেকদিন পর আজ বারান্দায় দাঁড়িয়ে সূর্য ওঠা দেখলাম। শীতটা বেশ কিছুদিন জ্বালিয়ে হঠাৎ করেই পালিয়ে গেল। ভালোই হলো। খুব মিষ্টি একটা আবহাওয়া। প্রকৃতি কেমন সেজে উঠছে আবার। পলাশ শিমুল চোখ মেলছে ধীরে ধীরে। চারিদিকে কেমন একটা উৎসব উৎসব ভাব। শুধু কি প্রকৃতি? মানুষেরও উৎসবের শেষ নেই। বিয়ে, পিকনিক, বেড়ানোর ছবিতে সয়লাব হয়ে যাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দেওয়ালগুলো। আহা কি আনন্দ! কত দিবসের ছড়াছড়ি! বন্ধু দিবস, ভ্যালেন্টাইন দিবস, বসন্ত দিন, কত প্রস্তুতি বিপণীদের অন লাইনে হাট নিয়ে বসে আছে। চাওয়া মাত্র দিবসের জন্য নির্ধারিত পোশাক ঘরে চলে আসছে। কত এগিয়েছি আমরা, কত আধুনিক হয়েছি আমরা। ডিজিটাল যুগের মানুষ আমরা। আমি মানুষটা বড্ড সেকেলে। কেবলই ফেলে আসা অতীতে আটকে থাকি।

একুশের গৌরবদীপ্ত ফেব্রুয়ারি মাসটা আসতেই মনটা কেমন অন্য রকম ভাললাগায় ভরে যায়। স্কুল, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনের সেই প্রভাত ফেরি এখনো হাতছানি দেয়। লাল পেড়ে সাদা শাড়ি যোগাড় করে রাখতাম শহীদ বেদিতে ফুল দেব বলে। তখন আমরা কিন্তু ফটোসেশনের জন্য নয়, সেলফির জন্য নয়, আমরা যেতাম প্রচণ্ড আবেগ নিয়ে। আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি? গানটি গাইতে গাইতে চোখের কোণ জলে ভরে উঠতো। হৃদয়ের গভীর হতে শ্রদ্ধায়, ভালবাসায়, কৃতজ্ঞতায় শহীদদের স্মরণ করতাম।

সেদিন একটা চ্যানেলে এসএসসিতে জিপিএ৫ পাওয়া কিছু ছাত্রছাত্রীদের ইন্টারভিউ নিচ্ছিল২১ ফেব্রুয়ারিতে কি হয়েছিল? ২৬ শে মার্চ কি দিবস? ১৬ ডিসেম্বর কি হয়েছিল। অবাক হয়ে দেখছিলাম একজন শিক্ষার্থীও সঠিক জবাব দিতে পারেনি। আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। এটাই বাস্তবতা। এরাই আমাদের ভবিষ্যত। আমাদের দেশের শিশুরা ‘এখন শিক্ষার্থী নয় পরীক্ষার্থী। প্রশ্ন ফাঁস এখন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে আমাদের কেনো গ্লানি নেই। আমাদের প্রয়োজন শুধু জিপিএ৫। আমাদের প্রয়োজন শুধু সার্টিফিকেট। এসব লিখতে লিখতে অনেকটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। এভাবে চলতে থাকলে আমরা একটা অদক্ষ ও অপদার্থ জাতিতে পরিণত হব নিঃসন্দেহে। ব্যর্থতার দায় কেউ নেয় না। উন্নত দেশ কিংবা আমাদের আশেপাশের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতেও কিছু লজ্জা এখনো অবশিষ্ট আছে। কিন্তু আমাদের দেশে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখতে চায়। শিক্ষা ব্যবস্থার এই হাল আমাদের গভীর সংকটে নিয়ে যাচ্ছে। জানি না এই অবস্থা কত দিন চলতে থাকবে।

আবারও ফিরে আসি একুশের কথায়। একুশ আমাদের আত্মবিশ্বাস ও আত্ম পরিচয়ের দিন। যে দিবসগুলো আমরা জাতীয় দিবস হিসেবে পালন করি সেদিনগুলোর যথার্থতা, সঠিক ইতিহাস আমরা আমাদের প্রজন্মের কাছে পৌঁছাতে পেরেছি কি? আমাদের গৌরবের ইতিহাস, আদর্শিক সংগ্রাম, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সবকিছুই দ্বিখণ্ডিত করে রেখেছে বর্তমান রাজনীতি। এই রাজনীতি কোনো আদর্শের ধার ধারে না। কেবলই নিজ স্বার্থ আর ভোগবাদে উৎসাহিত করে। আমরা যখন বেড়ে উঠছিলাম তখন আমাদের সামনে স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি আদর্শিক চেতনা ছিল। ছিলেন আদর্শবান দিকনির্দেশক দেশপ্রেমিক নেতারা। এখন বর্তমান প্রজন্মের সামনে কি আছে, কারা আছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। মাথার মধ্যে গোলমেলে অবস্থা! কি লিখতে বসে কি লিখে চলেছি।

