ভগবানরঞ্জন

ড. বাহারুল হক

মঙ্গলবার , ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ১০:৩৭ পূর্বাহ্ণ
64

নামের একটা অংশ হিসেবে অনেক হিন্দু পুরুষের নামের মধ্যে কুমার শব্দটা দেখা যায়। যেমন, বিপ্লব কুমার, আশিস কুমার ইত্যাদি। তবে কুমার নামের সবাই কিন্তু কুমার নন। কুমার একটি পেশার নাম। যারা মাটি দিয়ে থালা, বাসন, হাঁড়ি, পাতিল ইত্যাদি বানানোর মত কাজ করে এবং সেসব বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে তাদেরকে কুমার বলা হয়। মুসলিমদের কাউকে এই পেশায় আমি দেখিনি। যাদেরকে দেখেছি সবাই হিন্দু। আমি যে গ্রামে জন্মেছি, বড় হয়েছি সে গ্রামেও কুমার ছিল। কুমার সমপ্রদায় যে পাড়ায় থাকতো সে পাড়াকে বলা হতো কুমার পাড়া। আমি এখন যে একজন প্রিয় হিন্দু পুরুষের কথা বলব তাঁর নাম ভগবানরঞ্জন কুমার। তিনি আমাদের গ্রামের কুমার পাড়ারই একজন। তবে তিনি ছিলেন একজন শিক্ষক। আমার প্রিয় শিক্ষক। তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন কুমার পরিবারে। কিন্তু লেখাপড়া করে তিনি পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন শিক্ষকতাকে। আজ থেকে ষাট বছর আগে। ১৯৫৯ সালে আমি প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম। স্কুলটির অবস্থান আমাদের বাড়ির পাশেই। আমাদের বাড়ির বাউন্ডারি ওয়ালের ওপাশে। বাড়ি ঘেঁষা স্কুল হওয়াতে খুব কম বয়সে আমাদের স্কুলে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে বা যেতে হয়েছে। নানা কারণে সেই প্রাইমারি স্কুল জীবনের স্মৃতি আমার মনে উজ্জ্বল হয়ে আছে। সেই সব কারণের মধ্যে ভগবানরঞ্জন কুমারকে শিক্ষক হিসাবে পাওয়াও অন্যতম একটি কারণ। স্কুলটি ছিল সরকারি। স্কুল ঘরের ঠিক সামনের জায়গাটা এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পুরোটাই ছিল ফুলের বাগান। অনেক রকম ফুল ছিল বাগানে। তবে বেশির ভাগ ছিল গাঁদা ফুল। উজ্জ্বল হলুদ রঙের বড় বড় গাঁদা ফুলের বাতাসে দোল খাওয়া এখনো আমার চোখের সামনে ভাসে। ফুল গাছের সাথে বাগান জুড়ে ছিল নানা রঙের পাতা বাহার গাছ। আরবি এবং ফার্সি ভাষায় বাহার শব্দটি এসেছে সৌন্দর্য বোঝাতে। এসব নানা রঙের চোখ জুড়ানো পাতা সারা বছর ধরে সৌন্দর্য পরিবেশন করে বলে এদের নাম পাতা বাহার। ফুল গাছের মত পাতা বাহার গাছের কদর কম নয়। বরং ক্ষেত্র বিশেষে বেশি। কারণ ফুল মৌসুমী কিন্তু পাতা বাহার মৌসুমী নয়। সারা বছর পাতা বাহারের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। স্কুলের বাগানটা ও আমাকে স্কুলে টানতো। ফুল বাগান বরাবরই আমার কাছে ছিল খুব প্রিয় একটা বিষয়। আমাদের ঘরের সামনের উঠোনের দক্ষিণাংশে