ভাইরাস থেকে মুখের আলসার

ডা. প্রধীর রঞ্জন নাথ

শনিবার , ১৩ অক্টোবর, ২০১৮ at ১১:১৯ পূর্বাহ্ণ
56

হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস দিয়ে প্রাথমিক সংক্রমণের ক্ষেত্রে মাড়ি ও ঠোঁটে সংক্রমণ দেখা দিতে পারে যা জিনজাইভো স্টেমাটাইটিস নামে পরিচিত। অনেক সময় শিশুদের ক্ষেত্রে মাড়িতে এ অবস্থার সৃষ্টি হলে মনে হতে পারে যে তাদের দাঁত উঠেছে। বার বার হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস সংক্রমণের কারণে ঠোঁটে ফুসকুড়ি হতে পারে এবং প্রদাহ দেখা দিতে পারে যা চিলাইটিস নামে পরিচিত। সাধারণত মানুষের কাছে এ অবস্থাটি জ্বরঠোসা নামে অধিক পরিচিত। তবে সিফিলিসের কারণেও ঠোঁটে ঘা দেখা দিতে পারে। প্রজনন অঙ্গের বাইরে সবচেয়ে বেশি সিফিলিসের লক্ষণ দেখা যায় পুরুষদের উপরের ঠোঁটে এবং মহিলাদের নিচের ঠোঁটে। এ সময় ঠোঁটে ক্ষত দেখা দিতে পারে। হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস টাইপ-১ সাধারণত ঠোঁটকে আক্রান্ত করে যা কোল্ড সোর নামে পরিচিত। হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাসের মাধ্যমে ফ্যারিনজাইটিস, গলা ব্যথাসহ আলসার হতে পারে। হিউম্যান প্যাপিওলোমা ভাইরাস মুখের অভ্যন্তরে জেনিটাল ওয়ার্টস বা গোটার সৃষ্টি করে থাকে। মুখের অভ্যন্তরে আলসার যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় তবে সে ক্ষেত্রে দেখে নেয়া ভালো যে আলসারটি ভাইরাস জনিত কিনা। কারণ সাইটোমেগালো ভাইরাসের কারণে আলসার হলে তা সাধারণত দীর্ঘস্থায়ী হয়ে থাকে। এপস্টেন বার ভাইরাসের কারণে জিহ্বায় হেয়ারি লিউকোপ্লাকিয়া নামক সমস্যা দেখা দিতে পারে। জিহ্বার অবস্থানরত প্যাপিলাগুলো চুলের রংয়ের মতো কালো বর্ণ ধারণ করে এবং ধীরে ধীরে পরিস্থিতির অবনতি হয়ে থাকে। হেয়ারি লিউকোপ্লাকিয়া জিহ্বায় পাওয়া গেলে একজন রোগীর অবৈধ যৌন সম্পর্কের ইতিহাস থাকলে অবশ্যই দেখে নিতে হবে রোগীর শরীরে ঐ ভাইরাস আছে কিনা। ওরাল লাইকেন প্ল্যানাস এর সাথে ক্রনিক লিভার রোগের যোগসূত্র বিশেষ করে হেপাটাইটিস- ‘সি’ ভাইরাসের সম্পর্ক থাকতে পারে। বিশেষ করে ক্ষত যুক্ত ওরাল লাইকেন প্ল্যানাসের ক্ষেত্রে বায়োপসি করার পূর্বে হেপাটাইটিস-সি ভাইরাস আছে কিনা দেখে নেয়া ভালো। এছাড়া লিভারের কোনো সমস্যা আছে কিনা তাও দেখতে হবে। তাই আপনার মুখের আলসার যদি ভাইরাসজনিত হয়ে থাকে তাহলে কারণ নিরূপণ করে যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে।
মুখের জ্বালাপোড়া : বার্নিং মাউথ সিনড্রোম হলো একটি ব্যথাযুক্ত হতাশাজনক অবস্থা যার কারণে জিহ্বা, ঠোঁট, তালু অথবা পুরো মুখেই জ্বালাপোড়া ও ব্যথা হতে পারে। নারী এবং পুরুষ উভয়ের মাঝেই বার্নিং মাউথ সিনড্রোম পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। তবে বিশেষত মেয়েদের মেনোপজের সময় বা মেনোপজের পরে বার্নিং সাউথ সিনড্রোম বেশি দেখা যায়। এ রোগটি অল্প বয়সেও হতে পারে।
বার্নিং মাউথ সিনড্রোম এর লক্ষণ
* মুখ, ঠোঁট ও জিহ্বার জ্বালাপোড়া অনুভূত হওয়া।
* মুখের অভ্যন্তরে পুড়ে যাওয়ার মতো অনুভূতি হতে পারে।
* শুষ্ক মুখ * তিক্ত বা ধাতব স্বাদ * জিহ্বার স্বাদ * জিহ্বার স্বাদ-এ পরিবর্তন
* খাওয়ার অভ্যাসে পরিবর্তন।
যেসব ক্ষেত্রে বার্নিং মাউথ সিনড্রোম হতে পারে : * শুষ্কমুখ * ওরাল * ক্যান্ডিডোসিস (একটি ফ্যাংগাল সংক্রমণ) * দাঁত কামড়ানো, * যে সব স্নায়ু ব্যথা ও স্বাদ নিয়ন্ত্রণ করে তা কোনো কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হলে, * কৃত্রিম দাঁত বা ডেনচার ঠিকভাবে স্থাপন করা না হলে, * এলার্জিজনিত সমস্যা যেমন কোনো রোগীর খাবার বা মেটালিক ডেনচারের প্রতি এলার্জি থাকতে পারে * এসিড উদগীরণের কারণে, * দুশ্চিন্তা বা হতাশার কারণে অর্থাৎ যেকোন ধরনের মানসিক সমস্যা।
