ভরা থাক স্মৃতিসুধায়

লুসিফার লায়লা

মঙ্গলবার , ১৬ জুলাই, ২০১৯ at ১০:৩১ পূর্বাহ্ণ
48


তিনি লিখছেন ‘মানুষের বোধ করি ‘স্মৃতি’ এক দুর্লভ ঐশ্বর্য ’- ছোট্ট লেখাটার প্রায় সব কটা বাক্যেই ফিরে ফিরে দেখবার অবসর দাবি করে। কিন্তু এই একটা লাইনের ভেতর হুড়মুড় করে কত শত দৃশ্যের হইচই পড়ে গেছে । এই ঝড়-জলের দিনে এই লাইনটা মাথায় করে হাঁটতে হাঁটতে ভাবছি আমার সাথে তার কোন একত্রিত স্মৃতি তৈরি হয়নি কখনো । কেবল আমার একার ছেলেবেলার স্মৃতির ভাড়ার ঘরে উজ্জ্বল হয়ে রইল আমার দেখা প্রথম অভিনেতার মুখ। কালপুরুষের ছোট নাটকের দলটা আমার যে বয়েসে আমাদের পাড়ায় আসত সেই বয়েসে মঞ্চ নাটক নিয়ে ধারণা তো দূরে থাক নাটক যে অমন খোলা জায়গায় হতে পারে তাই জানা ছিলো না । জুলিয়াস সিজার নাটকের রিহার্সেল হত আমার দাদির বাড়ির ছাদের খেলাঘরের বড় কামড়াতে । আর বাকি খোলা ছাদটা ছিল আমাদের খেলার জায়গা। স্মৃতি বিভ্রাট না করলে জুলিয়াস সিজারের ভূমিকায় অভিনয় করতেন উনি। ভুলচুক হলে কিংবা দেরি হয়ে গেলে খুব রাগ করতেন ফলে শুরু থেকেই ভাবতাম বদরাগী একরোখা একটা মানুষ ষ আমাদের হইহল্লা বেশি হলে রুম থেকে মাথা বের করে সমস্ত হইহল্লার ভেতর ঠান্ডা জল ঢেলে দিয়ে আবার কাজে ডুবে যেতেন। আর যে দু’একটা দিন ঠিকমত কাজ হতো না উনি এসে আমাদের ছক্কার বোর্ডে ভাগ বসাতেন, খেলায় হেরে গেলে বোর্ডটা উল্টে দিয়ে বলতেন চুরি হয়েছে খেলায় চুরি হয়েছে। এই মজাটুকুও করতেন খুব গম্ভীর মুখ করে আর আমরা সেটাই সত্যি ধরে নিতাম।
মঞ্চ নাটক যে সত্যিকার অর্থেই একটা গভীর ভাবনার এবং এবং ব্যক্তিগত উৎকর্ষকে বারবার ঝালিয়ে নিয়ে একটা নিরন্তর চর্চার সূতিকাগৃহ সে কথা বহুকাল পরে এসে সেই ছেলেবেলায় দেখা নাটকের রিহার্সেলের স্মৃতি হাতড়ে বুঝেছি। যখন সেসব বুঝেছি তখন তিনি কোথায় আর আমি কোন দূরের পথে-পথে। কালপুরুষ নাট্যদল-এর পরে কত বড় হয়েছে আকারে, কত কত কাজ করেছে মঞ্চে সেসবের খবর হাওয়ায় ভেসে এসছে কিন্তু আলাদা করে নিজে খতিয়ে দেখবার অবসর আর মিলিয়ে নিতে পারিনি। মাঝে মাঝে সে বদরাগী লোকটাকে দেখেছি দূর থেকে গল্পে মেতে থাকতে কিন্তু স্মৃতির ভেতর খোদাই হয়ে যাওয়া মুখটার সাথে সে-মুখ মিলত না বলে আলাপ করবার সাহস আর সঙ্গ দেয়নি আমাকে। তার কত পরে এসে উনার গান শুনতে গিয়ে নতুন করে পেলাম সে পুরনো মুখ।
দেশের বাইরে বসে কত অজস্র দুপুর উনার গানের সাথে কাটিয়ে দিয়ে ভেবেছি এইবার যেচেপড়ে আলাপ করব কিন্তু আমার সংকোচটুকু কাটিয়ে নিয়ে আলাপ আর হয়নি। গত বছর এক বিয়েতে সে দূর থেকে দেখার দূরত্ব ঘুচে গিয়ে পরিচয় হয়েছিল নতুন করে। কিন্তু সে পরিচয়ও পারস্পরিক স্মৃতি নির্মাণের জন্যে অত্যন্ত দুর্বল উপকরণ। তবু তিনি থেকে গেলেন আমার ছেলেবেলার ভেতর আমার বড় বেলার জনারণ্যে। ‘যেখানে পরিচয়, নানারকমের উপলব্ধির