ভবন বানাতে গিয়ে যেন ভুবন নষ্ট না করি

শুকলাল দাশ

রবিবার , ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৮:২৬ পূর্বাহ্ণ
139

‘প্রকৃতিকে অতিক্রমণ কিছুদূর পর্যন্ত সয়, তার পরে আসে বিনাশের পালা…’-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
বলতে দ্বিধা নেই, আমরা আজ নিজেদের হাতেই প্রকৃতির মূল উপাদান এই সবুজ শ্যামলিমাকে নিঃশেষিত করে বিনাশের পথে এগিয়ে চলেছি। পরিবেশের যে বিন্যাস তার সাথে গণমানুষের যোগাযোগ আজ খুবই ক্ষীণ। বরঞ্চ দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে প্রকৃতি ও পরিবেশের সঙ্গে মানুষের বিচ্ছেদের ব্যবধান। নগরায়ণের নামে চলছে পরিবেশ বিপর্যয়। নির্বিচারে প্রকৃতির নির্মল ভুবন নষ্ট করা হচ্ছে। মানুষের সীমাহীন অত্যাচারে প্রাকৃতিক পরিবেশও আজ বিধ্বংসী হয়ে উঠেছে।
বরেণ্য কথা সাহিত্যিক আহম্মদ ছফা তাঁর এক প্রবন্ধে বলেছেন ‘এই পুষ্প, এই বৃক্ষ তরুলতা, এই বিহঙ্গ আমার জীবন এমন কানায় কানায় ভরিয়ে তুলেছে, আমার মধ্যে কোনো একাকীত্ব-কোনো বিচ্ছন্নতা আমি অনুভব করতে পারিনে…।’
সাহিত্যিক আহম্মদ ছফা’র সঙ্গে একাত্ম হয়ে বলা যায়- পুষ্প, বৃক্ষ, তরুলতা, বিহঙ্গ কিংবা নদী চিরকালই এই শ্যামল বাংলার গণমানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে গভীরভাবে মিশে আছে। কিন্তু সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলার প্রত্যাশায় এখানে যত রকমের আপাত উন্নতি সাধিত হয়েছে প্রকৃতির ছন্দপতন-ততটুকুই ঘটেছে, যোগাযোগ কমেছে মানুষের সাথে প্রকৃতি এবং পরিবেশের।
এখনকার বাংলাদেশের পরিবেশ নিয়ে কিছু বলতে গেলে প্রথমেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে জোড়াতালি দেয়া নিদারুণ এক ছবি, যাকে অনায়াসেই পরিবেশ বিপর্যয়ের করুণ চিত্র বলে আখ্যায়িত করা যায়। ইকো-হারমনি বলে একটা কথা বেশ প্রচলিত। অর্থাৎ এই ভূ-মণ্ডলে সকল মনুষ্যপ্রাণী, পশুপাখি, জীবজন্তু, গাছপালা, জলবায়ু সবকিছুই প্রকৃতির নির্দিষ্ট কিছু নিয়মের আবর্তে বাঁধা রয়েছে। কোনো কারণে এর একটি হারিয়ে গেলে অন্যটি আর ঠিকমতো কাজ করে না। ফলে এই ইকো-হারমনি বিনষ্ট হয়। তেমনি আমাদের পরিবেশের ক্ষেত্রেও একটি উপাদানের অভাবে অন্যান্য উপাদানের অবনতি ঘটে। এর ফলে সামাগ্রিকভাবে বিনষ্ট হয়েছে পরিবেশের ভারসাম্য। বেশিদিন আগের কথা নয়, আমাদের এই দেশটি নদীমাতৃক দেশ হিসেবে সবার কাছে সুপরিচিত ছিল, আজ সেই নামের প্রতি আমরা কেউই সুবিচার করছি না। গল্প, গান, কবিতায়, শিল্পীর তুলিতে বৈচিত্র্যময় নান্দনিকতার উৎস হওয়া ছাড়াও নদী দিয়েছে আমাদেরকে নানারকম সামাজিক সুবিধা, ব্যক্তিজীবনে নানাবিধ কর্মসংস্থানের সুযোগ। কিন্তু এদেশের সেই নদী এমনকি খাল বিল, পুকুরও আজ জরাগ্রস্ত। মাছে-ভাতে যে বাঙালির পরিচয়, সেই মাছের জোগানও ঠিকমতো দিতে পারছে না এই নদী-নালা খাল-বিল। উপরন্তু নানা কারণেই বিপর্যয় ঘটে চলেছে দেশেল উপকূলীয় অঞ্চল, সুন্দরবন, হাওড়, প্লাবনভূমিতে, পানি আর বাতাসে, বনে কিংবা পাহাড়ে। পরিবেশের কোন অংশই এই বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে না।
আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের মহাসড়কে। এ সড়কে একদিকে ব্রিজ, কালভার্ট, রাস্তা ইত্যাদি নির্মিত হচ্ছে, অন্যদিকে মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে গ্রাম ও শহরে নির্মিত হচ্ছে বাড়িঘর। অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নগরায়ণ। আর নগরায়ণ মানেই সারি সারি সুউচ্চ ভবন। উন্নত দেশগুলোয় ভবন তৈরিতে পরিবেশ বান্ধব উপাদানের ব্যবহার বাড়লেও বাংলাদেশে এখনো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হচ্ছে গতানুগতিক ধারার নির্মাণ সামগ্রী। বিশেষ করে ভবন নির্মাণে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় উপাদান ইট। মাটি পুড়িয়ে বানানো প্রচলিত ইটের উপরই নির্ভর করছে গোটা দেশ।
বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট-এইচবিআরআই’র তথ্য বলছে, দেশে এখন বছরে কম করে হলেও ১৭ দশমিক ২ বিলিয়ন পিস ইট তৈরি হচ্ছে। প্রতিমিলিয়ন ইট তৈরিতে পোড়াতে হয় ২৪০ মিলিয়ন টন কয়লা। কয়লার পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলে বনভূমি ধ্বংস করে পোড়ানো হচ্ছে কাঠ ও বাঁশ। ইট ভাটাগুলো থেকে বছরে কম করে হলেও ৯ দশমিক ৮ মিলিয়ন টন কার্বন-ডাইঅঙাইড নির্গত হচ্ছে বায়ুমণ্ডলে, যা দেশের মোট কার্বন ডাইঅঙাইড নির্গমনের প্রায় ২৩ শতাংশ। সাথে যোগ হচ্ছে কার্বন মনোঙাইড ও সালফার ডাইঅঙাইডের মতো বিষাক্ত গ্যাস। এসব বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে জনস্বাস্থ্যের ক্ষতির পাশাপাশি অন্যান্য প্রাণি ও উদ্ভিদের ক্ষতি হচ্ছে।
ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে মোট আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ২ কোটি ১৭ লাখ একর। কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ১৯৮৪ সালে দেশে মোট আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ২ কোটি ২ লাখ ৩৮ হাজার একর। ১৯৯৭ সালে কমে এসে তা ১ কোটি ৭৪ লাখ ৪৯ হাজার একরে এবং ২০১২ সালে বাংলাদেশের আবাদি জমির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ কোটি ৫৪ হাজার একরে।
প্রতি বছর জনসংখ্যা বাড়তির কারণে বাড়তি আবাসন, রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণে ভূমির ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এতে করে আবাদি জমির পরিমাণ দিন দিন কমতে শুরু করছে এভাবে চলতে থাকলে কোনো সময় দেশের আবাদি জমির পরিমাণ ভয়ানকভাবে যে কমে যাবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সেক্ষেত্রে প্রধান খাদ্য চাল আমদানি করতেই প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হয়ে যাবে।
বাংলাদেশের পরিবেশ নিয়ে অনেক সমস্যাকেই ইতোমধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং বেশকিছু সমস্যার সমাধানের কৌশলও নির্ধারিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞ মহল একটি বিষয়ে একমত যে, যে কোনো ধরণের টেকসই উন্নয়নের প্রাথমিক শর্তই হচ্ছে পরিবেশের যথোপযুক্ত উন্নয়ন।