বার্নিং মাউথ সিনড্রোমের রোগীদের যা করা প্রয়োজন : * অল্প অল্প করে প্রচুর পানি পান করতে হবে। * গলায় কোনো সমস্যা না থাকলে বরফ কুচি চোষা যেতে পারে পরিমিতভাবে। * গরম ও মশলাযুক্ত খাবার গ্রহণে বিরত থাকতে হবে, * চিনিবিহীন চুয়িংগাম চোষা যেতে পারে, * এলকোহল এবং ধূমপানের অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে, * উচ্চ রক্তচাপ যদি থাকে তাহলে এর ওষুধে পরিবর্তন প্রয়োজন হতে পারে। তবে মুখ ও জিহ্বায় জ্বালাপোড়া দেখা দিলে এবং তা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় তবে অতি দ্রুত এ বিষয়ে অভিজ্ঞ একজন চিকিৎসকের চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে।
হোমিওপ্যাথিক প্রতিবিধান : ভাইরাস থেকে মুখের আলসার নিরাময়ে হোমিওপ্যাথিতে অত্যন্ত ফলদায়ক ওষুধ আছে। যা অন্যপ্যাথিতে নেই। লক্ষণ সাদৃশ্যে নির্দিষ্ট মাত্রায় নিুলিখিত ওষুধ ব্যবহারে এই রোগ থেকে সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করে। যথা-
১. আর্সেনিক এলরাম : মুখের ক্ষত কঠিন আকার ধারণ করলে এটি প্রযোজ্য। অত্যন্ত অস্থিরতা, দুর্বলতা, জ্বালাপোড়া ভাব বর্তমান। মাড়ী ফোলা, মাড়ীতে বেদনা এবং স্পর্শকাতরতা, ক্ষত থেকে রক্ত নির্গত হয়, মাড়ীতে সাদা সাদা ঘা। মুখের অভ্যন্তর ভাগে এবং জিহ্বায় ক্ষত। ক্ষতে জ্বালাপোড়া ভাব।
২. মার্কসল : মুখের ক্ষতে পুঁজ হয়, মাড়ীতে ঘা এবং তাতে পুঁজ জিহ্বা স্ফীত এবং মোটা থলথলে তার উপর দাঁতের দাগ পড়ে। প্রচুর পরিমাণে রক্ত মিশ্রিত লালা স্রাব হয়। মাড়ী ছিদ্র হয়, রক্ত পড়ে এবং মুখ থেকে দুর্গন্ধ বের হয়। ক্ষত খুব তাড়াতাড়ি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে কিন্তু ক্ষত অতটা গভীর হয় না।
৩. বোরাক্স : এই জাতীয় রোগের ইহা প্রধান ওষুধ। শিশুদের মুখে ঘা, টাটানি বেদনা, সামান্য আঘাতেই মুখ থেকে রক্ত বের হয়। মুখের মধ্যে আগুনের মত গরম বোধ হয়, পিপাসা থাকে, বমি এবং বমিভাব। ইহার একটি প্রধান মানসিক লক্ষণ হচ্ছে নিম্নগতিতে ভয় হওয়া। মুখ ক্ষত হতে লালা স্রাব। মুখের ক্ষতে এক প্রকার উদ্ভেদ দেখা যায়। ক্ষতের জন্য শিশু মাতৃদুগ্ধ খেতে পারে না।
৪. এপিস : মুখের অভ্যন্তর ভাগের মিউকাস মেম্ব্রেন ফুলে যায়, লাল বর্ণ হয়। আগুনে পুড়ে গেলে যে ফোস্কা পড়ে ঘায়ের সৃষ্টি হয় ঠিক সেই প্রকার ফোস্কায় মুখের অভ্যন্তর ভাগ পূর্ণ হয়ে যায়। অনবরত মুখ দিয়ে চটচটে আঠারমত ফেনাযুক্ত লালা নির্গত হয়। পিপাসা থাকে না।
৫. এসিড নাইট্রিক : মুখে ক্ষত, ওষ্ঠের কোণে ক্ষত, মুখে ভয়ানক দুর্গন্ধ, মুখের ভাব রক্তিম, প্রদাহযুক্ত, মলিন এবং নালা নিঃসরণ এই সকলে ইহা প্রযোজ্য।
৬. হিপার সালফার : পুঁজ সঞ্চয় প্রবণতা-এই লক্ষণটি ইহার পরিচায়ক লক্ষণ। পুরাতন ক্ষতের চারিদিকে নতুন ফুসকুড়ি সৃষ্টি হয়ে ক্ষতটি বাড়তে থাকে। শীত কাতরে স্পর্শ কাতরতা, ক্ষতস্থানে খোঁচামারার ন্যায় বেদনা। অত্যন্ত জ্বালা যন্ত্রণা, লালাস্রাব, মাড়ী এবং মুখের অভ্যন্তর ভাগ স্পর্শকাতর সহজেই রক্ত পড়ে, কোন কিছু খাওয়ার সময় ব্যথা অনুভব করে ও গলক্ষত ইত্যাদি।
উপরোক্ত ওষুধ ছাড়া কেলি-ফ্লোরিকাম, ক্যালিবাইক্রম, ইথুজা, হাইড্রাসটিস, ফেরাম ফস, কেলিসালফ, বেলেডোনা, এসিড মিউর, ক্যাপটেসিয়া, আয়োডাম, কার্বোভেজ ফসফরাস, ল্যাকেসিস উল্লেখযোগ্য। তারপরেও চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সেবন করা উচিত।

x