পাকিস্তান, সৃষ্টির এক বৎসর না যেতেই ভাষার প্রশ্নে মানি না মানব না শব্দের উচ্চারণ দিয়ে বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সূচনা। কিভাবে যে এমন অদ্ভুত রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছিল। ১৩৭২ মাইল দূরত্বে শুধুমাত্র ধর্মকে পুঁজি করে পাকিস্তান নামে রাষ্ট্রটি গঠিত হয়েছিল। ভাষার মিল নেই, খাওয়ার মিল নেই সাংস্কৃতির মিল নেই। এমন কি পোশাক আশাকেরও মিল নেই। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে ১৪ আগস্ট ভারতকে ত্রিখণ্ড করে দুই খণ্ড নিয়ে পাকিস্তানের জন্ম। পূর্বে পূর্বপাকিস্তান আর পশ্চিমে পশ্চিম পাকিস্তান। মাঝখানে প্রকান্ড ভারত। পশ্চিমে যাও ভারতের ওপর দিয়ে, পূর্বে যাও তাও ভারতের ওপর দিয়ে। পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ও জনসংখ্যাগত গুরুত্ব সত্ত্বেও পাকিস্তান সরকার ও সেনাবাহিনী পশ্চিম পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে ছিল।

সালের ভাষা আন্দোলনে পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে সংঘাতের প্রথম ধাপ সূচিত হয়। পরবর্তী দশক জুড়ে কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়ে নানা পদক্ষেপে পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে। ১৯৫০ সাল থেকে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকারের প্রশ্ন উচ্চারিত হতে থাকে। পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বৈষম্য ছিল প্রকট। মোট জাতীয় বাজেটের সিংহভাগ বরাদ্দ থাকত পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য। শুরু থেকে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি শোষণমূলক আচরণ স্পষ্ট ছিল। কেবল অর্থনৈতিক শোষণ নয় বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ওপরও নিপীড়ন শুরু হয়। রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করা হয়, নজরুলকে খন্ডিত করা হয়। পাকিস্তানের জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় এসে ঘোষণা দেনউর্দু এবং উর্দুই কেবলমাত্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে। এর প্রতিবাদে বাঙালিরা ক্ষোভে ফেটে পড়ে।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি এই আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। এদিন পুলিশের গুলিতে প্রাণ দেন সালাম, বরকত, রফিক জব্বারসহ আরো অনেকে। প্রাণ দিয়ে প্রতিষ্ঠা করে যান মাতৃভাষাকে। আমাদের অনেক গৌরবের ইতিহাস আছে। আজ যে আমরা স্বাধীন দেশে বাস করছি সে দেশটি এমনি এমনি আসেনি। আমাদের প্রজন্মকে সেটা জানতে হবে। অনেক ত্যাগ, অনেক রক্ত, অনেক প্রাণের বিনিময়ে আমরা এদেশটা পেয়েছি। আমরা ভাষা আন্দোলনের ৬৫ বছর পার করেছি। মুক্তিযুদ্ধের ৪৭ বছর পার করেছি। কিন্তু কাঙিক্ষত দেশ আমরা পাইনি। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মুসলিম সবাই মিলে আমরা এদেশটা স্বাধীন করেছি। পূজার বাজনা কিংবা আযানের ধ্বনি বিঘ্ন সৃষ্টি করেনি। সুখে দুঃখে এক হয়ে থাকার ইতিহাস আমাদের। পাকিস্তানিদের মুখোশ ছিল ধর্মের। আমরা সৌভাগ্যবান জাতি যে পাকিস্তান থেকে আমরা আলাদা হতে পেরেছি। ২১ ফেব্রুয়ারি, ২৬ মার্চ, ১৬ ডিসেম্বরের তাৎপর্য প্রতিটি শিক্ষার্থীর বুঝতে হবে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের অহংকার। ত্রিশ লক্ষ শহীদের আত্মদান আমাদের গৌরব গাঁথা। যা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করবে।

পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই ছিল বৈষম্য ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির লড়াই। আমরা রবীন্দ্রনাথের জন্য লড়াই করেছি, আমরা অখন্ডিত নজরুলের জন্য লড়াই করেছি, আমরা আমাদের মায়ের ভাষার জন্য লড়াই করেছি। আমরা একটা মুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য লড়াই করেছি।

আমাদের এখন প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় কাঠামোগুলোকে সুবিন্যস্ত করা। শিক্ষায়, প্রশাসনে শৃংখলা ও সততা ফিরিয়ে আনা। মানুষের মৌলিক অধিকার ও গণতন্ত্রকে পুনরুজ্জীবিত করা। গণতান্ত্রিক সমাজে রাজনীতি হলো জনকল্যাণকর এক জাতীয় উদ্যোগ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে অপরাজনীতির শিকার হয়ে আমাদের সব অর্জনগুলো অর্থহীন হয়ে যাচ্ছে। রাজনীতি যারা করেন তারা যেন তাদের ওপর আস্থা রাখার মত বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠেনমানুষের কাছে, রাষ্ট্রের কাছে, সমাজের কাছে।

x