বয়সের সাথে বাড়ুক সৌন্দর্য

রুহি আফরোজ

রবিবার , ১৩ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৯:০০ পূর্বাহ্ণ
889

প্রাকৃতিক নিয়মেই সব সৃষ্টির বয়স বাড়ে। বয়স বাড়লে নানা শারীরিক পরিবর্তন দেখা দেয়। বয়স বাড়ার সাথে সাথে কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার পাশাপশি চেহারায় বয়সের নানান চিহ্ন দেখা দেয়। চোখের কোলে, নাকের দুপাশে কিংবা কপালের পাশে দেখা দেয় বলিরেখা কিংবা চামড়ায় ভাঁজ পড়ে। অনেকের ক্ষেত্রেই ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপসহ নানারকম রোগব্যাধি দেখা দিতে শুরু করে। কেউ কেউ শরীরের নানা অংশে ব্যথায় ভুগতে থাকেন। সব মিলিয়ে বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমাদের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা আর কর্মক্ষম থাকার সময় দুইই কমে যায়। তাই বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমাদের জীবনে জড়তা যেন না আসে সে ব্যাপারে সচেতন হতে হবে আগেভাগেই।
অল্প বয়স থেকেই সঠিক খাদ্যাভ্যাস মেনে চলা, নিয়মিত ব্যায়াম করা এবং ত্বকের যত্ন নিতে শুরু করলে শারীরিক ও মানসিক দুইভাবেই বার্ধক্য আসা পেছানো সম্ভব। তাছাড়া বর্তমান সময়ে মানুষের গড় আয়ু বেড়ে যাওয়ার কারণে এখন বার্ধক্য আসা পিছিয়েও গেছে। একসময় যা ছিল মধ্যবয়স, এখন সেটাই তারুণ্য।
‘এজিং’ বা বয়স বাড়া রুখে দেয়া না গেলেও কিছু সচেতনতা অবলম্বন করলে বয়স বাড়াকে ইতিবাচক ও সুস্থতার সাথে জয় করা যায় সহজেই।
মেকআপ বা অপারেশনে সমাধান না খুঁজে নিয়মিত ত্বকের যত্ন নিন
যেকোন বয়সেই মেকআপের উদ্দেশ্য হওয়া উচিৎ স্বাভাবিক সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে তোলা, চেহারার বৈশিষ্ট্য ঢাকা নয়। কিন্তু বয়সের সাথে সাথে আমাদের চেহারায় ও ত্বকে আসা পরিবর্তন দেখে আতঙ্কিত হয়ে অনেকেই মেকআপ দিয়ে সেসব চিহ্ন ঢাকতে চেষ্টা করেন। এটা করা একদমই উচিৎ না। বরং নিয়ম করে ত্বকের যত্ন নিন। প্রতিদিন ত্বক পরিষ্কার করতে হবে, নিয়ম করে সারা গায়ে ময়েশ্চারাইজার মাখতে হবে। কোলাজেন উৎপাদন করে এমন প্রসাধনী ব্যবহার করতে চেষ্টা করুন। কারণ বয়সের সাথে সাথে ত্বকে কোলাজেন উৎপাদন কমে যায় যা ত্বকের টানটান ভাব বজায় রাখে। প্রসাধনী কেনার সময় তাই পণ্যের গায়ে উপাদান আর গুণাবলী দেখে কেনা উচিৎ।
শুধুমাত্র মুখের যত্ন নিলেই হবে না, সমপরিমাণ যত্ন নিতে হবে কাঁধ এবং হাত পায়ের। কারণ কাঁধ, গলা ও হাত পায়ের চামড়া কুঁচকে গেলে বয়স্ক দেখায়। মুখ ধোয়ার সময় নিয়ম করে কাঁধ ও গলা পরিষ্কার করে ময়েশ্চারাইজার মাখতে হবে।
এছাড়াও তারুণ্যদীপ্ত ত্বকের জন্য সারাবছরই বাইরে যাওয়ার সময় এসপিএফসমৃদ্ধ সানব্লক মাখতে হবে। সূর্যালোক ত্বকের বুড়িয়ে যাওয়ার জন্য অনেকটাই দায়ী। তাই যতটা সম্ভব রোদ এড়িয়ে চলতে হবে।
ত্বক টানটান করার জন্য অনেকে ছুরি কাঁচির নীচে নিজেকে সঁপে দেন। কিন্তু নিয়মিত সঠিক নিয়মে মাসাজ করলে এবং সঠিকভাবে যত্ন নিলে তারুণ্যে ঝলমলে ত্বক ধরে রাখতে পারবেন দীর্ঘদিন।
যখনই চেহারায় বয়সের লক্ষণ যেমন ত্বকের শুষ্কতা, কুঁচকানো ভাব বা উজ্জ্বলতা হারাতে শুরু করবে, তখনই সচেতন হতে হবে। ত্বকের সমস্যার ধরণ বুঝে প্রসাধনী ও ত্বক পরিচর্যার উপাদান বেছে নিন। প্রয়োজনে একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ বা রূপচর্চা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। কারও ত্বকে যদি গুরুতর কোন সমস্যা থাকে তবে চাইলে লেজারের সাহায্যও নিতে পারেন। অনেকেই শরীরের বাড়তি পশম বা ত্বকে থাকা গভীর ক্ষতের দাগ নির্মূলের জন্য লেজার ট্রিটমেন্টের সাহায্য নিয়ে থাকেন। সেক্ষেত্রে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেবেন।