রসায়নে একটা সম্পর্কসেতু তৈরি করে, মন সেখানেই তাঁকে আপন বলে গ্রহণ করে নেয়। ‘এভাবেই তৈরি হয় আপন মানুষের বৃত্ত, কারো বড় কারো ছোট ’ – তিনিই লিখেছেন তার ফেইস বুকের পাতায়। আজ যখন দূর থেকে দেখাকে সম্বল করে তার জন্যে লিখছি এই যে আমার স্মরণগাঁথা তখন তার এই বাক্যগুলোই আমার ঢাল তলোয়ার। ঠিক কোন উপলব্ধির রসায়নে তার সাথে সম্পর্কিত আমি তাকে সুক্ষ্ম চোখে চিহ্নিত করে বুকমার্ক দেয়াটা কঠিন বরং আমি বলি যে তার অমন পরিশীলিত জীবন অনুভব, মানুষের সম্পর্কের রসায়নকে নিবিড় করে উপলব্ধিতে নেবার ক্ষমতা, গভীর করে দেখবার নিবিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি এবং সমসময়কে উদার চিত্তে যাপন করবার মতো গভীর মননশীলতাই এবং অনন্য রসবোধ তাকে আমার একান্ত জগতের মানুষ করে দিয়েছে।
কেবল বিরাট করে নিজেকে জাহির করবার লোভে ছুটতে থাকা মুখের ভিড়ে নিজের সমস্ত জানাকে গোপনে গুছিয়ে নিয়ে ঋদ্ধ হয়ে উঠবার তপস্যায় নিমগ্ন মুখ তাঁর। এত গান এত সুর তাঁর, নিজে গেয়েছেন এবং তাঁর গান গেয়েছেন ইন্দ্রানি সেন, সুবীর নন্দী, ফাতেমাতুজ জোহরা, বাপ্পা মজুমদার। কিন্তু এই যে এদের সাথে তার গানের সূত্রে আত্মীয়তা তার বাগাড়ম্বর নেই কোথাও। ভালো চিত্রনাট্য নির্মাতা, চৌকস নির্দেশক, নিপুণ অভিনেতা এবং সংবেদনশীল লেখক সত্তা নিয়ে যে জীবন তিনি কাটিয়ে গেলেন তার আয়ু হয়ত কম কিন্তু তার স্থায়িত্ব অবিনশ্বর। ফেইস বুকে , খবরের কাগজের ফিচার পাতায় , তার ব্যক্তিগত খেরো খাতায় জানি না কোন রতনহার লুকিয়ে আছে , জানি তাঁর যেটুকু প্রকাশিত তার সবটুকুই আমাদের সাহিত্যের সম্পদ, আমাদের স্বপ্ন নির্মাণের রসদ। কবে সেসব অপ্রকাশিতর সন্ধান মিলবে জানি না কেবল এই জানাটুকুই আমার বা আমার মতো অজস্র গুণগ্রাহীর পুরস্কার। আমাদের সময়ে আমাদের রোদ- ঝড়-জল কাদায় মাখামাখি শহরে তিনি ছিলেন। তিনি লিখেছিলেন ‘দিনশেষে পাখি যেমন, তেমনি নিশ্চিন্তে মানুষ তার নিজস্ব মানুষের কাছে ফেরে।’ যে শহর তার অজস্র স্মৃতির ভাঁড়ার ঘর, যে শহর তার একান্ত ভালোবাসার আধার সে শহরে নিজস্ব মানুষের কাছে তিনি ফিরেছেন ঝড় জলে নেয়ে। ছোট দৈর্ঘ্যের জীবন তা বড় পরিসরে যাপন করবার মতো অমন প্রাণবন্ত মানুষকে চিরবিদায় জানানোর অবকাশ নেই বরং তাঁর সমস্ত সৃজনশীলতার ভেতর তাঁর সাথে চিরকাল জীবন উদযাপনের যে মস্ত আয়োজন তিনি পিছে ছেড়ে গেলেন তার ভেতর দিয়েই তাঁর সাথে আমাদের আগামীদিনে যাপন। ভাবছি কি বিশেষণ জুড়ে দেব শান্তনু বিশ্বাসের নামের আগে, এত অজস্র বিশেষণ লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে তাকে বিশেষায়িত করতে চাইছে অথচ একটা শব্দে তাকে বাধা যাচ্ছে কি ? বরং শান্তনু বিশ্বাস যে সামগ্রিক অর্থে সর্বাঙ্গীনভাবে এজন শিল্পী এবং সৃজনশীল মানুষ আমাদের এই অকালে সে কথাটাই জুড়ে থাক তার না থাকা জুড়ে।

x