ভাগ্য বিড়ম্বিত তিন নর-নারীর সংগ্রাম নার্সারিতে দিন বদলের স্বপ্নে বিভোর তারা

মোঃ জামাল উদ্দিন : লোহাগাড়া

সোমবার , ৭ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৩:৪৪ পূর্বাহ্ণ
39

লোহাগাড়ার তিন ভাগ্য বিড়ম্বিত নারী-পুরুষ যথাক্রমে ইসলাম খাতুন (৩৬), সেকান্দর আলী (৫৬) ও বাবুল বাবু (৫৯)। তারা তিনজনই প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা সৃজিত নার্সারীতে কাজ করে দেশের অর্থনীতির ভিত মজবুত করছেন। প্রতিদিন সকালে সম্ভাবনার বার্তা নিয়ে পূর্ব দিগন্তে সূর্য উদিত হয়। সন্ধ্যায় পশ্চিম আকাশের কোলে সূর্য অস্ত যায়। তখন তারা খেয়ে না খেয়ে নিদ্রাতে ঢলে পড়েন। তারা সৃজিত নার্সারীর আয়ে গ্রাসাচ্ছাদন ও পরিবার-পরিজনের চিকিৎসার ব্যয়ভার নির্বাহ করেন। নুন আনতে তাদের সংসারে পান্তা ফুরিয়ে যায়। তবুও তারা দমেননি। শুধু এক মুঠো চাল কিংবা একটি শীতের কম্বলের জন্য বহুবার বহুভাবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এমনকি নারী নেত্রীসহ সরকারি অফিসে ধর্ণা দিয়েছেন। কোন কাজ হয়নি। বর্তমানে তাদের কদর বেড়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে তাদের দরজায় ভোটের বার্তা নিয়ে কড়া নেড়েছেন। অনেকে বলছেন, তোয়ারা গম আছনি। উত্তরে তারা বলেছেন, গম অনরা তাহনগই, আরা যেদ্দুরত আছি এদ্দুরত থেইক্কম। এতবছর ভাগ্য পরিবর্তন নমই, বর্তমানেও নইব। এমনটাই অভিমত রেখেছেন তারা এ প্রতিনিধির কাছে। আলাপ হল ইসলাম খাতুনের সাথে। তার বয়স যখন ১৫, তখন পটিয়ার জনৈক ব্যক্তির সাথে বিয়ে হয়। ধুমধাম করে পদুয়া সিকদার দিঘীর পশ্চিম পাড়ে মৌলভী পাড়ার মতিউর রহমানের মেয়েকে জামাইর হাতে তুলে দেন। জামাইর পেশা সম্পর্কে তিনি বলতে কিংবা ছাপার অক্ষরে লিখতে নিষেধ করেছেন। তাই পেশা সম্পর্কে উল্লেখ করা হল না। বিয়ের পরেই স্বামী তাকে প্রায় সময় মারধর করত। সেই ছিল কিলানোর গোসাই। কথায় কথায় পান থেকে চুন খসলে ইসলাম খাতুনকে মারধর করত। ইতোমধ্যে তার কোল জুড়ে একটি কন্যা সন্তান আসে এবং সে পুনরায় গর্ভবতী হয়। অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে কন্যা সন্তান ও গর্ভের সন্তানকে নিয়ে বাপের বাড়ি চলে আসে আজ থেকে ২০ বছর আগে। সেখানে তার কোল জুড়ে একটি পুত্র সন্তান আছে। তিনি মেয়ে ও ছেলের নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করেছেন। ছেলে-মেয়ে নিয়ে তার অমানিষার অন্ধকার আরো ঘনীভূত হয়। অন্ধকারে পথ হারিয়ে সে দিকবিদিগ ছোটাছুটি করার মতো অবস্থায় পড়েন। মানুষের বাড়িতে ঝি গিরী, অবস্থাপন্ন কৃষকের ধান ক্ষেতে জনখাটা, পাহাড় থেকে লাকড়ি এনে বাজারে বিক্রি করে ছেলে-মেয়েদের মুখের আহার যোগান। জননেত্রী শেখ হাসিনার কর্মসূচি স্বামী পরিত্যাক্তার নামে নাম লেখান এবং একটি কার্ডপ্রাপ্ত হন। পরে ছেলে-মেয়ে বড় হয়। মেয়েকে অন্য জায়গায় পাত্রস্থ করেন। সেখানেও বিধিবাম। একটি নাতি জন্মগ্রহণ করে। সন্তানের পর থেকেই জামাই তার কন্যাকে ফেলে রেখে উধাও হয়ে যায়। তখন থেকে ঝি-নাতী তার কাঁধে জগদ্দল পাথরের মতো বোঝা হয়ে রয়েছে। মানুষের বুদ্ধি নিয়ে চট্টগ্রাম আদালতে মামলা করেছেন। তদ্বিরের অভাবে সে মামলাও গতি পায়নি। একটি নার্সারীতে দিন মজুরী করতে করতে নার্সারী সম্পর্কে তার ধারণা জন্মে। বাপের ঘরে রিকশা চালক ভাইয়ের সংসারেও তার ঠাঁই হয়নি। সেখান থেকে বিতাড়িত হয়ে পদুয়া