ছিল। একটা ফুল বাগান। আমি আর আমার বড় বোন জোৎস্না, আমরা দুইজন ব্যস্ত থাকতাম এই ফুল বাগান নিয়ে। স্কুলটার দিকে তাকালে আমার মনে হতো স্কুল ঘরটি বাগানটাকে পরম আদরে কোলে নিয়ে বসে আছে। ফুলের বাগান সহ স্কুল ঘরটি বাঁশের বেড়া দিয়ে ভালোভাবে ঘেরাও দেয়া। তবে মাঝ বরাবর ছিল একটা গেট। সে গেটের উপরটা স্বর্ণলতা নামে এক প্রকার লতা জাতীয় গাছে ঢাকা থাকতো। দেখে আমার চোখ জুড়িয়ে যেতো। ফুল বাগানটিকে বলা যায় আমাদের প্রিয় শিক্ষক ভগবানরঞ্জনের বাগান। এই বাগান দেখভাল করার দায়িত্ব তিনি নিজ কাঁধে নিয়েছেন। আমার কাছে ফুল বাগানটির অন্যরকম একটা মূল্য আছে। আমার বিশ্বাস ফুল বাগানটি স্কুলের চার পাশের মানুষদের মনে একটা সৌন্দর্যবোধ জাগিয়ে দিয়েছে। সবাই চাইতো ফুল বাগানটি সুন্দর থাকুক। এবং চাইতো বলেই বাগানটিকে গরু – ছাগলের উপদ্রব থেকে রক্ষা করতে সবাই কাজ করতো। কেউ বাগানটিকে কোনোভাবেই নষ্ট হতে দিতোনা। ফুল বাগানের গেট দিয়ে আমরা সুশৃঙ্খলভাবে বাগানে প্রবেশ করতাম। তারপর বাগান পেরিয়ে স্কুল ঘর। বাগানটা নিয়ে কী সুন্দর একটা স্কুল! স্কুল ঘর আর বাগান নিয়ে যে মূল স্কুল তার সামনে ছিল একটা মাঠ। মাঠের একপাশে ছিল একটা টিউবওয়েল বা নলকূপ। ছাত্র- ছাত্রীদের জন্য বিশুদ্ধ পানি পানের কী সুন্দর ব্যবস্থা! মাঠের দুইপাশে একেবারে মুখোমুখি অবস্থায় ছিল আম গাছের মত দুইটি বড় বড় গাছ। গাছ দুইটিকে বড় না বলে মস্ত বড় বললেও কম বলা হয়। অত বড় আকৃতির গাছ সে আমলে আমি আর কোথাও দেখিনি।
প্রত্যেকটা গাছের প্রধান কাণ্ড মাটি থেকে বার/পনের ফুট উপরে উঠেছে। তারপর সে মূল কাণ্ড থেকে চতুর্দিকে বের হয়েছে অসংখ্য শাখা। শাখাগুলো থেকে বের হয়েছে প্রশাখা উপশাখা। গাছ দুইটিতে কখনে ফুল আসতে দেখিনি, কোন রকম ফলও না। আম পাতার মত শুধু পাতায় ভরা দুইটি গাছ। আসলে কী গাছ জানি না। আমরা আম গাছ বলেই জানতাম। প্রখর রোদ বা তীব্র তাবদাহের সময় পথিকদের দেখতাম গাছ দুইটির নিচে বসে গা জুড়াতো। আমরা ছাত্র-ছাত্রীরাও স্কুল গেট খোলার আগে বাড়ি থেকে এসে জড়ো হতাম গাছ দুইটির তলায়। সে মাঠে স্কুল ছুটির পর আমরা খেলাধুলা করতাম। গ্রামের ছেলে মেয়েরা প্রচণ্ড আগ্রহ নিয়ে আসতো স্কুলে এবং যতক্ষণ স্কুলে থাকতো সবাই আনন্দে থাকতো। স্কুলে শিক্ষক ছিল তিনজন। সে তিনজনের একজন ছিলেন ভগবানরঞ্জন কুমার। ভগবানরঞ্জনের পরনে থাকত ধুতি আর সাদা পাঞ্জাবি। ধুতির কোঁচটা খুব সুন্দর করে তিনি তাঁর পাঞ্জাবির একটা পকেটে ঢুকিয়ে রাখতেন। মুখটা ছিল তাঁর দাড়ি- গোঁফ হীন আর একটা পরম পরিতৃপ্তিভাবে ভরা। মাথার চুলগুলো ছিল কোঁকড়ানো আর কাজী নজরুলের মত ঝাঁকড়া লম্বা। কে জানে, কাজী নজরুলের মাথার চুল দেখেই হয়তো তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। গাঁয়ের রঙ ছিল ফর্সা। স্বাস্থ্যে, উচ্চতায়, গায়ের রঙে, চুলের স্টাইলে ড্রেসে সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সুদর্শন একজন ব্যক্তি। কথা – বার্তায় চাল চলনেও তিনি অন্য দুইজন থেকে ছিলেন একেবারে আলাদা। তিনি ছিলেন ছাত্র- ছাত্রীদের প্রিয়, আবার ছাত্র – ছাত্রীরাও তাঁর খুব প্রিয়। তাঁর কাছে আর প্রিয় ছিল স্কুলের ফুল বাগানটি। বাগানের ফুল দেখলে তিনি যেমন উৎফুল্ল হতেন তেমনই উৎফুল্ল হতেন তাঁর ছাত্র -ছাত্রীদের দেখলে। তিনি অন্য শিক্ষকদের মত বেত নিয়ে হাঁটতেন না, অন্য শিক্ষকদের মত তিনি বেত নিয়ে ক্লাসে আসতেন না। অথচ তারপরও পুরো ক্লাস থাকতো তাঁর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে।
সে স্কুলে প্রতিবারে বিভিন্ন উপলক্ষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। উপলক্ষ্যগুলো কি তা মনে নাই, মনে থাকার কথাও না। এই যেমন প্রতিদিন গাওয়া ” পাকসার জমিন সাদবাদ, কিসোয়ারে হাসিন — ”। জাতীয় সঙ্গীত কী আর মনে আছে? না, মনে নাই। সেসব অনুষ্ঠানের জন্য আমরা মুখিয়ে থাকতাম। অনুষ্ঠানের পুরো সময়টা কাটতো আমাদের অনাবিল আনন্দে। গান হতো, কবিতা আবৃত্তি হতো। শিক্ষকদের মধ্য থেকে গান পরিবেশন করতেন আমাদের প্রিয় শিক্ষক ভগবানরঞ্জন কুমার। তিনি গান গাইবেন বলে সেদিন আসার সময় হারমোনিয়াম নিয়ে আসতেন।বসে তাঁর ডান হাতটা রাখতেন হারমোনিয়ামের কীবোর্ডের উপর আর রীডবোর্ডের পেছনে কামারের হাপারের মত থাকা বিলাউ শক্ত করে ধরতেন তাঁর বাঁ হাত দিয়ে। তারপর শুরু করতেন গান গাওয়া। গানের সাথে বাজাতে থাকতেন হারমোনিয়াম। এদিকে দুই হাতের কারুকাজে হারমোনিয়াম থেকে বের হতো গানের সাথে চাহিদা মত লাগসই সব শব্দ। হারমোনিয়ামে উৎপাদিত শব্দ গানকে করে তুলতো আরো শ্রুতিমধুর, আরো আকর্ষণীয়। এভাবে হাসি আনন্দে দিন কেটে যেত। আমাদের সে স্কুলে মাঝে মাঝে নাটক মঞ্চস্থ হতো। দর্শকদের উপস্থিতিতে মাঠ ভরে উঠতো। সুশ্রীর অধিকারী ছিলাম বলে নাটকের নারী চরিত্রে অভিনয় করার দায়িত্ব আমার উপর পড়তো। কতটুকু কী রকম অভিনয় করেছি তা জানি না, তবে দর্শকদের মূহুর্মুহু হাততালির কথা আজো মনে পড়ে। সে আমলে আমার কোনরূপ কূপমুন্ডতা দেখিনি। এখনকার চেয়ে মানুষ সে আমলে আরো উদার এবং সংস্কৃতি মনা ছিল বলে আমার বিশ্বাস। ষাট বছর আগেও গ্রামে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড অনুষ্ঠানে কোন দিক থেকে কোনরূপ বাধা আসেনি। গান-বাজনা, কবিতা, নাটক, খেলাধুলা, লেখা – পড়া নিয়ে গ্রামের হিন্দু মুসলমান সবাই মিলে মিশে থেকে এক আনন্দ মুখর পরিবেশে উদার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বড় হয়েছি, আমাদের শৈশব কেটেছে। শুধু আমাদের গ্রাম না সে সময় সারা বাংলাদেশটাই এরকম ছিল। তাইতো শাহ আব্দুল করিম লিখে গেয়েছেন কালজয়ী সে গান —” আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম /গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান /মিলিয়া বাউলা গান আর মুর্শিদী গাইতাম।”