বাজারে প্রচলিত এন্টি এজিং ক্রিম ব্যবহার না করে প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে তৈরি ফেসপ্যাক ব্যবহার করুন। আর মাসাজ করতে নারকেল তেল বা অলিভ অয়েল ব্যবহার করুন।
বয়সের সাথে সাথে চুলের কাট, পোশাকের ধরন এমনকি সাজগোজের ধরনেও কিছুটা মার্জিত রুচির ছাপ আসলে দেখতে ভালো লাগবে।
সঠিক খাদ্যাভ্যাস
বলা হয়ে থাকে ত্বকে আমাদের খাদ্যাভ্যাসের প্রতিচ্ছবি পড়ে । শরীরে বয়স বাড়ার লক্ষণ দেখা দেওয়া পিছিয়ে দিতেও খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রনের বিকল্প নাই তাই। এখন ক্লিন ইটিং টার্মটা বেশ জনপ্রিয়। অর্থাৎ যতটা সম্ভব অরগ্যানিক বা ভেষজ খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা। অতিরিক্ত লবণ, চিনি, ভাজাভুজি, চর্বিযুক্ত মাংস, মাখন, চিনি, লবণ আর প্যাকেটে প্রক্রিয়াজাত খাবার যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে। খাদ্যতালিকায় রাখুন বেশি বেশি শাকসবজি, ফল, বাদাম আর চর্বিমুক্ত দুধের তৈরি খাবার।
গবেষণা বলছে ভেষজ খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুললে তা হৃদরোগ, ক্যানসার, পারকিসনস আর আলঝেইমারসের মত রোগের প্রতিরোধ তৈরি করে। খাবারে কৃত্রিম উপাদান বা রাসায়নিক মেশালে বয়সের সাথে সাথে নানারকম রোগ হওয়ার জন্য যেসব ক্রোমোজোম দায়ী তাদের কার্যক্রম বদলে দেয়।
আঁশ বেশি এমন খাবার খেলে শুধু যে দীর্ঘক্ষণ পেট ভরিয়ে রাখে, তাই না, এটা কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে, হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়, টাইপ টু ডায়াবেটিস এবং কোলন ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি কমায়।
একটু বয়স বেড়ে যাওয়ার পর অনেকেই কোষ্ঠ্যকাঠিন্যে ভুগে থাকেন। কোষ্ঠ্যকাঠিন্য যাতে না হয় তাই নিয়মিত বেশি করে আঁশ জাতীয় খাবার খেতে হবে। পঞ্চাশ বছর বয়সের পর পুরুষদের দিনে অন্তত ৩০ গ্রাম আঁশসমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে আর মহিলাদের জন্য পরিমাণটা ২১ গ্রাম। নিয়মিত কোষ্ঠ্য পরিষ্কার হলে ত্বকে সহজে ব্রণ বা অন্য সমস্যা দেখা দেবে না।
নিয়মিত ব্যায়াম অবশ্যই
নিয়মিত ব্যায়াম করলে মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল ও অক্সিজেনের সরবরাহ বাড়ায়। ফলে আলঝেইমারস বা স্মৃতিভ্রম রোগের সম্ভাবনা কমে যায়। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে নিয়মিত অ্যারোবিক এক্সারসাইজে স্মৃতিভ্রম রোগের লক্ষ্মণ ও সম্ভাবনা দূর করে।
কিছু না হোক, প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট করে হাঁটুন। একটানা না পারলে সারাদিনে কয়েক ভাগ করে হাঁটুন। নিয়মিত হাঁটলে বা ব্যায়াম করলে-
ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকবে
মুড চনমনে থাকবে
হাঁড় ও পেশি মজবুত হবে
ভালো ঘুম হবে
এছাড়াও হৃদরোগ, টাইপ টু ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ আর উচ্চ মাত্রার কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণেও সাহায্য করে নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম।

x