পরিবেশ বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে আমরা বেশকিছু বিষয় উল্লেখ করতে পারি। যেমন-ব্যাপক বৃক্ষ নিধন, বহুতল ভবন নির্মাণ, বন উজাড়করণ, পাহাড় ধ্বংস, অবৈধ বস্তি স্থাপন, রাস্তা ও ফুটপাত দখল, মুক্তজলাশয় ভরাট, নদী ও খালের অবৈধ দখল, সর্বসাধারণের ব্যবহারযোগ্য খেলার মাঠ-পার্ক ইত্যাদি বেদখলসহ আরও অনেক কিছু। এ সব কিছু ঘটছে দেশের মারাত্মক জনসংখ্যার স্ফীতি, কর্মসংস্থানের অভাব, গ্রাম থেকে শহরে-নগরে দলেদলে অভিবাসন, এই অপরিকল্পিত নগরায়ন ও শিল্পায়ন এবং কিছু রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী মহলের মদদে। তবে আশার কথা হচ্ছে-বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের মূল ফোকাস ছিল গ্রাম হবে শহর। শহরের সকল সুযোগ-সুবিধা গ্রামের জনগণকেও দিতে চান সরকার। সেই লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কাজ শুরু করেছেন। তাঁর মন্ত্রিসভার প্রত্যেক সদস্য এবং সরকারি সকল প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের তিনি এই ব্যাপারে পরিকল্পনা গ্রহণের নির্দেশনা দিয়েছেন। গ্রাম যদি শহর হয়- তাহলে শহরে জনসংখ্যার চাপ অনেকটা কমে যাবে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হবে।
প্রকৃতি ও পরিবেশকেন্দ্রিক এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো উপেক্ষিত থাকলে টেকসই উন্নয়ন ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাবে। বরং অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে মারাত্মক সংকট দেখা দিতে পারে। এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতেই পরিবেশের প্রেক্ষিতে সুশাসনের প্রয়োজনীয়তার উপলব্ধি করা আজ খুবই জরুরি একটি বিষয়। পরিবেশ সুশাসন হচ্ছে এমন এক ধরণের সমন্বিত ও জবাবদিহিতামূলক স্বচ্ছ প্রশাসনিক ব্যবস্থা যার মাধ্যমে দেশের সরকার অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি টেকসই পরিবেশ সংরক্ষণেও সমানভাবে মুখ্য ভূমিকা পালন করবে।
বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম মহানগরীর প্রায় ৬৫ শতাংশের বেশি ভবন অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত হয়েছে বলে নগর পরিকল্পনাবিদদের বক্তব্যে বিভিন্ন সময়ে উঠে এসেছে।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা এসডিজির অন্যতম এজেন্ডা হলো, পরিবেশবান্ধব নির্মাণ সামগ্রীর ব্যবহার নিশ্চিত করা যা বাংলাদেশের জন্যও হয়ে উঠেছে বড় চ্যালেঞ্জ। উন্নত দেশগুলোর পাশাপাশি চীন, থাইল্যান্ড, সিংগাপুর, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়াসহ পৃথিবীর অনেক উন্নয়নশীল দেশ প্রচলিত ইটের বদলে ভবন নির্মাণে বালি, সিমেন্ট ও নুড়িপাথর দিয়ে বানানো ব্লক ব্যবহার করছে। এতে একদিকে যেমন কমছে কার্বন নির্গমন, অন্যদিকে রক্ষা পাচ্ছে ফসলি জমি। আনন্দের বিষয়, আমাদের দেশে কংক্রিট ব্লক ব্যবহার ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। এটার বহুল ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশবিদদের মতো নগরায়নের আধুনিক ছোঁয়ায় গা ভাসাতে গিয়ে আমরা প্রতিদিন পরিবেশ নষ্ট করছি। এটা এখনই থামানো উচিত। আমাদের উন্নয়ন দরকার, আধুনিক শিল্প কারখানা ও সুউচ্চ ভবন দরকার। তবে এটা হতে হবে সুপরিকল্পিত।

x