বাজার সংলগ্ন স্থানে পুত্র-কন্যা-নাতী নিয়ে বসবাস করেন। পুঁজির অভাবে নার্সারীতে চারা তৈরি করতে পারেন না। শুধু একাশিয়া ও হাইব্রীড মিঞ্জিয়াম চারা উৎপাদন করেন। আর বিভিন্ন সময়ে কৃষকের ধান ক্ষেতে কিংবা জমিতে মজুরী করেন। ছেলেটি ভ্যানগাড়ি নিয়ে বিভিন্ন বাজারে চারা বিক্রি করে মা’র হাতে দু’পয়সা তুলে দেন। বিভিন্ন সময়ে বৃক্ষমেলা কিংবা সরকারি সহায়তার কথা তিনি শুনেছেন। কোন কাজ হয়নি। সংবাদপত্রের উপরে তার অতুলনীয় বিশ্বাস। তিনি মনে করেন তার দুঃখের কাহিনী সংবাদপত্রের পাতায় ছাপা হলে দেবদূতের মতো কোন ব্যক্তি তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসবেন।
মোঃ সেকান্দর আলী যৌবনে একজন প্রান্তিক চাষী ছিলেন। নিবাস বাঁশখালী উপজেলার পুঁইছড়ি গ্রামে। অপরিকল্পিত সংসার ও বিভিন্ন দায়দেনার কারণে তিনি ভূমিহীন চাষী হয়ে যান। তার ৩ পুত্র, ৩ কন্যা। ছেলে সৈয়দ আলী লোহাগাড়ার পদুয়া এলাকায় একটি নার্সারীতে চাকরি করতেন। সেখান থেকে তার নার্সারী বিষয়ে ধারণা জন্মে। সেকান্দর আলী বিভিন্ন সময়ে পরের জমিতে দিনমজুরী ও বিভিন্ন ফাইফরমাশ খেটে পরিবারের ভরণ-পোষণ চালাতেন। বর্তমানে ১০ শতক জমি লাগিয়ত নিয়ে ৫ বৎসর যাবৎ নার্সারী সৃজন করে চলেছেন। তার নার্সারীতে হরেক রকমের ফলদ-বনজ ও ঔষধী বৃক্ষের চারা রয়েছে। তার ছেলে সৈয়দ আলী ভ্যান গাড়ি করে বিভিন্ন হাটবাজারে ছোট চারা যেমন মরিচ, গাদা ফুল ও অন্যান্য প্রজাতির চারা বিক্রি করেন। বড় বড় চারাগুলো তিনি উত্তর বঙ্গের নওগাঁ, শান্তাহার, বগুড়া ও রাজশাহী প্রভৃতি অঞ্চল থেকে কিনে নিয়ে মজুদ করেন। পরিচর্যা করেন। মৌসুমে তা বিক্রি হয়। এসব প্রজাতির অন্যতম হল আম, জাম সফেদা, বেলেম্বু, কাঁঠাল প্রভৃতি। তিনি বলছেন বৌ, ছেলে-মেয়েরা বাঁশখালীতে রয়েছে। তাদেরকে দেখভাল করার জন্য মাঝে মধ্যে বাঁশখালী যেতে হয়, টাকা পাঠাতে হয়। বর্তমানে তিনি সৈয়দ আলীকে নিয়ে একটি ভাড়া বাসায় থাকেন এবং বাঁশখালী থেকে পরিবার-পরিজনকে নিয়ে আসার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি বলছেন, পুঁজির অভাবে তার ব্যবসা সমপ্রসারণ করা যাচ্ছে না। তবুও তিনি স্বপ্ন দেখেন সুন্দর আগামীর।
বাবুল বাবু একজন ভূমিহীন কৃষক। পদুয়া হরিমন্দির এলাকায় তিনি বসবাস করেন। তার নার্সারীতে গিয়ে দেখা গেল শুনশান অবস্থা। তবে চারার তেমন আধিক্য নেই। পাশাপাশি তিনটি নার্সারীরই অবস্থান। এলাকাবাসীরা বলছেন, বাবুল বাবু বিভিন্ন নার্সারী থেকে চারা সংগ্রহ করে হাটবাজার ও গ্রামগঞ্জে বিক্রি করেন। বয়সের ভারে ক্লান্ত। এ বৃদ্ধ মনে করেন পুঁজি পেলে তার দুটি হাত পুনরায় সচল হবে। নার্সারী ভরে উঠবে সবুজের সমারোহে।
ইসলাম খাতুন, সেকান্দর আলী ও বাবুল বাবুকে দেখতে আপনার বেশীদূর যাওয়ার দরকার নেই। পদুয়া তেওয়ারীহাটের যেখান থেকে ফরিয়াদিরকুল অভিমুখী সিএনজি চালিত অটোরিকশা ছাড়ে সেখান থেকে সামান্য পূর্বদিকে গেলেই এ তিন জনের দেখা পাবেন আপনি। বর্ণনার বিষয় নয়, অনুভূতির বিষয় বলে তাদের দুর্দশার কথা বর্ণনা করা কঠিন। বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এ ভাগ্য বিড়ম্বিত মানুষজনের অবস্থা কি তা একবার দেখে আসতে পারেন। তাহলেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সোনার বাংলার রূপকার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার স্বপ্ন সার্থক হবে। এমনটাই অভিমত রেখেছেন এলাকাবাসী।

x