এ স্কুলে আমরা পেয়েছি সাম্য, মৈত্রী, কর্মনিষ্ঠতা আর পরিষ্কার – পরিচ্ছন্নতা বোধ জাগরণের মত মহান শিক্ষা । স্কুলে কোন ঝাড়ুদার ছিল না। স্কুলকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব ছিল ছাত্র- ছাত্রীদের আর একাজে আমাদের লিডার ছিলেন আমাদের প্রিয় শিক্ষক ভগবানরঞ্জন কুমার। তিনি নিজে আমাদের সাথে থেকে আমাদের শেখাতেন কীভাবে কাজ করতে হয়, কীভাবে ফুল বাগানের ঘাস পরিষ্কার করতে হয়, কীভাবে গাছে পানি দিতে হয়, ইত্যাদি সব। মাঝে মাঝে মাঠ পরিষ্কার করার বড় দায়িত্বও আমাদের উপর পড়তো। সেখানেও থাকতেন আমাদের প্রিয় শিক্ষক ভগবানরঞ্জন কুমার। সবাইকে তিনি মাঠে নামিয়ে দিতেন। কে গরীবের ছেলে কে ধনীর ছেলে, কার বাড়িতে চাকর চাকরানী আছে কার বাড়িতে নাই, এসব তিনি ভাবতেন না। তাঁর কাছে সবাই সমান, সবাইকে কাজ করতে হবে।
স্কুলতো আর বন্ধ হয় না। আমার প্রিয় স্কুলটিও আছে, চলছে। তবে স্কুলের আগের সে অবয়ব, সে সৌন্দর্য আর নাই। ফুল বাগানের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে গেছে সেই কবে! বেড়া নাই, গেট নাই। স্কুল ঘরটি যেন উলঙ্গ। মাঠ সেই আগের মত নাই। মাঠের বিশাল আম গাছ দুটি নাই। মাঠের এক পাশে মসজিদ তৈরি হয়েছে। মসজিদের সামনে মাঠের বড় একটা অংশ এখন ঈদগাহ। বাউন্ডারি ওয়াল দিয়ে ঈদগাহকে পৃথক করে রাখা হয়েছে। ঈদগাহটা মোটামুটি পরিষ্কার। কিন্তু স্কুলের মূল অংশে পরিচ্ছন্নতার কোন বালাই নাই। ভগবানরঞ্জন কুমারের মত কোন শিক্ষক এখন আর নাই। এখন শিক্ষক যারা আছেন তাঁরা ক্লাসে পাঠদান করাকেই কেবল তাদের দায়িত্ব মনে করেন। কোমলমতি শিশুদেরকে জীবনধর্মী আর কোন শিক্ষা দেওয়া হয় না। আমি প্রাইমারি স্কুল ছেড়েছি ১৯৬৪ সালে। ১৯৬৫ সালে পাক – ভারত যুদ্ধ হয়। যুদ্ধ শুরু হলে আমাদের গ্রামের কিছু হিন্দু বিশেষ করে শিক্ষক বা শিক্ষিত হিন্দুরা দেশ ত্যাগ করে ভারতে চলে যায়। কিন্তু ভগবানরঞ্জন কুমার কিছুদের দলে নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করেননি। তিনি ভারতে পাড়ি দেননি। জন্মভূমির প্রতি প্রচণ্ড ভালোবাসা বুকে নিয়ে আর ভগবানের ওপর ভরসা করে ভগবানরঞ্জন কুমার জন্মভূমিতে রয়ে গেছেন এবং জন্মভূমিতেই সুখ খুঁজেছেন।
লেখক : প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

x